সোমবার ০৫ ডিসেম্বর ২০২২, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৯, ১০ জামাদিউল আউয়াল ১৪৪৪ হিজরী

সম্পাদকীয়

প্রধানমন্ত্রীর জাতীয় ঐক্যের ডাক

| প্রকাশের সময় : ২৭ জানুয়ারি, ২০১৯, ১২:০৪ এএম

গত শুক্রবার সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়েছেন। ভাষণে তিনি বলেছেন, এখন আমাদের প্রয়োজন জাতীয় ঐক্য। বিভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধভাবে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। আমাদের ঐক্যের যোগসূত্র হবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, অসাম্প্রদায়িকতা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, সাম্য ও ন্যায়বিচার এবং উন্নয়ন ও অগ্রগতি। তিনি বলেন, বিজয়ের পর আমরা সরকার গঠন করেছি। সরকারের দৃষ্টিতে দল-মত নির্বিশেষে দেশের সকল নাগরিক সমান। আমরা সবার জন্য কাজ করব। দেশের সরকার প্রধান হিসেবে, প্রধানমন্ত্রীর এ জাতীয় ঐক্যের আহ্বান ইতিবাচক। আমরা তাঁর এ আহ্বানকে স্বাগত জানাই। তবে এ কথা অনস্বীকার্য, দেশে বহু বছর ধরে রাজনৈতিক বিভাজন, বিদ্বেষ, হিংসা-প্রতিহিংসা, পারস্পরিক অসহাবস্থানের বিষয় বিদ্যমান রয়েছে। ক্ষমতাসীন দল ও বিরোধী দলের মধ্যে জাতীয় স্বার্থে একমত হতে দেখা যায়নি বললেই চলে। বরং কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ বা সংকটকালে সরকার বা বিরোধী দলের মধ্যে মতদ্বৈততা দেখা গিয়েছে। ক্ষমতাসীন দল এবং বিরোধী দলকে একে অপরকে শত্রুজ্ঞান করার এক ধরনের অপসংস্কৃতি দীর্ঘদিন ধরেই বিরাজমান। এ প্রেক্ষাপটে, প্রধানমন্ত্রী জাতীয় ঐক্যের যে ডাক দিয়েছেন, রাজনৈতিক বিভাজন দূর করে তার সত্যিকার বাস্তবায়ন দেশের মানুষ দেখতে চায়। 

যে কোনো দেশের ক্ষেত্রেই জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার বিকল্প নেই। জাতিকে বিভাজিত রেখে কোনো দেশ সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে অগ্রসর হতে পারে না। উন্নত বিশ্বের দেশগুলোতে আমরা দেখেছি, জাতীয় স্বার্থে সরকার ও বিরোধী দল সহমত পোষণ করে। দেশের স্বার্থে সকলেই এক কাতারে শামিল হয়। আমাদের দেশে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার কথা বলা হলেও, জাতীয় স্বার্থে সরকার বা বিরোধী দলকে এক হতে দেখা যায় না। বিরোধী দলের কথা গ্রহণযোগ্য হলেও সরকার তা আমলে নেয় না। মনে করে, তার সিদ্ধান্তই সঠিক এবং সে অনুযায়ীই কাজ করে। আবার সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ ইতিবাচক হলেও বিরোধী দল তার বিরোধিতা করে। রাজনৈতিক দলগুলোর এই পরস্পরবিরোধী অবস্থানের কারণে দেশে একদিকে যেমন সুস্থ রাজনৈতিক পরিবেশ গড়ে উঠেনি, তেমনি গণতান্ত্রিক ধারাও অত্যন্ত দুর্বল অবস্থায় রয়ে গেছে। এখনতো সংসদে নিজেদের যোগ্যতায় নির্বাচিত হয়ে প্রকৃত বিরোধী দল হওয়ার সংস্কৃতিই বন্ধ হয়ে গেছে। যারা বিরোধী দল হয়, তারা সরকারি দলের হয়ে নির্বাচিত হয়ে বিরোধী দলে বসে। ফলে সংসদে সরকার ও বিরোধী দল একাকার হয়ে থাকে। প্রকৃত বিরোধী দল বলতে কোনো কিছু থাকে না। বিগত সংসদে যেমন দেশের মানুষ এ চিত্র দেখেছে, নতুন সংসদেও একই চিত্র লক্ষ্যযোগ্য। গত সংসদে যাদের বিরোধী দলের সদস্য হিসেবে সরকার গণ্য করেছে, তারা সরকারের মন্ত্রিসভায়ও ছিলেন। ফলে ঐ বিরোধী দলকে দেশের মানুষ বিরোধী দল হিসেবে মনে করেনি। তাকে ‘গৃহপালিত’ বিরোধী দল হিসেবে আখ্যায়িত করেছিল। এ ধরনের রাজনীতি যে জাতীয় ঐক্যের রাজনীতি, তা বিশ্লেষকরা স্বীকৃতি দেয়নি। বলা বাহুল্য, যে দেশে সরকার ও বিরোধী দল একাকার হয়ে থাকে সেখানে গণতান্ত্রিক চর্চা হওয়ার সম্ভাবনা খুব কমই থাকে। সরকারের ভেতর থেকে বের হওয়া বিরোধী দল গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। সরকারের ভুল-ত্রুটি ধরিয়ে দেয়ার মতো নৈতিক অবস্থানও তার থাকে না। প্রধানমন্ত্রী জাতীয় ঐক্যের যে ডাক দিয়েছেন, তা আমরা ইতিবাচক ধরে নিয়েই বলতে চাই, কেবল ঐক্যের ডাক দিলেই হবে না, তা সত্যিকার অর্থে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া বাঞ্চনীয়। এ কাজটি সরকারের পক্ষে সম্ভব। অন্য কারো পক্ষেই তা সম্ভব নয়। এ কথা সকলেরই জানা, সব মানুষে এক দলে যোগদান করা মানে জাতীয় ঐক্য নয়। বহুমত এবং বহুপথ থাকা গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। জাতীয় কল্যাণ ও স্বার্থে জাতীয় ঐকমত্যই প্রকৃত পক্ষে জাতীয় ঐক্য। জাতীয় ঐক্যে সবশ্রেণি পেশার মানুষের ঐক্য থাকতে হয়।
দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও অগ্রগতির কথা কেউই অস্বীকার করে না। প্রশ্ন হচ্ছে, এই উন্নয়ন ও অগ্রগতি ঐক্যমত্যের ভিত্তিতে হচ্ছে কিনা? বর্তমান সরকার গত শাসনামলে উন্নয়ন আগে, গণতন্ত্র পরে- এমন একটা থিওরি নিয়ে চলেছে। এ নিয়ে সচেতন শ্রেণি ও নাগরিক সমাজের মধ্যে সমালোচনা হয়েছে। প্রত্যেকেই মনে করেছে, টেকসই উন্নয়নের জন্য গণতন্ত্র এবং উন্নয়ন দুটোকেই প্রাধান্য দিতে হবে। একটিকে বাদ দিয়ে আরেকটি যথাযথভাবে এগিয়ে নেয়া সম্ভব নয়। সরকার এ বিষয়টি আমলে নেয়নি। এর কারণ হচ্ছে, সরকার মনে করেছে দেশের প্রধান বিরোধীলকে বাদ দিয়ে তার সমমনা কিছু দলকে নিয়ে দেশ পরিচালনা করতে পারলেই যথেষ্ট। সরকারের এ মনোভাব ও বিরোধী দলকে দমন-পীড়ন করে কোণঠাসা করার কারণে দেশ স্পষ্টতই দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়ে এবং এর প্রভাব সমাজেও পড়ে। এতে দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ এক ধরনের অস্থিতিশীল হয়ে থাকে। দেশ ও সমাজে বিরাজমান যে বিভক্তি, এর জন্য মূলত রাজনীতিবিদরাই দায়ী। এ অবস্থা থেকে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা ছাড়া বের হওয়ার কোনো পথ নেই। জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার অন্যতম শর্ত হচ্ছে, বিরোধী দলগুলোকে তাদের রাজনীতি করার অধিকার অবাধ করে দেয়া। আমরা দেখছি, প্রধান বিরোধী দলসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের এ অধিকার সংকুচিত হয়ে আছে। তারা বাধাহীনভাবে তাদের গণতান্ত্রিক কর্মসূচি পালনের ক্ষেত্রে বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে। বিরোধী দলকে এভাবে কোণঠাসা করে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। আমরা মনে করি, জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা করতে হলে প্রধান বিরোধী দলসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের গণতান্ত্রিক রাজনীতি করার অধিকার অবাধ করে দিতে হবে। সরকারকে এ বিষয়টি গুরুত্ব দিতে হবে। এ কাজটি করতে পারলে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি যেমন স্থিতিশীল থাকবে, তেমনি উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রাও বেগবান হবে।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন