ঢাকা, মঙ্গলবার, ২২ অক্টোবর ২০১৯, ০৬ কার্তিক ১৪২৬, ২২ সফর ১৪৪১ হিজরী

সম্পাদকীয়

ভুয়া ওয়ারেন্টে গ্রেফতার বন্ধ করতে হবে

| প্রকাশের সময় : ২৪ জুন, ২০১৯, ১২:০৫ এএম

দেশের বিভিন্ন আদালত থেকে ভুয়া ওয়ারেন্ট পাঠিয়ে নিরপরাধ মানুষকে গ্রেফতার ও হয়রানি করছে একটি প্রতারক চক্র। এমনকি অস্তিত্বহীন আদালত থেকে ভুয়া ওয়ারেন্ট জারি হওয়ার পরও সংশ্লিষ্ট থানার পুলিশ কোনো যাচাই-বাছাই ছাড়াই ওয়ারেন্টভুক্ত ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে আদালতে হাজির করলে সংশ্লিষ্ট আদালতও তাকে কারাগারে পাঠিয়ে দিচ্ছে। গতকাল ইনকিলাবে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে এমনি কয়েকটি চাঞ্চল্যকর ভুয়া ওয়ারেন্টের তথ্য জানা যায়। সেখানে দেখা যাচ্ছে, একই ব্যক্তির নামে দেশের বিভিন্ন বিভাগীয় আদালত থেকে ওয়ারেন্ট পাঠানো হচ্ছে। দেখতে আসল ওয়ারেন্টের মত হওয়ায় ওয়ারেন্ট আদেশ হাতে পাওয়ার পরই পুলিশ তা তামিল করতে সক্রিয় হয়ে ওঠে। একাধিক স্থান থেকে একাধিক মামলায় ওয়ারেন্ট জারি হওয়ার কারণে ভুয়া ওয়ারেন্টের শিকার এসব ব্যক্তির জামিনে বেরিয়ে আসতে বাড়তি জটিলতা দেখা দেয়। তাদের পক্ষে জামিন চেয়ে আদালতে যাওয়ার পর মামলার নথি তলব করতে গেলে কোনো নথিপত্র খুঁজে পাওয়া যায় না। সারাদেশের বিভিন্ন আদালতে এমন অসংখ্য ভুয়া ওয়ারেন্টে গ্রেফতারকৃতদের মামলার নথিপত্র খুঁজতে গিয়ে পুলিশ ও আদালতের কর্মকর্তারা নাস্তানাবুদ হতে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে ভুয়া ওয়ারেন্ট বা মিথ্যা মামলার রহস্য উদঘাটনে মাসের পর মাস লেগে যায়। ততদিন পর্যন্ত ভুয়া ওয়ারেন্টের শিকার নিরপরাধ মানুষের কারাবাস প্রলম্বিত হতে থাকে।

রাজনৈতিক কারণে দীর্ঘদিন ধরে দেশে বিচারহীনতার সংস্কৃতি নিয়ে অনেক কথা হচ্ছে। সামাজিক অবক্ষয় ও বিচারহীনতার কারণে সামাজিক শৃঙ্খলা ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম। এহেন বাস্তবতায় দেশি-বিদেশি মাননবাধিকার সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে প্রায়শ: বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা, বিচারহীনতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলা হচ্ছ্।ে এসব অভিযোগের বিশ্বাসযোগ্য জবাবও সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কাছে পাওয়া যায় না। মিথ্যা মামলায় হয়রানি, বিনা বিচারে আটক, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পোশাকে বা পরিচয়ে তুলে নেয়ার পর অনেকের হদিস খুঁজে না পাওয়া ইত্যাদি বিষয়গুলো অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। বিশেষত রাজনৈতিক কারণে লাখ লাখ মানুষের নামে মিথ্যা মামলা, হাজার হাজার মানুষের গ্রেফতারের ঘটনা বড় ধরনের সামাজিক-রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার জন্ম দিয়েছে। অজ্ঞাত আসামীর মামলায় যে কাউকে ফাঁসিয়ে দেয়ার সুযোগ থাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এক শ্রেণীর সদস্য প্রকারান্তরে মানুষের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা মুক্তিপণ আদায় করেছে বলেও অভিযোগ আছে। মিথ্যা মামলার পাশাপাশি ভুয়া ওয়ারেন্টের মাধ্যমে গ্রেফতার হয়রানির ঘটনা আইন-আদালত সম্পর্কে সমাজে একটি আতঙ্কজনক মনোভাব তৈরী করেছে। কোনো দেশের বিচারব্যবস্থা, বিচার বিভাগ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য এটি অনাস্থা ও অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতি। সব বিভাগেই কিছু অসাধু ও দুর্নীতিপরায়ণ ব্যক্তির তৎপরতা থাকতে দেখা যায়। এদের কারণে প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের অনাস্থা থেকে বড় ধরনের সামাজিক-রাজনৈতিক সংকট দেখা দিতে পারে।

গতমাসে রাজধানীর শেওড়াপাড়া থেকে চার ভুয়া ডিবি পুলিশ সদস্যকে আটক করেছে পুলিশ। ইতিপূর্বে বিভিন্ন সময়ে ডিবি পরিচয়ধারি ভুয়া পুলিশ আটকের অনেক ঘটনার খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। মিথ্যা মামলা, ভুয়া ডিবি-পুলিশ নামধারি ব্যক্তিরা কখনো কখনো এসব পরিচয় ব্যবহারের পাশাপাশি ভুয়া আদালতের নামও ব্যবহার করছে। গত বছর ৩রা জুন একটি ওয়ারেন্টের বিপরীতে রাজধানীর বাড্ডা থেকে জনৈক জনি চৌধরীকে গ্রেফতার করে পুলিশ। প্রথমে যশোরের সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত থেকে পাঠানো ওয়ারেন্টে জামিন নিয়ে মুক্তি পাওয়ার আগেই জুলাইয়ে ‘ঢাকা মেট্রোপলিটান আদালত-৯’ থেকে পাঠানো আরেকটি ওয়ারেন্টে তার মুক্তি আটকে দেয়া হয়। অথচ ঢাকা মেট্রোপলিটান আদালত-৯’ নামে কোনো আদালত নেই বলে জানা যায়। অত:পর চট্টগ্রাম তৃতীয় জেলাজজ আদালত থেকে প্রেরিত আরেকটি ওয়ারেন্ট জারি জনি চৌধুরীর কারাবাস প্রলম্বিত করা হয়। একই ব্যক্তির বিরুদ্ধে উল্লেখিত ৩টি ওয়ারেন্টই ভুয়া বলে জানা যায়। সারাদেশে এভাবে কত সংখ্যক মানুষ মিথ্যা মামলা, ভুয়া ওয়ারেন্ট ও ভুয়া পুলিশ-ডিবির হয়রানির শিকার হচ্ছে তার কোনো পরিসংখ্যান কারো কাছেই নেই। ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতা, অন্যায়-অবিচার ও দুর্নীতির প্রতিকার চাইতে মানুষ আদালতের দ্বারস্থ হয়। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পেশাদার সদস্যরা যদি মিথ্যা মামলা, ভুয়া ওয়ারেন্ট বা ভ’য়া আদালতের কথিত ফরমান নিয়ে ব্যাস্ত থাকে তাহলে সাধারণ মানুষের বিচার প্রাপ্তি সুদুর পরাহত। যে বিশেষ ক্ষেত্রে মিথ্যা মামলা ও ভুয়া ওয়ারেন্টের মত অপরাধ ধরা পড়ছে, এসব ঘটনার সুত্রগুলোকে সামনে রেখে ভুয়া ওয়ারেন্টের সাথে জুিড়ত নেপথ্য চক্রকে চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় আনা অসম্ভব নয়। শর্ষের ভেতরে ভুত এবং গুরুপাপে লঘুদন্ডের ব্যবস্থা চালু থাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অপরাধমুক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। কোটি কোটি টাকার দুর্নীতি, মাদক ব্যবসা এবং মুক্তিপণ আদায়ের মত অপরাধে অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তাদেরও শুধুমাত্র বদলি করেই দায় শেষ করার অভিযোগ আছে পুলিশ বিভাগের বিরুদ্ধে। এ কারণেই বছরে হাজার হাজার পুলিশ সদস্য বিভাগীয় শাস্তির সম্মুখীন হওয়ার পরও পুলিশের অপরাধ প্রবণতা কমছে না। পুলিশ ও নিম্ন আদালতকে রাজনৈতিক প্রভাব, পক্ষপাত থেকে মুক্ত রেখে আইনগত স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা না হলে মিথ্যা মামলা, ভুয়া ওয়ারেন্টের হয়রানি এবং বিচারহীনতা থেকে সাধারণ মানুষকে রক্ষা করা সম্ভব নয়। কোনো সভ্য সমাজে এ ধরনের ব্যবস্থা চলতে পারে না।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন