ঢাকা সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১৩ আশ্বিন ১৪২৭, ১০ সফর ১৪৪২ হিজরী

সম্পাদকীয়

ময়লার ভাগাড়ে নবজাতক কেন?

মো. তোফাজ্জল বিন আমীন | প্রকাশের সময় : ১৮ জুলাই, ২০১৮, ১২:০২ এএম

মানবসভ্যতার চরম উন্নতির এই যুগে আমরা কোন দিকে যাচ্ছি এটা ভেবে দেখা দরকার। প্রতিনিয়ত সংবাদপত্রের পাতায় চোখ ভুলালে মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের বীভৎস রূপ দেখতে পাই। গুম, খুন, অপহরণ, বন্ধুকযুদ্ধের মিছিলের সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়ে চলেছে ডাস্টবিনে কুড়িয়ে পাওয়া নবজাতকের সংখ্যা। এ ঘটনা এখন আর কাউকে আলোড়িত করে না। একটি সমাজ ও রাষ্ট্রের অধঃপতন কতটা হলে নবজাতককে ডাস্টবিনে ফেলে দেয়া হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। আরবের অন্ধকার যুগে কন্যা সন্তানকে জীবন্ত যেভাবে পুঁতে ফেলা হতো এ যুগেও কিছু নরপিশাচ ডাস্টবিন কিংবা ময়লার ভাগাড়ে নবজাতককে ফেলে দিতে কুণ্ঠাবোধ করছে না। অথচ মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) শিশুদের আল্লাহতায়ালার বাগানের সুগন্ধ ফুলের সাথে তুলনা করেছেন। একজন মানুষের মানসিক অবস্থা সম্পূর্ণ বিকৃত হলে পরেই এমন আচরণ করতে পারে? সেটা আমাদের বিবেচনায় নেয়া জরুরি। সৃষ্টির সূচনা লগ্ন থেকে স্বামী-স্ত্রীর ভালোবাসার মধ্য দিয়ে সন্তান পৃথিবীর আলোর মুখ দেখে আসছে। অথচ এখন মানুষ ভালোবাসার সন্তানকে ডাস্টবিনে নিক্ষেপ করছে শুধুমাত্র অবৈধ পাপাচারকে ঢাকতে। এই অপরাধপ্রবণতা সমাজ ও রাষ্ট্রে একদিনে গড়ে উঠেনি। মৌলবাদের জুজুর ভয় দেখিয়ে যারা ধর্মকে দূরে সরিয়ে দিতে চায় তাদের এখনই ভেবে দেখা দরকার ধর্ম নিয়ে যুদ্ধ করবে নাকি নবজাতকের জীবন সুরক্ষা করবে। যে সমাজ ও রাষ্ট্রে অবাধ প্রেমাচার, পরকিয়া, যৌনাচারের সমস্ত রুট খোলা থাকে, সেখানে নবজাতকের জীবন ডাস্টবিনের স্তূপে পতিত হবে এটাই তো স্বাভাবিক!
প্রতিনিয়ত বদলাচ্ছে সমাজের রূপ। আগের দিনে যেসব ঘটনা মানুষের হৃদয়কে নাড়া দিতো এখন আর ওইসব ঘটনা নিয়ে কেউ ভাবে না। ডাস্টবিনে নবজাতক কুড়িয়ে পাওয়ার ঘটনা নতুন নয়! একের পর এক নবজাতক উদ্ধার হচ্ছে কখনও জীবিত কখনও মৃত। পরিত্যক্ত স্থান, ডাস্টবিন, ড্রেন, ডোবা-নালা, ঝোপ-ঝাড় সর্বত্রই জীবিত অথবা মৃত নবজাতক মিলছে। যে সময়ে লিখছি তখনও ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের সাভারের কর্ণপাড়া ব্রিজের পাশে একটি কাগজের কার্টুনের ভিতর থেকে এক নবজাতকের লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। আর লেখাটি যখন প্রকাশিত হবে তখনও হয়তো গণমাধ্যমে নবজাতকের লাশের খবর মুদ্রিত হবে। শুধু রাস্তায় নয়, হাসপাতালের ডাস্টবিনেও নবজাতক পাওয়া যাচ্ছে। এসব অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা তো এমনি এমনি ঘটছে না। সামাজিক অবক্ষয়, ইন্টারনেটের ভয়াবহতা, মাদকের আগ্রাসন, পর্নোগ্রাফি, অবাধ মেলামেশা মূলত এই অনাকাক্সিক্ষত ঘটনাগুলোর জন্য দায়ী। যে শিশুটি মায়ের নিরাপদ আঁচলে জড়িয়ে থাকার কথা সে শিশুটি ডাস্টবিনের স্তূপে কাক-কুকুরের খোরাক হচ্ছে। নারীরা মায়ের জাতি হওয়া সত্তে¡ও কেমন করে কলিজা ছেঁড়া ধনকে ডাস্টবিনে ফেলে দেয় তা বোধগম্য নয়। নবজাতক হত্যার মতোই দেশে এখন এবরশন বা গর্ভপাত ব্যাপক হারে বেড়ে চলেছে। দেশের আইন অনুযায়ী গর্ভপাত নিষিদ্ধ হলেও এর মাত্রা জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। শুধুমাত্র ২০১৪ সালেই দেশে প্রায় ১২ লাখ এবরশন করানো হয়। এবরশন ছাড়াও প্রায় ৪ লাখ ৩০ হাজার এমআর হয়েছে। ২০১৪ সালেই বাচ্চা নষ্টের পরিমাণ ছিল প্রায় ১৬ লাখেরও বেশি যেখানে দেশে মোট গর্ভের সংখ্যা সাড়ে ৪২ লাখ (সূত্র: গুটম্যাকার, ২০১৭)। সামাজিক এই পাপাচারে অবিবাহিত মেয়েরা সবচেয়ে বেশি জড়িত। বয়ফ্রেন্ডের সাথে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করার ফলে যখনই গর্ভবতী হচ্ছে তখনই গোপন পাপ ঢাকতে ডাস্টবিন অথবা গর্ভপাতের পথ বেছে নিচ্ছে।
উন্নয়নের মহাসড়কে দেশ এগিয়ে গেলেও ধর্মীয় মূল্যবোধের অভাবে চরম অবক্ষয়ের দিকে চলে যাচ্ছে। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে ধর্মীয় অনুশাসন না থাকার ফলে ডাস্টবিনের ভাগাড়ে নবজাতকের জীবিত অথবা মৃত লাশ মিলছে। ২ এপ্রিল গাইবান্ধায় এক পাষÐ পিতা তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে স্ত্রী সন্তান প্রসব করার অপরাধে কলিজার টুকরা নবজাতক শিশুকে ছুড়ে ফেলে হত্যা করেছে। ২ মে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সদর হাসপাতালের ডাস্টবিন থেকে এক নবজাতক থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। ১২ মে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের জনতা হাউজিংয়ের পার্শ্ববর্তী কাঁচাবাজারের সামনে থেকে এক নবজাতক মেয়েকে উদ্ধার করেছে পুলিশ। উদ্ধার হওয়ার আগে নবজাতকের নাভি পর্যন্ত কাটা হয়নি। বলার অপেক্ষা রাখে না একটি শিশু জন্ম নেওয়ার পর তার বাঁচার অধিকারটুকু রাষ্ট্র নিশ্চিত করতে পারেনি। শুধু ডাস্টবিন কিংবা পরিত্যাক্ত স্থান থেকে নবজাতক উদ্ধার হচ্ছে তা কিন্ত নয়! মৃত নবজাতক ও অহরহ পাওয়া যাচ্ছে। ২৯ এপ্রিল ময়মনসিংহের বাঘমারা এলাকার একটি ড্রেন এবং ভাটিকাশর ডাস্টবিন থেকে দুটি নবজাতকের মৃতদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে ২০১৮ সালের প্রথম চার মাসে ডাস্টবিনে ২৭ জন অজ্ঞাত নবজাতকের লাশ পাওয়া গেছে। আর চলতি মে মাসের প্রথম পনের দিনে মোট ২৮ জন নবজাতককে ডাস্টবিনে পাওয়া গেছে। এদের মধ্যে ১৭ জন মৃত ও ৮ জন জীবিত ছিল। বাকি ৩ জনের তথ্য পাওয়া যায়নি (ইত্তেফাক, ১৯ মে ২০১৮)। অবৈধ মেলামেশার ফলাফল নিষ্ঠুর ও বেদনাদায়ক হয়। একটি অবৈধ সন্তানের কথা না হয় বাদ-ই দিলাম। কিন্তু যখন দেখি একটি বৈধ কন্যা সন্তানকে ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া হচ্ছে শুধুমাত্র মেয়ে হওয়ার অপরাধে তখন সত্যিই মনে দাগ কাটে। ক্ষণিকের উচ্ছ¦াস আর আবেগের মোহে যে অবৈধ শিশুর জন্ম হচ্ছে তার তো কোন অপরাধ নেই! তাহলে কেন ডাস্টবিনের স্তূপে চাপা পড়ে ক্ষত-বিক্ষত হচ্ছে নবজাতকের জীবন। সমাজ ও রাষ্ট্রে যখন আইনের শাসনের ব্যতয় ঘটে তখন অন্যায়, জুলুম, পাপাচার সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্যে ক্ষমতাসীনরা যে ফন্দি করে তার ছিটে ফোটাও যদি ধর্মীয় অনুশাসন প্রতিষ্ঠায় করা হতো তাহলে নবজাতক শিশুদের এভাবে ময়লার স্তূপে পড়ে থাকতে হতো না। এ ধরনের নিষ্ঠুরতা প্রতিরোধে রাষ্ট্র কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে এমনটিই দেশবাসীর প্রত্যাশা।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন