ঢাকা শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১১ আশ্বিন ১৪২৭, ০৮ সফর ১৪৪২ হিজরী

ইসলামী জীবন

শিশুদের প্রতি ভালোবাসা

প্রকাশের সময় : ১২ এপ্রিল, ২০১৬, ১২:০০ এএম

অধ্যক্ষ মোঃ ইয়াছিন মজুমদার

সাম্প্রতিক সময়ে শিশু নির্যাতনের চিত্র ভয়াবহ রূপ লাভ করেছে। শিশুরা জাতির ভবিষ্যৎ। শিশুদের ভালোবাসা ও তাদের প্রতি আমাদের কর্তব্য সম্পর্কে ইসলাম যে দিকনির্দেশনা দিয়েছে তা মেনে চললে এ নৈতিক অবক্ষয় থেকে বেঁচে থাকা সম্ভব হত।
হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন এক বেদুইন নবী (সা.)-এর কাছে এসে বললো আপনারা শিশুদের চুমু দেন আমরাতো তাদেরকে চুমু দেই না। উত্তরে নবী (সা.) বলেন আল্লাহ তাআলা তোমার অন্তর থেকে দয়ামায়া উঠিয়ে নিয়ে গেলে আমি তার কি করতে পারি। (বুখারী) একদা নবী (সা.) ঈদের নামাজ আদায়ের জন্য গৃহ থেকে বের হলেন। একটু গিয়ে দেখলেন এক শিশু মলিন বেশে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে কাঁদছে। নবী (সা.) তার মাথায় হাত বুলিয়ে জিজ্ঞেস করলেন বাবা তুমি কাঁদছে কেন? শিশুটি জবাবে বলল, ‘আমার বাবা-মা বেঁচে নেই, আমি অসহায়, ঈদে আমার কোন পোশাক নেই, আমি দুঃখে কাঁদছি।’ নবী (সা.) শিশুটিকে কোলে তুলে নিয়ে ঘরে ফিরে এলেন, তাকে গোসল করিয়ে নতুন পোশাক দিলেন এবং বললেন আজ থেকে আমি বিশ্ব নবী মোহাম্মদ (সা.) তোমার বাবা, আয়েশা (রা.) তোমার মা, ফাতেমা (রা.) তোমার বোন। নবীজীর আদর পেয়ে শিশুটি তার দুঃখ ভুলে গেল। ছোট শিশু উমায়েরের একটি ছোট পাখি ছিল। একবার সে বসেছিল তার নিকট পাখিটি ছিল না। নবীজী (সা.) তার নিকট দিয়ে অতিক্রম করছিলেন বললেন হে উমায়ের তোমার পাখিটি কোথায়? ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও দ্বীনি শত ব্যস্ততার মধ্যেও নবী (সা.) শিশুটির পাখির বিষয়টি স্মরণ রেখেছেন বলে শিশুটি অবাক হল। নবী (সা.)-এর দুই নাতি ইমাম হাসান ও ইমাম হোসাইন (রা.)কে নবী (সা.) কত আদর করতেন তা ইতিহাস খ্যাত।
নবীজী ঘোড়ার মত হামাগুড়ি দিয়ে চলতেন আর নাতিরা নবী (সা.)-এর পিঠ মোবারকে আরোহণ করতেন। যায়েদ বিন হারেসা (রা.) শিশুকালে দাস হিসেবে বিক্রি হন। হাতবদল হতে হতে নবী (সা.)-এর হাতে এসে পড়েন। তার পিতা মাতা তার খোঁজ পেয়ে তাকে মুক্ত করতে নবী (সা.)-এর কাছে আসেন। নবী (সা.) তাকে মুক্ত করে দিয়ে তার পিতা-মাতার সাথে চলে যাওয়ার অথবা নবী (সা.)-এর নিকট থেকে যাওয়ার যে কোন একটি গ্রহণের সুযোগ দিলেন। তিনি নবী (সা.)-এর সাথে থাকার ইচ্ছা পোষণ করলেন। নবী (সা.)-এর ¯েœহের কারণে সে এরূপ করেছিল। পরবর্তীতে নবী (সা.) তাকে আপন পালক পুত্র হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। অনেক অসহায় পরিবার অভাবের তাড়নায় শিশুদের বাসাবাড়িতে, গ্যারেজে, শিল্পকারখানার কাজে নিয়োজিত করছে। ছোট মানুষ, কাজে তার কিছু ভুল হওয়া অস্বাভাবিক নয়। সামান্য ভুলের জন্য মালিক পক্ষ অনেক সময় তাদের সাথে নির্দয় আচরণ করেন। আপনার ছোট শিশুটির কথা একটু ভাবুন, তাকে কি এ ধরনের কাজে নিয়োজিত করবেন? আর সেই বা এ বয়সে কতটুকু দক্ষতার সাথে কাজ করতে পারবে? আবু হোরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন রাসূল (সা.) বলেছেন- কেউ তার অধীনস্থ (চাকর)কে অন্যায়ভাবে একটি বেত্রাঘাত করলেও কিয়ামতের দিন তার থেকে তার বদলা নেয়া হবে (তাবরানী)। আবু বকর (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন নবী (সা.) বলেছেন- অধীনস্থদের (চাকর) প্রতি ক্ষমতার অপব্যবহারকারী জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না (ইবনে মাজাহ)। মনিব যা খায়, যে ধরনের পোশাক পরে দাস-দাসীদের একই ধরনের খাওয়া ও পোশাক প্রদানের নির্দেশ ইসলাম দিয়েছে।
নবী (সা.) বলেছেন- তোমাদের কারো খাদেম তার জন্য খাবার নিয়ে এলে তাকে তার সাথে বসিয়ে খাবার খাওয়াতে না পারলে (কমপক্ষে) এক বা দুই লোকমা যেন তার মুখে তুলে দেয়। কারণ সে কষ্ট করে তার জন্য খাবার প্রস্তুত করে এনেছে (বুখারী)। দাস-দাসী কোন ভুল করলে ক্ষমা করা উত্তম।
আল্লাহ বলেছেন- ক্ষমা প্রদর্শন কর, ভালো কাজের আদেশ দাও, জাহেলদের থেকে বিমুখ থাক (সূরা আরাফ-১৯৯)। হযরত আনাস (রা.) শিশু বয়সে নবী (সা.)-এর খাদেম নিযুক্ত হন। তিনি দশ বছর নবী (সা.)-এর খেদমতে নিয়োজিত ছিলেন। তিনি বলেন- এ দীর্ঘ সময়ে নবী (সা.) কখনো হে আনাস তুমি এটা করলেনা কেন? বা ওটা এরূপ করলে কেন? এরূপ বলেননি। তিনি আরো বলেন- একদা নবী (সা.) একটি কাজে আমাকে এক জায়গায় প্রেরণ করলেন। যাওয়ার পথে শিশুরা খেলছে দেখে আমি তাদের খেলা দেখতে লাগলাম এবং কাজের কথা ভুলে গেলাম। দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হল হঠাৎ আমার মাথায় কারো হাতের স্পর্শ পেয়ে আমি পিছনে তাকিয়ে দেখি নবী (সা.) আমার মাথায় হাত রেখে দাঁড়িয়ে আছে। আমি ভয় পেয়ে গিয়ে বললাম- আমি এখনি যাচ্ছি। নবী (সা.) মুচকি হেসে বললেন- তিনি নিজে গিয়ে ঐ কাজটি সেরে এসেছেন, তিনি আমাকে একটু রাগও দেখালেন না। আল্লাহপাক বলেন- অতএব তুমি ইয়াতিমদের প্রতি নির্দয় আচরণ করো না এবং প্রার্থনাকারীকে ধমক দিওনা (সুরা আদদোহা ৯-১০)। নবী (সা.) বলেছেন- যে আমাদের ছোটদের প্রতি দয়া করে না এবং বড়দের অধিকার আদায় (সম্মান) করে না সে আমার উম্মত নয়।
শিশু ও সন্তানদের প্রতি আমাদের কর্তব্যও রয়েছে। শিশু মাতৃগর্ভে আসার পর মায়ের চিন্তাচেতনায় সততা ও ইসলামী ভাবধারা প্রাধান্য পাওয়া উচিত। কারণ তার চিন্তাচেতনা সন্তানের উপর প্রভাব ফেলে। জন্মের সাথে সাথে ছেলে বা মেয়ে যাই হোক না কেন তার ডান কানে আযান ও বাম কানে ইকামাত দিয়ে তাওহীদের বাণী তার কাছে পৌঁছে দিতে হবে। পূর্ণ দুই বছর মায়ের দুধ পান করা শিশুর অধিকার। আল্লাহ বলেন- গর্ভধারণ ও দুধপানের সময়সীমা ত্রিশ মাস (সূরা আহকাফ-১৫)। জন্মের সাতদিনের সময় তার আকিকা করা ও মাথার চুল কামানো সুন্নাত, সম্ভব হলে চুলের ওজন পরিমাণ স্বর্ণ বা রৌপ্য অসহায় দরিদ্রদের মাঝে বিতরণ করে দিতে হবে। সালমান ইবনে আমের জাবি (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেছেন- আমি রাসূল (সা.) কে বলতে শুনেছি সন্তানের আকিকা করা প্রয়োজন সুতরাং তার পক্ষ থেকে তোমরা রক্ত প্রবাহিত কর, তার থেকে কষ্ট দূর কর (বুখারী)। সন্তান পুত্র বা কন্যা যাই হোক ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখা নিষেধ। নবী (সা.) বলেছেন- যার কন্যা সন্তান রয়েছে সে তাকে প্রোথিত করেনি, অবহেলা করেনি, পুত্র সন্তানকে তার উপর প্রাধান্য দেয়নি আল্লাহ তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন (আবু দাউদ)।
সন্তানকে দ্বীনি জ্ঞান, নৈতিকতা, সততা শিক্ষা দেয়া প্রত্যেক অভিভাবকের অবশ্য কর্তব্য। সাইদ ইবনুল আস (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন- রাসূল (সা.) বলেন- পিতা সন্তানকে যা দান করে এর মধ্যে সর্বোত্তম দান হল উত্তম শিক্ষা ও উত্তম প্রশিক্ষণ (মেশকাত)। শিশুরা অনুকরণপ্রিয় তাই পিতা-মাতা ও মুরুব্বীদের নিজেদের সুন্দর আচরণ করতে হবে তবেই সন্তান তা শিখবে। হযরত আবদুল কাদের জিলানী (র.) প্রথম দিন মক্তবে গিয়ে মুখস্থ কুরআন ওস্তাদকে শুনিয়ে দিতে লাগলেন, ওস্তাদ তা শুনে অবাক হয়ে ভাবলেন সে কোথায় তা শিখলো? জানা যায় তার মায়ের কুরআনের আঠার পারা মুখস্থ ছিল। তার মা তা বেশি বেশি তিলাওয়াত করতেন, তা শুনে শুনে তার মুখস্থ হয়ে গেছে। শিশুকে সৎ উপদেশ দেয়া প্রয়োজন, লোকমান (আ.) তার ছেলেকে যে উপদেশ দিয়েছেন কুরআনের ভাষায় তা বর্ণনা করা হয়েছে- হে প্রিয় বৎস আল্লাহর সাথে শিরক করো না, নিশ্চয়ই শিরক বড় জুলুম। নামাজ কায়েম করবে, সৎ কাজের আদেশ দিবে, অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করবে, মানুষকে অবজ্ঞা করে মুখ ফিরিয়ে নিবে না, অহংকার করে জমিনে চলবে নাÑ আল্লাহ অহংকারীদের ভালোবাসেন না।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন