ঢাকা, মঙ্গলবার ২৩ জুলাই ২০১৯, ০৮ শ্রাবণ ১৪২৬, ১৯ যিলক্বদ ১৪৪০ হিজরী।

স্বাস্থ্য

কিডনী ও মূত্রনালির সংক্রমন

ডাঃ মোঃ হুমায়ুন কবীর | প্রকাশের সময় : ৪ জানুয়ারি, ২০১৯, ১২:০৭ এএম

কিডনী মানবদেহের একটি অতি প্রয়োজনীয় অঙ্গ। যা মানবদেহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিডনীর ভিতরে নেফ্রন নামক প্রায় ১০ লক্ষ ছাঁকনি থাকে। কোনো কারনে কিডনীর স্বাভাবিক কাজের ব্যাঘাত ঘটলেই মানবদেহে শুরু হয় ছন্দপতন। কিডনীর রোগের মধ্যে রয়েছে জন্মগত ক্রটি, হঠাৎ বা ধীরে ধীরে বিকল হয়ে যাওয়া, পাথর এবং প্র¯্রাবের সংক্রমন ইত্যাদি। 

কোনভাবে কোন জীবানু যদি মূত্রতন্ত্রের প্রবেশ করে সংক্রমন সৃষ্টি করে, তাহলে সেই অবস্থাকে বলা হয় মুত্রতন্ত্রের সংক্রমন বা সংক্ষেপে ইউটিআই। এটি একটি বিব্রতকর স্বাস্থ্য সমস্যা।
কিডনির কাজ:
মানবদেহের পিঠের নিচের অংশে মেরুদন্ডের দু’পাশে দুটি কিডনীর অবস্থান। মানবদেহে কিডনী গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে থাকে।
দেহের বর্জ্য পদার্থ নিস্কাশন করে এবং বাড়তি তরল পদার্থ সিঃসরন করে।
দেহের রক্তচাপ নিয়ন্ত্রনে ভূমিকা রাখে।
দেহের প্রয়োজনীয় লবনের সমতা ঠিক রাখে।
দেহে এসিড ও ক্ষারের সমতা বজায় রাখে।
এক ধরনের হরমোন তৈরীর মাধ্যমে অস্থিমজ্জাকে প্রভাবিত করে শরীরে রক্ত তৈরী করে।
দেহের হাড়গুলোকে সরল ও মজবুত রাখতে সাহায্য করে।
মুত্রতন্ত্রের সংক্রমনঃ
কিডনী, মুত্রথলি, মুত্রনালী এবং ইউরেটার এ চারটি অংশ নিয়ে মুত্রতন্ত্র গঠিত। মুত্রতন্ত্রের যেকোন অংশ জীবানু বা ব্যাকটেরিয়া দ্বারা আক্রান্ত হলে তাকে ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন বা ইউটিআই বলে। ইউরেথ্রাইটিস, সিস্টাইটিস, পায়েলোনেফ্রাইটিস প্রভূতি প্র¯্রাবের সংক্রমনের বিভিন্ন নাম, ই. কলাই নামক জীবানু শতকরা ৭০ ভাগ প্র¯্রাবের সংক্রমনের কারন। এছাড়া অসুস্থতার কারনে দীর্ঘদিন প্র¯্রাবের নালীতে নল থাকলে ইউটিআই হতে পারে।
মুত্রতন্ত্রের সংক্রমনের প্রকারঃ
অবস্থান অনুযায়ী মুত্রতন্ত্রের সংক্রমন তিন প্রকারের হয়ে থাকে।
উপসর্গবিহীন বা অ্যাসিম্পটোমেটিক সংক্রমন।
নি¤œ মুত্রন্ত্রের সংক্রমন। যা শুধু মুত্রথলি বা বøাডার এবং মুত্রনালী বা ইউরেথ্রা আক্রান্ত হয়।
উপর মুক্রতন্ত্রের সংক্রমন বা পায়েলোনেফ্রাইটিস। যা কিডনী নিজেই আক্রান্ত হয়।
জীবানু কিভাবে মুত্রতন্ত্রে প্রবেশ করে?
মুত্রনালী থেকে প্র¯্রাবের থলি, সেখান হতে ইউরেটরের মাধ্যমে জীবানু কিডনী পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। ই. কলাই জীবানুর শতকরা ৯৫ ভাগ খাদ্যনালী বা বৃহদান্ত্রে বসবাস করে। মলত্যাগের সময় যদি কোনভাবে এ জীবানু প্র¯্রাবের নালীর সংস্পর্শে আসে, তখন এ জীবানু দ্বারা আক্রান্ত হয়। ছেলেদের তুলনায় মেয়েরা বেশী আক্রান্ত হয়।
কারনঃ
মুত্রতন্ত্রের সংক্রমনের কারন বহুবিধ। কারনগুলো নি¤œরুপঃ
বেশীরভাগ ক্ষেত্রে ব্যাকটেরিয়া (প্রায় ৯০ ভাগ) এবং কিছু ক্ষেত্রে যা ছত্রাক বা পরজীবী দ্বারা আক্রান্ত হয়।
এলার্জিজনিত কারনেও হতে পারে।
মুত্রতন্ত্রে সংক্রমন মেয়েদের ক্ষেত্রে বেশী দেখা যায়। কারন মেয়েদের ক্ষুত্রনালির দৈর্ঘ্য ছোট। যেখানে ছেলেদের দৈর্ঘ্য ৮ ইঞ্চি, সেখানে মেয়েদের দৈর্ঘ্য মাত্র ১.৫ ইঞ্চি।
মেয়েদের মুত্রদ্বার এবং যৌনীপথ খুব কাছাকাছি, ঋতু¯্রাবের সময় অনেক নোংরা কাপড় ব্যবহার করে, ফলে সহজেই জীবানু যোনীপথে এবং পরে মুত্রনালিকে সংক্রমিত করে।
মেয়েদের প্র¯্রাব আটকে রাখার প্রবণতা বেশী। ফলে সহজেই সংক্রমন হওয়ার সম্ভাবনা বেশী থাকে।
যারা পানি কম পান করে।
ডায়াবেটিস আক্রান্ত রোগী।
ষাটোর্ধ্ব বয়স, যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম।
কাদের হয়?
পুরুষের তুলনায় নারীদের ইউটিআই ৪ গুন বেশী হয়। সাধারণত ১৫-৬০ বছরের নারীরা বেশী ভোগেন, গড়ে প্রায় ৬০ শতাংশ নারী বিশেষ করে যৌন সক্রিয় বয়সে ইউটিআই এ আক্রান্ত হয়।
মুত্রনালীতে জন্মগত ক্রটি মুত্রনালির ভাল্ভ, বøাডার নেক অবস্ট্রাকশন ইত্যাদির কারনে শৈশবে ছেলেদের এ রোগ হয়। এ বয়সে উপসর্গবিহীন জীবাণুর নিঃসরণ ঘটে, তবে সচেতন না হলে ক্রমেই জটিল আকার ধারন করতে পারে।
এছাড়া স্কুল পড়–য়া মেয়েদের মধ্যেও এ রোগের প্রকোপ দেখা যায়। এক্ষেত্রে উপসর্গবিহীন সংক্রমন হয়। সচেতন না হলে বিয়ের পর এবং গর্ভাবস্থায় ক্রনিক রুপ নিতে পারে।
চল্লিশোর্ধ্ব পুরুষের প্রস্টেটগø্যান্ড বড় হয়ে প্র¯্রাবে বাঁধার সৃষ্টি হয়, ফলে এ রোগ আক্রান্ত হয়।
গর্ভাবস্থায় ৫ শতাংশ নারী উপসর্গবিহীন নিঃসরনে ভোগে, যাদের ১৫-৫০ শতাংশের মধ্যে পায়েলোনেফ্রাইটিসের ঝুঁকি থাকে। গর্ভাবস্থায় এ রোগ মা ও শিশুর জন্য হুমকিস্বরুপ। এতে প্রিম্যাচিউরড বাচ্চা প্রসব, নবজাত শিশুর মৃত্যু, ষ্টিলবার্থ, অ্যাবরশন ইত্যাদি বেশী হয়। আবার গভবর্তীর উচ্চ রক্তচাপ ও প্রি এক্লাম্পটিক টক্সিমিয়া হতে পারে।
লক্ষণঃ
ইউটিআই এর বেশি কিছু লক্ষণ পরিলক্ষিত হয়। তবে সংক্রমনের উপসর্গ আক্রমনের স্থানভেদ ভিন্ন তর। যেমন:
প্রসাবের জ¦ালাপোড়া ও ঘন ঘন প্র¯্রাব।
প্রসাবের সময় ব্যথা অনুভব হওয়া।
প্রসাবের বেগ বেশী অথচ কম প্র¯্রাব ত্যাগ।
প্রসাবের পরও প্রসাবের করার ইচ্ছা।
তলপেটে ব্যথা এবং ভার ভার বোধ।
ঘন ফেনার মত দূর্গন্ধযুক্ত প্রসাব ত্যাগ।
প্রসাবের রং ঝাপসা বা লালচে।
ফোঁটা ফোঁটা প্রসাব ত্যাগ, অনেক সময় রক্ত যাওয়া।
দূর্বলতা, খাবারে অরুচীভাব।
বারবার জ¦র হওয়া।
শিশু বিছানায় প্রস্রাব ত্যাগ এবং যথাযথ না বেড়ে ওঠা।
পেটের রোগ (যেমন: অজীর্ণ, ডায়রিয়া ইত্যাদি)
জটিলতাঃ
ইউটিআই এর বিরক্তিকর দিক হলো পুনরাগমন বা বারবার সংক্রমন ইউটিআই আক্রান্ত মহিলা একবার আক্রান্ত হওয়ার পর প্রতিবার পাওয়ার পর বারবার হতে পারে। যখন বারবার একই জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হয়, তখন পুনরাগমন রিকারেন্সকে রিলাপ্স বলে।
সংক্রমন রক্তে প্রবেশ চার সেপসিস এবং ক্ষেত্রবিশেষে জীবণসংহারী সেপটিসিমিয়া হতে পারে। এ অবস্থা অত্যন্ত মারাত্মক। যা সঠিক চিকিৎসা না করালে মারাত্মক বিপর্যয় ঘটতে পারে।
ঝঁকিপূর্ণ কারণঃ মহিলাদের ক্ষেত্রে−
যৌন সম্পর্কের সময় জীবাণু বা ব্যাকটেরিয়া মুত্রথলিতে চলে যায়। ফলে যৌন সম্পর্কে মুত্রথলির সংক্রমন একটা বড় কারন।
যেসব নারী বিভিন্ন স্পার্মিসাইড, কৃত্রিম ডায়াফ্রাম ব্যবহার করেন, তাদের ঝুঁকি আরো বেশী।
গর্ভধারণ কালে ইউরেটর মোটা হয়, ফলে আবার গর্ভাবস্থায় ইস্ট্রোজেন এবং প্রজেস্টেরন প্রসাব দিয়ে বেশী নির্গত হবে, ফলে ব্যাকটেরিয়া প্রতিরোধ ক্ষমতা করে গিয়ে সংক্রমন হয়।
ঋতুকালে যারা অস্বাস্থ্যকর কাপড় ব্যবহার করেন তাদের সংক্রমন হার বেশী।
ঋতুবন্ধ হওয়ার পরও মেয়েদের মুত্রতন্ত্রের সংক্রমন হওয়ার হারও বেশী।
পুরুষের ক্ষেত্রে−
প্রস্টেটগ্রন্থির বড় হওয়া।
সারকামসিশন বা মুসলমানি না করা হলে লিঙ্গের অগ্রভাগের চামড়ার ভাঁজের ভেতরে ব্যাকটেরিয়া জমে সংক্রমন হতে পারে।
অ্যানাল ইন্টারকোর্স।
সহবাসের সময় মেয়েদের যৌনাঙ্গ হতে।
এইডস রোগী হতে।
তাছাড়াও পানি কম পান করা,প্রসাবের পরিমান কমে যাওয়া, প্রসাবের নালীতে দীর্ঘদিন ক্যাথেটার লাগানো থাকলে সংক্রমন হয়।
প্রয়োজনীয় পরীক্ষাঃ
রোগ নির্ণয়ের জন্য নিন্মোক্ত পরীক্ষাগুলো করা যেতে পারে।
প্রসাবের রুটিন পরীক্ষা, প্রসাবের কালচার।
রক্তের সেরাম ক্রিয়েটিনিন পরীক্ষা।
তলপেটের আন্ট্রাসনোগ্রাম পরীক্ষা।
মুত্রনালীর রস পরীক্ষা।
সিস্টোস্কপি।
চিকিৎসাঃ
ইউটিআই আসলে খুব সাধারন রোগ। সময়মত যদি চিকিৎসা না করা হয় তবে মারাত্মক আকার ধারন করতে পারে। চিকিৎসকেরা উপযুক্ত রোগের উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসা প্রদান করলে এ রোগ থেকে সহজেই পরিত্রান পাওয়া সম্ভব। এ সময়ে পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং প্রচুর পরিমানে পানি বা তরল পান করতে হবে।
হোমিওপ্যাথিক উপসর্গভিত্তিক চিকিৎসা পদ্ধতি, তাই সঠিক সময়ে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা নিলে এ রোগ হতে পরিত্রান পাওয়া সম্ভব।
এছাড়াও প্রচুর পানি পান করে জীবাণুগুলোকে বিধৌত করে বের করে দিতে হবে। পুন:পুন প্রসাবের করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। ক্র্যানবেরি জুস খাওয়া যেতে পারে। বেশি সময় প্রসাবের ধরে রাখা যাবে না।
প্রতিরোধঃ
যে কোন রোগ প্রতিরোধ হলো সর্বোওকৃষ্ট চিকিৎসা, জেনে নিই এই রোগ হতে কিভাবে প্রতিরোধ পাওয়া সম্ভব। সবচেয়ে বেশী প্রয়োজন নিয়মিত ও পরিমিত পানি পান করা। সকালে ঘুম হতে উঠে খালি পেটে পানি পানের অভ্যাস গড়ে তোলা।
প্রসাবের আটকে না রাখা। যখনই বেগ আসে তখনই প্রসাবের করা।
ক্র্যানবেরী জুস খেলে মুত্রতন্ত্রের সংক্রমন কমে যায়, তা খাওয়ার অভ্যাস করা।
কোষ্ঠ্যকাঠিন্য যেন না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
বাথরুম ব্যবহারের পর টয়লেট টিস্যু পেছন হতে সামনের দিকে না এনে, সামনে হতে পিছনের দিকে ব্যবহার করতে হবে । যাতে করে মলদ্বারের জীবাণু মুত্রপথে এসে সংক্রমন না করতে পারে।
মুত্রত্যাগের পর যথেষ্ট পানি ব্যবহার করতে হবে।
শারীরিকভাবে পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন থাকতে হবে।
ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রন রাখতে হবে।
যৌন সহবাসের পূর্বে প্রসাবের ত্যাগ করতে হবে। এতে মুত্রনালিতে আসা সব জীবাণু পরিস্কার হয়।
স্যানিটারী প্যাড ঘন ঘন বদলিয়ে নিবেন।
মেয়েরা ডিওডারেন্ট ব্যবহার না করুই উত্তম। এগুলো ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্য নষ্ট করে।
মুসলমানি বা সারকামসিশন করানো হলে সংক্রমন হতে রক্ষা পাওয়া সম্ভব।
খুব আঁটসাঁট অন্তবাস না পরা। সুতী কাপড় আর্দ্রতা শুষে নেয়। তাই সুতী অন্তর্বাস পরিধান করা উত্তম।
সতর্কতাঃ
প্রসাবের জ্বালাপোড়া বা ব্যথা করা মানেই সংক্রমন নয়। অন্য কোনো কারনেও হতে পারে। তাই চিকিৎসা ব্যতীত অযথা ঔষধ বা অ্যান্টিবায়োটিক কিনে খাওয়া হতে বিরত থাকা উচিত। এতে হিতে বিপরীত হতে পারে। এই ক্ষেত্রে হোমিওপ্যাথিক ঔষধ নিরাপদ ও সেবনে এ রোগ হতে দীর্ঘমেয়াদী পরিত্রান পাওয়া সম্ভব।

কনসালট্যান্ট, রেনেসাঁ হোমিও মেডিকেয়ার
৮৯, নিমতলী সিটি কর্পোরেশন মার্কেট, চাঁনখারপুল,ঢাকা-১০০০।
মোবাইল: ০১৭১৭৪৬১৪৫০, ০১৯১২৭৯২৮৯৪

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

গত ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন