ঢাকা, শনিবার ২০ জুলাই ২০১৯, ০৫ শ্রাবণ ১৪২৬, ১৬ যিলক্বদ ১৪৪০ হিজরী।

জাতীয় সংবাদ

অর্থমন্ত্রীর চিঠি মানছে না জনপ্রশাসন

প্রশাসনে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাড়ছে

পঞ্চায়েত হাবিব | প্রকাশের সময় : ৭ নভেম্বর, ২০১৭, ৭:১২ পিএম

প্রশাসনে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বেড়েই চলেছে। সরকারের আস্থাভাজন কর্মকর্তারা অবসরের পরও চাকরিতে বহাল থাকছেন। এতে যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও প্রশাসনের শীর্ষপর্যায়ের পদগুলোতে পদোন্নতি হচ্ছে না অনেকের। এতে কর্মকর্তাদের একটি অংশ পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এদিকে নতুন করে আবার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ঘটনায় প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। পাশাপাশি আগের মতো প্রেষণে নিয়োগ নিয়েও নিয়মিত কর্মকর্তাদের মধ্যে আপত্তি আছে।
সরকারের উচ্চ পদগুলোতে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের প্রক্রিয়া তো থামেইনি, উল্টো বেড়েছে। চলতি মাসেই শুধু সচিবপর্যায়ে দু’জন সচিবকে আবার চুক্তিতে নিয়োগ দিয়েছে সরকার। বর্তমানে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাকরির বয়স ৫৯ বছর, আর মুক্তিযোদ্ধাদের অবসরের বয়স ৬০ বছর। বিশেষায়িত ও কারিগরি পদের ক্ষেত্রে যেখানে দক্ষ লোকের সংখ্যা খুবই কম সেখানে শুধু চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া যেতে পারে। কিন্তু দেখা গেছে, যাদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া হচ্ছে তারা কেউই ওই সব পদে অপরিহার্য নন।
চলমান চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের বিরোধিতা করে ২০১৪ সালের ১ মার্চ জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ও মন্ত্রী কাছে একটি চিঠি পাঠিয়েছিলেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের জন্য একটি নীতিমালা প্রণয়নের তাগিদ দিয়েছিলেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। কিন্তু পরিস্থিতি পাল্টায়নি, বরং এ প্রক্রিয়া আরো বেড়েছে।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এম হাফিজ উদ্দিন খান ইনকিলাবকে বলেন, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের বহুবিধ ক্ষতিকর প্রভাব রয়েছে। এখন চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের মূল শর্ত হলো দলীয় মনোভাব, দলীয় আনুগত্য। এটা প্রশাসনের ভারসাম্য নষ্ট করে। অনেকের প্রমোশনের পথ বন্ধ হয়ে যায়, যা কর্মকর্তাদের হতাশ করে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ক্ষুব্ধ কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে ঢালাও পদোন্নতির ফলে জনপ্রশাসনে এমনিতেই পর্যাপ্ত পদ নেই। পদোন্নতি পেয়েও অনেক কর্মকর্তাকে দীর্ঘদিন ধরে এক স্তর নিচের পদে কাজ করতে হচ্ছে। অনেককে কোনো দপ্তর না দিয়ে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করে রাখা হচ্ছে। এ অবস্থায় আবারও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে সমস্যা বাড়াবে।
সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার ইনকিলাবকে বলেন, যেখানে নিয়মিতদের মধ্যে উপযুক্ত কর্মকর্তা আছেন, সেখানে কোনোভাবেই চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া উচিত নয়। তবে উপযুক্ত কর্মকর্তা না থাকলে চুক্তিতে নিয়োগ হতে পারে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রশাসনে ৭১৫ জন অতিরিক্ত সচিব, ৮০২ জন যুগ্মসচিব ও এক হাজার ৫৫৫ জন উপসচিব রয়েছেন। যদিও অতিরিক্ত সচিবের স্থায়ী পদের সংখ্যা এক শ’র কিছু বেশি। আর যুগ্মসচিবের নিয়মিত পদের সংখ্যা সাড়ে ৪০০ ও উপসচিবের নিয়মিত পদ সাড়ে আট শ’র মতো।
জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. কামাল আব্দুল নাসের চৌধুরীর চাকরিতে চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে ডিসেম্বরে। আবারও তিনি চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া হবে। গত ১৭ আগস্ট চুক্তিতে আরো দুই বছরের জন্য গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব পদে নিয়োগ পান মো: শহীদউল্লাহ খন্দকার। একই দিন দুই বছরের জন্য আবারো চুক্তিতে নিয়োগ পান স্থাপত্য অধিদফতরের প্রধান স্থপতি গোলাম নাসির। এর আগে ৭ আগস্ট চুক্তিতে দুই বছরের জন্য নিয়োগ পান আইন ও বিচার বিভাগের সচিব আবু সালেহ শেখ মো: জহিরুল হক। এ নিয়োগ উচ্চ আদালত স্থগিত ঘোষণা করলেও চেম্বার জজ তা দুই মাসের জন্য স্থগিত করেছেন। গত ২৮ জুন সচিব পবন চৌধুরীর অবসরোত্তর ছুটি (পিআরএল) বাতিল করে দুই বছরের জন্য তাকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের ( বেজা) নির্বাহী চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। ১ ফেব্রুয়ারি চুক্তিতে এক বছরের জন্য বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) চেয়ারম্যান হন অবসরোত্তর ছুটিতে থাকা মেজর জেনারেল মঈন উদ্দিন। একই দিন ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদফতরের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী আহাম্মেদ খানের মেয়াদও চুক্তিতে দুই বছর বেড়েছে। ২৫ জানুয়ারি চুক্তিতে আরো এক বছরের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সিনিয়র সচিব নিয়োগ পান অবসরে যাওয়া সুরাইয়া বেগম। চলতি বছরের ৩১ মে অতিরিক্ত সচিব হোসনে আরার পিআরএল বাতিল করে চুক্তিতে তাকে দুই বছরের জন্য বাংলাদেশ হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (সচিব পদমর্যাদায়) নিয়োগ দেয়া হয়। এ ছাড়া চলতি বছর অবসরোত্তর ছুটিতে থাকা অতিরিক্ত সচিব তরুণ কান্তি ঘোষকে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের ভাইস চেয়ারম্যান নিয়োগ দেয়া হয়। পেট্রোবাংলার কর্মকর্তা জামিল আহমেদ আলিমের অবসরোত্তর ছুটি বাতিল করে এক বছরের জন্য পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মাইন্স) পদে চুক্তি ভিত্তিতে নিয়োগ দেয়া হয়। গত ৩১ মে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিসের (বিআইআইএসএস) বোর্ড অব গভর্নর্সের চেয়ারম্যান পদে মুন্সী ফয়েজ আহমেদ আবারো দুই বছরের জন্য নিয়োগ পান।
গতকাল মঙ্গলবার জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব নাজিমউদ্দিন চৌধুরীকে ছয় মাসের চুক্তিতে এই বিভাগের সচিব হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে সরকার। ১৯৮৪ সালের বিসিএস ব্যাচের নিরীক্ষা ও হিসাব ক্যাডারের এই কর্মকর্তার অবসরোত্তর ছুটি (পিআরএল) বাতিলের শর্তে আগামী ১০ নভেম্বর থেকে পরবর্তী ছয় মাস, অর্থাৎ আগামী ৯ মে পর্যন্ত সচিব পদে নিয়োগ দিয়েছে মন্ত্রণালয়। ২০১০ সালের ২১ নভেম্বর যুগ্ম-সচিব এবং ২০১৪ সালের ১৩ জানুয়ারি অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতি পান নাজিমউদ্দিন। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব থাকাকালে ২০১৫ সালের ১৩ ডিসেম্বর এই বিভাগের ভারপ্রাপ্ত সচিব এবং ২০১৬ সালের ১৪ জুন সচিব পদে পদোন্নতি পান তিনি। নাজিমউদ্দিন পদাধিকারবলে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের নিয়ন্ত্রণাধীন এবং রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ছয়টি প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে আছেন। এদিকে নাজিমউদ্দিন ছয়টি প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন কালে তিতাস ও বাপেক্স নিয়ে বিভিন্ন অনিয়ম দুনীতি অভিযোগ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়সহ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে থাকার পর ছয় মাসের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়ো দেয়া হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সচিব বলেন, প্রভাবশালী এক মন্ত্রীর কারণে এ চুক্তি দেয়া হয়েছে। এদিকে আরেক আদেশে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালের অধ্যাপক (ক্লিনিক্যাল নিউরোসার্জারি) ডা. শেখ সাদের হোসেনের চুক্তির মেয়াদ আরও দুই বছর বাড়িয়েছে সরকার। গত ২০ অক্টোবর থেকে পরবর্তী দুই বছরের জন্য এই চুক্তি কার্যকর হবে। ২০১৬ সালের ১৭ অক্টোবর চুক্তিতে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালের অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ পান ডা. সাদের হোসেন। বাংলাদেশ শিশু একাডেমির পরিচালক আনজীর লিটনের চুক্তির মেয়াদও আগামী ২০ নভেম্বর থেকে পরবর্তী দুই বছর বাড়িয়েছে সরকার। ২০১৬ সালের ২০ নভেম্বর চুক্তিতে শিশু একাডেমির পরিচালক পদে নিয়োগ পান তিনি। চুক্তির আগের শর্ত অপরিবর্তিত রেখে ডা. শেখ সাদের হোসেন এবং আনজীর লিটনকে নতুন করে চুক্তিপত্র করতে হবে বলে প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়েছে।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন