ঢাকা, শনিবার , ২৩ নভেম্বর ২০১৯, ০৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ২৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪১ হিজরী

অভ্যন্তরীণ

অনিয়ম ও জনবল সঙ্কটে চিকিৎসাসেবা ব্যাহত

দাগনভূঞা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স

দাগনভূঞা (ফেনী) থেকে সৈয়দ ইয়াছিন সুমন | প্রকাশের সময় : ৩০ মার্চ, ২০১৮, ১২:০০ এএম

অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতা, ডাক্তার-নার্স সঙ্কট, অ্যাম্বুলেন্স না থাকা, এক্স-রে টেকনিশিয়ান সঙ্কটসহ নানা সমস্যায় জর্জরিত দাগনভূঞা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। নানাবিধ সমস্যা, অনিয়ম, দুনীর্তির কারনে যেন নিজেই রোগীতে পরিণত হয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। ফলে চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে উপজেলার পাঁচ লক্ষাধিক মানুষ।
সূত্র জানায়, ১৯৯৬ সালের অক্টোবর মাসে ৩১ শয্যার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি চালু হয়। চালুর পর থেকে নানা সমস্যায় আটকে আছে হাসপাতালটির চিকিৎসাসেবা। বর্তমানে প্রয়োজনীয় সংখ্যক ডাক্তার, নার্স, সুইপার নিরাপত্তা প্রহরি না থাকায় হিমশিম খেতে হচ্ছে কর্তৃপক্ষকে। তা ছাড়া অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগতো আছেই। হাসাপাতালের অ্যাম্বুলেন্সটি গত চার-পাঁচ বছর থেকে বিকল অবস্থায় পড়ে রয়েছে। ফলে মুমূর্ষু রোগীদের জরুরি অবস্থায় সদরসহ বিভিনড়ব হাসপাতালে প্রেরণ করা সম্ভব হয় না। টেকনিশিয়ানের অভাবে গত ১১ বছর ধরে ব্যবহৃত হচ্ছে না এক্স-রে মেশিনটি। ফলে দীর্ঘদিন ব্যবহৃত না হওয়ায় একদিকে যেমন মেশিনটি অনেকটা অকেজো হয়ে পড়ছে। অন্যদিকে এর সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সাধারণ জনগণ। হাসপাতালে পাঁচজন কনসালটেন্টের স্থলে আছে দুইজন। একমাত্র ডেন্টাল সার্জনের পদটি রয়েছে শূন্য। টিএইচও থেকেও যেন না থাকার মতো। হাসপাতালে ঠিকমত সময় না দিয়ে অন্যরাও ব্যক্তিগতভাবে বিভিনড়ব ক্লিনিকে রোগী দেখেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকতা (টিএইচও) সার্বক্ষনিক হাসপাতালে অবস্থান করার কথা থাকলেও তিনি তা করেন না। সরজমিন পরিদর্শনে জানা যায়, টিএইচও ডা. আবুল খায়ের মিয়াজির পরিবার থাকে পূর্বের কর্মস্থল ছাগলনাইয়ায়। ফলে পরিবার ও প্রাইভেট প্রাকটিসের কারণে তাকে প্রতিদিন ছাগলনাইয়া থেকে আসাযাওয়া করতে হয়। ফলে তিনি হাসপাতালে ঠিক মতো সময় দিতে পারেন না। আর যতটুকু সময় দেন তার মধ্যে প্রায়ই ব্যস্ত থাকেন বিভিনড়ব ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের সাথে ব্যস্ত সময় পার করেন। প্রায় একই অভিযোগ ডা. রাফিউল আলামের বিরুদ্ধে। তিনিও রোগীদের চেয়ে বেশি ব্যস্ত থাকেন ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের নিয়ে। তা ছাড়া কোনো ছাত্র-ছাত্রী কাগজপত্র সত্যায়িত করতে গেলে তিনি (ডা. রাফিউল) সিল নেই বলে তাদের ফিরিয়ে দেন। এ বিষয়ে তাকে প্রশড়বকরা হলে তিনি ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের সময় দেয়ার বিষয়টি অস্বীকার করে ইনকিলাবকে জানান, কাগজপত্র সত্যায়িত করা আমার কাজ নয়। পূর্বের কর্মস্থল ছাগলনাইয়ায় অবস্থান ও অফিস সময়ে ফাঁকি দেয়ার বিষয়ে টিএইচও ডা. আবুল খায়ের মিয়াজি ইনকিলাবকে জানান, অফিসে আমার তেমন কোনো কাজ নেই। আমার শতকারা ৭৫ ভাগ কাজ হচ্ছে মাঠে। তাছাড়া ছাগলনাইয়ায় অবস্থান করলেও যখনি দরকার হয় তখন আমি চলে আসি।
অপরদিকে ২৬ জন নার্সের মধ্যে রয়েছে ১৩ জন। তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারির ১৯ জনের মধ্যে রয়েছে সাতজন। প্রয়োজনীয় ওষুধপত্রের সঙ্কটত রয়েছেই। তাছাড়া অ্যানেস্থেসিয়া ডাক্তার না থাকাসহ নানান সমস্যায় গর্ভকালীন স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সংশ্লিষ্ট জনগণ। ফলে কোনোরকম জোড়া তালি দিয়ে চলছে হাসপাতালটি।
সরেজমিন পরিদর্শনে কথা হয় কয়েক জন রোগীর সাথে। বিবি ফাতেমা নামে এক অভিভাবক নূর নবী নামের তার বাচ্চাকে নিয়ে আসে ডায়রিয়া আক্রান্ত হলে। তিনি বলেন নার্সদেরকে না ডাকলে তারা আসে না। আবদুল হালিম (২৩) জ্বর নিয়ে আসে হাসপাতালে। ছয়দিন ভর্তি থাকে কিন্তু ওষুধ ও পরীক্ষা নিরীক্ষা বাইরে থেকে করতে হবে বলে তিনি অভিযোগ করেন। প্রায় একই অভিযোগ করেন নূরনবী নামে আরেক অভিভাবক। অভিযোগ রয়েছে হাসপাতালে চিকিৎসকদের সাথে দাগনভূঞা বাজারের প্রাইভেট ক্লিনিকের সাথে চুক্তি রয়েছে। ফলে তারা তাদের সুবিধা মতো হাসপাতালে রোগীদের পরীক্ষা নিরীক্ষর জন্য পাঠান। ডাকা ছাড়া নার্সরা সেবা দেয় না এমন অভিযোগের বিষয়ে নার্সদের সুপারভাইজার সুশীলা অভিযোগটি সত্য নয় বলে জানান।
সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, শিশু ওয়ার্ডে পুরুষ রোগী ভর্তি রয়েছে। ফলে শিশুদের সাথে থাকা মায়েরা থাকেন অস্বস্বিতে। এ বিষয়ে টিএইচও ইনকিলাবকে জানান, পুরুষ রোগী কম। তাই তারা পুরুষ ওয়ার্ডে থাকতে চায় না। ফলে তাদের শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়। তবে এ বিষয়ে কোনো রোগী এ পর্যন্ত কোনো অভিযোগ দেননি। জনসংখ্যার হার ও চাহিদা ভিত্তিতে হাসপাতালটি ২০১১ সালের এপ্রিল মাসে ৫০ শয্যায় উনড়বীত করণের লক্ষ্যে প্রায় চার কোটি টাকা ব্যয়ে একটি ভবন নির্মাণের কাজ শেষ হয়। কিন্তু ১৯ শয্যার বর্ধিত এ ভবনটির নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার ছয় বছর পার হলেও অদ্যাবধি জনবল বা প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি অনুমোদন পায়নি। ফলে জনগনের কোন কাজে আসছে না এ ভবনটি। এবিষয়ে জনবল ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির জন্য সংশ্লিষ্ট দফতরে আবেদন পাঠানো হয়েছে বলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়।
এক সময়ে যে হাসপাতালে রোগীতে ভরপুর থাকত বর্তমানে সেখানে নানান সমস্যার কারণে রোগী শূন্য হয়ে পড়েছে। ফলে সমস্যা, অনিয়ম ও দুনীতির কারণে ক্ষোভ প্রকাশ করেন উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার শরিয়ত উল্ল্যাহ বাঙ্গালী ও স্থানীয় কাউন্সিলর মহিউদ্দিন জুয়েলসহ এলাকাবাসী।
দাগনভূঞা উপজেলা চেয়ারম্যান দিদারুল কবির রতন ইনকিলাবকে জানান, ৫১ শয্যার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটির নানা সমস্যার বিষয়ে তিনি অবগত রয়েছেন। ফলে দ্রæত সমস্যা সমাধানের জোর চেষ্টা চালানো হচ্ছে।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

গত ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন