ঢাকা, শনিবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৬ আশ্বিন ১৪২৬, ২১ মুহাররম ১৪৪১ হিজরী

জাতীয় সংবাদ

চট্টগ্রামে তীব্র সঙ্কট

প্রকাশের সময় : ২৭ জানুয়ারি, ২০১৬, ১২:০০ এএম

শফিউল আলম : সমগ্র চট্টগ্রামে গ্যাসের সংকট বিরাজ করছে দীর্ঘদিন ধরেই। সংকট এখন আরও শোচনীয়। চলছে হাহাকার অবস্থা। চাহিদার তুলনায় গ্যাস সরবরাহ অর্ধেকেরও নিচে নেমে গেছে। কারণ জাতীয় গ্রিড থেকে চট্টগ্রামের জন্য ন্যূনতম যোগানটুকুও মিলছে না। গতকাল পর্যন্ত সারাদেশের মধ্যে আনুপাতিক হিসাবে গ্যাসের সর্বাপেক্ষা ঘাটতি বা সংকট চেপে বসে আছে চট্টগ্রামেই। কর্ণফুলী গ্যাস কোম্পানি অসহায়ত্ব প্রকাশ করছে। রেশনিং করেও সংকট সামাল দিতে হিমশিম অবস্থা। তাছাড়া শিগগির চট্টগ্রামে গ্যাস সংকট নিরসনে আশারবাণী শোনাতে পারেনি জ্বালানি দপ্তর। বরং সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মহেশখালীতে এলএনজি টার্মিনাল ও পাইপলাইন স্থাপন সাপেক্ষে ২০১৭ সালের আগে চট্টগ্রামে গ্যাস সংকট স্থায়ীভাবে সুরাহার সম্ভাবনা ক্ষীণ। এ অবস্থায় গ্যাসের অভাবে শিল্প কল-কারখানা, ব্যবসা-বাণিজ্য, হিমায়িত খাদ্য, গার্মেন্টসহ রফতানিমুখী খাতে উৎপাদনে অচলাবস্থা বিরাজ করছে। রফতানি হচ্ছে ব্যাহত। শুধুই শিল্প-বাণিজ্য খাতে দৈনিক গড়ে প্রায় ৬শ’ কোটি টাকা লোকসান হচ্ছে। তবে পরোক্ষ আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ কোটি কোটি টাকা। উৎপাদন ব্যাহত হতে থাকায় রফতানি অর্ডার বাতিল হওয়ার আশংকায় প্রতিনিয়ত উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় আছেন শিল্প মালিকরা। তাছাড়া হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেও গ্যাসের সংযোগ না পেয়ে অলস ঠাঁয় বসে আছে প্রায় একশ’ ভারী ও মাঝারি শিল্প-কারখানা। কারখানার যন্ত্রপাতি বিনষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ব্যাংক ঋণ দায়দেনা নিয়ে চরম বিপাকে রয়েছেন শিল্পোদ্যোক্তারা।
গ্যাসের সংকটে শিল্প বাণিজ্যখাতের পুরনো গ্রাহকদেরও চলছে একই দুর্দশা। অনেক কল-কারখানায় লালবাতি জ্বলার উপক্রম। গার্মেন্টস, কম্পোজিট টেক্সটাইল, সার, ভোজ্যতেল, চিনি, সিএনজি ফিলিং স্টেশন, হিমায়িত খাদ্য, আবাসন, ঢেউটিন, এমএস রডসহ স্টীল ও রি-রোলিং মিলসমূহে মারাত্মক বিপর্যয় নেমে এসেছে। প্রধান সমুদ্র বন্দরসহ সুবিধাজনক ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে চট্টগ্রামকে ব্যবসা শিল্প বিনিয়োগের ‘আদর্শ স্থান’ বলা হয়ে থাকে। অথচ গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের কারণে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীরা চট্টগ্রাম থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। নতুন শিল্পায়ন ও ব্যবসার প্রসার না হওয়ায় কর্মসংস্থানের পথও রুদ্ধ। শিল্পনগরী চাটগাঁ জৌলুস হারাতে বসেছে। গ্যাসের অভাবে চট্টগ্রামের গ্যাস-নির্ভর রাউজান তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র, শিকলবাহা বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ রাখতে হচ্ছে। তাই শীতের মওসুমেও চেপে বসেছে লোডশেডিং। এতে ওয়াসার পানি পরিশোধন ও সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। চট্টগ্রামে পর্যাপ্ত ও নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহের দাবিতে প্রতিদিনই মানববন্ধন, সভা-সমাবেশ হচ্ছে। এসব সমাবেশ থেকে অনতিবিলম্বে চট্টগ্রামে জরুরীভিত্তিতে অন্তত বর্তমান সরবরাহের চেয়ে বাড়তি একশ’ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করে শিল্প-বাণিজ্য-রফতানি ও গৃহস্থালীতে বিরাজমান দুর্দশা লাঘবের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়। জাতীয় গ্রিড থেকে খুবই অপ্রতুল গ্যাস সরবরাহ করে চট্টগ্রামবাসীর সাথে ‘বিমাতাসুলভ আচরণে’র অভিযোগ উঠেছে। গ্যাসের অভাবে রান্নার চুলা বন্ধ থাকায় ঘরে ঘরে সাধারণ জনগণের ক্ষোভ-অসন্তোষ বেড়েই চলেছে।
বিজিএমইএ’র সাবেক প্রথম সহ-সভাপতি নাসির উদ্দিন চৌধুরী গ্যাস সংকট প্রসঙ্গে উদ্বেগ ব্যক্ত করে গতকাল জানান, চট্টগ্রামে চলমান গ্যাসের সংকটে দ্বিমুখী অচলাবস্থা বিরাজ করছে। শিল্প-কারখানা, রফতানি এবং গৃহস্থালী খাতে। গ্যাসের চাপ চট্টগ্রামে খুব কম থাকায় বিশেষত রফতানিমুখী গার্মেন্টসহ শিল্প-কারখানায় সময়মতো সিডিউল মাফিক উৎপাদনব্যবস্থা সচল রাখা যাচ্ছে না। অপ্রত্যাশিত সময়ে খুব সীমিত সময় ধরে গ্যাসের চাপ থাকে। তখন শ্রমিক-কর্মীদের দিয়ে বাড়তি সময়ে কাজ করাতে হয়। এতে করে কাখানাগুলোতে উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে গেছে। যা স্বাভাবিক ব্যবসা-বাণিজ্যে প্রতিকূলতা স্বরূপ। এ অবস্থায় গ্যাসের অভাবে রফতানি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাই চট্টগ্রামে গ্যাস সংকটের শিগগিরই সুরাহা প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রামে গ্যাসের চাহিদা রয়েছে প্রতিদিন ৫শ’ মিলিয়ন ঘনফুট। তবে এখানে ন্যূনতম চাহিদা ধরা হয় ৪শ’ ৫০ মিলিয়ন ঘনফুট। গতকালসহ (মঙ্গলবার) গত ১২ দিন যাবত চট্টগ্রামে গ্যাসের সরবরাহ মাত্র ২২০ থেকে ২৫০ মিলিয়ন ঘনফুটে ওঠা-নামা করছে। তবে এর আগে চট্টগ্রামে দৈনিক ২৭০-২৮০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যাচ্ছিল। এরফলে গৃহস্থালী খাতে সংকট এতোটা তীব্র ছিল না। চট্টগ্রামে গ্যাসের গ্রাহক ৫ লাখেরও বেশি। বর্তমান অবস্থায় জাতীয় গ্রিড থেকে সরবরাহ বৃদ্ধির দিকেই প্রতিনিয়ত তাকিয়ে আছে কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিঃ (কেজিডিসিএল)। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা চট্টগ্রামে গ্যাস সংকট সম্পর্কে জানান, সামগ্রিকভাবে সারাদেশে গ্যাস সংযোগ বেড়ে গেছে। তদুপরি গ্রিড হয়ে চট্টগ্রাম অভিমুখী গ্যাস পাইপ লাইন আকারে ছোট। ১৯৮১ সালে স্থাপিত চট্টগ্রামমুখী ২৪ ইঞ্চি ব্যাসের লাইন দিয়ে পর্যাপ্ত পরিমাণ গ্যাস আসছে না।
এদিকে চট্টগ্রাম মহানগরী, শহরতলীসহ বৃহত্তর চট্টগ্রামের ১২টি শিল্পাঞ্চলে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে অথবা বন্ধ রয়েছে গ্যাস সংকটের কারণে। কোন কোন কারখানায় শ্রমিক ছাঁটাই চলছে। কোথাও কোথাও শ্রমিক-কর্মচারীদের বসিয়ে বেতন দিতে হচ্ছে। শিল্প-কারখানায় বিদ্যুতের বিকল্প চাহিদা মেটাতে গিয়ে গ্যাস চালিত ক্যাপটিভ পাওয়ার প্লান্ট কিনেছেন অনেক শিল্প মালিক। কিন্তু গ্যাসের অভাবে ক্যাপটিভ পাওয়ার প্লান্টগুলো চালু করা যাচ্ছে না। চট্টগ্রামজুড়ে গ্যাসচালিত সবধরণের শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্যিক কর্মকা-ে চলছে নজিরবিহীন অচলাবস্থা। সেই সাথে রান্না-বান্নায় গ্যাসের সংকট আরও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। ভোর থেকে ও রাতের অর্ধেকটা সময় পর্যন্ত চুলায় গ্যাস থাকে না বেশিরভাগ জায়গায়। অসময়ে অল্প কিছুক্ষণ গ্যাস এসে আবার নিভু নিভু অবস্থায় চলে যাচ্ছে। প্রতিটি বাড়িঘরে গৃহিণীদের কষ্ট-দুর্ভোগের যেন আর শেষ নেই। অচল গ্যাসের চুলার ধারেই জ্বালাতে হচ্ছে লাকড়ি অথবা কেরোসিনের চুলা। হোটেল-রেস্তোরাঁয়ও খাবার তৈরি কাটছাঁট করা হয়েছে গ্যাস সংকটের কারণে।
চট্টগ্রামে নিববচ্ছিন্ন ও পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহের দাবি জানিয়ে আসছে চিটাগাং চেম্বার, মেট্রোপলিটন চেম্বার, বিজিএমইএসহ বিভিন্ন বণিক-শিল্পোদ্যোক্তা সংগঠন। চট্টগ্রামে বেশ ক’দিন যাবত গ্যাসের সরবরাহ কমে আসায় আবাসিক ও শিল্প খাতের গ্রাহকদের চরম দুর্দশায় ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। গত ২১ জানুয়ারি চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মাহবুবুল আলম গ্যাস সংকট নিরসনে জাতীয় গ্রিড থেকে সরবরাহ বৃদ্ধির আহ্বান জানিয়ে জ্বালানি উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-এলাহী চৌধুরী, জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ ও পেট্রোবাংলা চেয়ারম্যান ইশতিয়াক আহমেদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। চেম্বার নেতা বলেন, চলমান গ্যাস সংকটে চট্টগ্রামে শিল্পখাতে উৎপাদন ব্যাহত এবং বিদেশী ক্রেতাদের অর্ডার মোতাবেক পণ্য রফতানি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তাছাড়া মহানগরীর গ্যাস নির্ভর হাজার হাজার বাসাবাড়ি, রেস্তোরাঁ এবং খাবারের দোকানগুলোতে গ্যাসের অভাবে রান্না করা যাচ্ছে না। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক নারী-পুরুষ, ক্লিনিক ও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগী সবচেয়ে বেশী সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। গ্যাসের অভাবে তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদন সচল রাখা যাচ্ছে না। এতে করে নাগরিক জীবনে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, চট্টগ্রামে বছরের পর বছর চাহিদার তুলনায় প্রায় অর্ধেক গ্যাস সরবরাহের কারণেই শিল্পায়ন বন্ধ রয়েছে। চলমান শিল্প কারখানাগুলোর অবস্থাও নাজুক। রেশনিংয়ের মাধ্যমে কেজিডিসিএল কোনমতে পরিস্থিতি সামাল দিয়ে আসছিল। কিন্তু অবস্থার আরও অবনতি হওয়ায় চট্টগ্রাম মহানগরীর আবাসিক এবং শিল্প-কারখানাসহ সর্বক্ষেত্রে সংকট বেড়ে গেছে। তিনি দেশের বাণিজ্যিক কার্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দু ও দ্বিতীয় বৃহত্তম মহানগরীর ৫০ লাখেরও বেশি অধিবাসী এবং শিল্পোদ্যোক্তাদের নাজুক অবস্থা বিবেচনা করে জরুরীভিত্তিতে জাতীয় গ্রিড থেকে চট্টগ্রামে পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন