ঢাকা, শুক্রবার, ২৩ আগস্ট ২০১৯, ০৮ ভাদ্র ১৪২৬, ২১ যিলহজ ১৪৪০ হিজরী।

সম্পাদকীয়

চতুর্থ শিল্প বিপ্লব এবং আমাদের ভাবনা

আফসানা রিজোয়ানা সুলতানা | প্রকাশের সময় : ১৯ জুলাই, ২০১৯, ১২:১৭ এএম

আঠারো শতকের শেষার্ধে শিল্পৎপাদনের ক্ষেত্রে ইংল্যান্ডে যে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সূচনা হয় তাই সাধারণভাবে শিল্প বিপ্লব নামে পরিচিত। শিল্প বিপ্লবের ফলে ইংল্যান্ড বিশ্বের প্রথম শিল্পোন্নত দেশে পরিণত হয় এবং দেশটি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দিক থেকে সামনে এগিয়ে যায়। তখন ইংল্যান্ডের শিল্পপণ্য পৃথিবীর সব দেশে রপ্তানি হতো। তাই ইংল্যান্ডকে বলা হতো পৃথিবীর কারখানা। 

পৃথিবীতে এখন পর্যন্ত ৩টি শিল্প বিপ্লব হয়েছে। প্রথম শিল্প বিপ্লব হয় ১৭৬০ সালে বাষ্পীয় ইঞ্জিন আবিষ্কারের মাধ্যমে যা উৎপাদন শিল্পের স¤প্রসারণ ঘটায়। দ্বিতীয় শিল্প বিপ্লবটি হয়েছে উনিশ শতকের শেষার্ধে এবং বিশ শতকের প্রথমার্ধে ১৮৭০ সালে বিদ্যুৎ আবিষ্কারের মাধ্যমে যা উৎপাদন শিল্পে আমূল পরিবর্তন আনে। তৃতীয়টি ১৯৬০ সালে তথ্য প্রযুক্তির উদ্ভবের কারণে। তার ফলে বিভিন্ন শিল্পে অভাবনীয় পরিবর্তন ঘটে। আমরা এখন চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছি। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবটি হবে মূলত ডিজিটাল বিপ্লব। তখন কল কারখানাগুলোতে ব্যাপক হারে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হবে। শুধু কলকারখানাই নয় যোগাযোগ ব্যবস্থায়ও আসবে আমূল পরিবর্তন। আগের শিল্প বিপ্লব গুলোর ক্ষেত্রে দেখা গেছে মানুষ যন্ত্রকে পরিচালনা করেছে। কিন্তু ৪র্থ বিপ্লবে যন্ত্রকে উন্নত করা হয়েছে। যার ফলে যন্ত্র নিজেই নিজেকে পরিচালনা করতে পারবে। এমনিতেই মানুষের থেকে যন্ত্রের ধারণ ক্ষমতা অনেক বেশি এবং যন্ত্র অনেক নিখুঁত ও দ্রæত কাজ করতে পারে।

কিন্তু সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি তা হল ৪র্থ শিল্প বিপ্লবের ফলে অনেক লোক তাদের কর্মসংস্থান হারাবে। মানুষের কাজ দখল করে নেবে উন্নত ধরনের মেশিন, রোবট ইত্যাদি। অটোমেশিনের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৩৮-৪৭%, জার্মানিতে ৩৫%, যুক্তরাজ্যে ৩০%, জাপানে ২১% লোকের চাকরি হারাবার সম্ভাবনা রয়েছে। ধারনা করা হচ্ছে ৪র্থ শিল্প বিপ্লবের ফলে বাংলাদেশে পোশাক শিল্পে ৬০%, আসবাবপত্র শিল্পে ৫৫%, প্রক্রিয়াজাত কৃষি পণ্য খাতে ৪০%, চামড়া ও জুতা শিল্পে ৩৫% এবং পর্যটন ও সেবা শিল্পে ২০% লোক কাজ হারাবে। ইতিমধ্যে বাংলাদেশে তৈরি পোষাক খাতে ৪৭% বৃহৎ ও ২৫% মাঝারি শিল্পে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হয়েছে।

পরিবর্তিত পরিস্থিতে একমাত্র তথ্যপ্রযুক্তি ও কারিগরি জ্ঞান সম্পন্ন ব্যক্তিরাই টিকে থাকবে। আমাদের দেশে কারিগরি দক্ষ জনবল মাত্র ১৪%। ভিন্ন এক মতে তা ৩৮%। কিন্তু উন্নত বিশ্বের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই সেখানে কারিগরি ভাবে দক্ষ জনগোষ্ঠী প্রায় ৬০%। তাই আমদের এখন থেকেই একটি সুপরিকল্পনার মাধ্যমে এগিয়ে যেতে হবে। দেশে কারিগরি দিক থেকে দক্ষ জনগোষ্ঠী গড়ে তুলতে হবে। জাতীয় পর্যায় প্রযুক্তিগত অবকাঠামো গড়ে তুলতে আমাদের গার্মেন্টস খাত শ্রম নির্ভর। তুলনামূলক সস্তা শ্রমের কারণে চীন তাদের দেশ থেকে কাঁচামাল আমাদের দেশে পাঠিয়ে দেয়। তারা এখন পোশাক খাতে রোবট কাজে লাগানোর পরিকল্পনা করছে। এটি বাস্তবায়ন হলে তারা আমাদের দেশে আর কাঁচামাল পাঠাবে না। ফলে আমাদের শ্রমিকরা এ খাতে তাদের কাজ হারাবে।

শুধু মাত্র আমাদের দক্ষ জনগোষ্ঠী নেই বলে আমাদের পোশাক শিল্পের প্রযুক্তিগত খাতে ২ লাখ বিদেশি নাগরিক কাজ করে। অবাক হই যখন দেখি প্রায় ১ কোটি শ্রমিক বিদেশে হাড় ভাঙ্গা পরিশ্রম করে আমাদের দেশে যে রেমিটেন্স পাঠায় আমার প্রায় তার অর্ধেকই তুলে দেই মাত্র ২ লাখ বিদেশিদের হাতে। আজ আমরা প্রযুক্তিগত ভাবে অনগ্রসর বলেই আমাদের এই অবস্থা।

আমাদের দেশে প্রতি বছর প্রচুর পরিমাণে মোবাইল ও কম্পিউটার আমদানি করা হয়। ব্যবসায়ীদের মতে দেশে তথ্য প্রযুক্তির হার্ডওয়্যার পণ্যের বাজার প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার। কিন্তু দুঃখের বিষয় তথ্য প্রযুক্তির বাজারে মাত্র ১ ভাগ আমাদের দখলে। বাকি সবটাই আমদানি নির্ভর। আমরা যদি এগুলো আমাদের দেশে উৎপাদন করে নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে বাহিরে রপ্তানি করতে পারি তাহলে আমরা প্রচুর পরিমাণে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারব। আমাদের হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যার সেক্টরে বিলিয়ন ডলার সম্ভাবনা তৈরি হবে।

তাই শুধু শিক্ষিত নয়, দেশে দক্ষ জনগোষ্ঠী গড়ে তোলার দিকে মনযোগ দিতে হবে। শুধুমাত্র দেশেই নয়, যারা বিদেশে কাজ করছে তাদেরকেও যথাযথ প্রশিক্ষণ দিয়ে বিদেশে পাঠাতে হবে। বিদেশে আমাদের ১ কোটি শ্রমিক আয় করেন ১৫ বিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে ভারতের ১ কোটি ৩০ লাখ শ্রমিক আয় করেন ৬৮ বিলিয়ন ডলার। কর্মক্ষেত্রে আমাদের শ্রমিকদের অদক্ষতাই তাদের আয়ের ক্ষেত্রে এই বিরাট ব্যবধানের কারণ।

সঙ্গত কারণেই আমাদের উচিত কারিগরি শিক্ষার উপর জোর দেয়া। কারণ আগামীতে বেশির ভাগ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে শিল্প কল কারখানাগুলোকে কেন্দ্র করে। আর যে দেশ শিল্পায়নে যত বেশি অগ্রসর সে দেশ তত বেশি উন্নত। আমরা যদি সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে না পারি তাহলে অবশ্যম্ভাবীভাবে আমাদের পিছিয়ে পড়তে হবে।
লেখক: শিক্ষার্থী, কৃষি অনুষদ, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

 

 

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন