ঢাকা, বুধবার ২৪ জুলাই ২০১৯, ০৯ শ্রাবণ ১৪২৬, ২০ যিলক্বদ ১৪৪০ হিজরী।

সম্পাদকীয়

পর্যটনকে বিশ্বব্যাপী ব্র্যান্ডিং করতে হবে

| প্রকাশের সময় : ১৩ জুলাই, ২০১৯, ১২:০৫ এএম

পর্যটন নগরী হিসেবে রাজধানী ঢাকার ইতিহাস-ঐতিহ্যের গুরুত্ব শত শত বছর ধরে রয়েছে। বিশেষ করে মুঘল আমলা থেকে শুরু করে এই সময়ের ইসলামী স্থাপত্যকলা, স্থান, পরিবেশের কারণে সারাবিশ্বের পর্যটকদের জন্য ঢাকা অন্যতম আকর্ষণীয় স্থান হিসেবে পরিগণিত। রাজধানীর এই বিশেষত্বের কারণে ওআইসি কর্তৃক গত বছর ঢাকাকে ওআইসি সিটি অব ট্যুরিজম-২০১৯ হিসেবে নির্বাচন করা হয়। ওআইসিভুক্ত চার দেশের সঙ্গে প্রতিদ্ব›িদ্বতা করে ঢাকা শীর্ষস্থান দখল করে। গত বছরের ৫ ও ৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় অনুষ্ঠিত ওআইসি’র পর্যটন মন্ত্রীদের দশম সম্মেলনে এ নির্বাচন হয়। সম্মেলনে বাংলাদেশের নিকটতম প্রতিদ্ব›দ্বী আজারবাইজানের গাবালাকে ২০২০ সালের সিটি অব ট্যুরিজম ঘোষণা করা হয়। গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর একটি হোটেলে ঢাকা দ্য ওআইসি সিটি অব ট্যুরিজম-২০১৯ উদযাপন উপলক্ষে দুইদিন ব্যাপী অনুষ্ঠানের উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঢাকাকে ইসলামী পর্যটনের ‘বিশ্ব বাণিজ্য ব্র্যান্ড’ হিসেবে পরিণত করার আহ্বান জানান। তিনি এর গুরুত্ব তুলে ধরে বলেছেন, ইসলামী পর্যটনকে বিশ্ব বাণিজ্য ব্র্যান্ড হিসেবে বিকশিত করার জন্য দ্রæত ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। এর বাজার বার্ষিক ৮.৩ শতাংশ হারে বেড়ে ২০২১ সাল নাগাদ ২৪৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছবে। তিনি আন্তঃ ওআইসি পর্যটক বৃদ্ধির লক্ষ্যে সংস্থাটির সদস্যভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে ভিসা সহজীকরণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং পর্যটনকেন্দ্রিক খাতগুলোর মানোন্নয়নে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।

উপমহাদেশে মুসলমানদের সভ্যতা ও বিকাশের ক্ষেত্রে ঢাকার ইতিহাস ও ঐতিহ্য চারশ’ বছরেরও বেশি। ঢাকার প্রাচীন ও আধুনিক যুগের স্থাপত্য শৈলীর ব্যাপক বিস্তার থেকেই তার সাক্ষ্য পাওয়া যায়। শত শত বছরের পুরনো মুসলিম স্থাপত্যকীর্তি এখনো সগৌরবে টিকে আছে। আহসান মঞ্জিল, লালবাগ কেল্লা, কার্জন হল, সলিমুল্লাহ মুসলিম হল, সোনারগাঁওয়ের পানাম নগরীসহ অন্যান্য স্থাপত্যশৈলী মুসলমানদের ইতিহাস-ঐতিহ্য বহন করে চলেছে। আধুনিক যুগে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররম-যা পবিত্র কাবা শরীফের অনুকরণে তৈরি করা হয়েছে। এছাড়া আরও অসংখ্য মসজিদ অনন্য স্থাপত্য কারুকাজ নিয়ে নির্মিত হয়েছে। ঢাকাকে বলা হয় মসজিদের শহর। বিশ্বে এমন নগরী খুব কমই রয়েছে যেখানে এত সংখ্যক মসজিদ রয়েছে। এসব মসজিদের মধ্যে অনিন্দ্যসুন্দর স্থাপত্যশৈলী নিয়ে নির্মিত হয়েছে। যে কোনো পর্যটকদের তা সহজে আকর্ষণ করে। শুধু রাজধানী ঢাকা নয়, অন্যান্য শহর থেকে শুরু করে দেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে আছে মুসলমানদের স্থাপত্যর্কীতি। এসব স্থাপত্যর্কীতি যদি যথাযথভাবে সংরক্ষণ করে এগুলো দেখার জন্য পর্যটকদের যাতায়াতের ব্যবস্থা সহজ ও সুগম করে তোলা যায়, তবে পর্যটন খাতটি যেমন সমৃদ্ধ হবে, তেমনি আয়ও বৃদ্ধি পাবে। সবচেয়ে বড় কথা, বাংলাদেশ যে ইসলাম ও মুসলমানদের অন্যতম পীঠস্থান এ বিষয়টি বিশ্ব দরবারে আরও অধিক পরিচিতি লাভ করবে। দুঃখের বিষয় হচ্ছে, পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধার অভাবে যে পর্যটন খাতটি হতে পারত অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে অন্যতম মাধ্যম তা থেকে অনেক পিছিয়ে রয়েছে। আমরা যদি পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর দিকে তাকাই তাহলে দেখব এক পর্যটন খাত থেকেই দেশগুলো বিশাল অংকের অর্থ উপার্জন করছে। ভারত ট্যুরিজম থেকে আয় করছে বছরে ২৪০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা দেশটির জিডিপিতে ৯.২ শতাংশ যোগান দিচ্ছে। মুসলমান দেশ হিসেবে পাকিস্তানে ট্যুরিজম খাত থেকে আয় করছে ৩২৮.৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা দেশটির জিডিপিতে যোগান দিচ্ছে ২.৮ শতাংশ। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মুসলমান দেশ ইন্দোনেশিয়া বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে দ্রæত গতির ট্যুরিস্ট দেশের মধ্যে ৯ নম্বর স্থানে রয়েছে। দেশটি এ খাত থেকে ৮.৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। ট্যুরিজমকে দেশটি ব্র্যান্ডিং করেছে। মুসলিম অধ্যুষিত ছোট্ট দেশ মালদ্বীপের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক খাতই হচ্ছে ট্যুরিজম। এ খাতটি হয়ে উঠেছে দেশটির কর্মসংস্থানের প্রধান উৎস। এসব দেশের তুলনায় ট্যুরিজমের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বেশ পিছিয়ে রয়েছে। এর অন্যতম কারণ এ খাতটিতে গুরুত্বের অভাব। যেখানে উন্নত বিশ্বের দেশগুলো ট্যুরিজমকে ব্র্যান্ডিং করছে এবং অকর্ষণীয় শিরোনাম দিয়ে বিদেশি চ্যানেলগুলোতে তাদের বিজ্ঞাপন দিচ্ছে, সেখানে আমাদের দেশ অনেক পিছিয়ে রয়েছে। দেশের সম্মান এবং বিশ্বব্যাপী পরিচিতি পেতে ট্যুরিজম যে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারে, এ বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ গুরুত্ব দিয়ে অনুধাবন করছে বলে মনে হয় না। এ প্রেক্ষাপটে, ওআইসি কর্তৃক সিটি অব ট্যুরিজম হিসেবে ঢাকার ঠাঁই পাওয়া দেশের জন্য অনেক বড় একটি অর্জন।

আমরা অর্থনীতি থেকে শুরু করে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বেশ কিছু অর্জন ও ব্র্যান্ডিংয়ের সুযোগ লাভ করলেও সেগুলো যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারছি না। কার্যকর উদ্যোগ ও পদক্ষেপের অভাবে তা এক সময় অপসৃয়মান হয়ে পড়ে। ওআইসি কর্তৃক ইসলামি পর্যটনের যে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে, তা অনেক বড় সার্টিফিকেট। এখন এই সার্টিফিকেট ধরে রাখতে হলে আমাদের পর্যটন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, সর্বোপরি সরকারকে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করতে হবে। পর্যটনের ক্ষেত্রে কোথায় কি সমস্যা তা শনাক্ত ও দূর করে পর্যটকদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির উদ্যোগ নিতে হবে। পর্যটনকে ব্র্যান্ডিং করে সারাবিশ্বে উপস্থাপন করতে হবে। ঢাকাকে যে সিটি অব ট্যুরিজম ঘোষণা করা হয়েছে, এর সার্থকতা প্রমাণে বিভিন্ন স্থাপত্যকীর্তিগুলোর যথাযথ সংরক্ষণ এবং সেসব স্থানে যাতায়াত ব্যবস্থা সহজ করে গড়ে তোলা দরকার। যেসব হোটেল-মোটেল গড়ে উঠেছে সেগুলো সংস্কারের মাধ্যমে মানসম্পন্ন পরিবেশ সৃষ্টি এবং পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। ওআইসি যে স্বীকৃতি দিয়েছে তা সার্টিফিকেট সর্বস্ব হলে চলবে না। দেশের পর্যটনকে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরতে ব্যাপক প্রচারণা এবং সরকারের বিভিন্ন দলিল-দস্তাবেজ, চিঠি-পত্র, ফাইলে পর্যটনের বিষয়টি তুলে ধরে ব্র্যান্ডিংয়ের কাজটিকে এগিয়ে নিতে হবে। উন্নয়নের মাধ্যমে পর্যটন শিল্পকে একটি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক খাতে পরিণত করতে হবে।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

গত ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন