ঢাকা, শনিবার ২০ জুলাই ২০১৯, ০৫ শ্রাবণ ১৪২৬, ১৬ যিলক্বদ ১৪৪০ হিজরী।

সম্পাদকীয়

তাবলীগের দু’পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ

| প্রকাশের সময় : ৩ ডিসেম্বর, ২০১৮, ১২:০৩ এএম

তাবলীগ জামাতের মত একটি দ্বীনি সংগঠনে অভ্যন্তরীণ বিরোধ ও সেই বিরোধের জেরে সংঘাত-সংঘর্ষের ঘটনা অনভিপ্রেত ও দু:খজনক। বছরাধিকাল আগে সংগঠনটি দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়ে। একপক্ষে আছে দিল্লীর নিজামউদ্দীন মারকাজের মওলানা সাদের অনুসারীরা। অন্যপক্ষে আছে দেওবনেূর কওমীপন্থী মাদরাসার অনুসারীরা। এ পক্ষের নেতৃত্বে আছেন ঢাকার কাকরাইল মারকাজের মওলানা জুবায়ের। সাদ অনুসারী ও জুবায়ের অনুসারীদের মধ্যে গত শনিবার টঙ্গীতে ব্যাপক সংঘাত-সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে একজন নিহত ও উভয়পক্ষে তিন শতাধিক ব্যক্তি আহত হয়েছে। অরাজনৈতিক ও অহিংস এই সংগঠনের বিবদমান দুই অংশের মধ্যে এহেন সংঘাত-সংঘর্ষ নজিরবিহীন এবং তা সবাইকে উদ্বিগ্ন ও মর্মাহত করেছে। বিশ্বব্যাপী দ্বীন প্রচারে তাবলীগ জামাতের ভূমিকা ও অবদান অনস্বীকার্য। এই সংগঠনের অনুসারীরা শান্তি, শৃংখলা নির্বিরোধ সহাবস্থান ও অহিংসার বাণী প্রচার করে থাকে ইসলামের অন্যান্য মৌলিক বিষয় প্রচারের সঙ্গে সঙ্গে। অথচ তারাই ওইদিন লাঠিসোটা, ইটপাটকেল নিয়ে একে অপরের ওপর হামলা চালিয়েছে। রক্তে রঞ্জিত করেছে ইজতেমা ময়দানসহ টঙ্গীর রাস্তাঘাট। দিনভর এই সংঘাত-সংঘর্ষের ঘটনায় ব্যস্ততম বিমানবন্দর সড়কসহ ওই এলাকার সকল সড়কে যান চলাচল ব্যহত হয়, তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। এতে অভাবনীয় বিপাক ও দুর্ভোগে পড়ে যাত্রী, পথচারী ও সাধারণ মানুষ। তাবলীগ জামাতের এ যাবৎকালের ভাবমর্যাদা, সুনাম ও জনপ্রিয়তায় এই ঘটনা ব্যাপক বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা পর্যবেক্ষকদের।
জোড় ইজতেমাকে কেন্দ্র করে এই সংঘাত-সংঘষের ঘটনা ঘটে। দুই পক্ষই জোড় ইজতেমার ঘোষণা দেয়। সাদপন্থীরা ৩০ নভেম্বর থেকে ৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত পাঁচদিন এবং জুবায়েরপন্থীরা ৭ ডিসেম্বর থেকে ১১ ডিসেম্বর পর্যন্ত পাঁচদিন জোড় ইজতেমার ঘোষণা দেয়। উল্লেখ করা যেতে পারে, প্রতিবছর জানুয়ারি মাসে টঙ্গীতে তবলিগ জামায়াতের বিশ্ব ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দু’দফায় বিশ্ব ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয়। আগামী বছর অনুষ্ঠেয় বিশ্ব ইজতেমার জন্য দু’পক্ষই তারিখ নিধারণ করে। সাদপন্থীরা ১১ থেকে ১৩ জানুয়ারি তারিখ নির্ধারণ করে। জুবায়েরপন্থীরা তারিখ নির্ধারণ করে ১৮ থেকে ২০ জানুয়ারী। জোড় ইজতেমা করা হয় মূলত বিশ্ব ইজতেমার প্রস্তুতি হিসাবে। কিন্তু এবার জাতীয় নির্বাচনের কারণে জানুয়ারিতে বিশ্ব ইজতেমা অনুষ্ঠান স্থগিত করা হয়। স্থগিত করার পেছনে আরো একটি বড় কারণ ছিল, দুই পক্ষের বিরোধ-দ্ব›দ্ব এবং দুটি তারিখ নির্ধারণ এ প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আগেই জানিয়েছিলেন, তাবলীগ জামাতের দু’গ্রæপের দ্ব›েদ্বর পাশাপাশি জাতীয় নির্বাচনের কারণে ইজতেমার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। তাই জানুয়ারিতে বিশ্ব ইজতেমা নির্ধারিত সময়ে হবে না। এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বৈঠকে, যেখানে বিবদমান দু’পক্ষের প্রতিনিধিরাই উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে দ্ব›দ্ব নিরসনে দেওবন্দ মাদরাসার মতামত জানতে সরকার ও দুই পক্ষের সমন্বয়ে ৬ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। বলা হয়, কিছুদিনের মধ্যেই কমিটি ভারত সফর করবে। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে বিশ্ব ইজতেমা স্থগিত ও দ্ব›দ্ব নিরসনের উদ্যোগকে বিভিন্ন মহল থেকে স্বাগত জানানো হয়। প্রশ্ন হলো, জানুয়ারিতে বিশ্ব ইজতেমা অনুষ্ঠান যখন স্থগিত করা হয়েছে এবং এর সম্ভাব্য কোনো তারিখও দেয়া হয়নি তখন জোড় ইজতেমার আয়োজন কেন? দু’পক্ষেরই এই আয়োজনে শামিল হওয়া উচিৎ হয়নি। দ্বিতীয়ত, দু’পক্ষের পৃথক পৃথক দিনে জোড় ইজতেমা আয়োজনের বিষয়টি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের অবিদিত থাকার কথা নয়। যেখানে বিরোধ-দ্ব›দ্ব রয়েছে, সংঘাতের আশংকা রয়েছে, সেখানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের আগেই সতর্ক হওয়া উচিৎ ছিল। টঙ্গীতে অবস্থানরত পক্ষের উপর হামলার উদ্দেশ্যে সারা দেশ থেকে যারা চারপাশে সমবেত হচ্ছিল, তখনই পুলিশ তাদের রুখতে কিংবা ছাত্রভঙ্গ করে দিতে পারত। কিন্তু প্রশাসনের গাফিলতির কারণে বহিরাগতরা টঙ্গি ময়দানে থাকা উলামা শিক্ষার্থী ও তাবলীগকর্মীদের উপর আক্রমনের সুযোগ নিয়েছে প্রশাসন সজাগ থাকলে এই অনাকাক্সিক্ষত সংঘর্ষ ও হতাহতের ঘটনা ঘটতে পারতো না। দেখা গেছে, আইনশৃংখলা বাহিনী উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে যথাযথ ভূমিকা ও দায়িত্বশীলতা প্রদর্শন করতে পারেনি। এটাও কম দু:খজনক নয়।
শনিবার বিকালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ে দু’পক্ষের প্রতিনিধিদের নিয়ে ফের বৈঠক হয়েছে। বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, সভায় সর্বসম্মতিক্রমে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, ৩০ ডিসেম্বর জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, সে কারণে নির্বাচন পর্যন্ত ইজতেমার সব আয়োজন বন্ধ থাকবে। আমরা আগেও বলেছিলাম, নির্বাচনের আগে কোনো ধরনের ইজতেমা হবে না। আমরা সেটাকেই রিপিট করেছি। বলেছি, ইলেকশন পর্যন্ত ইজতেমার জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি সভা কিংবা জোড় ইজতেমা এবং ইজতেমার জন্য সব ধরনের কার্যকলাপ দেশব্যাপী বন্ধ থাকবে। আশা করা যায়, অত:পর দু’পক্ষই এ সিদ্ধান্ত মেনে চলবে। তবে পরে যখনই বিশ্ব ইজতেমা অনুষ্ঠিত হোক না কেন, তখনই ফের বিরোধ-দ্ব›দ্ব দেখা দেবে যদি তার আগেই এর নিরসন না হয়। অতএব, বিরোধ-দ্ব›েদ্বর সমাধান করতে হবে যত দ্রæত সম্ভব। আর সে দায়িত্ব নিতে হবে শীর্ষ মুরুব্বীদের। মনে রাখতে হবে, সেদিন যারা সংঘাতে-সংঘর্ষে শামিল হয়েছিল, তাদের পরস্পরের মধ্যে কোনো বিরোধ-দ্ব›দ্ব ছিলনা। নেতৃত্ব পর্যায়ে বিরোধ-দ্ব›দ্বই তাদের ওই অবস্থানে নিয়ে গিয়েছিল। সে কারণে নেতৃত্ব পর্যায়ে বিরোধ-দ্ব›দ্ব অবসানের কোনো বিকল্প নেই। আশা করি, উভয় তরফের মুরুব্বীরা সংগঠনের স্বার্থে, দ্বীনের স্বার্থে নিজেদের মধ্যকার বিরোধ দ্ব›দ্ব মিটিয়ে ফেলতে আন্তরিকভাবে সচেষ্ট হবেন। আমরা এও আশা করি, দু’পক্ষের সবাই সর্বাবস্থায় শান্ত থাকবে, ধৈর্যধারণ করবে এবং সহনশীলতা প্রদর্শন করবে। বিরোধ-দ্ব›েদ্বর শান্তিপূর্ণ সমাধান সকল মহলের কাম্য।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (1)
parvez ৩ ডিসেম্বর, ২০১৮, ৯:৩৩ এএম says : 0
টঙ্গীর মাঠে ইজতেমা করা একটি জায়েজ কাজ ; ফরয-ওয়াজিব-সুন্নাত-নফল কিছুই নয়। অথচ অপরের জানমালের ক্ষতি করা হারাম ( ফরযের বিপরীত )। এখানে যদি আবার ইজতেমার ব্যবস্থা করা হয়, আবার এই ঘটনা ঘটবে। অতএব, এই মাঠে অনির্দিষ্ট কালের জন্য ইজতেমা বন্ধ করা হোক।
Total Reply(0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন