ঢাকা, বুধবার ২২ মে ২০১৯, ০৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬, ১৬ রমজান ১৪৪০ হিজরী।

অভ্যন্তরীণ

নাব্যতা সঙ্কটে মহানন্দা ও পাগলা

৬৬ কোটি টাকা ব্যয়ে খননের কার্যাদেশ

শিবগঞ্জ (চাঁপাইনবাবগঞ্জ) থেকে কামাল হোসেন | প্রকাশের সময় : ১৭ এপ্রিল, ২০১৯, ১২:০৪ এএম

দেশের উত্তর-পশ্চিমের সীমান্তবর্তী জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জ। এ জেলার উপর দিয়ে প্রবাহিত পদ্মা, মহানন্দা, পাগলা ও পুনর্ভবা নদী। কালের বিবর্তনে নাব্য হারিয়েছে মহানন্দা, পাগলা ও পুনর্ভবা নদী। জেলার নাব্য হারানো নদীগুলোর মধ্যে পাগলার দৈর্ঘ্য ৪১ কিলোমিটার। নদীটি ভারতের মালদহ জেলার মহদিপুর হতে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার শাহবাজপুর হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। পাগলা ছিল খরস্রোতা একটি নদী। কিন্তু উজানে বাঁধের কারণে পানি প্রবাহ কমে যায়। এছাড়া পদ্মা নদীর বামতীর সংরক্ষণ বাঁধের কারণে পদ্মা নদীর সংযোগ বন্ধ হওয়ায় পাগলা নদীটি নাব্য হারিয়ে মরা খালে পরিণত হয়। এ নদীর পানির উপর নির্ভরশীল ছিল শিবগঞ্জ পৌরসভাসহ উপজেলার ঘোড়াপাখিয়া, ছত্রাজিতপুর, নয়ালাভাঙা, উজিরপুর, পাঁকা, দুর্লভপুর, কানসাট, শ্যামপুর ও শাহবাজপুর ইউনিয়নের জনসাধারণ।
এছাড়াও সদর উপজেলার রানীহাটি ও সুন্দরপুর ইউনিয়নসহ আশপাশের ইউনিয়নের বাসিন্দারা। কিন্তু আষাঢ় মাসেও এই নদীতে পানি থাকে না। ফলে পানি না থাকায় এক সময়ের খরস্রোতা নদী তীরবর্তী জনসাধারণ চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, ব্যাহত হয় চাষাবাদ। হারিয়ে যায় দেশি প্রজাতির সুস্বাদু মাছ। এমন অবস্থায় স্থানীয় পানি উন্নয়ন বোর্ড পাগলা নদী খনন নামে একট প্রকল্প গ্রহণ করে। প্রকল্পটি একনেকে পাস হবার পর দরপত্র আহ্বান ও গ্রহণ শেষে এরই মধ্যে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের কার্যাদেশও দেয়া হয়েছে।
আগামী ১০ দিনের মধ্যে নদীর খনন কাজ শুরু হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সৈয়দ সাহিদুল আলম। তিনি জানান, শিবগঞ্জ উপজেলার শাহবাজপুর হতে সদর উপজেলার সুন্দরপুর ইউনিয়নের কালিনগর পর্যন্ত ৪১ কিলোমিটার পাগলা নদী খনন করা হবে। দুই বছর মেয়াদে খনন কাজ বাস্তবায়ন করা হবে। এ কাজে ব্যয় হবে ৬৬ কোটি টাকা। খনন কাজ শুরু হবে সদর উপজেলার সুন্দরপুর ইউনিয়নের কালিনগরে পদ্মা-পাগলা নদীর মোহনা থেকে।
তিনি আরও জানান, পাগলা নদীতে জলকাঠামো নির্মাণ করে বারো মাস পানি সংরক্ষণ করে সেচ প্রকল্প গ্রহণের পরিকল্পনা রয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের। স্থানীয় প্রবীণ সাংবাদিক মুক্তিযোদ্ধা তসলিম উদ্দিন বলেন, পাগলা নদী ছিল খরস্রোতা। সারা বছর পানি থাকত। নদী তীরবর্তী বাসিন্দারা গোসলসহ ঘর-গৃহস্থালির কাজে ব্যবহার করত পাগলার পানি। শিবগঞ্জ ও সদর উপজেলার পুঁটিমারী বিলের পানির জোগান ছিল এই পাগলা নদী। নদীতে ছিল প্রচুর দেশি প্রজাতির মাছ। নদীটিকে ঘিরেই গড়ে উঠেছিল রামচন্দ্রপুর হাটে ব্রিটিশদের নীলকুঠি, কানসাটে স্থাপন করা হয়েছিল ময়মনসিংহের মুক্তাগাছার জমিদারের রাজভবন, জাহ্নমুণির আশ্রম। এই নদীটি ছিল এক সময়ের ব্যবসা-বাণিজ্যেরও প্রাণ। গড়ে উঠেছিল রামচন্দ্রপুর বাজার, কালিনগর হাট, রানীহাটি বাজার, শিবগঞ্জ বাজার, কানসাট বাজার। নদীটির পানি বিলে ব্যবহারের জন্য কানসাট, জোহুরপুর দাঁড়া, ত্রিমোহনী ও মহানন্দা নদীর বারোঘরিয়া এলাকায় মরিচা দাঁড়া নামক স্থানে নির্মাণ করা হয় সুইচগেট। এই ৩টি সুইচগেট দিয়েই বিলভাতিয়া, তেঁতুলিয়া, বাঁশবাড়িয়া, পুঁটিমারীসহ গোটা বিলে নদীর পানি ঢুকে একদিকে যেমন মৎস্য চাষ হতো অন্যদিকে তেমনি ধান চাষ।
তিনি আরো বলেন, এক সময় এই পাগলা নদী দিয়ে লঞ্চ চলাচল করত। ঢাকুয়ালদের দাঁড়, পাল ও গুণ টানা নৌকায় আমের চালান যেত রাজধানী ঢাকার বাজারে। এ নদী পথেই চলত জমজমাট ব্যবসা-বাণিজ্য। বন্যা মৌসুমে এত বেশি স্রোত থাকত যে, কেউ নৌকা নিয়ে পারে যাবার চেষ্টা করত না। সেই বহতা নদী এখন মরা একটি খালে পরিণত হয়েছে।
জানা যায়, বর্ষাকালে বৃষ্টির পাশাপাশি এই নদীর একটা অংশের পানির উৎস ছিল পদ্মা নদী। কিন্তু প্রয়োজনের তাগিদেই পদ্মা নদীর ভাঙন রোধে শিবগঞ্জ উপজেলার উজিরপুর ইউনিয়নের দশরশিয়া দাঁড়ায় ও ১৮ কলম নামক স্থানে বেড়িবাঁধ নির্মাণ করায় পাগলার সাথে পদ্মা নদীর সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এতে পাগলা নদী আরো পানিশূন্য হয়ে পড়ে। ফলে শিবগঞ্জ ও সদরের নদী তীরবর্তী বিশাল এলাকার জনসাধারণ পানি সংকটে পড়েছে। বন্ধ হয়ে গেছে নৌ-পথে ব্যবসা-বাণিজ্য। এখন আর পাওয়া যায় না দেশী প্রজাতির মাছ। কোনো নৌকা ছাড়ায় মানুষ অনায়াসে পায়ে হেঁটে নদীতে পারাপার করে থাকেন। নদীটি হারিয়ে ফেলেছে তার মানচিত্র। আগামী ২ বছরের মধ্যে খনন কাজ শেষ হলে নদী তীরবর্তী কয়েক লাখ লোক উপকৃত হবে। নদীর পানি সেচসহ অন্যান্য কাজে ব্যবহার করা যাবে। দেশী প্রজাতির মাছ চাষ করে সরকার কয়েক কোটি টাকার রাজস্ব পাবে। ফিরে আসবে জীববৈচিত্র এমনটাই আশা করছেন নদী তীরবর্তী মানুষের।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন