ঢাকা সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১৩ আশ্বিন ১৪২৭, ১০ সফর ১৪৪২ হিজরী

সম্পাদকীয়

গণতন্ত্রের সূচক এত নিম্নগামী কেন?

মো. তোফাজ্জল বিন আমীন | প্রকাশের সময় : ৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯, ১২:০৫ এএম

বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্র আজ বিপন্ন। গণতন্ত্র তার জায়গা থেকে অজানা গন্তব্যে পাড়ি দিচ্ছে। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের কথা না হয় বাদ-ই দিলাম। ৫৬ হাজার বর্গমাইলের এই দেশে গণতন্ত্রের মজবুত ভিত্তি রচিত হয়নি বলেই স্বাধীনতার ৪৭ বছর পরও গণতন্ত্রের সূচকে বাংলাদেশ পিছিয়ে। ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানে রাষ্ট্রপরিচালনার যে চারটি মূলনীতি নির্ধারিত হয় সেগুলোর অন্যতম ছিল গণতন্ত্র। কিন্তু সেই গণতন্ত্র আজও প্রতিষ্ঠিত হয়নি। শুধু মনের আয়নাতে কল্পনা করা যায়। গণতন্ত্রের সংজ্ঞাটা অনুধান করা যায় কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় না। গণতন্ত্রের জন্য এদেশের মানুষ যে ত্যাগ স্বীকার করেছে, উপমহাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তার নজির খুব বেশি নেই। কিন্তু সেই গণতন্ত্র আজ কোথায়? একটি দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ কতটুকু বিরাজ করছে তা পরিমাপ করার জন্য ব্যারোমিটারের প্রয়োজন নেই। দেশটির জনগণ কিংবা বিরোধীদলের চেহারাই বলে দেয় তারা কতটুকু গণতান্ত্রিক অধিকার ভোগ করতে পারছে।
লন্ডনভিত্তিক সাময়িকী দি ইকোনমিস্টের ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (ইআইইউ) সম্প্রতি ‘গণতন্ত্রের সূচক ২০১৮’ প্রকাশ করেছে। বিশ্বের ১৬৫টি স্বাধীন দেশ এবং দুটি অঞ্চলকে নিয়ে সূচকটি তৈরি করা হয়েছে। নির্বাচনী ব্যবস্থা ও বহুদলীয় অবস্থান, সরকারের কার্যকারিতা, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং নাগরিকদের অধিকারের বিষয়টিকে সামনে রেখে একটি দেশের পরিস্থিতি বিবেচনা করে দশ পয়েন্ট ভিত্তিক এ সূচক তৈরি করেছে ইআইইউ। প্রাপ্ত স্কোরের ভিত্তিতে চারটি শ্রেণিতে দেশগুলোকে ভাগ করা হয়েছে। যেমন, পূর্ণ গণতন্ত্র, ত্রুটিপূর্ণ গণতন্ত্র, মিশ্র শাসন ও স্বৈরতন্ত্র। মূল্যায়নের ১০ পয়েণ্টের মধ্যে ৯ দশমিক ৮৭ স্কোর নিয়ে শীর্ষে রয়েছে নরওয়ে। শীর্ষ পাঁচে অবস্থানকারী অন্য দেশগুলোর হচ্ছে, আইসল্যান্ড, সুইডেন, নিউজিল্যান্ড ও ডেনমার্ক। সবার নিচের ১৬৭তম অবস্থানে রয়েছে উত্তর কোরিয়া। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভালো অবস্থানে আছে ভারত এবং শ্রীলংকা। বাংলাদেশ ৫ দশমিক ৪৩ স্কোর নিয়ে ৯২তম অবস্থানে রয়েছে। ২০১৬ সালের সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ৮৪তম। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সূচক কেন দুর্বল অবস্থানে রয়েছে সেই বিষয়টি রাষ্ট্রের সবার দেখা প্রয়োজন।
একটি স্বাধীন দেশের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হচ্ছে একটি সুষ্ঠু অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচন। আর সে নির্বাচনটি যখন একতরফা হয়ে যায় তখনই বির্তকের জন্ম হয়। বির্তকিত নির্বাচনে মাধ্যমে যখন একটি দল জয়ী হয় তখন কিন্তু দলটির উপর জনগণের ক্ষোভ বাড়তে থাকে। ক্ষমতায় যাওয়া আর জনগণকে বোকা বানানো এক জিনিস না। জনগণ এখন আর আগের মতো এতো বোকা নয়! ডিজিটাল জামানায় ভাবের পাগল পাওয়া যায়। কিন্তু সত্যিকারের পাগল পাওয়া যায় না। কারণ পাগলও টাকা চেনে। এই সরকারের আমলে স্কুল কমিটি, বাজার কমিটি, ব্যবসায়ীদের নেতা নির্বাচন থেকে শুরু করে স্থানীয় সরকারের নির্বাচন পর্যন্ত বিতর্কিত হয়েছে। স্বাধীনতার শুরুতেই সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব হয়ে উঠেনি বলেই স্বাধীনতার তিন বছরের মাথায় বহুদলীয় গণতন্ত্রের স্থলে একদলীয় শাসনব্যবস্থা জাতির কাঁধে চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল নির্ভেজাল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু সে গণতন্ত্র আজ কোথায়? ১৯৯০ সালে স্বৈরাচার এরশাদ শাসনের অবসানের পর বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর থেকে নিয়মিত নির্বাচন হয়ে আসছে। ২০০৮ সালে কেয়াটেকার সরকারের অধীনে আওয়ামী লীগ দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে ক্ষমতায় আসে। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, কেয়ারটেকার সরকার পদ্ধতির নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতার স্বাদ গ্রহণ করার সুযোগ পেয়েও পরে এই ব্যবস্থা সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে বাতিল করে। ১৯৯১ সালে প্রবর্তিত কেয়ারটেকার সরকার ব্যবস্থার অধীনে অনুষ্ঠিত কয়েকটি জাতীয় নির্বাচন ব্যতীত কোনো নির্বাচনই অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ হয়নি। যার জলন্ত প্রমাণ হচ্ছে, আওয়ামী লীগ আমলের ১৯৭৩ সালের, ২০১৪ সালের এবং সর্বশেষ ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং বিএনপির আমলে ১৯৭৯ সালের এবং ১৯৯৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন। অনুরূপভাবে জাতীয় পার্টির সময়কালে ১৯৮৬ সালের এবং ১৯৮৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হওয়ার পেছনে বিরোধী জোটকে ক্ষমতাসীনরা দায়ী করে আসছিল এতদিন। কিন্তু ২০১৮ সালে জাতি যে ভেলকিবাজির নির্বাচন দেখেছে তা মূলত সিলেকশন টাইপের নির্বাচন। গণতন্ত্রের নামে এ ধরনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া মোটেও সুখকর নয়।
আওয়ামী লীগের নেতা-নেত্রীদের মুখে খুব জোর গলায় উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধির কথা শোনা যায়। অথচ উল্লেখযোগ্য মানুষের কর্মসংস্থানের কথা শোনা যায়নি। উন্নয়ন হয়নি, এটা বলব না। তবে যেটুকু উন্নয়ন হচ্ছে তা হচ্ছে অল্পসংখ্যক মানুষের উন্নয়ন। এর বিরুদ্ধে জনগণ টু শব্দ পর্যন্ত করতে পারছে না। কারণ রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ববাদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ক্ষমতাসীনরা দুটি অস্ত্র অবলম্বন করে কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠে। একটি হলো রাষ্ট্রীয় শক্তি, যার মাধ্যমে অর্থনৈতিক ও বিচারিক কাঠামোকে ব্যবহার করে ক্ষমতায় টিকে থাকে। অন্যটি হলো সমর্থকদের পুরস্কৃত করা। একদিকে বলপ্রয়োগ করে বিরোধীদের বিতাড়িত করা অন্যদিকে অন্যায় সুবিধা দিয়ে নিজেদের সমর্থকগোষ্ঠিকে চাঙ্গা রাখার অপচেষ্টা অব্যাহত রাখা। ২০১৪ সালের একতরফা নির্বাচন হয়ে যাওয়ার পর ১১ জানুয়ারি দি ইকোনমিস্ট পত্রিকার এক প্রতিবেদনে মন্তব্য করা হয় যে, বাংলাদেশের গণতন্ত্র পচে গেছে। জাতীয় নির্বাচনে কথা না হয় বাদ-ই দিলাম, ২০১৪ সালের নির্বাচন পরবর্তী স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাচনে ক্ষমতাসীনরা পেশিশক্তির ব্যবহার করে জয় নিশ্চিত করেছিল। গত বছর মার্চে জার্মান গবেষণা সংস্থা ব্যাটেলসম্যান স্টিফটাং কর্তৃক প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন সরকারকে বিশ্বের স্বৈরতান্ত্রিক সরকারগুলোর কাতারভুক্ত করা হয়। বাংলাদেশকে স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রের তালিকায় রাখা ব্যাটেলসম্যান ফাউন্ডেশনের নাম যদিও এর আগে অনেকেই শোনেননি, কিন্তু ব্রিটিশ সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন দ্য ইকোনমিস্ট অনেকের কাছেই পরিচিত। বিগত এক যুগ ধরে তারা প্রতি বছর বৈশ্বিক গণতন্ত্রের মান পর্যালোচনা করে প্রকাশ করছে ডেমোক্রেসি ইনডেক্স। ২০১৬ সাল থেকে ২০১৭ সালে বাংলাদেশের গণতন্ত্র পরিস্থিতির আট ধাপ অবনতি হয়েছে। ক্ষমতাসীন সরকার মতপ্রকাশের অধিকার নিয়ন্ত্রণের সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। পত্রিকা ও টিভির সংখ্যা উপস্থাপন করে তারা গণমাধ্যম ও ইলিকট্রনিক মিডিয়ায় জিগির তুলে প্রায়ই মতপ্রকাশের স্বাধীনতার হিসাব দেয়। অথচ দেশের প্রতিটি মানুষ জানেন, জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনের রাস্তাটি ছাড়া আসলে আর কোথাও সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলা বা সমাবেশ করা প্রায় অসম্ভব।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা কতটা নির্দয় হতে পারে তার বহু দৃষ্টান্ত গণতান্ত্রিক বিশ্বের ইতিহাসে রয়েছে। গণতান্ত্রিক দেশের নির্বাচনে ভেলকিবাজির ভোট অনুষ্ঠিত হলে সেখানকার ক্ষমতাসীন শাসকরা কতটা দানবীয় হয়ে উঠতে পারে তার বড় উদাহরণ তো জার্মানির হিটলার। ভি-এস নাইপল তার একটি উপন্যাসে লিখেছিলেন, অধিক দূর থেকে নাকি সবকিছু অধিক স্পষ্ট দেখা যায়। কাছে থাকলে মানুষ সমস্যার মধ্যে নিজেও গুলিয়ে যায়। আর সেজন্য হয়তো ক্ষমতাসীন শাসকেরা জনগণের মনের দ্রোহটা বুঝতে পারেন না। সাধারণ মানুষ সরকারকে ভালোবাসার বদলে ঘৃণা দিচ্ছে এটা ক্ষমতাসীনদের অনুধাবন করা প্রয়োজন। বাদ্যের আওয়াজ অনেক দূর থেকে শোনা যায়। কিন্তু ছেড়া বাদ্যের আওয়াজ ঢুলি নিজের কানেও শুনতে পায় না। নির্বাচনের পর যত মানুষের সাথে নির্বাচন সম্পর্কে কথা হয়েছে সবাই বলছে, এটা নির্বাচন নয় সিলেকশন। গণতন্ত্র কোনো গাছের ফল নয় যে পেড়ে নিলেই হলো। গণতন্ত্রের নামে খাল কেটে স্বৈরাচারী কুমির আনা হচ্ছে । বিশ্বের ৬২% দেশ গণতান্ত্রিক হলেও স্বৈরাচারের লেবাস রাষ্ট্রনায়েকেরা পরিত্যাগ করতে পারেনি। স্বৈরাচাররা সবসময় ক্ষমতা প্রয়োগ করে গণতন্ত্রের দোহাই দিয়ে। আখেরে তাদের কারো পরিণতিই শুভ হয় না।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন