ঢাকা, শুক্রবার ১৯ জুলাই ২০১৯, ০৪ শ্রাবণ ১৪২৬, ১৫ যিলক্বদ ১৪৪০ হিজরী।

সম্পাদকীয়

বিএসএফ’র অনাকাক্সিক্ষত হত্যাকাণ্ড বন্ধ হোক

| প্রকাশের সময় : ১৭ জুন, ২০১৯, ১২:০৬ এএম


ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ বাংলাদেশ সীমান্তে নিহতের সংখ্যা বাড়ার কথা স্বীকার করলেও এসব ঠান্ডা মাথার হত্যাকান্ড নিয়ে যেন তাদের তেমন কোনো মাথাব্যথা নেই। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে অবৈধ অনুপ্রবেশ সংক্রান্ত সমস্যার ক্ষেত্রে গ্রেফতার ও প্রত্যর্পণের জন্য দুই দেশের সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর মধ্যে সমঝোতা চুক্তি থাকলেও ভারতীয়রা সে সব চুক্তি বা আন্তর্জাতিক কনভেনশনের তেমন তোয়াক্কা করছে না। তারা ‘শ্যুট অ্যাট দ্য সাইট’ বা দেখামাত্র গুলি করার বর্বর নীতি অবলম্বন করছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতের সাথে বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে দুই দেশের সরকারের তরফ থেকেই অত্যন্ত ‘চমৎকার’ ‘অন্যন্য উচ্চতায়’ রয়েছে বলে দাবী করলেও সীমান্তে বিএসএফ’র গুলিতে নিরীহ নিরস্ত্র মানুষ হত্যা বন্ধ হয়নি। ইতিপূর্বে ভারতের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীসহ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে সীমান্তে বিএসএফ’র লিথ্যাল ওয়েপন ব্যবহার না করা এবং হত্যাকান্ড শূণ্যর কোঠায় নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দেয়া হলেও তা কখনো বাস্তবায়িত হয়নি। বিজিবি-বিএসএফ’র যৌথ বৈঠকে বরাবরই বিএসএফ’র হত্যাকান্ড অন্যতম এজেন্ডা হিসেবে আলোচিত হয়ে থাকে। ইতিপূর্বে ভারত সরকারের উচ্চ মহল থেকে সীমান্ত হত্যার বিষয়টি প্রকারান্তরে স্বীকার করে নিলেও এবার বিএসএফ ভিন্ন সুরে কথা বলছে। ঢাকার পিলখানায় বিজিবি সদর দফতরে চারদিনব্যাপী বিএসএফ-বিজিবি মহাপরিচালক পর্যায়ের সম্মেলন শেষে গত শনিবার বিএসএফ মহাপরিচালক রজনীকান্ত মিশ্র সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বিএসএফ’র হাতে নিহতের সংখ্যাবৃদ্ধির বিষয় স্বীকার করলেও এসব মৃত্যুকে তিনি হত্যাকান্ড বলে মানতে নারাজ। তাঁর ভাষায় সীমান্তে অনাকাঙ্খিত মৃত্যু ঘটছে।

কথিত বন্ধুরাষ্ট্রের সীমান্তরক্ষী বাহিনী(বিএসএফ) পারস্পরিক সম্পর্ক, বাণিজ্যিক লেনদেন, আন্তর্জাতিক কনভেনশন ও মানবাধিকারের শর্ত লঙ্ঘন করে বাংলাদেশ সীমান্তে বেপরোয়া হত্যা-নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছে। ভারতের সাথে পাকিস্তান ও চীনসহ আরো বেশ কয়েকটি দেশের স্থল ও নৌসীমান্ত থাকলেও আর কোনো রাষ্ট্রের নাগরিকরা বিএসএফ’র হাতে এমন হত্যা-নির্যাতনের স্বীকার হওয়ার নজির নেই। ভারতীয় সীমান্তরক্ষিরা বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তকে বিশ্বের অন্যতম ভয়ঙ্কর, রক্তক্ষয়ী ও প্রাণঘাতি সীমান্ত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। বাংলাদেশ ভারত দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যিক সম্পর্ক বরাবরই ভারতের অনুক‚লে। যতই দিন যাচ্ছে বাণিজ্য বৈষম্য বেড়েই চলেছে। সেই সাথে মাদক, অস্ত্রসহ নিষিদ্ধ অনেক পণ্যের অনুপ্রবেশ ঘটছে যা প্রতিরোধ করতে দুই দেশের সীমান্ত রক্ষী বাহিনী চরমভাবে ব্যর্থ হচ্ছে। বিএসএফ মাদক ও অস্ত্র চোরাচালানিদের রুখতে না পারলেও সীমান্তবর্তী এলাকার নিরীহ কৃষক- রাখাল ও গরু ব্যবসায়ীরা যত্রতত্র নির্মমতার শিকার হচ্ছে। হত্যাকান্ড নিয়ে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের প্রতিবাদ, সরকার এবং বিজিবি’র উদ্বেগও এখন পাত্তা দিচ্ছে না। হত্যাকান্ড কমিয়ে আনতে ব্যর্থতা স্বীকার না করে উপরন্তু হত্যাকান্ডকে ‘অনাকাঙ্খিত মৃত্যু’ অ্যাখ্যা দিয়ে দায় এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। বিএসএফ ডিজির এ ধরনের দায়হীন বক্তব্য নিন্দনীয়, আমরা হতাশ ও ব্যথিত।

বাংলাদেশ সীমান্তে হত্যাকান্ড কমিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি পালনে বিএসএফ শুধু ব্যর্থই হচ্ছে না, হত্যা ও নির্যাতনের শিকার মানুষের সংখ্যা সাম্প্রতিক সময়ে উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। এ প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া বিভাগের নিবার্হী পরিচালক ব্রাড অ্যাডামস বলেন, ভারতের সীমান্ত রক্ষী বাহিনী যেভাবে বাংলাদেশের দরিদ্র নিরস্ত্র গ্রামবাসিদের উপর নিয়মিত গুলি চালাচ্ছে বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের কাছে এমন আচরণ কাঙ্খিত নয়। হিউম্যান রাইটস ওয়াচে দক্ষিণ এশিয়া বিভাগের পরিচালক, মিনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেন, ‘সীমান্তে মানুষের উপর অত্যাধিক বল প্রয়োগ ও নির্বিচার প্রহার অসমর্থনীয়। এসব নির্যাতনে ঘটনা ভারতের আইনের শাসনের প্রতি দায়বদ্ধতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।’ গতকাল একটি ইংরেজী দৈনিকে প্রকাশিত রিপোর্টে দেখা গেছে সম্প্রতি বিএসএফ’র নির্যাতনে সাতক্ষীরা সীমান্তে জনৈক কবিরুল মোল্লা নিহত হওয়ার ঘটনাটিকে অমানবিক বা বর্বরোচিত বললেও কম বলা হয়। অবৈধভাবে সীমান্ত লংঘনের দায়ে গত ১০ মে ৩২ বছরের যুবক কবিরুল মোল্লাকে ধরে তার মুখ এবং পায়ুপথে পেট্টোল ঢেলে নির্যাতন করার পর তাকে সীমান্তের জিরো পয়েন্টে ফেলে রেখে যাওয়ার কয়েক ঘন্টা পর সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। গত ১০ বছরে বিএসএফ’র গুলি ও নির্যাতনে এমন হত্যাকান্ডের সংখ্যা শহস্রাধিক বলে জানা যায়। বিএসএফ’র ধারাবাহিক হত্যাকান্ড এবং বর্বরোচিত নির্যাতনের ঘটনায় আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো বিভিন্ন সময়ে সোচ্চার ভ‚মিকা পালন করলেও আমাদের সরকারের সংশ্লিষ্টদের প্রতিক্রিয়া ও প্রতিবাদ যথাযথ উচ্চকণ্ঠ নয়। ভারতীয় ঊর্ধ্বতন মহল সীমান্ত হত্যা বন্ধে ঐকমত্য ও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হওয়ার পরও বিএসএফ আগের চেয়ে বেপরোয়া গতিতে অনাকাঙ্খিত হত্যাকাণ্ডে লিপ্ত হওয়ার বাস্তবতা প্রমাণ করে তাদের প্রতিশ্রুতি বিশ্বাসযোগ্য বা আশ্বস্ত হওয়ার মত নয়। সীমান্ত গ্রামগুলোতে বিএসএফ’র হত্যা-নির্যাতন এবং মাদক ও অস্ত্র চোরাচালান বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ দেখতে চায় বাংলাদেশ। লোক দেখানো সম্মেলন ও দায় এড়ানো বক্তব্য অনাকাঙ্খিত ও অপ্রত্যাশিত।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন