ঢাকা, সোমবার, ১৯ আগস্ট ২০১৯, ০৪ ভাদ্র ১৪২৬, ১৭ যিলহজ ১৪৪০ হিজরী।

সম্পাদকীয়

বিনাবিচারে সাজাভোগের সংস্কৃতি বদলাতে হবে

| প্রকাশের সময় : ১৮ জুলাই, ২০১৯, ১২:০৫ এএম

রাষ্ট্রপতির সাধারণ ক্ষমা লাভের পরও ১০ বছর জেল খেটে অবশেষে সুপ্রীম কোর্টের লিগ্যাল এইড কমিটির আবেদনের প্রেক্ষিতে মুক্তি পেয়েছেন জামালপুরের সরিষাবাড়ি উপজেলার পাখিমারা গ্রামের স্কুলশিক্ষক আজমত আলী(৭৪)। ১৯৮৭ সালের একটি হত্যা মামলায় অভিযুক্ত হয়ে নিম্ন আদালতে যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত হওয়ার পর স্কুলশিক্ষক আজমত আলী প্রথমত: ন্যায়বিচারের জন্য উচ্চ আদালতে আপীল করেন, অন্যদিকে রাষ্ট্রপতির সাধারণ ক্ষমার জন্যও আবেদন করেন। ১৯৯৬ সালে তিনি রাষ্ট্রপতির সাধারণ ক্ষমায় কারামুক্ত হওয়ার পর ২০০৫ সালে হাইকোর্টের রায়েও খালাস পান আজমত। কিন্তু রাষ্ট্রপক্ষের একটি লিভ টু আপীলে নিম্ন আদালতে হাজিরের নির্দেশ দিলে ২০০৯ সালের অক্টোবর পুনরায় গ্রেফতার হয়ে কারাভোগ করতে থাকেন আজমত। অথচ রাষ্ট্রপতির সাধারণ ক্ষমার পর তার আর জেলে থাকার কোনো কারণ ছিল না। রাষ্ট্রপতির ক্ষমা পাওয়ার পরও জীবনের মূল্যবান ১০ বছর জেলে কাটাতে হল স্কুল শিক্ষক আজমতকে। দেশের কারাগারগুলোতে এমন হাজার হাজার আজমতরা বৈধ আইনগত ভিত্তি ছাড়াই বছরের পর বছর ধরে জেল খাটছে। আজমতের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগে মামলাসহ আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলেও কোনো অভিযোগ বা তথ্য প্রমান ছাড়া অথবা পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট বিভাগের ভুলের কারণে অসংখ্য মানুষকে বছরের পর বছর ধরে অন্যায়ভাবে জেলে থাকতে হচ্ছে।

রাষ্ট্রপতির সাধারণ ক্ষমার ১০ বছর পরও আজমত মুক্তি না পাওয়ায় লিগ্যাল এইড কমিটি সুপ্রীম কোর্টে আবেদন করেছিল বলেই আজমত মুক্তি পেলেন। তা নাহলে তাঁকে হয়তো আমৃত্যু জেলখানায়ই কাঁটাতে হত। ভুল মামলা ও দুদকের তদন্তে মিথ্যা তথ্যের কারণে ৩ বছর আটক রাখার পর গণমাধ্যম ও উচ্চ আদালতের কল্যাণে নির্দোষ যুবক জাহালম মুক্তি পাওয়ার পর সমাজে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হলেও দেশের আদালতগুলোতে এমন হয়তো আরো অসংখ্য মানুষ বিনা বিচারে ও ভুল মামলায় সাজা ভোগ করছে। শুধুমাত্র আইনগত প্রক্রিয়ার অস্বচ্ছতা, পুলিশি তদন্তে গাফিলতি, অহেতুক দীর্ঘসুত্রিতা এবং বিচার প্রক্রিয়ায় আস্বাভাবিক সময় ক্ষেপণের কারণে বিনাদোষেই অসংখ্য মানুষের মহামূল্যবান সময় জেলখানার অন্ধকারে শেষ হয়ে যাওয়ার এই বাস্তবতা পরিবর্তনে সরকারের বিশেষ উদ্যোগ ও সদিচ্ছা প্রয়োজন। বিচার বিভাগের সংশ্লিষ্টদের কর্মকান্ডে স্বচ্ছতা, গতিশীলতা ও সমন্বয়হীনতার কথা বলা হচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে। অথচ স্বচ্ছতা, গতিশীলতা ও সমন্বয়হীনতা দূর করার কোনো কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। বিচার পাওয়া রাষ্ট্রের কাছে নাগরিকদের অন্যতম মৌলিক অধিকার। একদিকে বিচার বিভাগের অস্বচ্ছতা ও সমন্বয়হীনতার কারণে মানুষ ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, অন্যদিকে অভিযুক্ত হওয়ার পর অসহায় ও অতি দরিদ্র মানুষ আইনজীবী নিয়োগসহ বিচারিক প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে না পারার কারণেও অনেক মানুষ বছরের পর বছর ধরে বিনা বিচারে জেল খাটছে। লিগ্যাল এইড কমিটির সহায়তায় সিপন নামে এক ব্যক্তি ১৮ বছর জেলে থাকার পর মুক্তির খবর প্রকাশিত হয়েছিল।

দেশের কারাগারগুলোতে ধারণ ক্ষমতার চেয়ে দ্বিগুণের বেশি বন্দি রয়েছে বলে জানা যায়। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, এসব বন্দির দুই তৃতীয়াংশই বিনা বিচারে বা রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলায় আটক হয়েছে। একশ্রেনীর মানুষ রাজনৈতিক প্রভাব খাঁটিয়ে প্রকাশ্য দিবালোকে নানা ধরণের অপরাধ সংঘটিত করেও পার পেয়ে যাচ্ছে। আরেক শ্রেণীর মানুষ রাজনৈতিক ভিন্ন মতের কারণে অথবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভুল বা স্বেচ্ছাচারিতার কারণে জেল খেটে মরছে। বিচারিক প্রক্রিয়ায় অস্বচ্ছতা, দীর্ঘসুত্রিতা ও সমন্বয়হীনতার কারণে দেশের আদালতগুলোতে মামলার জট বেড়েই চলেছে। বর্তমানে ৩৩ লক্ষাধিক মামলা অমিমাংসিত রয়েছে বলে জানা যায়। বিচারপ্রক্রিয়ার বর্তমান অবস্থা অব্যাহত থাকলে এই মামলার জট কখনোই সহনীয় মাত্রায় কমিয়ে আনা সম্ভব নয়। ‘জাস্টিস ডিলেইড, জাস্টিস ডিনাইড’, মামলার কার্যক্রমে অস্বাভাবিক সময় ক্ষেপন হলে সুবিচার থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা অনেক বেশি। আমাদের দেশের দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলার বাদি-বিবাদিরা এভাবেই সুবিচার বঞ্চিত হচ্ছেন। লাখ লাখ মামলাজটে লাখ লাখ মানুষ আইনগত হয়রানি ও অবিচারের সম্মুখীন। সুপ্রীম কোর্টের লিগ্যাল এইড কমিটির কিছু বিচ্ছিন্ন পদক্ষেপে দু’একজন জাহালম, সিপন বা আজমত মুক্তি পেলেও, তাদের জীবনে ঘটে যাওয়া ট্রাজেডির খবর মানুষ জানতে পারলেও অসংখ্য মানুষের কাহিনী কেউ জানতে পারছে না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও দুদকের মত সাংবিধানিক সংস্থার দায়িত্ব হচ্ছে, জননিরাপত্তা ও দুর্নীতি-অস্বচ্ছতার বিরুদ্ধে সুবিচার নিশ্চিত করা। কিন্তু সরিষার মধ্যে ভুত থাকলে ভুত তাড়ানোর বিকল্প উপায় খুঁজে বের করার দায়িত্ব সরকারের। আজমত, জাহালম বা সিপনের মত যারা বছরের পর বছর ধরে বেআইনী প্রক্রিয়ায় জেল খাটছেন তাদের জীবনের মূল্যবান সময় ও পারিবারিক বঞ্চনার ক্ষতিপুরণ দেয়া হয়তো সম্ভব নয়। তবে এমনসব ভাগ্যাহত মানুষের পুর্নবাসন ও ক্ষতিপুরণের ব্যবস্থা করতে হবে। যাদের গাফিলতি, খামখেয়ালি ও ভুলের কারণে মানুষ বিচার বঞ্চিত হয়ে দুর্ভোগের শিকার হয়, তাদেরকে যথপোযুক্ত জবাবদিহিতা, শাস্তি ও অর্থদন্ডের আওতায় আনতে হবে।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন