ঢাকা, বুধবার ২৪ জুলাই ২০১৯, ০৯ শ্রাবণ ১৪২৬, ২০ যিলক্বদ ১৪৪০ হিজরী।

স্বাস্থ্য

অস্টিওপরোসিস রোগ ও নারী

ডা: মাও: লোকমান হেকিম | প্রকাশের সময় : ৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯, ১২:০৫ এএম

আমাদের দেশে অপুষ্টি হলো জাতীয় সমস্যা । আর্থিক অনটন, খাদ্য সংকট, পুষ্টি জ্ঞানের অভাব ও কুসংস্কার হলো এর মূল কারণ। মা ও শিশুরা হলো অপুষ্টির সহজ ও নিমর্ম শিকার। মানুষের সবচেয়ে প্রিয় হলো তার জীবন । তাই সবার হৃদয় জুড়ে থাকে বেঁচে থাকার বাসনা। খাদ্য ছাড়া জীবনের অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না। সব বয়সে সুস্থ, সবল ও কর্মক্ষম থাকতে হলে জন্ম থেকেই একজন মানুষকে প্রয়োজন অনুসারে সুষম খাবার খেতে হয়। এতে করে মানবশরীর স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠে। দীর্ঘ দিন কর্মক্ষম থাকে। এর ব্যতিক্রম ঘটলেই দেখা দেয় বিপত্তি। শরীরে বাসা বাঁধে নানা রোগ্যব্যাধি । অস্টিওপরোসিস এমন একটি জটিল রোগ। এটি মানবদেহে বাসা বাঁধলে হাড়ে অসংখ্য ছিদ্রের সৃষ্টি হয়। ফলে হাড়ের কার্যকারিতা যায় কমে। হাড় সহজেই ছোটখাটো আঘাতে ভেঙে যায়। সাধারণত এই রোগের সহজ শিকার হয় নারীসমাজ। তখন তাদের জীবন হয়ে ওঠে দুর্বিষহ। হাড়ের ভেতরে খনিজ পদার্থের ঘনত্ব কমে গেলে অস্টিওপরোসিস দেখা দেয়। শরীরে থাইরয়েড ও হরমোনের পরিমাণ বেড়ে গেলেও অস্টিওপরোসিস হতে পারে। যৌন হরমোন পরিমাণের চেয়ে কম থাকলে সমস্যাটি হতে পারে। ধূমপানও হাড়ের ভঙ্গুরতা তথা অস্টিওপরোসিসের আরেকটি বড় কারণ। সমস্যা হচ্ছে, প্রাথমিক অবস্থায় এ রোগের কোনো লক্ষণ প্রকাশ পায় না। সাধারণত মাত্রা বাড়ার সাথে সাথে হাড়ে ফাটল ধরা অথবা পেছনের হাড়ে ব্যথা হয়ে তাকে। ধারণার চেয়ে অনেক আগে হাড়ে চিড় দেখা দেয়। অতিসম্প্রতি একটি জাতীয় পত্রিকার এক প্রতিবেদনের মাধ্যমে জানতে পারলাম-অস্টিওপরোসিসে আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে প্রতি তিনজনের একজন নারী। সাধারণত নারীর হাড়ের ঘনত্ব পুরুষের চেয়ে কম থাকে। এ কারণে ৫০ পেরোনোর পর বাংলাদেশে ৩০ শতাংশ নারী অস্টিওপরোসিসে আক্রান্ত হন। তরুণ বয়সে অস্টিওপরোসিস খুব একটা হয় না। তরুণদের আক্রান্তের ঘটনা বিরল। ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি সেবন বাড়ালে সমস্যাটি থেকে মুক্তি মেলে। উচ্চ ক্যালরিসম্পন্ন প্রোটিন বয়স্কদের অস্টিওপরোসিসের ঝুঁকি কমায়। রোগটি থেকে বাঁচতে চাইলে বেড়ে ওঠার বয়স পর্যন্ত শিশুদের প্রতিদিন প্রচুর পরিমাণে ক্যালসিয়াম আছে, এমন খাবার খাওয়ানো উচিত। হাড়ের ঘনত্ব বাড়াতে পরিমিত ফল ও শাকসবজি খাওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেন চিকিৎসকেরা। তারুণ্যে যারা পর্যাপ্ত ভিটামিন ডি, ক্যালসিয়াম-সমৃদ্ধ খাবার এবং ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন পরিপূরক হিসেবে ব্যবহার করেন, বুড়ো বয়সে তাদের অস্টিওপরোসিসের আশঙ্কা কম থাকে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু) ও ওয়ার্ল্ড ফুট অ্যান্ড অ্যাগ্রিকালচার অর্গানাইজেশনের (এফএও) সুপারিশ অনুসারে, একজন বয়স্ক মানুষের দৈনিক ১০০০ থেকে ১৩০০ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম গ্রহণ করা উচিত; কিন্তু এশিয়ান গ্রামীণ অঞ্চলের মানুষ দৈনিক মাত্র ৪৫০ মিলিগ্রামের কম ক্যালসিয়াম গ্রহণ করে থাকে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, এত অল্প পরিমাণ ক্যালসিয়াম হাড়ের স্বাস্থ্যের সুরক্ষা দিতে পারে না। অস্টিওপরোসিসের কারণে প্রতি বছর বিশ্বব্যাপী ৮৯ লাখ মানুষের হাড়ে ভঙ্গুরতা দেখা দেয়। ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বে অস্টিওপরোসিসে হাড়ে অঙ্গুরতার ৫০ শতাংশ হবে এশীয়দের মধ্যে। এশিয়ার দেশগুলোতে রোগটি যেমন ডায়াগনসিসের বাইরে থাকে আবার ডায়াগনসিস হলেও চিকিৎসা করা হয় না দারিদ্রের কারণে। সমস্যাটি শহরের চেয়ে গ্রামে বেশি। শিশুকাল ও তরুণ বয়সে শারীরিক ব্যায়াম করলে হাড় শক্ত হয়। দিনের নির্দিষ্ট সময় অবসরে থাকা, খেলাধুলার অনুশীলন করা এবং দিনের কয়েক ঘন্টা বসে কাটালে কোমরের হারের ভঙ্গুরতা থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। শারীরিক ফিটনেস ও অঙ্গ চালনা অস্টিওপরোসিসের ঝুঁকি কমায়। অস্টিওপরোসিস রোগে নারীরা বেশি আক্রান্ত হওয়ায় বাংলাদেশের নারী-স্বাস্থ্যের জন্য এটি ঝুঁকি হিসেবে দেখা দিয়েছে। এখনই যদি এ রোগ সম্পর্কে সরকারি ও বেসরকারিভাবে যৌথ উদ্যোগ নেয়া না হয় তাহলে আমাদের নারীসমাজ তাদের যথাযথ দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হবে। ফলে আমাদের জাতীয়পর্যায়ে সামগ্রিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে হবে। তাই সময় থাকতে কার্যকর কর্মসূচি নেয়া জরুরি। গ্রামীণপর্যায়ে এ রোগের প্রবণতা বেশি হওয়ায় গ্রামের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য উপজেলা হাসপাতালগুলোতে এর চিকিৎসা সহজলভ্য হওয়া প্রয়োজন।

চিকিৎসক-কলামিস্ট, মোবা : ০১৭১৬২৭০১২০

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

গত ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন