ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর ২০২০, ১৬ আশ্বিন ১৪২৭, ১৩ সফর ১৪৪২ হিজরী

জাতীয় সংবাদ

জীবন বড়ই মধুর : অসাধারণ ভালো মানুষে ভরা এ পৃথিবী

ব্রাসেলসে সন্ত্রাসী হামলা : গর্ভের ১৬ সপ্তাহের সন্তানকে এক মায়ের চিঠি

প্রকাশের সময় : ২৮ মার্চ, ২০১৬, ১২:০০ এএম

ইনকিলাব ডেস্ক : প্রচ- আওয়াজ, দম বন্ধ হয়ে আসা কালো ধোঁয়া, চার দিকে ধ্বংস¯ূÍপ, রক্তে ভেসে যাওয়া প্রাণহীন মানুষ আর আহতদের আর্তনাদ ও ভয়-ভীতি এসব এখন আর তার কাছে খুব বেশি স্মরণীয় নয়। তার পরিবর্তে মনুষত্ববোধে উজ্জীবিত অপরিচিত মানুষদের উদারতা ও মানবিকতা তার কাছে এখন বেশি স্মরণীয়। ব্রাসেলস বিমানবন্দরে সন্ত্রাসী হামলার প্রত্যক্ষদর্শী ¯েœহার কাছে মানুষের মানবিকবোধই বেশি শ্রেয়। তিনি এবং তার স্বামী সমীপ মেহতা আবুধাবি থেকে বিমানে করে যে মুহূর্তে ব্রাসেলস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছেন তখনই পরপর বোমা বিস্ফোরণে বিমানবন্দর কেঁপে ওঠে। বিস্ফোরণের তা-বে উপর থেকে থেকে সিলিং তাদের মাথার ওপর পড়তে শুরু করে।
অ্যারাইভাল এরিয়া গ্রাউন্ড লেভেলের নিচে এবং তখন কি করতে হবে এটা বোঝাও খুব কঠিন। সমীপের হঠাৎ মনে হয়েছিল যে, তাদের মাটিতে শুয়ে পড়া উচিত যদি বন্দুকযুদ্ধ শুরু হয়ে যায় তাহলে আত্মরক্ষার উপায় হিসেবে মাটিতে শুয়ে পড়াই শ্রেয়। তবে পরক্ষণেই সে চিন্তা বাদ দিয়ে তারা সেখান থেকে বের হওয়ার চেষ্টা চালানোর সিদ্ধান্ত নেন।
¯েœহা ফোনে সিএনএনের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, আমরা প্রথমে বুঝতে পারছিলাম না কোন দিকে দৌড়াব। মুহূর্তে তার মনে হয়েছিল যে, তিনি হয়তো মারা যাচ্ছেন। তবে মৃত্যুভয়ে ভীত ছিলেন না। কারণ ভালোবাসার মানুষটি যে তার পাশেই ছিলেন। ভালোবাসার মানুষ স্বামী পাশে থাকায় মৃত্যুভয়ে তিনি ভেঙে পড়েননি। তখন মৃত্যুচিন্তা সরে গিয়ে বাঁচার চিন্তা মাথায় আসে। সৌভাগ্যবশত বিমানবন্দর থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজে পান। কোনোমতে পার্কিং গ্যারেজের দিকে এগিয়ে যান। সেখানে গিয়ে আরো অনেককে দেখেন। লোকজন গাড়ির পেছনে আত্মরক্ষার চেষ্টা করছিল, অনেকে ভয়ে পাথর হয়ে গিয়েছিল। অনেকে কাঁদছিল। অনেকে উ™£ান্তের মতো এদিক-সেদিক দৌড়াদৌড়ি করছিল।
পুলিশ ও উদ্ধারকারীরা সাথে সাথেই সেখানে হাজির হয় এবং লোকজনকে সাহায্য করতে সম্ভব সবকিছুই তারা করেন। তখন তার নিশ্চিত মনে হয়েছিল যে, তিনি বাঁচবেন। তিনি বললেন, ‘আমি নিশ্চিত ছিলাম যে, আমি বাঁচব এবং আমার অনাগত সন্তানের জন্যই আমার মনে এই বিশ্বাস জোরালো ছিল।’ ব্রাসেলসে আক্রান্ত হওয়ার সময় ¯েœহার গর্ভে ১৬ সপ্তাহের অনাগত সন্তান।
মেহেতা দম্পতি মহাসড়কের দিকে কোনোমতে দৌড়ান। হাইওয়েতে তাদেরকে তুলে নিতে একটি ক্যাব থামে। ক্যাবচালক তাদের কেবল হাসপাতালেই নিয়ে যাননি। যাওয়ার সময় গোটা সময়জুড়ে তাদের সঙ্গে কথা বলেছেন। সেই মানসিক বিপর্যস্ত অবস্থার সময় মানুষের সঙ্গে কথা বলা তাদের জন্য খুবই জরুরি ছিল।
এরপর সিন্ট অগাস্টিনাস হাসপাতাল। সেটা ছিল তাদের জন্য এক অনির্বচনীয় খুশির মুহূর্ত। প্রথমেই আল্ট্রাসাউন্ড পরীক্ষা করা হয়। দেখা যায় তার গর্ভের সন্তান খুবই ভালো অবস্থায় রয়েছে। আল্ট্রাসাউন্ড পরীক্ষায় তারা জানতে চাননি সন্তান ছেলে না মেয়ে শুধু জানতে চেয়েছেন সে ভালো আছে তো ? আল্ট্রাসাউন্ড পরীক্ষায় যে ছবি ভেসে আসে তাতে দেখা যায় সন্তান স্বাস্থ্যবান এবং মায়ের পেটে নিরাপদ অবস্থায় রয়েছে। মায়ের পেটে সন্তানটি তার হাতের বুড়ো আঙ্গুল চুষছে।
সন্তানের অবস্থা জানার পর ¯েœহা অনুভব করলেন এখন তার জীবনে যা ঘটেছে সে কথা তার সন্তানের জন্য লিখে রাখবেন। অনাগত সন্তানের জন্য লেখা তার এই চিঠি হয়তো খোলা হবে যখন তার বয়স হবে ১৬ বছর বা তারচেয়েও বেশি।
তিনি ভাবছিলেন এখন সবকিছু তাজা তাকতে থাকতেই লেখা দরকার। পরে এসব ঘটনা ধূসর হয়ে যেতে পারে। তিনি সন্তানের উদ্দেশে লেখা শুরু করেন।
‘হাই সুইটহার্ট’ সম্বোধন করে অনাগত সন্তানকে লেখা শুরু করেন। তিনি লেখেন, আমরা তোমাকে জানাচ্ছি যে, তুমি যখন ১৬ সপ্তাহের ছিলে তখন তোমার মা ও বাবা ব্রাসেলস বিমানবন্দরে এক ভয়াবহ বোমা বিস্ফোরণের শিকার হয়েছিল। সেই ঘটনার চেয়ে তোমাকে যেটা বলতে চাই তা হলো মানবতা আজ আমরা এখানে যা দেখলাম সেটাই তোমাকে বলতে চাই। তোমাকে বলতে চাই জীবন খুবই মধুর ও বিস্ময়কর এবং এই পৃথিবী সত্যি অসাধারণ ভালো মানুষে ভরা। তুমি বাবা-মাকে বেঁচে থাকার বিশ্বাসই কেবল যোগাওনি তোমার উপস্থিতি আমাদের সাহস ও সাবধানতা বাড়িয়ে দিয়েছে। মানসিক শক্তি যুগিয়েছে যা আগে কখনো তেমন অনুভব করিনি।
আগের চেয়ে এখন আমি নিজেকে বেশি জীবন্ত মনে করি এবং আমি জানি যে, তোমাকে নিরাপদ ও রক্ষা করতেই হবে এবং এ জন্য আমি শান্ত ও ধৈর্য ধারণ করছি। এখন আমার পূর্ণ বিশ্বাস যে, আমরা বেঁচে থাকব। তুমি আমাদের কাছে মহামূল্যবান এবং তুমি ইতোমধ্যেই আমাদের কাছে আজকের নায়কে পরিণত হয়েছ।
আমরা যখন সিন্ট অগাস্টিনাস হাসপাতালে জরুরি বিভাগে পৌঁছাই এবং আল্ট্রাসাউন্ড পরীক্ষায় দেখতে পাই যে তুমি ভালো আছো, নড়াচড়া করছে এবং বুড়ো আঙ্গুল চুষছো তখন এই সন্ত্রাসী হামলার জন্য সকল যন্ত্রণা, দুঃখ- বেদনা, সকল অবিশ্বাস, ঘৃণা, রাগ-ক্ষোভ মুহূর্তেই দূর হয়ে যায়।
আমি সর্বান্তকরণে বিশ্বাস করি, তুমি আরো ভালো পৃথিবীতে আসছ। যদি তা না হয় তাহলে এই পৃথিবীকে ভালোভাবে গড়ে তুলতে সর্বোত্তম চেষ্টা করবে। আমি মনে করি এই পৃথিবী এতই প্রেম ও ভালোবাসা ছড়িয়ে দিয়েছে যে, তোমার আগমন আমাদের কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সুখ। তোমার জীবন যে জিনিসের কাছে ঋণী তা হলো মানুষের মানবতা ও উদারতা।
ভালো থেকো এবং সাহসী হও। তোমাকে আমাদের অনেক অনেক ভালোবাসা। ইতি- মা ও বাবা।
এখন ¯েœহা যখনই সেদিনের কথা ভাবেন, তখন আর সেই গুটিকয়েক বিবেকবর্জিত মানুষের কথা ভাবতে চান না। যারা মানুষের মধ্যে ঘৃণা সৃষ্টির জন্য এ ধরনের মানবতাবিরোধী হামলা চালাতে পারে তাদের কথা এখন তিনি আব ভাবতে চান না। বরং তার বদলে মনুষ্যত্বে উজ্জীবিত মানুষদের কথা ভাবতে চান। তাদের কথা ভাবতে চান যারা মানুষের সাহয্যে এগিয়ে আসেন এবং সকল আন্তরিকতা দিয়ে বিপন্ন মানুষকে সহায়তা প্রদানে সর্বাত্মক চেষ্টা করেন। স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে হতাহত মানুষদের উদ্ধারে যারা এগিয়ে এসেছে, রাস্তায় যেসব চালক মহাসড়কে তাদের গাড়ি থামিয়ে আহত মানুষদের উদ্ধার করেছে। বিপন্ন মানুষদের সাহায্যে যারা এগিয়ে এসেছে মাবনতাবোধসম্পন্ন এসব মানুষের কথাই তার বেশি মনে পড়ে।
তিনি বলেন, এসব মানুষের জাতি-ধর্ম-বর্ণ বলে কিছু নেই, তারা শুধুই মানুষ। আর এভাবেই আমরা মানুষের সমাজে মিলেমিশে বসবাস করি। এসব মানুষ মনে করে মানুষের জীবন অন্যকে সেবা করার জন্যই। যা বিপদের সময় তাদের এগিয়ে আসার প্রেরণা যোগায়। তিনি বলেন, ব্রাসেলসে যা ঘটেছে তা খুবই দুর্ভাগ্যজনক। কিছু মানুষ ঘৃণ্য কাজ করলেও এখনো পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষই ভালো এবং এ জন্যই পৃথিবী এখনো এত সুন্দর। সূত্র : সিএনএন

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন