ঢাকা, সোমবার ২৪ জুন ২০১৯, ১০ আষাঢ় ১৪২৬, ২০ শাওয়াল ১৪৪০ হিজরী।

শান্তি ও সমৃদ্ধির পথ ইসলাম

খাজা নিজামউদ্দীন আউলিয়া : যিনি শাসকদের এড়িয়ে চলতেন

খালেদ সাইফুল্লাহ সিদ্দিকী | প্রকাশের সময় : ৯ জুন, ২০১৯, ১২:০৩ এএম

কোনো কোনো চ্যানেলের সংলাপে এখনো শোনা যায়, নিজামউদ্দীন আউলিয়া ছিলেন ‘ডাকাত সর্দার’। যাদের মননে মগজে ইতিহাসের তথ্য বিকৃতির জীবাণু জমাট বেঁধে আছে তা সহজে দূরীভ‚ত হওয়ার নয়, যদি না সে জ্ঞানপাপী পন্ডিতদের আল্লাহ হেদায়েত করেন। এ আলোচনার শুরুতে সে ডাকাতের পরিচয় তুলে ধরতে চাই।
মাত্র ১২ বছর বয়সে বালক নিজামউদ্দীন প্রচলিত সকল বিদ্যা সমাপ্ত করার পর বদায়ুন শহরের বাইরে হাউজের নিকট গিয়ে সারা রাত ইবাদতে লিপ্ত থাকতেন।

এক রাতের কথা, তিনি ইবাদতে মশগুল। এমন সময় হঠাৎ দেখতে পান বদায়ুনের শেখ জালালউদ্দীনের খেলাফতপ্রাপ্ত আলী মাওলা সেখানে উপস্থিত এবং বললেন- ‘নিজাম! তুমি তো অনেক বিদ্বান-জ্ঞানী ব্যক্তিকে দেখেছ, এখন আল্লাহর নিকট একজন আধ্যাত্মিক সাধক তলব করো, কিন্তু এ কথাও মনে রেখো এরূপ সাধক সময়ের আগে পাওয়া যায় না। তুমি যদি সময়ের সাথে চলতে চলতে সময়ের আগেই বের হয়ে যাও, তাহলে তোমার পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়ে যাবে।’

এ কথাগুলো বলেছিলেন আগত আলী মাওলা। তার পরিচয় এই যে, তিনি যৌবনে ডাকাতি করে বেড়াতেন। এক রাতে ডাকাতি করার উদ্দেশে ঘর থেকে বের হন, তার কাছ দিয়েই শেখ জালালউদ্দীন তবরেজী যাচ্ছিলেন। তিনি আলী মাওলাকে দেখে ডাকলেন এবং বললেন, ‘হে অন্ধ! অপরের ঘরের দিকে তাকিয়ে কী দেখছ? কখনো আমার আঙিনায় এসো।’ শেখের এ বাক্যগুলো আলী মাওলার ওপর বিদ্যুতের মতো পতিত হয়। সে তৎক্ষণাৎ শেখের পায়ে লুটিয়ে পড়ে এবং বলতে থাকে- ‘শেখ, শেখ! আমি এসে গেছি, শেখ আমি এসে গেছি।’ শেখ জালালউদ্দীন আলী মাওলা তাকে তার সঙ্গে নিয়ে যান এবং নিজের সাথেই রাখেন।

অতঃপর বদায়ুন হতে লাখনুতি যাওয়ার সময় বদায়ুনের ‘বেলায়েত’ তার কাছে সমর্পণ করে যান। এ সেই এক সময়ের আলী মাওলা ডাকাত, যাকে ইতিহাস বিকৃতকারী লেখকগণ ‘নিজামুদ্দীন ডাকু’ নামে আখ্যায়িত করেছেন। আলী মাওলাই তার যৌবনকালে ডাকাতি করতেন এবং শেখ জালালউদ্দীন তবরেজীর হাতে বায়াত হয়ে তার খেলাফত লাভ করেন। আর ঘটনাটি নিজামুদ্দীন আউলিয়ার ঘটনা বলে চালিয়ে দেয়া হয়েছে। ইতিহাসের কী নির্মম বিকৃতি!

আলী মাওলা সম্পর্কে একটি ঘটনা বর্ণিত হয়ে থাকে যে, একদিন তিনি নিজামকে তার মায়ের বোনা সুতির একটি ‘আবা’ (সুফিদের একটি বিশেষ পোশাক) পরিয়ে দেন এবং তার মস্তকে পাগড়ি বেঁধে দিয়ে চিৎকার করে বলতে থাকেন, ‘হে বদায়ুনের আলেমগণ! যখন খাজা নিজাম হিন্দুস্থানের অন্ধকার জগতে পূর্ণিমার চাঁদ হয়ে উদিত হবে তখন আপনারা সবাই এ কথার সাক্ষী থাকবেন যে, তার মাথায় পাগড়ি পরানোর সৌভাগ্য আমার শুধু আমার ভাগ্যে লিপিবদ্ধ হয়েছিল।’

সুলতানুল মাশায়েখ, মাহবুবে এলাহী খাজা নিজামউদ্দীন আউলিয়া (রহ.) ছিলেন উপমহাদেশে ইসলাম প্রচারের অন্যতম একজন। হিজরী ষষ্ঠ শতকে যখন তাতারী হামলাকারীরা এশিয়া মাইনর ও বালখ-বোখারা ধ্বংসস্ত‚পে পরিণত করেছিল, তখন ঐসব স্থানের অসংখ্য পরিবার হিন্দুস্থানে এসে বসবাস করতে থাকে।
তখন হিন্দুস্থানে সুলতান শামসুদ্দীন আলতামাশ রাজত্ব করছিলেন। বিদ্যানুরাগী, শিক্ষাপ্রেমিক হিসেবে খ্যাত এ সুলতানের আমলে খাজা নিজামউদ্দীনের দাদা ও নানা তাদের আত্মীয়স্বজনসহ বোখারা থেকে হিজরত করে লাহোরে এসে বসবাস করতে থাকেন।

কিছুকাল পর এ পরিবার বদায়ুনে স্থানান্তরিত হয়। খাজা নিজামউদ্দীনের পিতার নাম সৈয়দ আহমদ এবং মাতার নাম জোলেখা। জোলেখা ছিলেন আরব মহিলা। হিজরী ৬৩৪ সালের ২৭ সফর তাদের এক পুত্রসন্তান জন্ম লাভ করে এবং তার নাম রাখা হয় মোহাম্মদ, যিনি পরবর্তীকালে নিজামউদ্দীন আউলিয়া নামে বিশ^খ্যাতি লাভ করেন। তাবে সবাই তাকে নিজাম নামে ডাকতেন।

তার পিতা সৈয়দ আহমদকে সুলতান শামসুদ্দীন আলতামাশ বদায়ুনের কাজী (বিচারক) পদে নিযুক্ত করেছিলেন। কিন্তু বেশি দিন তিনি এ পদে থাকননি। তিনি সুলতানকে এই বলে পদত্যাগ করেন যে, ‘আপনি আমার নামাজের সামনে এই দুনিয়া কেন এনে রেখে দিয়েছেন। এ পদ অন্য কাউকে প্রদান করুন।’

অতঃপর তিনি মসজিদে গিয়ে আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগিতে আত্ম নিয়োগ করেন। এ সময় নিজামের জন্ম হয়। পিতা তাকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন এবং বয়স বাড়ার সাথে সাথে তার সঙ্গে রাখতেন। চার বছর বয়সের সময় তিনি পিতার সঙ্গে জঙ্গলে চলে যেতেন। অল্পবয়সেও তিনি নামাজ কাজা করতেন না। নিজাম তার পিতার সঙ্গে লাগাতার রোজা রাখতেন। লোকেরা তাকে বলত, ‘মিয়া! তোমার ওপর রোজা ফরজ নয়।’ নিজাম জবাব দিতেন- ‘খাবারের চেয়ে রোজা রাখাটাই আমার কাছে প্রিয়, রোজাই আমার খাদ্য।’

পিতা সৈয়দ আহমদ আল্লাহর ধ্যানে জিকির-ফিকিরে মগ্ন থাকতেন। নিজাম চাঁদ-সূর্যের উদয়াস্ত এবং তারকারাজির চমক উপভোগ করতেন। তার মাতা প্রায় তাকে আউলিয়া কাহিনী শোনাতেন। তিনি অতি আকর্ষণী, তাকে সাধকদের এবং তাদের রিয়াজত সাধনার কাহিনী শোনাতেন। নিজাম এসব শুনে আরো উৎসাহিত ও অভিভূত হতেন। তার মা জোলেখা তাকে সান্ত¡না দিয়ে বলতেন- ‘বেটা! আল্লাহ তোমাকে উচ্চ মর্যাদা দান করুন, কিন্তু উচ্চ মর্যাদার অধিকারী হতে হলে তোমাকে স্বীয় পিতা ও নানার অনুসরণ করতে হবে, জ্ঞান অর্জন করতে হবে এবং প্রিয় নবী (সা.)-এর সিরাতের ওপর আমল করতে হবে।’

নিজামের বয়স যখন পাঁচ বছর তখন তার পিতা ইন্তেকাল করেন। তিনি কোনো দুনিয়াবি উপকরণ রেখে যাননি। তাই নিজাম ও তার মা জোলেখা দারুণ অর্থ সঙ্কটে পতিত হন। প্রায় সময় মা-বেটা দু’জনকেই অভুক্তও থাকতে হয়েছে। যে দিন ঘরে কিছু থাকত না। অর্থাৎ খাবারের ব্যবস্থা থাকত না, নিজামের মা হেসে বলতেন- ‘নিজাম! আজ আমরা আল্লাহর মেহমান।’ এতে নিজাম খুবই আনন্দিত হতেন। কখনো একটানা দুই তিন দিন ঘরে খানা রান্না হলে আত্মভোলা নিজাম বলতেন- ‘মা! এবার তো কয়েক বেলা হয়ে গেল, আমরা কবে আল্লাহর মেহমান হব?’
এ অভাব-অনটনের মধ্যেও নিজামের মা তার শিক্ষাদীক্ষার প্রতি বিশেষ নজর রাখতেন। এ উদ্দেশ্যে তিনি নিজামকে বদায়ুনের বিখ্যাত আলেমদের নিকট সমর্পণ করেন। নিজাম ছিলেন জন্মগতভাবে অত্যন্ত মেধাবী, ধীশক্তি সম্পন্ন। তিনি খুব দ্রুত প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করেন। অতঃপর পর্যায়ক্রমে কুরআন, হাদিস, ফিকাহ, উসূল, তাসাউফ এবং হেকমত প্রভৃতি শাস্ত্রে পারদর্শিতা অর্জন করেন। তার শিক্ষা খরচ নির্বাহের জন্য তার মা সুতি কাপড় বুনে তার আয় দিয়ে এ খরচ বহন করতেন।

মাত্র ১২ বছর বয়সেই নিজাম জাহেরী সকল বিদ্যা শেষ করেন। কিন্তু এ অল্প বয়সেই বিভিন্ন বিষয়ে তার যোগ্যতা ও প্রতিভার স্বাক্ষর রাখতে শুরু করেন। তিনি যেকোনো মাহফিলে হাজির হয়ে যেতেন। বিখ্যাত আলেমগণও তার সাথে বাহাস-বিতর্কে অংশ নিতে সাহস করতেন না। বদায়ুনের আলেমদের মধ্যে ‘মাহফিল ধ্বংসকারী নিজাম’ (মাহফিল শেকন) নামে মশহুর হয়ে যান।

খাজা নিজামুদ্দীন আউলিয়ার পরবর্তী জীবনের বহু গুরুত্বপূর্ণ দিক ইতিহাসের গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় এবং ভারতবর্ষে ইসলামের ব্যাপক প্রসারে তার অনন্য অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। তবে পরবর্তী আলোচনায় আমরা খাজা সাহেবের প্রাচার-প্রচারণা জীবনের এমন একটি দিকের ওপর আলোকপাত করতে চাই, যা আউলিয়া-মাশায়েখের জীবনে খুব বেশি দেখা যায় না। আর তা হচ্ছে তার দরবারে সুলতান, বাদশাহগণের প্রবেশাধিকার না থাকা।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (6)
তাহের ৯ জুন, ২০১৯, ১:৩৯ এএম says : 0
খাজা নিজামুদ্দীন আউলিয়া (রহ.)-এর পূর্ব পুরুষগণ সাদাত বংশের লোক ছিলেন। হিজরি ৬ষ্ঠ শতকে তাতারি হামলাকারীরা -এশিয়া মাইনরের বালখ, বোখারা ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে দিয়েছিল। সেখান থেকে অসংখ্য খান্দান হিন্দুস্থানে চলে আসে, সেখানে তখন শামসুদ্দীন আলতামাশ সিংহাসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন
Total Reply(0)
গুলাম ৯ জুন, ২০১৯, ১:৩৯ এএম says : 0
বিদ্যানুরাগী ও জ্ঞানপিপাসু এ সুলতানের সুখ্যাতি ছিল ব্যাপক। খাজা নিজামুদ্দীনের দাদা ও নানা উভয়ই তাদের পরিবার-পরিজন ও আত্মীয়স্বজনের সাথে রোখারা হতে হিজরত করেন এবং প্রথমে লাহোরে এসে বসবাস আরম্ভ করেন।
Total Reply(0)
মনির হাসান ৯ জুন, ২০১৯, ১:৪০ এএম says : 0
তিনি কাজী পদ ছেড়ে দিয়ে সারাক্ষণ আল্লাহর স্মরণে নিজেকে নিয়োজিত করেন।’ একদিন মসজিদে হঠাৎ অনুভব করেন যে, তার সমগ্র ঘর তার দিকে এগিয়ে আসছে। তিনি একে গায়েবি ইশারা মনে করে দ্রুত গৃহে পৌঁছেন।
Total Reply(0)
কালাম ৯ জুন, ২০১৯, ১:৪২ এএম says : 0
হে আল্লাহ নিজামউদ্দীন আউলিয়াদের মতো লোক আবার পাঠাও এই দুনিয়ায়
Total Reply(0)
রাব্বি ৯ জুন, ২০১৯, ১:৪২ এএম says : 0
শুকরিয়া ইতিহাস জেনে উপকৃত হলাম
Total Reply(0)
সাইফ ৯ জুন, ২০১৯, ৫:০৫ পিএম says : 0
ইনকিলাব সংশ্লিষ্ট ও জনাব লেখক সাহেবকে অনেক ধন্যবাদ এবং মহান আল্লাহ্‌র কাছে আপনাদের সকলের দীর্ঘায়ু কামনা করছি। আল্লাহ্‌ আমাদেরকে তাঁর প্রিয় হাবীব (সাঃ) ও তাঁর প্রিয় আওলীয়া গনের সন্মান করার, ভালো বাসার, এবং তাদের অনুশারিত পথের অনুস্বরণ করার তৌফিক দান করুন। এবং এয়াদের শত্রুদের দলভুক্ত হওয়া থেকে রক্ষা করুন।
Total Reply(0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন