ঢাকা, সোমবার, ১৯ আগস্ট ২০১৯, ০৪ ভাদ্র ১৪২৬, ১৭ যিলহজ ১৪৪০ হিজরী।

জাতীয় সংবাদ

উন্নয়নেও বসবাস জঘন্য

বৃষ্টি আর জোয়ারে চট্টগ্রাম ডুবছে বারবার

শফিউল আলম | প্রকাশের সময় : ২০ জুলাই, ২০১৯, ১২:০৪ এএম

এক. সবুজ পাহাড় টিলা বন-জঙ্গল নদ-নদী সাগর হ্রদ খাল-ছরা ঝরণা বিশাল দীঘি মাঠঘাট সমতল প্রান্তর। ভোরবেলা হরেক বুনো প্রাণী আর পাখ-পাখালির ডাকে মানুষের ঘুম ভাঙে। বর্ষাকালে যখন মুষলধারে বৃষ্টি নামে সেই বর্ষণের পানি পাহাড় টিলা সমতল বেয়ে খুব দ্রæত চাক্তাই খালসহ অন্তত ৫০টি খাল-ছরা দিয়ে খরস্রোতা লুসাই কন্যা কর্ণফুলী নদী হয়ে বঙ্গোপসাগরে নিষ্কাষণ হয়ে যায়।
প্রকৃতির আপন নিয়মের ফলেই কোথাও পানিবন্দী অবস্থা তৈরি হয় না। সড়ক রাস্তাঘাট ছিমছাম। নেই হরেক যানবাহনের জটিল কোনো জট। বন্দরনগরী চট্টগ্রামের এই ছিল পুরনো চিত্র। আর তখন বা তারও আগে থেকে চট্টগ্রামকে বলা হতো দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী।
দুই. চট্টগ্রামের ‘উপাধি’ দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী। আরও বলা হচ্ছে অর্থনৈতিক রাজধানী। তবে চট্টগ্রামের প্রতি ‘বিমাতাসুলভ আচরণ’ অবহেলা-অনাদরের প্রসঙ্গগুলো দফায় দফায় তুলে ধরে অনেক আগেই চট্টগ্রামে এক সেমিনারে মূল আলোচক দেশের খ্যাতনামা শিল্পপতি চাটগাঁর কৃতিসন্তান সাবেক মন্ত্রী এ এম জহিরুদ্দীন খান তীব্র ক্ষোভ-অসন্তোষের সাথেই বলেন, ‘চট্টগ্রাম আর আগের চট্টগ্রাম আছে নাকি! চট্টগ্রাম হয়ে গেছে ‘ছোট্ট-গ্রাম’। দিন দিন চট্টগ্রাম তার অতীত গৌরব, ঐতিহ্য ও গুরুত্ব হারিয়ে ফেলেছে। কী আছে চট্টগ্রামে! সরকারি আমলাদের সবধরনের সিদ্ধান্ত পেতে হলে এমনকি ছোটখাট বিষয়ের জন্যও রাজধানী ঢাকায় দৌঁড়াতে হয়। এ কারণে দেশের এবং বহুজাতিক কোম্পানিগুলোও এখান থেকে ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-কারখানার তল্পিতল্পা গুটিয়ে ঢাকায় চলে যাচ্ছে’।
তিন. প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বারে বারে চট্টগ্রামে ছুটে আসেন। তিনি নিজেই একাধিকবার বলে গেছেন, চট্টগ্রামের উন্নয়নের দায়িত্ব তিনি নিজ কাঁধেই নিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর আন্তরিকতা ও সদিচ্ছার ফলে বন্দরনগরীসহ বৃহত্তর চট্টগ্রামের উন্নয়নে প্রায় অর্ধশত প্রকল্প-গুচ্ছ প্রকল্প ও মেগাপ্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ চলছে। এরজন্য এক লাখ কোটি টাকারও বেশি বরাদ্দ দিয়েছে সরকার।
দেশের প্রথম টানেল কর্ণফুলী নদীর তলদেশে বঙ্গবন্ধু টানেল, মীরসরাই-সীতাকুন্ডে দেশের সর্ববৃহৎ বঙ্গবন্ধু শিল্পজোন, দোহাজারী-রামু-কক্সবাজার-ঘুনধুম রেললাইন, মহেশখালীর মাতারবাড়ীকে ঘিরে জ্বালানি কেন্দ্রসহ গভীর ও বহুমুখী সমুদ্রবন্দর, চট্টগ্রাম ওয়াসার পানি সরবরাহ সক্ষমতা বৃদ্ধি, সিটি আউটার রিংরোড, বায়জিদ থেকে ফৌজদারহাট সংযোগ সড়ক, জাইকার সহায়তায় পোর্ট কানেকটিং রোডসহ বিভিন্ন অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প, চট্টগ্রাম বন্দরের দক্ষতা ও সক্ষমতা বাড়াতে ভারী যান্ত্রিক সরঞ্জাম, কন্টেইনার ইয়ার্ড ও টার্মিনাল স্থাপন ইত্যাদি অনেক প্রকল্প চট্টগ্রামের উন্নয়নকে নিশ্চিতভাবে এগিয়ে দেবে এমনটি সরকারের আশাবাদ।
অন্যদিকে বিভিন্ন খাতে মেগা প্রকল্পসহ চলমান উন্নয়ন কার্যক্রম সত্তে¡ও দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী খ্যাত বন্দরনগরী চট্টগ্রাম জঘন্য বসবাসের শহুরে ঠিকানায় পরিণত হয়ে উঠেছে। ৬০ লাখ মানুষের পক্ষে দিন দিন বসবাসের অনুপযোগী হয়ে উঠেছে চট্টগ্রাম নগর। প্রাচ্যের রানী এখন শুধুই কষ্টের শহর। নাগরিকদের কষ্ট-দুর্ভোগ বহুমুখী। এরমধ্যে পানিবদ্ধতা, অসহ্য যানজট, বিশৃঙ্খল যান চলাচল, পাহাড়ধস, খাল-ছরা ও কর্ণফুলী নদীতে নির্বিচারে দখল আর দূষণ, খানাখন্দে ভরা প্রায় প্রতিটি সড়ক রাস্তাঘাট এমনকি অলিগলি ইত্যাদি সমস্যা-সঙ্কট প্রতিদিনই চট্টগ্রামবাসীকে ভোগাচ্ছে।
অপরিকল্পিত এবং সমন্বয়হীন উন্নয়নের কারণেই মূলত চট্টগ্রামে নাগরিক ভোগান্তি বেড়েই চলেছে একথা বলে আসছেন নগরবিদগণ। কিন্তু সংশ্লিষ্ট শীর্ষ কর্মকর্তারা তাদের সতর্কতাকে আদৌ আমলে নিচ্ছেন না। দেখা যাচ্ছে, সিডিএর সাবেক চেয়ারম্যান আবদুচ ছালামের সময়ে যথেচ্ছ অপরিকল্পিত ও যথাযথ সমীক্ষা ছাড়াই তৈরি নগরীর ফ্লাইওভারও বৃষ্টিতে পানিবন্দী ও অকেজো হয়ে পড়ছে। চালু হওয়ার আগেই মাটির নিচে ভেঙে ও ধসে গিয়ে পড়েছে কথিত ‘স্বপ্নের সিটি রিং রোড’ এবং পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতের টাইলস।
১২০ বর্গমাইল আয়তনের চট্টগ্রাম নগরী এক-দেড় দশক আগেও ছিল যথেষ্ট ছিমছাম পরিপাটি। কিন্তু চট্টগ্রাম মহানগরী জুড়ে অবৈধ দখলবাজি আর ধ্বংসের শেষটা চলছে পদে পদে। এরমধ্যে রয়েছে পাহাড় টিলা, গাছপালা, নদ-নদী, খাল-ছরা, বিশাল হ্রদ পুকুর-দীঘি, মাঠঘাট, নালা-নর্দমা, ফুটপাত পর্যন্ত গিলে খাচ্ছে দখলবাজরা। কিছুক্ষণ ধরে বৃষ্টিপাত আর জোয়ার হলেই নগরী ও আশপাল এলাকা ডুবে যাচ্ছে বার বার।
ভাঙাচোরা গর্তে ভরা সড়কে চলাফেরা দায়। চট্টগ্রামের জনগণকে ‘সেবাদানকারী’ সরকারি বেসরকারি আধাসরকারি ও স্বায়ত্বশাসিত বিভাগ, সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান রয়েছে ৩২টি। অথচ তাদের কাজেকর্মে নেই কোনো সমন্বয়। বরং আছে প্রকাশ্যে ও নেপথ্যে দ্ব›দ্ব আর রশিটানাটানি। চোখে পড়ে জোড়াতালি সমাধানের ব্যর্থ চেষ্টা। টেকসই উন্নয়নের উদ্যোগ ও সমন্বয়ের অভাব প্রকট। এ অবস্থায় চট্টগ্রামবাসী উন্নয়নের জোয়ার থেকে সুফল পাবে কবে কীভাবে? এই প্রশ্ন ঘুরেফিরে আলোচিত হচ্ছে চাটগাঁর নাগরিকমহলে।
পানিবদ্ধতাসহ চট্টগ্রামবাসীর ‘বারমাইস্যা সমস্যা’ প্রসঙ্গে সাদার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি বিশিষ্ট নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক প্রকৌশলী এম আলী আশরাফ গতকাল দৈনিক ইনকিলাবকে বলেন, চট্টগ্রাম নগরীর খালগুলো পুনরুদ্ধার ও পানিবদ্ধতা সমস্যা দূরীকরণে ২৮ এপ্রিল ২০১৮ সালে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) সরকারের সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ লাভ করে। চুড়ান্তভাবেই ও সময়মতো সিডিএ বরাদ্দ পায়। তবে তা কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে বাস্তবে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। কেননা এরমধ্যে সিডিএ সাড়ে ৮শ’ কোটি টাকা সরকারের কাছ থেকে ছাড় করে নিয়েছে।
অথচ এ সময়ের মধ্যে কাজ হয়েছে ৪শ’ ১৮ কোটি টাকার। চলতি জুলাই মাসে ঘোর বর্ষার মাঝেই খাল উদ্ধার কার্যক্রম শুরু করা হয়। তাছাড়া সিডিএর এ মেগাপ্রকল্পের মেয়াদ ২০২০ সাল পর্যন্ত। সময় আছে এক বছরের কিছু বেশি। তাহলে প্রধানমন্ত্রীর সদিচ্ছায় সিডিএকে দেয়া সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের বড় অংশ ফেরৎ যাবে? এরজন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ব্যবস্থাপনায় অদক্ষতা দায়ী বলে মনে করেন।
সরকারি সেবাদাতা সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এসব সংস্থাকে ডেকে নিয়ে সিটি মেয়র ইতোপূর্বে একাধিকবার সমন্বয় সভা করেছেন। যেহেতু কোনো সংস্থা বা বিভাগের কর্তাব্যক্তির ব্যর্থতার জন্য মেয়রের ব্যবস্থা নেয়ার ক্ষমতা রাখা হয়নি এ কারণে সমন্বয়ের চেষ্টাও কাজে আসছে না। বরং একেকটি বিভাগ মন্ত্রণালয়ের দিকেই তাকিয়ে থাকে। কেননা ক্ষমতা তো ঢাকায় কেন্দ্রীভূত হয়েই আছে।
এদিকে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, নাগরিক মহলের দাবি সিটি কর্পোরেশন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ), চট্টগ্রাম ওয়াসা, পরিবেশ অধিদপ্তর, বন্দর কর্তৃপক্ষ, জেলা প্রশাসনসহ সেবাদানকারী সরকারি সংস্থা ও বিভাগগুলোর সমন্বয় এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। বন্দরনগরীর প্রাণপ্রবাহ খাল-ছরাগুলো পুনরুদ্ধার ও পানিবদ্ধতা সমস্যা নিরসনের জন্য সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ, নগর পরিকল্পনাবিদদের সম্পৃক্ত করা জরুরি। অন্যথায় বাণিজ্যের আদিস্থান ও বন্দরনগরী চট্টগ্রাম বসবাসের আরও অযোগ্য হয়ে পড়বে। শিল্পায়ন, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ, ব্যবসা-বাণিজ্য, রাজস্ব আহরণসহ সবক্ষেত্রে ধীরে ধীরে নেমে আসবে বিপর্যয়।
বৃষ্টি ও জোয়ার মিলে চট্টগ্রামে পানিবদ্ধতা সমস্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাবে মর্মে সতর্ক করে বিশেষজ্ঞগণ চান টেকসই শহর রক্ষা বাঁধ। যা হতে হবে পরিকল্পিত, যথেষ্ট উঁচু এবং বাঁধ-সড়ক তথা মেরিন ড্রাইভওয়ে কাম এমব্যাঙ্কমেন্ট। সেখানে পর্যাপ্ত সংখ্যক ¯øুইচ গেট থাকলে অনায়াসে জোয়ার-ভাটার পানির স্বাভাবিক অপসারণ সম্ভব। নগরীর বেদখল ও হারিয়ে যাওয়া খাল-ছরা ভূমির দলিল-ম্যাপ-খতিয়ান (আর.এস, পি.এস, বি.এস) ইত্যাদি অনুসারেই পুনরুদ্ধারে কঠোর পদক্ষেপ এবং সংস্কার প্রয়োজন। এরফলে বর্ষণ ও জোয়ারের পানি প্রকৃতির আপন নিয়মে বঙ্গোপসাগরে নিষ্কাশিত হবে। কিছুটা হলেও চট্টগ্রাম ফিরে পাবে তার হারানো অতীত পরিবেশ-প্রকৃতি।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন