মঙ্গলবার, ১৭ মে ২০২২, ০৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯, ১৫ শাওয়াল ১৪৪৩ হিজরী

সম্পাদকীয়

খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী সহনশীল ইসলামের ভিত রচনা করে গেছেন

| প্রকাশের সময় : ২৬ মার্চ, ২০১৮, ১২:০০ এএম

মিতবাক
সুলতানুল হিন্দ হযরত খাজা মঈনুদ্দিন চিশতী (রহ) এর ওফাত দিবস ছিল গতকাল। এ উপলক্ষে বাংলাদেশসহ উপমহাদেশের বিভিন্ন স্থানে যথোপযুক্ত মর্যাদায় ওরশ, মিলাদ, কোরআনখানি ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। উপমহাদেশে ইসলাম প্রচার ও প্রতিষ্ঠায় যেসব পীর-আউলিয়া-দরবেশের অবদান অবিস্মরণীয় হয়ে আছে, হযরত খাজা মঈনুদ্দিন চিশতী (রহ) তাদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয়। তিনি পিতার দিক থেকে হযরত ইমাম হোসাইন (রা.) এবং মাতার দিক থেকে হযরত ইমান হাসান (রা.) এর বংশধর ছিলেন। হিজরি ৫৩৭ সালে ইস্ফাহানে তার জন্ম হয়। তিনি ইন্তেকাল করেন হিজরি ৬৩৩ সালে আজমীরে। আজমীরে তার সমাধি অবস্থিত। বিগত ৮০০বছরের অধিককাল তার এই অন্তিম শয়ানস্থল অর্থাৎ আজমীর উপমহাদেশের অন্যতম প্রধান আধ্যাত্মিক কেন্দ্র হিসাবে বিবেচিত হয়ে আসছে। প্রতিদিন অসংখ্য ভক্ত-অনুরাগী তার মাজার জেয়ারত করেন। শুধু মুসলমানরাই নন, বিভিন্ন ধর্মের শত-সহ¯্র মানুষ প্রতিদিন মাজারে উপস্থিত হয়ে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করেন। তাদের আশা-প্রত্যাশা ও কামনা-বাসনার কথা আল্লাহর নিকট ব্যক্ত করেন। খাজা বাবার দরবার থেকে কেউ কখনো খালি হাতে ফিরে আসেন না, আল্লাহর দেয়া সম্মান বা কারামত হিসাবে যা ওলি-আউলিয়াগণ প্রাপ্ত হন, এমন একটি বিশ্বাস ও প্রবাদ প্রচলিত হয়ে আছে। শত শত বছর ধরে বহু সুলতান, বাদশাহ ও শাসক ভারত শাসন করেছেন। তারা হিন্দ বা ভারতের রাজনৈতিক বা রাষ্ট্রীয় শাসক, কিন্তু হযরত খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী (রহ) হলেন ভারতের আধ্যাত্মিক সুলতান। সুলতান, বাদশাহ ও শাসকের পরিবর্তন হলেও ‘সুলতানুল হিন্দ’ এখনো অপরিবর্তনীয়। অতীতের মতো এখনো ভারতের শাসকরা বিশ্বাস করেন, সুলতানুল হিন্দের দোয়া ছাড়া ভারতশাসকের মর্যাদা পাওয়া সম্ভব নয়। মনে করা হয়, সাধক-আউলিয়াগণ বিশেষ কোনো দেশ বা এলাকার আধ্যাতিœক ও প্রকৃতিগত রাজনৈতিক গতিধারা পরিচালনা করেন। হযরত খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী (রহ) সম্পর্কেও এমনটাই বলা হয় যে, তিনি আধ্যাতিœকভাবে ভারত নিয়ন্ত্রণ করেন। স্বাধীন ভারতে গত ৭০ বছর ধরে যারাই শাসন ক্ষমতায় এসেছেন তারা সবাই সুলতানুল হিন্দের এই ক্ষমতা স্বীকার ও মান্য করে তার ও তার দরবারের প্রতি অপরিসীম শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেছেন।
পৌত্তলিক ভারতে ইসলামের প্রচার ও প্রসারে হযরত খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী (রহ) এর অন্যন্য অবদানের কথা ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ হয়ে আছে। কথিত আছে, বিশ্বনবী হযরত মুহম্মদ (সা:) এর আধ্যাত্মিক নির্দেশে তিনি ভারতে আগমন করেন এবং পৌত্তলিকতা উৎসাদন করে ইসলামের আদর্শ, শিক্ষা ও তৌহিদ প্রতিষ্ঠা করেন। এ প্রসঙ্গে বিখ্যাত একজন ঐতিহাসিকের একটি অভিমত উল্লেখ করা যেতে পারে। তিনি বলেছেন, ‘হিন্দুস্থানের সুপ্রসিদ্ধ ও বিখ্যাত আউলিয়ায়ে কেরামের মধ্য খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী (রহ) একজন, যিনি রাজপুতনা রাজ্যে ইসলাম প্রচার করেন এবং ৬৩৩ হিজরি মোতাবেক ১২৩৫ খ্রীস্টাব্দে আজমীরে ইন্তেকাল করেন। এ সাধক সিজিস্তানের অধিবাসী ছিলেন, যা ইরানের পূর্বে অবস্থিত। খ্যাত আছে যে, খাজা সাহেব যখন মদীনা জিয়ারতে যাচ্ছিলেন, তখন তার প্রতি নির্দেশ আসে হিন্দুস্থানে ইসলাম প্রচারে। আল্লাহর পয়গম্বর (স:) স্বপ্নে হাজির হন এবং বলেন, আল্লাহতায়ালা হিন্দুস্থানকে তোমার হাওলা করেছেন। যাও এবং আজমীরে বসবাস অবলম্বন কর। আল্লাহর মদদে ইসলাম ধর্ম তোমার ও তোমার ভক্ত-অনুসারীদের পবিত্রতায় এই ভূখÐে প্রসার লাভ করবে।’
উপমহাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে ইসলামের প্রচার, প্রসার ও প্রতিষ্ঠা ঘটেছে পীর-আউলিয়া ও সাধকদের দ্বারা। তাদের জীবনব্রতই ছিল অমুসলিমদের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দেয়া, একত্মবাদে তাদের দীক্ষা দেওয়া এবং মানব জীবনের প্রকৃত লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান দান করা। এসব সাধক ইসলামকে প্রাকৃতিক ও মানবিকভাবে উপস্থাপন করেন। তারা অমুসলিমদের বিবেককে জাগ্রত করার চেষ্টা করেন এবং সেই বিবেকের কাছে ইসলামকে অত্যন্ত মানবিকভাবে উপস্থাপন করেন। সাধকদের জ্ঞান, শিক্ষা, ব্যক্তিগত চরিত্র, আচার-আচরণ, মানবিকতা, ধৈর্য ও সহনশীলতা ছিল কিংবদন্তিতুল্য। এসব গুণের কারণেই তাদের প্রতি অকৃষ্ট হয়ে দলে দলে মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেছেন। উপমহাদেশে, পূর্ব এশিয়ায়, আফ্রিকায় ও বিশ্বের অন্যান্য স্থানে ইসলামের প্রচার, প্রসার ও বিস্তার এভাবেই ঘটেছে। শক্তি প্রয়োগ, সামরিক অভিযান ও জোর-জবরদস্তি করে ইসলামের এই বিশ্বব্যাপী সম্প্রসারণ ঘটেনি। উপমহাদেশে এখন অন্তত ৭০ কোটি মুসলমানের বাস। এক সময় এখানে একজন মুসলমানও ছিল না। পীর-আউলিয়া-দরবেশ-সাধক ও ইসলাম প্রচারকগণই প্রথমে এসে ইসলাম প্রচার শুরু করেছেন এবং ধীরে ধীরে ইসলামের প্রসার ঘটেছে। এজন্য তাদের অপরিসীম চেষ্টা ও কষ্ট করতে হয়েছে, নানামুখী প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হয়েছে। আল্লাহর পথে সর্বস্বত্যাগী এসব মানুষ অবলীলালায় চেষ্টা চালিয়ে গেছেন, কষ্ট স্বীকার করেছেন, প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলা করেছেন। ইসলামী শাসন ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রটি তারাই নির্মাণ করেছেন। এর পরে এসেছেন ইসলামী শাসন ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাকামী অভিযানকারীরা। ইতিহাস মতে, মুহম্মদ বিন কাসিম প্রথম ভারতে অভিযান পরিচালনা করেন। কিন্তু এর আগেই উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মুসলমানের বসবাস এখানে গড়ে ওঠে। গড়ে ওঠে অনেক প্রচার কেন্দ্র, খানকা ও শিক্ষালয়। বাংলাদেশের ইতিহাস পর্যালোচনা করলেও দেখা যায়, ১২০৩-৪ সালে ইখতিয়ার উদ্দীন মোহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজী বাংলা দখল করে সেনশাসনের অবসান ঘটান। কিন্তু তারও অনেক আগে এখানে বিভিন্ন এলাকায় ইসলামের প্রচার ও প্রসার ঘটে এবং মুসলমানদের গ্রাম বা পল্লী গড়ে ওঠে। ইখতিয়ার উদ্দীন মোহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজী তৎকালীন পীর-আউলিয়া-দরবেশ-সাধকদের অবদান সম্পর্কে জ্ঞাত দিলেন এবং তিনি ইসলাম প্রচারের কাজকে আরও সম্প্রসারিত করার জন্য তাদের প্রয়োজনীয় সাহায্য-সহযোগিতা করেন, মাদরাসা-মক্তব গড়ে তোলেন।
হযরত খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী (রহ) যখন ভারতে আসেন তখনই তার হাতে অনেকে ইসলাম গ্রহণ করেন। কথিত আছে, দিল্লী থেকে তার আজমীর যাওয়ার পথে সাতশ’ হিন্দু ইসলাম গ্রহণ করেন। আজমীর তখন ছিল এক হিন্দুরাজার শাসনে। অধিবাসীরা ছিল হিন্দু এবং বিভিন্ন দেবদেবীর পুজারী। আজমীরে যে ব্যক্তি প্রথম ইসলাম গ্রহণ করেন তিনি ছিলেন একজন যোগী। ক্রমান্বয়ের দলে দলে মানুষ ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করেন। হযরত খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী (রহ)এর খ্যাতিও চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে। আজমীরের রাজা ছিলেন কট্টর হিন্দু, অহংকারী ও ইসলামবিদ্বষী। কথিত আছে, একদিন একজন মুসলমান কোনো কারণে রাজার বিরাগভাজন হয়ে হয়রানির শিকার হন। খাজা বাবা এখবর পেয়ে অসন্তুষ্ট হন এবং বলেন, আমরা পাথুরাকে (রাজা) জীবিত ধরে দিয়েছি। পরে দেখা যায় তা সত্য প্রমাণিত হয়েছে। ওই সময় গজনির সুলতান শাহাবুদ্দীন ঘোরী আজমীর আক্রমন ও দখল করেন। রাজা পাথুরা গ্রেফতার ও নিহত হন। সুলতান শাহাবুদ্দিন ঘোরীর বিজয়ের পর ইসলামের প্রসার ও প্রতিষ্ঠা তরান্বিত হয়।
হযরত খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী (রহ) চিশতীয়া তরিকার এক শীষস্থানীয় সাধক ছিলেন। তিনিই মূলত সুফীবাদী এই তরিকাটি উপমহাদেশে নিয়ে আসেন এবং তার কেন্দ্র স্থাপন করেন আজমীরে। এখান থেকেই এই তরিকার শিক্ষা উপমহাদেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে। উপমহাদেশের মুসলমানদের আধ্যাত্মিক জীবনের ওপর এই তরিকার বিশেষ প্রভাব রয়েছে। হযরত খাজা মঈনুদ্দীন চিশতীর খলিফা ছিলেন খাজা কুতুবুদ্দিন বখতিয়ার কাকী। তার খলিফা ছিলেন বাবা ফরিদ শাকরগঞ্জ। বাবা ফরিদের দু’জন বিখ্যাত খলিফার একজন ছিলেন আলী আহমদ সাবির এবং অন্যজন নিজামউদ্দীন আউলিয়া। নিজাম উদ্দীন আউলিয়ার শিষ্যগণ নিজামী নামে পরিচিত। বস্তুত, এসব আধ্যাত্মিক পূরুষের মুরিদ-অনুসারীরা এখনো উপমহাদেশের বিভিন্ন স্থানে খানকা ও শিক্ষালয় প্রতিষ্ঠা করে ইসলামের প্রচার-প্রসারে নিয়োজিত আছেন। অন্যান্য তরিকার অনুসারীরাও একই কাজ করে যাচ্ছেন। আধ্যাত্মিক আকাঙ্খা ও জিজ্ঞাসা মানুষের সহজাত। বিভিন্ন তরিকা বা সিলসিলা মানুষের এই আকাঙ্খা পূরণ করছে, জিজ্ঞাসার জবাব দিয়ে ‘পরিপূর্ণ মানুষ’ হওয়ার পথ প্রশস্ত করছে।
ইসলাম প্রকৃতির ধর্ম, শান্তির ধর্ম। প্রকৃতি বিরোধী, শান্তিবিরোধী কোনো কিছু ইসলাম সমর্থন করেনা। সহনশীলতা ইসলামের একিিট বড় শিক্ষা। এখানে জোর জবরদস্তি ও উগ্রতার কোনো স্থান নেই। আজকে সালাফী, উগ্রবাদী, জঙ্গী ইত্যাদি নামে বিভিন্ন গোষ্ঠীর সন্ধান পাওয়া যায়। এরা ইসলামের প্রকৃত শিক্ষার অনুসারী নয়। হযরত খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী (রহ) সহ পীর-আওলিয়া ও দরবেশগণ যে ইসলামের প্রচার ও প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করে গেছেন, সালাফী, উগ্রবাদী ও জঙ্গী গোষ্ঠীর ইসলাম তার থেকে বিপরীত। আশার কথা, সউদী আরবসহ বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে প্রকৃত ইসলাম বা সহনশীল ইসলামের নবজাগরণ সূচিত হতে দেখা যাচ্ছে, যার ভিত রচনা করেছিলেন হযরত খাজা মঈনুদ্দীন চিশতি (রহ) ও তার মতো আধ্যাত্মিক সাধকগণ। মূলের দিকেই যে সবার প্রত্যাবর্তন ঘটছে, এটা বিশ্ব মুসলিমের জন্য অবশ্যই সুখবর ।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

গত ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন