ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৬ নভেম্বর ২০২০, ১১ অগ্রহায়ণ ১৪২৭, ১০ রবিউস সানি ১৪৪২ হিজরী

সম্পাদকীয়

ঢাকার চারপাশের নদ-নদীর দূষণ রোধ করতে হবে

| প্রকাশের সময় : ৩০ জুন, ২০১৯, ১২:০৫ এএম

ঢাকার চারপাশের নদ-নদীর দূষণের বিষয়টি নতুন নয়। বছরের পর বছর ধরে এই দূষণ চলছে। বলা যায়, নদীগুলোকে রাজধানীর ডাস্টবিন হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। নৌবাহিনীর এক কর্মপরিকল্পনায় উল্লেখ করা হয়েছে, প্রতিদিন নদীগুলোতে রাজধানীসহ আশপাশের কলকারখানা ও গৃহস্থালীর বিষাক্ত তরল এবং কঠিন বর্জ্য মিলিয়ে প্রায় ৫০ হাজার মেট্রিক টন নদীগুলোতে পড়ছে। এসব বর্জের মধ্যে রয়েছে, শিল্পবর্জ্য, বিষাক্ত রাসায়নিক দ্রব্য, ট্যানারি বর্জ্য, পয়ঃনিষ্কাশন ও গৃহস্থালী বর্জ্য, ডকইয়ার্ডের লোহার মরিচা, সিমেন্ট-বালু মিশ্রিত পানি এবং পোড়া তেল-মবিল। এর মধ্যে ৬০ শতাংশ শিল্পবর্জ্য। এছাড়া ইটভাটা, পলিথিন, ডকইয়ার্ড ও পোড়া মবিলসহ ৩০ শতাংশ কঠিন ও ১০ শতাংশ নৌবর্জ্য দ্বারা নদীগুলো দূষিত হচ্ছে। রাজধানীর চারপাশের ১৮৫টি উৎসমুখ দিয়ে প্রতিদিন এই বর্জ্য নিষ্কাশিত হচ্ছে। এমনকি সিটি করপোরেশন কর্তৃক আহরিত বর্জ্যও নদীগুলোতে ফেলা হচ্ছে। অর্থাৎ ঢাকার চারপাশের নদ-নদীগুলো দীর্ঘদিন ধরেই ময়লা-আবর্জনার বাগাড় হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব নদ-নদী দূষণমুক্ত করা নিয়ে বহু আলোচনা এবং উদ্যোগ নেয়ার কথা শোনা গেছে। উচ্চ আদালতও নির্দেশ দিয়েছে। দেখা যাচ্ছে, কোনো কিছুতেই এই দূষণ রোধ করা যাচ্ছে না। নদ-নদীগুলোর নাব্য রক্ষা এবং যে ১৮৫টি আবর্জনার উৎসমুখ রয়েছে সেগুলো বন্ধ করার জন্য ২০০৯ সালে তৎকালীন নৌপরিবহন মন্ত্রীর সভাপতিত্বে একটি টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছিল। এই কমিটি গত ১০ বছরে ৪৩টি বৈঠক করে একাধিক সিদ্ধান্ত নিলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে ঢাকার চারপাশের নদ-নদীর দূষণ চলছে এবং তা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ থেকে পরিত্রাণের যেন কোনো উপায় নেই।

একটি দেশের রাজধানীর চিত্র কতটা করুণ ও দুর্দশাগ্রস্ত হতে পারে তা ঢাকাকে না দেখলে বোঝা যাবে না। বিশ্বে এমন রাজধানী নেই। এর স্বীকৃতিও বছরের পর বছর ধরে মিলছে। বসবাসের অযোগ্য, অসভ্য নগরী, বায়ু দূষণে এক নম্বর শহরের তালিকায় ঠাঁই পেয়েছে। অথচ ঢাকার মতো এমন অবস্থানের রাজধানী বিশ্বে আর কোথাও নেই। বিশ্বে এমন কোনো রাজধানী নেই যার ঢাকার মতো চারপাশে নদ-নদী এবং অভ্যন্তরেও খাল, ঝিল রয়েছে। প্রকৃতির এ এক অপার দান। এই দানকে কীভাবে ধ্বংস করা হচ্ছে, তা নদ-নদীগুলোর দখল ও দূষণের চিত্র থেকেই বোঝা যায়। বলা যায়, সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর উদাসীনতা, অবহেলা এবং উদ্যোগের অভাবে নদ-নদীগুলোকে মেরে ফেলা হচ্ছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, রাজধানীসহ এর আশপাশের এলাকাগুলোতে ছোট-বড় মিলে প্রায় আড়াই লাখ শিল্প-কারখানা রয়েছে। এসব শিল্প-কারখানার ৬০ শতাংশ শিল্পবর্জ্য নদীগুলোতে ফেলা হচ্ছে। এগুলোর ৯৯ ভাগেরই তরল বর্জ্যরে শোধনাগার নেই। অথচ শিল্প-কারখানায় বর্জ্য শোধনাগার থাকা বাঞ্চনীয়। বলার অপেক্ষা রাখে না, বর্জ্য শোধনাগার বা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ছাড়াই এসব শিল্প-কারখানা গড়ে তোলার অনুমতি দেয়া হয়েছে। এ ধরনের অনুমতি দেয়াকে উদাসীনতা বা অবহেলা বলা যায় না, বরং তা দুর্নীতি এবং ইচ্ছাকৃত অনুমোদন ও অপরাধ। বিস্ময়ের বিষয় হচ্ছে, যে ১৮৫টি বর্জ্যরে উৎসমুখ চিহ্নিত করা হয়েছে বিগত ১০ বছরে সেগুলো বন্ধ করার কোনো উদ্যোগই নেয়া হয়নি। ঢাকার চারপাশের নদ-নদী রক্ষায় সরকার যে টাস্কফোর্স গঠন করেছে, তার কার্যক্রমও দৃশ্যমান নয়। বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকার আন্তরিক হলে টাস্কফোর্স দিয়ে নদ-নদীর দূষণ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। কি কারণে টাস্কফোর্স যথাযথভাবে কাজ করছে না, তার কোনো জবাব পাওয়া যায় না। তাহলে এই টাস্কফোর্স গঠন করে কি লাভ হচ্ছে? ঢাকার চারপাশের নদ-নদীর দূষণের মাত্রা এতটাই যে, এগুলোর পানি কোনোভাবেই ব্যবহার উপযোগী নয় এবং প্রকৃতিগতভাবে স্রোপ্রবাহের মাধ্যমে তা পরিশোধিত হওয়ারও কোনো উপায় নেই। ভাবা যায়, এক বুড়িগঙ্গার তলদেশে ১০ থেকে ১২ ফুট পলিথিনের স্তর পড়েছে! অপচনশীল পলিথিনের এই স্তর অপসারণ করা এক প্রকার অসম্ভব। তার উপর প্রতিদিন অপচনশীল পলিথিন সেখানে পড়ে এই পুরুত্ব বাড়িয়ে চলেছে। এর ফলে বুড়িগঙ্গা তার স্বাভাবিক নাব্য হারিয়ে ফেলেছে। অন্যান্য নদ-নদীগুলোর অবস্থাও একই। দখল-দূষণের মাধ্যমে নদ-নদীকে কীভাবে হত্যা করা হয়, তার নজির বিশ্বের আর কোথাও আছে বলে আমাদের জানা নেই।

নদ-নদীর দখল-দূষণ নিয়ে অনেক লেখালেখি হয়েছে এবং বিশেষজ্ঞরা তা রক্ষায় অনেক পরামর্শও দিয়েছেন। এসব লেখালেখি ও পরামর্শ সরকার যে খুব গুরুত্ব দিয়ে আমলে নিচ্ছে, তা তার সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমে বোঝা যাচ্ছে না। অবশ্য প্রতিষ্ঠানগুলো যদি গুরুত্ব দিয়ে কাজ করত, তবে তা দৃশ্যমান হতো। ঢাকার চারপাশের নদ-নদীতে যে ১৮৫টি বর্জ্যরে উৎসমুখ রয়েছে বিগত ১০ বছরে কেনা তা বন্ধ করা যায়নি, এর জবাব সরকার টাস্কফোর্সের কাছে চাইতে পারে। ১০ বছর আগে যদি উৎসমুখগুলো বন্ধ করা হতো, তবে নদ-নদীর দূষণ অনেকাংশে কমে যেত। এত শোচনীয় অবস্থায় উপনীত হতো না। আমরা মনে করি, নদ-নদী দূষণ রোধে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত পদক্ষেপ নেয়া জরুরী। দূষণ রোধে টাস্কফোর্স কেন ব্যর্থ হচ্ছে, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। যেসব শিল্প-কারখানা বর্জ্য শোধনাগার ছাড়া গড়ে উঠেছে এবং উৎপাদিত বিষাক্ত বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলছে সেগুলোর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। প্রয়োজনে শিল্প-কারখানা সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিতে হবে। রাজধানীর চারপাশের নদ-নদী বাঁচাতে সরকারকে আলাদাভাবে বৃহৎ প্রকল্প হাতে নিতে হবে। বিচ্ছিন্ন কিছু পদক্ষেপ নিয়ে তা বাঁচানো যাবে না।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

গত ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন