ঢাকা, মঙ্গলবার ২৫ জুন ২০১৯, ১১ আষাঢ় ১৪২৬, ২১ শাওয়াল ১৪৪০ হিজরী।

ধর্ম দর্শন

দারিদ্র্য বিমোচনে জাকাতের ভূমিকা

গাজী মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম জাবির | প্রকাশের সময় : ১৩ জুন, ২০১৯, ১২:০৫ এএম

আজকের বিশ্বে মানব সভ্যতা জ্ঞান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে প্রভূত অগ্রগতি সাধন করেছে। এর ফলে বিভিন্ন জাতি-রাষ্ট্র ব্যাপক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সমৃদ্ধি অর্জন করেছে। অনেকের জীবনযাত্রার মান বেড়েছে। অপর দিকে দুঃখজনক ভাবে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার এক বিরাট অংশ দারিদ্র, নিরক্ষরতা, স্বাস্থ্যহীনতা ও নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছে। সম্পদ বন্টনে বৈষম্য এ শোষণ প্রক্রিয়ার নির্মম যাতাকালে নিষ্পেষিত হয়ে এসব আদম সন্তান বিপন্ন অবস্থায় দিন কাটাতে বাধ্য হচ্ছে। এ চিত্র একেবারে নতুন নয়, যুগে যুগে দেশে দেশে বিভিন্ন মতাদর্শের পরীক্ষা-নিরীক্ষা হলেও বিশ্বে আজও বঞ্চিত ও হতভাগ্য মানুষের সংখ্যা কম নয় বরং অব্যাহত ভাবে বেড়েই চলেছে। সমাজ থেকে দারিদ্র বিমোচনে জাকাত ব্যবস্থার অন্যতম দিক হলো উৎপাদিত ফল-ফসলের উশর প্রদান, যার মাধ্যমে কৃষি প্রধান দেশ হিসেবে আমরা সমাজ থেকে দারিদ্র বিমোচন করতে পারি। আর এ উশর উৎপাদিত ফসল কিংবা এর সমপরিমান মূল্য দিয়েও দারিদ্র বিমোচনের কাজ করা যায়। উশর প্রদানের উদ্দেশ্য হলো সমাজের দারিদ্র এবং মুখাপেক্ষী শ্রেণিকে সাহায্য করা। অনেক সময় অর্থ তাদের জন্য অধিক উপকারী হয়। আল্লামা কাসানী বলেন, “হানাফী মাযহাবে ফসলের জাকাতের মূল্য দিলে চলবে”। (আল কাসানী, বাদাইউস সানাই’য় খ, ২য় পৃ. ৬৩। দারিদ্র বিমোচনে সমাজের দারিদ্রদের জন্য-সুপরিকল্পিত ও সুনির্দিষ্ট কর্মসূচী গ্রহণ করা প্রয়োজন। দারিদ্রমুক্ত সমৃদ্ধ দেশ গঠনে জাকাত ব্যবস্থা একটি মোক্ষম হাতিয়ার। এতে করে ধনী-দরিদ্রের মাঝে বৈষম্যের অবসান হয়ে মানবিকতার ও ইনসাফ পূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠা হবে, অন্যদিকে ধনীদের আর্থিক-পরিশুদ্ধতার পাশাপাশি আত্মিক পরিশুদ্ধতার পথ সুগম হয়। জাকাত দরিদ্র, অভাবী ও অক্ষম জনগোষ্ঠীর সামাজিক নিরাপত্তার গ্যারান্টি, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধির হাতিয়ার। ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে তৃতীয় স্তম্ভ হচ্ছে জাকাত। ঈমানের পর নামাজ এবং তারপরই জাকাতের স্থান। কোরআনে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে ৮২ বার সরাসরি, ৩২ স্থানে জাকাতের কথা বলা হয়েছে। তার মধ্যে ২৮ স্থানে নামাজ ও জাকাতের এক সঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে। হযরত খালিদ বিন ওয়ালিদ (রাঃ) বলেছেন, “ নামাজ এবং জাকাত একটি অপরটির সম্পূরক, একটি ছাড়া অন্যটি কবুল হয়না। আর এ কারণে ইসলাম জাকাত আদায়ের জন্য কঠোর ব্যবস্থা করেছে। পূর্বেকার নবী-রাসুলদের উপর ও জাকাত ব্যবস্থার উপস্থিতি ছিল, যেমন হযরত ইব্রাহীম (আঃ) এর উপর জাকাতের বিধান (সূরা আল আম্বিয়া:৭৩), হযরত ইসমাঈল (আঃ) এর উপর জাকাতের হুকুম (সূরা মারিযাম:৫৫)। হযরত মুসা (আঃ) এর উপর আল্লাহর নির্দেশ , (সূরা আল আরাফঃ ১৫৬),হযরত ঈসা (আঃ) এর উপর আল্লাহর ফরমান (সূরা মারিয়ামঃ৩১)। তারি ধারাবাহিকতায় শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর উপর ও একই বিধান অবর্তীর্ণ হয়। পবিত্র কোরআনে সূরা বাকারায় আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন, “ নামাজ কায়েম কর, জাকাত আদায় করো এবং রুকুকারীদের সাথে একত্রিত হয়ে রুকু করো। ” (সূরা আল বাকারাঃ ৪৩)।

জাকাতের গুরুত্ব ও মর্যাদা বুঝার আরেকটি ফোকাস পয়েন্ট হলো ইসলামের ৫টি মূল স্তম্ভের মধ্যে জাকাত ব্যতীত কালিমা, নামাজ, রোজা, হজ্ব এগুলো হচ্ছে আল্লাহর সাথে বান্দার সর্ম্পক ও বুঝা পড়ার বিষয়। কিন্তুু জাকাত এমন একটি স্তম্ভ যার সর্ম্পক আল্লাহর সাথে তো বটেই, মানুষের প্রতি মানুষের অধিকারকে ও এর সাথে জুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। ফলে এই ইবাদতটির সুফল ব্যক্তির সীমা ছাড়িয়ে, মানব-জাতির সার্বিক কল্যাণকামীতায় রূপ নিয়েছে। ইসলাম যে একটি কল্যাণকর জীবন বিধান তার একটি স্বার্থক দৃষ্টান্ত জাকাত বিধান।

জাকাত কারা দেবেনঃ জাকাত কেবল স্বাধীন, পূর্ণ বয়স্ক মুসলিম নর বা নারী যার কাছে নিসাব পরিমান সম্পদ আছে তার উপর ফরজ। জাকাতের শর্তগুলো হচ্ছেঃ

সম্পদের উপর পূর্ণাঙ্গ মালিকানা: সম্পদের উপর জাকাত ফরজ হওয়ার জন্য সম্পদের মালিকানা সুনির্দিষ্ট ও পূর্নাঙ্গ হওয়া জরুরী। সম্পদ উৎপাদনক্ষম হওয়াঃ জাকাতের জন্য সম্পদকে অবশ্যই উৎপাদনক্ষম, বর্ধনশীল বা প্রবৃদ্ধমান হতে হবে। নিসাবঃ জাকাত ধার্য হওয়ার তৃতীয় শর্ত হচ্ছে নিসাব পরিমান সম্পদ থাকা। নিসাব বলা হয় শরীয়ত নির্ধারিত নি¤œতম সীমা বা পরিমানকে। সাধারণভাবে ৫২.৫০ তোলা রূপা বা ৭.৫০ তোলা সোনা বা এর সমমূল্যের সম্পদ কে নিসাব বলে। কারো কাছে ৭.৫০ তোলা সোনা বা ৫২.৫০ তোলা রূপা থাকলে বা উভয়টি মিলে ৫২.৫০ তোলা রূপার মূল্যের সমান অথবা সব সম্পদ মিলে ৫২.৫০ তোলা রূপার সমমূল্যের সম্পদ থাকলে সে সম্পদের জাকাত দিতে হয়। জাকাত কাদের জন্যঃ আট শ্রেণীর লোক জাকাত পাওয়ার যোগ্য। (সূরা তওবা: ৬০)। ফকির, মিসকিন, আমেলুন, মনজয় করার জন্য, দাস মুক্তির জন্য , ঋণ গ্রস্তদের ঋণ পরিশোধ,আল্লাহর পথে জিহাদ কারী ও মুসাফিরের জন্য। এ আল্লাহর বিধান। আল্লাহ সর্বজ্ঞ প্রজ্ঞাময়”।

ইরশাদ হচ্ছে, “তোমরা সালাত আদায় কর, জাকাত দাও এবং রাসূল (সাঃ) এর আনুগত্য কর যাতে তোমরা অনুগ্রহ ভাজন হতে পার”। (সূরা নূর: ৫৬)। সূরা নিসার ১৬২ নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা তার বান্দাদের জন্য “আজরুন আজীম” এর প্রতিশ্রæতি দিয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে:“ এবং যারা সালাত আদায় করে, জাকাত দেয় এবং আল্লাহ ও পরকালে ঈমান রাখে আমি তাদেরকে মহা পুরষ্কার দিব”। ইসলামে জাকাত বিধান হলো মানব সমাজকে অর্থনৈতিক শোষণ, অবিচার ও দারিদ্রের অভিশাপ থেকে মুক্ত করার এক চমকপ্রদ ব্যবস্থা। আল্লাহর ঘোষণা “মানুষের সম্পদ বৃদ্ধি করবে বলে তোমরা যে সুদ দাও, মুলত আল্লাহ কাছে তাতে সম্পদ মোটেই বৃদ্ধি পায় না। কিন্তুু তোমরা যে জাকাত আদায় করো একমাত্র আল্লাহর সন্তুুষ্ট লাভ করার উদ্দেশ্যে তা অবশ্য দ্বিগুণ বৃদ্ধি পায়। (সূরা আর রূম-৩৯) আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রতিদানের এই প্রতিশ্রæতি শুধু আখিরাতের জন্য নয়, দুনিয়ার জীবনের জন্যও । তাই প্রকৃতপক্ষে জাকাত দানকারীরা আল্লাহর পক্ষ থেকে বিরাট মুনাফার অধিকারী হচ্ছে। আমরা রাষ্ট্রীয়ভাবে এই জাকাত ব্যবস্থার সুষ্ঠু প্রয়োগ দেখতে চাই। সেই সাথে বিত্তবানদের সম্পদে অভাবীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিষবৃক্ষটিকেই সমূলে উপড়ে ফেলাই হলো ইসলামের লক্ষ্য। এভাবে সমাজতন্ত্রের ন্যায় অযৌক্তিক সমতা প্রতিষ্ঠ বা পুঁজিবাদের ন্যায় সম্পদের একচেটিয়া ভোগাধিকার এর পরিবর্তে ইসলাম ইনসাফের ভিত্তিতে একের সম্পদে অন্যের অধিকার প্রতিষ্ঠার এক শাশ্বত ও কার্যকর মানদন্ড পেশ করেছে। এভাবে শুধু অর্থনৈতিক বৈষম্য নয়, সাথে সামাজিক মর্যাদার বৈষম্য দূর করার ব্যবস্থা রয়েছে। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে সম্পদের জাকাত প্রদানের নির্দেশ দেয়ার পাশাপাশি ফল-ফসলের জাকাত প্রদানেরও নির্দেশ প্রদান করেছেন যার মাধ্যমে উশর প্রদানের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। পৃথিবীতে মানব জাতির জীবিকা নির্বাহের প্রধান উৎস ও ক্ষেত্র হলো ভূমি। আল্লাহ তায়ালা মানব সৃষ্টির পরে এ ভূমিকে তার ব্যবহার অধীন করে দিয়েছেন এবং জীবিকা নির্বাহের জন্য এ জমিনকে করেছেন উর্বর । ইরশাদ হচ্ছে “নিশ্চয়ই আমি তোমাদেরকে এ জমিনে ক্ষমতা- ইখতিয়ার দিয়ে প্রতিষ্ঠিত করেছি এবং এখানে তোমাদের জন্য জীবন জীবিকার সামগ্রীর ব্যবস্থা করেছি। কিন্তুু তোমরা খুব কমই কৃতজ্ঞতা স্বীকার করো” (সৃরা আল আ’রাফ, আয়াত ১০)। ইরশাদ হচ্ছে-“হে মু’মিনগন তোমরা যা উপার্জন করো এবং আমি যা ভূমি হতে তোমাদের জন্য উৎপাদন করে দেই তন্মধ্যে যা উৎকৃষ্ট তা (জাকাত হিসেবে)ব্যয় করো; এবং তার নিকৃষ্ট বস্তুু ব্যয় করার সংকল্প করো না; অথচ তোমরা তা গ্রহণ করো না, যদি না তোমরা চক্ষু বন্ধ করে থাকো এবং জেনে রাখো যে, আল্লাহ অভাবমুক্ত ও প্রশংসিত” (সূরা আল বাকারা, আয়াতঃ ২৬৭)। আল্লাহ তায়াল মুমিন গণকে টাকা পয়সা ও সম্পদের জাকাত আদায়ের মতো একই গুরুত্বের সাথে ভূমি থেকে উৎপাদিত

ফল Ñফসলের নির্ধারিত অংশ তথা উশর প্রদানের নির্দেশ দিয়েছেন। যমীনে বীজ বপন থেকে শুরু করে ফসল সংগ্রহ পর্যন্ত সকল পর্যায় সঠিক ভাবে সম্পন্ন হওয়া মহান আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহের ফল। উর্বরা শক্তি ও উৎপাদনশীলতার দিক দিয়ে পৃথিবীর সকল এলাকার মাটি এক সমান নয়। বীজ বপনের পর অংকুরোদগম হওয়া থেকে শুরু করে ফসল উৎপাদনের শেষ পর্যায় পর্যন্ত বিভিন্ন স্তরে পানির প্রয়োজন হয়, যা মহান আল্লাহ তার অশেষ কুদরতে আকাশ থেকে বর্ষণ করেন কিংবা মাটির গভীর হতে প্রয়োজন মিটিয়ে দেন অথবা খাল-বিল, নদী-নালা এবং ঝর্না থেকে এ প্রয়োজন মেটানোর ব্যবস্থা করে থাকেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, “তোমরা যে বীজ বপন করো সে সর্ম্পকে ভেবে দেখেছ কি? তোমরা তা উৎপন্ন করো না আমি উৎপাদনকারী ? আমি ইচ্ছা করলে তাকে খড়-কুটা বানিয়ে দিতে পারি, অতঃপর তোমরা বিষ্ময়াবিষ্ট হয়ে যাবে। (বলবে) আমরা তো ঋণের চাপে পড়ে গেলাম, বরং আমরা হৃত-সর্বস্ব হয়ে পড়লাম” (সূরা আল ওয়াকিয়াহ, আয়াতঃ ৩৬-৩৭)। আল্লাহ তায়ালা আরো ইরশাদ করেন, “আর তাদের জন্য নিদর্শন হলো মৃত ভূমি, আমি একে সঞ্জীবিত করি এবং তা থেকে উৎপন্ন করি শস্য, তারা তা থেকে ভক্ষণ করে। আমি তাতে সৃষ্টি করি খেজুর ও আঙ্গুরের বাগান এবং তাতে সৃষ্টি করি ঝর্না, যাতে তারা তার ফল খায় এবং তাদের হাত একে সৃষ্টি করে।অতঃপর তারা কি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে না? (সূরা আল ইয়াসীন, আয়াতঃ৩৬-৩৫)।

ইরশাদ হচ্ছে,“মানুষ তার খাদ্যের প্রতি লক্ষ করুক, আমরা প্রচুর পানি বর্ষণ করেছি, অতঃপর ভূমিকে উত্তম রূপে বিদীর্ণ করেছি। অতঃ পর তাতে শস্য-উৎপাদন করেছি। আর উৎপন্ন করেছি আঙ্গুর, শাক সবজি, যয়তুন, খেজুর, ঘন সন্নিবেক্ষিত উদ্যান, রকমারী ফল ও ঘাস- তোমাদের জন্য ও তোমাদের চতুষ্পদ জন্তুুগুলোর জন্য জীবিকার সামগ্রী হিসেবে” (সূরা আল-আবাসা, আয়াতঃ ২৪-৩২)। হযরত আবদুল্লাহ বিন ওমর (রাঃ) থেকে বণির্ত রাসসুল্লাহ (সাঃ) বলেন, বৃষ্টির পানি বা নদীনালা অথবা অন্যান্য প্রাকৃতিক পানি সিঞ্চনে যা উৎপাদিত হয় সে ফল ও ফসলে ১০% উশর আদায় করতে হবে। আর যা কৃত্রিম উপায়ের পানি দ্বারা সেচ দিয়ে উৎপাদিত হয় সে ফল এ ফসলে অর্ধেক উশর আবশ্যক হবে।” (সহীহ-বুখারী), দিল্লী কুতুব খানা রাশিদিয়া, ১৩৭৫ হিঃ,খ, হাদীস নং-১৪১২, খ,১১,হাদিস-১৪৫৩)। দয়াল নবী (সাঃ) বলেনঃ, বৃষ্টির পানি, নদীর পানি, ঝর্নার পানি বা মাটির আর্দ্রতা থেকে যা উৎপাদিত হয় তা থেকে উশর বা দশ ভাগের এক ভাগ জাকাত প্রদান করতে হবে। আর পশু বা যন্ত্র ব্যবহার করে সেচের মাধ্যমে যা উৎপন্ন করা হয় তা থেকে নিসফ উশর (২০ ভাগের এক ভাগ) জাকাত প্রদান করতে হবে; (সুনান নাসাঈ, খ,৫ পৃ. ৪৩-৪৪, হাদীস নং-২৪৮৭, ২৪৮৮,২৪৮৯। হাদীস সমূহের আলোকে মুসলিম উম্মাহর সকল ইমাম ও আলেম ঐক্যবদ্ধ ভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন যে, অতিরিক্ত সেচ ব্যবস্থা ছাড়া স্বাভাবিক আর্দ্রতা, বৃষ্টি, র্ঝণা বা নদীর প্রবাহমান পানির মাধ্যমে উৎপাদিত ফল-ফসলের ১০% জাকাত প্রদান করা মুমিনের উপর ফরজ। আর যদি উৎপাদনের ক্ষেত্রে মানবীয় প্রচেষ্টার মাধ্যমে অথবা যন্ত্র বা জীব-জন্তুর মাধ্যমে পানি সরবরাহ করা হয় তাহলে এভাবে উৎপাদিত ফল ও ফসলের ৫% জাকাত প্রদান করা মুমিনের উপর ফরজ। জাকাত ব্যবস্থার গুরুত্বঃ প্রথমত, আর্থিক ও আত্মিক পরিশুদ্ধিতা অর্জন। এ ব্যাপারে আল্লাহর নির্দেশ হলো- “তাদের ধন-সম্পদ থেকে জাকাত উসুল করে তাদেরকে পবিত্র এবং পরিচ্ছন্ন করে দাও।”(সূরা আত তাওবা:১০৩)। অন্যত্র এসেছে- খালেছভাবে আল্লাহর উদ্দেশ্যে তারা ইয়াতিম, মিসকীন এবং বন্দীদের খাওয়ার ব্যবস্থা করে দেয় এবং তারা বলে যে, আমরা তোমাদেরকে কেবল আল্লাহ তা’য়ালার সন্তুষ্টির জন্যই খাওয়াচ্ছি। তোমাদের কাছে আমরা কোনরূপ বিনিময় বা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ চাই না।” (সূরা দাহর:৮-৯) এখানে প্রথম আয়াতটি আর্থিক পরিশুদ্ধিতার অনন্য দলিল। এই আয়াতগুলোর সঠিক মর্ম উপলদ্ধির জন্য ইসলামের ভ্রাতৃত্ব নীতির সাথে মিলিয়ে আলোচনা করা প্রয়োজন। সূরা হুজরাতের ১০ নং আয়াতে বলা হয়েছে- “মুমিনরা তো পরস্পর ভাই ভাই।” এর ভিত্তিতেই হাদীসে এসেছে মুমিনরা সবাই মিলে একটি দেহের মতো, এর কোন একটি অঙ্গ রোগাক্রান্ত হলে সর্বাঙ্গে তার প্রভাব পড়ে। এজন্য এক দারিদ্রপীড়িত ভাইয়ের অভাবের কষ্টগুলোর তার একার থাকে না, বরং অন্যরাও তার দুঃখ-কষ্টের ভাগীদার হয়। তাই স্বাভাবিকভাবেই এক স্বচ্ছল ভাইয়ের সম্পদে আরেক অভাবী ভাইয়ের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়।ইসলাম এটাকে তাদের প্রতি করুনা নয় বরং তাদের প্রাপ্য হিসেবেই পেশ করেছে। এ ব্যাপারে (কোরআনের ভাষ্য হলো) “গরীব নিকটাত্মীয়দেরকে তাদের প্রাপ্য দাও এবং মিসকীন ও গরীব মুসাফিরকেও ।” (বনী ইসরাঈল:২৬) এ জন্যেই কোরআনে জাকাত আদায়ের মাধ্যমে সম্পদকে পবিত্র করার নিদের্শ দেয়া হয়েছে। নিজের উপার্জিত সম্পদে অন্যের অধিকার স্বীকার করে নেয়, সে অত্যন্ত মহৎ ব্যক্তিত্বের পরিচয় প্রদান করে। এটা তাকে স্বার্থপূজা, আত্মকেন্দ্রিকতা ও মনের সংকীর্ণতা থেকে রক্ষা করে। যে ব্যক্তি আল্লাহর নির্দেশ পালনে এত বড় আর্থিক কুরবানী করতে প্রস্তুুত হয়ে যায়, জীবনের আর সকল দিকে সে আল্লাহর অবাধ্য হতে পারে না। অপরদিকে মানুষের হক আদায়ে যে সদ্য সচেতন, তার দ্বারা কখনা অন্যের ক্ষতি হতে পারে না। কেননা, তার সম্পদের এই নির্ধারিত অংশটিতে তার নিজের কোন অধিকার নেই। এটা যার প্রাপ্য তাকেই বুঝিয়ে দিতে হবে। যদি সে এটা দিতে অস্বীকার করে তবে সে অন্যের সম্পদ আত্মসাৎ এর দায়ে অভিযুক্ত হবে। আর এই বিধানের আলোকে যে ব্যক্তি স্বেচ্ছায় কারো সম্পদ বা সম্ভ্রমে সে কখনো অন্যায় হস্তক্ষেপ করতে পারে না। এভাবে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য জাকাত আদায়কারী ব্যক্তির আর্থিক ও আত্মিক পরিশুদ্ধিতায় একটি কার্যকরী প্রশিক্ষণ পেয়ে যায়।দ্বিতীয় বিষয়টি হলো আর্থিক নিশ্চয়তা প্রদান। অর্থনৈতিক জীবনে অনিশ্চয়তা মানুষকে সবচেয়ে বেশি অপরাধ প্রবণ করে তুলে। যে সমাজে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা যত বেশি থাকে, সেখানে চুরি, ডাকাতি, চাঁদাবাজি, আত্মসাৎ, হত্যা, লুণ্ঠনের মতো ভয়াবহ অপরাধগুলো ততবেশি প্রভাব বিস্তার করে। তাই ইসলাম মানুষকে ক্ষুধা-দারিদ্রের অভিশাপ থেকে মুক্তি প্রদান করে একজন সৎ মানুষ হিসেবে জীবন যাপনের পথ প্রশস্ত করতেই জাকাতের মতো একটি কল্যাণকর সামাজিক বিধান দিয়েছে।তৃতীয়ত ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য দূর করে ইনসাফ ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা। ইসলামে কখনো বাহ্যিক অবস্থায় পরিপ্রেক্ষিতে মানুষে মানুষে পার্থক্য করা হয় না। এ ব্যাপারে ইসলামের নীতি হলো-“তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি সবচেয়ে বেশী তাকওয়াবান, সেই আল্লাহর কাছে সর্বাধিক সম্মনিত। ” (সূরা হুজরাত:১৩) তাই সমাজে অর্থের ভিত্তিতে মর্যাদার মাপকাঠি নির্ধারণের প্রথাকে ইসলাম ভেঙ্গে দিতে চায়।

এখন প্রশ্ন হলো, জাকাত আদায় ও বন্টনের কাজটা করবে কে? রাষ্ট্রের প্রতিটি মানুষের যাবতীয় চাহিদা পূরণের দায়িত্ব যাদের উপর, তাদেরই এ কাজ করতে হবে। অর্থাৎ সরকারকেই এ দায়িত্ব নিতে হবে। জাকাতের মাধ্যমে দারিদ্র জয়ের অপার সম্ভাবনা থাকা সত্তে¡ও যথাযথ পদক্ষেপ ও ব্যবস্থাপনার অভাবে যদি মানুষ দারিদ্রের অভিশাপ থেকে মুক্তি না পায়, তাহলে এ অবহেলার জন্য কিয়ামতের ময়দানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে।সুতরাং সম্পদশালী জনগণের উচিত হলো জাকাত দেয়া আর রাষ্ট্র পরিচালনাকারীদের কর্তব্য হলো বাধ্যতামূলক আইন করে জাকাত আদায় করে গরীব মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়া। এ কাজটি করলে জাকাত আদায় ও বন্টনের জন্য প্রয়োজন হবে, একটি কার্যকারী দপ্তরের। যেখানে ইসলামী বিধান অনুসারে জাকাত আদায় ও বন্টনের জন্য বিপুল মানুষের কর্মসংস্থানেরও সুযোগ হবে।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন