ঢাকা, বুধবার, ২১ আগস্ট ২০১৯, ০৬ ভাদ্র ১৪২৬, ১৯ যিলহজ ১৪৪০ হিজরী।

জাতীয় সংবাদ

থানায় বেওয়ারিশ মামলা

হাঁফ ছেড়ে বাঁচল দুদক কোনো অভিভাবক নেই ৭ হাজার মামলার

সাঈদ আহমেদ | প্রকাশের সময় : ১৬ জুলাই, ২০১৯, ১২:০৪ এএম

শত শত কোটি টাকা আত্মসাৎ, প্রতারণা ও জালিয়াতি সংক্রান্ত ৭ হাজার মামলার কোনো অভিভাবক নেই। মামলাগুলোর আঁতুড়ঘর দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক)। আইন সংশোধনের পর যেনতেন প্রকারে মামলাগুলো ‘নিষ্পত্তি’ দেখিয়ে হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। দায় চাপিয়ে দিয়েছে পুলিশের ঘাড়ে। অথচ পুলিশও মামলাগুলো নিষ্পত্তি করছে না। বছরের পর বছর অতিবাহিত হলেও অনেকটা লাওয়ারিশের মতো ‘তদন্তাধীন’ হিসেবে ফেলে রাখা হয়েছে থানার রেকর্ড রুমে। কোনো কোনো মামলা তদন্ত ছাড়াই নিষ্পত্তি করা হচ্ছে একতরফাভাবে। এতে ভুক্তভোগী কোনো প্রতিকার পাচ্ছেন না। তেমনি ফেরত পাচ্ছে না প্রতারণামূলকভাবে হাতিয়ে নেয়া অর্থও।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামানের মতে, দুদক আইন সংশোধনীর ফলে হয়তো দুদকের ওপর চাপ কমেছে। দায় চেপেছে পুলিশের ওপর। তবে দুদকের উচিত ছিল থানা পুলিশের হাতে চলে যাওয়া মামলাগুলো কোনো একটি প্রক্রিয়ায় মনিটর করা। কারণ, এতে সাধারণ মানুষের স্বার্থ রয়েছে। দুদকের এখতিয়ারবহির্ভূত হলেও এগুলো বেসরকারি ব্যক্তিগত পর্যায়ে এগুলোও বড় দুর্নীতি। আইনি এখতিয়ার হারালেও দুদকের হাতে মামলাগুলোর মনিটরিং কিংবা ন্যূনতম একটা অভিভাবকত্ব থাকা দরকার।

কেস স্টাডি (এক) : দ্বিগুণ মুনাফার লোভ দেখিয়ে ৫ লাখ গ্রাহকের কাছ থেকে ৩ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেয় আইডিয়াল কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেড (আইসিএল)। হজ আমানত, ডিপিএস, মাসিক মুনাফা, দ্বিগুণ বৃদ্ধি আমানত, শিক্ষা আমানত, আবাসন আমানত, ব্যবসায়িক আমানত, দেনমোহর আমানত, কোটিপতি ডিপোজিট স্কিম, লাখপতি ডিপোজিট স্কিমসহ চটকদার প্রকল্পের নামে অর্থ হাতিয়ে নেন প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান শফিকুল ইসলামসহ অন্যরা। গণমাধ্যমে এ নিয়ে ব্যাপক লেখালেখি হলে দুর্নীতি দমন কমিশন বিষয়টি আমলে নেয়। কমিশনের সংশ্লিষ্ট ধারায় অনুসন্ধান শুরু হয়। গঠিত হয় ৫ সদস্যের তদন্ত টিমও। উপ-পরিচালক নাসিরউদ্দিনের নেতৃত্বে এ টিম টানা ৩ বছর অনুসন্ধান চালায়। অনুসন্ধান প্রক্রিয়ায় প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক শফিকুর রহমান, তার স্ত্রী কাজী সামসুন নাহার মিনা, পরিচালক কাজী ফখরুল ইসলাম, শেখ আহমেদ এবং এস এম মোর্শেদ জুয়েলকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। জব্দ করা হয় তাদের মালিকানাধীন ১৩ প্রতিষ্ঠানের রেকর্ডপত্রও। তৎকালীন কমিশনের মৌখিক নির্দেশে ওই কর্মকর্তা কোনো কোনো ভুক্তভোগীর কিছু অর্থ আদায় করে দেন। এ পর্যায়ে প্রতারণা, আত্মসাৎ ও জালিয়াতির তদন্তের এখতিয়ার দুদক থেকে পুলিশের হাতে চলে গেলে ‘অনুসন্ধান’টি ‘মামলা’ হিসেবে চলে যায় থানায়। বর্তমানে বাড্ডা থানায় এটির তদন্ত চলছে বলে জানা গেছে। আইসিএলের কাছে অর্থ খোয়ানো লাখ লাখ ভুক্তভোগী কোনো প্রতীকার পাচ্ছেন না।

কেস স্টাডি (দুই) : প্রবাসী শ্রমিকদের প্রায় দেড় কোটি টাকা হাতিয়ে পালিয়ে আসেন সিলেট সুনামগঞ্জ গোলাম কিবরিয়ার ছেলে শিরতাজ আহমেদ। তিনি সৌদি আরবের খামিছ এলাকায় বাংলাদেশি শ্রমিকদের নিয়ে ‘ডায়নামিক মিশন লি.’ নামে সমিতি গড়ে তোলেন। দ্বিগুণ লভ্যাংশ দেয়ার কথা বলে সমিতির সদস্য ২৮ শ্রমিকের কাছ থেকে জনপ্রতি ৫ লাখ টাকা করে ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা নিয়ে তিনি দেশে পালিয়ে আসেন। ২০১৫ সালের নভেম্বরে ঘটনাটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত হয়। দুর্নীতি দমন কমিশন বিষয়টি ‘অভিযোগ’ হিসেবে আমলে নেয়। ফৌজদারি দন্ডবিধির ৪২০ ধারাসহ সংশ্লিষ্ট তিনটি ধারায় অনুসন্ধান শুরু করে। কর্মকর্তা ছিলেন তৎকালীন সহকারী পরিচালক মাসুদুর রহমান। কোনো অভিযোগকারী না থাকায় মামলাটির কোনো বাদীও নেই। দুদক নিজেই এটির বাদী। দুদক বাদী এ মামলাটি এখন পড়ে আছে সুনামগঞ্জ সদর থানায়। যেসব প্রবাসী শ্রমিকের অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে তারা কোনো প্রতিকারই পাচ্ছেন না। ২০১৫ সালে ‘দুর্নীতি দমন কমিশন আইন-২০০৪’ সংশোধন হওয়ার পর ব্যক্তি পর্যায়ের প্রতারণা, আত্মসাৎ এবং জালিয়াতি তদন্তের এখতিয়ার হারায় দুদক। দায়িত্ব চলে যায় পুলিশের কাছে। ফলে দুদকে শুরু হওয়া ‘অনুসন্ধান’টি থানা পুলিশের কাছে এখন ‘তদন্তাধীন’ অবস্থায় পড়ে আছে। সরাসরি কোনো বাদী না থাকায় এগুলো নিষ্পত্তির কোনো তাগিদও নেই।

থানায় পড়ে থাকা প্রায় ৭ হাজার আত্মসাৎ, প্রতারণা ও জালিয়াতির মামলার প্রেক্ষাপটগুলো এরকমই। ঘটনা ভয়াবহ। অথচ সে অনুযায়ী নেই আইনি তৎপরতা। ফলে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিলেও আত্মসাৎকারীরা পাচ্ছেন এক ধরনের আইনি সুরক্ষা।

রাজধানীর কয়েকটি থানায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দুর্নীতি দমন কমিশন থেকে আসা মামলাগুলোর বেশির ভাগই পড়ে আছে ‘অনিষ্পন্ন’ অবস্থায়। ফাইনাল রিপোর্ট দেয়ার মধ্য দিয়ে কিছু মামলা নিষ্পত্তিও হয়েছে। এসব ‘নিষ্পত্তি’ সম্পন্ন হয়েছে বলতে গেলে একতরফা। যারা ভুক্তভোগী তারা মামলাগুলোর বাদী নন। এ হিসেবে এখন দুদকই বাদী। কিন্তু আইনগত এখতিয়ার না থাকায় দুদক এ বিষয়ে কোনো ধরনের তদারকিতেও নেই। ফলে থানা পুলিশের এখতিয়ারে থাকা দুদকের এ মামলাগুলোর পরিণতিও জানে না কেউ।

রাজধানীর উত্তরখান থানার ওসি মো. হেলালউদ্দিন (সাবেক ওসি, তদন্ত, ধানমন্ডি থানা) এ প্রতিবেদককে জানান, দুদকের মামলা নিষ্পত্তি হচ্ছে না এটি ঠিক নয়। আমরা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিষ্পত্তির চেষ্টা করছি। জনবল সঙ্কট রয়েছে। তথাপি দুদক থেকে আসা কিছু কিছু মামলা আমার দায়িত্বকালে নিষ্পত্তি হয়েছে। এগুলোর বেশির ভাগের বাদীর খোঁজ নেই। বাধ্য হয়ে একতরফাভাবে নিষ্পত্তি করতে হয়েছে। কলাবাগান থানার পরিদর্শক (তদন্ত) সমীরচন্দ্র সূত্রধর বলেন, আমি দুদকের ১৮টি মামলা পেয়েছি। এর মধ্য থেকে গুরুত্বপূর্ণ ৫টি মামলা নিয়ে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজ করছি। এগুলো শেষ করে বাকি ১৩ মামলায় হাত দেবো।

দুদক সূত্র জানায়, ২০১৩ সালে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন-২০০৪ এর সংশোধনীতে ফৌজদারি দন্ডবিধির ৪০৮/৪২০/৪৬২ক/৪৬২খ/৪৬৬/৪৬৭/৪৬৮/৪৬৯/৪৭১ এবং ৭৭ক ধারা দুদকের তফসিলভুক্ত করা হয়। ফলে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী, কেরানি, নিরাপত্তা প্রহরী, গৃহপরিচারক কর্তৃক অপরাধজনিত বিশ্বাস ভঙ্গ, মিথ্যা পরিচয় প্রদান, প্রতারণা এবং জাল-জালিয়াতির অভিযোগে দায়ের হওয়া মামলাগুলো তদন্তের জন্য চলে আসে দুদকে। ফলে কয়েক মাসের মধ্যে মামলাজট সৃষ্টি হয় সংস্থাটিতে। সীমিত জনবলের কারণে দুদকের অন্যান্য অভিযোগের অনুসন্ধান ও মামলার তদন্তের স্থবিরতা দেখা দেয়। অচলাবস্থা নিরসনে দুদক ২০১৪ সাল থেকেই এগুলো তফসিল থেকে বাদ দেয়ার অনুরোধ জানিয়ে আসছে। এরই ফলশ্রুতিতে ২০১৬ সালের ৯ জুন ‘দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) বিল-২০১৬’ পাস হয়। এতে সরকারি স্বার্থ নেই- এমন ব্যক্তি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতারণা, অর্থ আত্মসাৎ ও জালিয়াতির মতো ঘটনা তদন্তের এখতিয়ার চলে যায় পুলিশের হাতে। দুদকের হাতে থাকে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের প্রতারণা, আত্মসাৎ ও জালিয়াতি তদন্তের এখতিয়ার। আইন পাসের পর দুদকে চলমান, কিন্তু এখতিয়ারবহির্ভূত অনুসন্ধান ও তদন্তগুলো পাঠিয়ে দেয়া হয় পুলিশের হাতে।

দুদক সচিব দিলোয়ার বখত এ প্রতিবেদককে বলেন, আইন সংশোধন হওয়ার পর কমিশনের এখতিয়ারবহির্ভূত আত্মসাৎ, প্রতারণা ও জালিয়াতির মামলাগুলো যার কাছে যে অবস্থায় আছে সে অবস্থায়ই ‘স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিসমাপ্তি ঘটেছে’ মর্মে আদেশ জারি করা হয়েছে। পরিসমাপ্ত মামলাগুলো পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে সংশ্লিষ্ট থানায়। আমরা মামলাগুলোর কোনো পরিসংখ্যান রাখিনি। তবে ৭ হাজারের কম নয়। পরবর্তীতে মামলাগুলোর কী পরিণতি হয়েছে- সেই খোঁজ রাখাও আমাদের এখতিয়ারবহির্ভূত।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

গত ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন