ঢাকা, মঙ্গলবার, ২২ অক্টোবর ২০১৯, ০৬ কার্তিক ১৪২৬, ২২ সফর ১৪৪১ হিজরী

সম্পাদকীয়

বিদ্যমান বাঁধের টেকসই সংস্কার করতে হবে

| প্রকাশের সময় : ১৮ জুন, ২০১৯, ১২:০৯ এএম

দেশের অভ্যন্তর এবং উপক‚লীয় বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও শহররক্ষা বাঁধগুলো ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। একদিকে মেরামতের অভাব, অন্যদিকে বাঁধ দখলের ঘটনায় এ ঝুঁকির সৃষ্টি হয়েছে। দৈনিক ইনকিলাবের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, দেশের দক্ষিণাঞ্চলের প্রায় ৪ হাজার কিলোমিটার উপকূলীয় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের বেশিরভাগই ঝুঁকিপূর্ণ। যথাযথ সংস্কারের অভাবে এ দশায় উপনীত হয়েছে। শুধু উপকূলীয় বাঁধই নয়, শহররক্ষার জন্য যেসব বাঁধ রয়েছে সেগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় রয়েছে। অবৈধ দখল এবং সংস্কারের অভাবে বাঁধগুলো ক্ষয়ীষ্ণু হয়ে পড়েছে। বিস্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে, রাজশাহী শহররক্ষার জন্য যে বাঁধ রয়েছে তার কোনো কোনো জায়গা বিক্রি পর্যন্ত হয়েছে। এছাড়া বাঁধে অবৈধভাবে গড়ে উঠেছে স্থাপনা। এসব উচ্ছেদে পানি উন্নয়ন বোর্ড কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। অথচ বন্যা নিয়ন্ত্রণ বা শহররক্ষা যে বাঁধই হোক না কেন, প্রতি বছর এগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কারে সরকার কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ দিচ্ছে। বরাদ্দকৃত অর্থ কখন, কীভাবে ব্যয় হচ্ছে, তার কোনো চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যায় না। বাঁধগুলোর দুরবস্থা কোনোভাবেই কাটছে না। তাহলে এগুলোর সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণে বরাদ্দকৃত এত টাকা কোথায় যায়?

দেশের বিদ্যমান বাঁধের সংস্কার, রক্ষণাবেক্ষণ ও পুনর্নিমাণ নিয়ে বহু লেখালেখি হয়েছে। এসব করতে গিয়ে এন্তার দুর্নীতির বিষয়টিও বারবার উঠে এসেছে। এতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের তেমন বিচলন হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে না। প্রতিষ্ঠানটি লোকদেখানো কিছু কাজ করেই বরাদ্দকৃত অর্থের ব্যবহার দেখাচ্ছে। আদতে বাঁধের সাথে সংশ্লিষ্ট কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও ঠিকাদারদের জন্য বাঁধ সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজটি হয়ে পড়েছে তাদের স্থায়ী আয়ের উৎস। যত দুর্বল বাঁধ নির্মাণ করা যায়, ততই তাদের লাভ। এতে বাঁধের সংস্কার ও পুননির্মাণে নতুন করে অর্থ বরাদ্দ পাওয়া যায়। এতে তাদেরও ব্যবসার পুঁজি এবং লাভ হয়। বিষয়টি এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে, বাঁধগুলো যতদিন থাকবে তা এই অসাধু শ্রেণীর ব্যবসাও চলতে থাকবে। এর কোনো প্রতিকার হবে না। উপকূলসহ শহররক্ষা বাঁধ নির্মাণের উদ্দেশ্য হচ্ছে, বসত-বাটি, জমি-জমা, ফসল রক্ষা করা। হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদ রক্ষার জন্য হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে বাঁধগুলো নির্মাণ করা হয়েছে। নির্মিত এসব বাঁধ রক্ষণাবেক্ষণের জন্য আলাদা বরাদ্দও থাকে। দেখা যাচ্ছে, বাঁধের অনেকগুলোই যথাযথভাবে নির্মিত হয়নি। দুর্বল কাঠামো ও নি¤œমানের উপকরণ দিয়ে তৈরি। ফলে বন্যা বা জলোচ্ছ¡াসের ফলে এগুলো অনেকটা বালির বাঁধে পরিণত হয়। বন্যার সময় দেশের বিভিন্ন এলাকায় সাধারণ মানুষকে তাদের সম্পদ রক্ষায় নিজ উদ্যোগে বাঁধ জোড়া দিতে দেখা যায়। ইতোমধ্যে বর্ষা শুরু হয়েছে। এখনো পুরোপুরি বর্ষার জোয়ার শুরু হয়নি। আবহাওয়ার পরিবর্তনজনিত কারণে যদি বন্যা দেখা দেয়, তাহলে বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও শহররক্ষা বাঁধগুলো কী অবস্থায় রয়েছে, তার প্রকৃত চিত্র পাওয়া যাবে। তবে যে সংবাদ পাওয়া গেছে, তাতে উপকূলীয় বাঁধগুলো খুব একটা সুবিধাজনক অবস্থায় নেই। বলার অপেক্ষা রাখে না, একটি অঞ্চল রক্ষার জন্য যে বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে তার একটি অংশ ভেঙ্গে গেলে পুরো এলাকাই প্লাবিত হয়। এজন্য পুরো বাঁধেরই সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ প্রয়োজন। দেখা যায়, বাঁধের এই সংস্কার কাজ বর্ষা মৌসুম এলেই জোরেসোরে শুরু হয়। সারাবছর খবর থাকে না। অসাধু শ্রেণীটি যেন এ সময়ের জন্যই অপেক্ষায় থাকে। এর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য পরিষ্কার। এ সময় বাঁধে ফাটল কিংবা ধস দেখা দেয়। আর তাতেই অর্থবরাদ্দ করা হয়। অর্থবরাদ্দের অর্থই হচ্ছে দুর্নীতির সুযোগ সৃষ্টি। কোনো রকমে বাঁধ সংস্কার বা জোড়াতালি দেখিয়ে বিপুল অংকের অর্থ হাতিয়ে নেয়া হয়। এ ধরনের দুর্নীতি ও অপসংস্কৃতির কারণেই যুগের পর যুগ ধরে দেশের বাঁধগুলো ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়ে গেছে।

আমাদের কথা হচ্ছে, বিদ্যমান যেসব বাঁধ রয়েছে সেগুলোর দীর্ঘমেয়াদের টেকসই সংস্কার করার উদ্যোগ নিতে হবে। সংস্কার ও পুনর্নিমানের জন্য যাদের এ দায়িত্ব দেয়া হবে, তাদের এ গ্যারান্টি দিতে হবে। বাঁধের সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ যথাযথভাবে হয়েছে কিনা, তা পানি উন্নয়ন বোর্ডকে সততার সাথে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। যাদের দায়িত্ব দেয়া হয়, তাদের কোনো গাফিলতি বা দুর্নীতি থাকলে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা নিতে হবে। হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত বাঁধ দেখভালের অভাবে পরিত্যক্ত বা ভাঙনের মুখে পড়ে থাকবে, তা কোনোভাবেই বরদাশত করা যায় না। বলা বাহুল্য, নির্মিত বাঁধগুলো শুধু সম্পদই রক্ষা করে না, তা মানুষের যাতায়াত ও প্রাকৃতিক পরিবেশ এবং তার ভারসাম্য বজায় রাখতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কাজেই সারাবছর ধরেই বিদ্যমান বাঁধগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ ও যতœ নেয়া অপরিহার্য। শুধু বর্ষা এলেই তা সংস্কার করতে হবেÑএ অপসংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসতে হবে। বাঁধগুলোকে মজবুত করার পাশাপাশি কীভাবে সৌন্দর্যকরণের মাধ্যমে নান্দনিক করে গড়ে তোলা যায়, পানি উন্নয়ন বোর্ডকে এ চিন্তা করতে হবে। বাঁধের অবৈধ দখল ও স্থাপনা কোনোভাবেই প্রশ্রয় দেয়া যাবে না।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন