ঢাকা, মঙ্গলবার, ২০ আগস্ট ২০১৯, ০৫ ভাদ্র ১৪২৬, ১৮ যিলহজ ১৪৪০ হিজরী।

ধর্ম দর্শন

নামাজের নৈতিক, সাংস্কৃতিক ও ব্যবহারিক উপকারিতা

এ. কে. এম. ফজলুর রহমান মুন্শী | প্রকাশের সময় : ২৫ জুলাই, ২০১৯, ১২:০১ এএম

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

নামাজ হচ্ছে, মূলত: ঈমানের আস্বাদ, রূহের খাদ্য এবং অন্তরের শান্তি ও নিরাপত্তার উপকরণ এবং একই সাথে তা মুসলমানদের প্রতিবেশিক, আখলাকী, তামাদ্দুনী ও ব্যবহারিক জীবনের সামগ্রিক কর্মকান্ডের সক্রিয় হাতিয়ার। রাসূলুল্লাহ (সা:)-এর দ্বারা আখলাক, তামাদ্দুন ও ব্যবহারক জীবন-যাত্রার যত সব সংস্কার সাধিত হয়েছে এর বৃহত্তর অংশ নামাজের বদৌলতে হাসিল হয়েছে। এরই প্রভাব ও প্রতিক্রিয়ার দ্বারা ইসলাম এক বেদুঈন, বর্বর এবং অশিষ্ট দেশকে যার খাওয়া পরার নিয়মও জানা ছিল না, কয়েকটি বছরে আদব, শিষ্টাচার ও সভ্যতার শীর্ষতম চূড়ায় পৌঁছে দিয়েছিল এবং এখনো ইসলাম যখন আফ্রিকার অসভ্য বর্বর দেশসমূহে পৌঁছে যায়, তবে তা বাইরের শিক্ষা ছাড়াই শুধু ধর্মীয় প্রভাব দ্বারা ভদ্র ও সুসভ্য বনে যায়। তাছাড়া সুসভ্য জাতিসমূহের মাঝে যখন ইসলাম প্রবেশ করে, তখন তার লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও দৃষ্টিভঙ্গিকে বুলন্দ হতে বুলন্দতর অবস্থায় পৌঁছে দেয় এবং পবিত্র হতে পবিত্রতর জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত করে তোলে এবং তাদেরকে এখলাস ও আন্তরিকতার সেই শিক্ষা দান করে, যার দরুন ঐ সকল কাজ যা পূর্বে মৃক্তিকাবৎ ছিল তা পরশ পাথরে পরিণত হয়।

১। গাত্রাবরণ : নামাজের এসকল ব্যবহারিক জীবনযাত্রার উপকারীতাগুলোর মাঝে সবচেয়ে প্রাথমিক বস্তুু হচ্ছে দেহ আচ্ছাদিত করা। মানুষের লজ্জা ও সম্ভ্রমের হেফাজত ও নিরাপত্তার লক্ষ্যে স্বীয় দেহের বিভিন্ন অংশকে লুকিয়ে রাখা ও আচ্ছাদিত করা একান্ত দরকার। আরবের বেদুঈনরা এই সভ্যতা হতে অনবহিত ছিল। এমনকি শহরের বাসিন্দারাও এ ব্যাপারে ছিল উদাসীন। তাছাড়া অকুরায়শী মহিলারা যখন হজ্জের সময় আগমন করতো তখন তারা পরিধেয় বসন খুলে ফেলতো। অধিকাংশ মহিলাই উলঙ্গ হয়ে তাওয়াফ করত। ইসলাম আগমনের সাথে সাথে দেহাচ্ছাদনের প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরা হয়। এমনকি গাত্রাবরণ ছাড়া ইসলামের বিধান অনুসারে নামাজ আদায় করাও দুরস্ত নয়। এ প্রসঙ্গে কুরআনুল কারীমে ইরশাদ হচ্ছে :

অর্থাৎÑ“প্রত্যেক নামাজের সময় তোমরা কাপড় পরিধান কর।” (সূরা আ’রাফ) পুরুষের জন্য কম সে কম নাভী হতে হাঁটু পর্যন্ত এবং মহিলাদের জন্য কপাল হতে পা পর্যন্ত ঢেকে রাখা নামাজে অপরিহার্য করা হয়। এ শিক্ষা জাহেল এবং বর্বর আরবদেরকে এবং যেখানেই ইসলাম গমন করেছে সেখানকার উলঙ্গ বাসিন্দাদেরকে গাত্রাবরণ ধারণ করতে বাধ্য করেছে এবং নামাজের তাকিদ দ্বারা দিনে পাঁচবার তাদেরকে এই ফরজ সম্পর্কে অবহিত করে সব সময়ের জন্য তাদেরকে দেহ আচ্ছাদিতকরণে অভ্যস্ত করে তোলে। আফ্রিকা এবং হিন্দুস্থানের মুসলমান এবং অমুসলমানদের পোশাকের উপর একনজর তাকালে একথাটি বুঝা যাবে যে, ইসলাম সভ্যতার এই প্রাথমিক শিক্ষায় পৃথিবীকে কত বড় সাহায্য করেছে।

অপরদিকে বিশ্বের অপরাপর সুসভ্য জাতিসমূহ সৌন্দর্য ও পরিচ্ছন্নতা এবং রং ও আরামপ্রিয়তা এমন কি সভ্যতার অনিয়মচারিতার ফলে নির্লজ্জতার সমুদ্রে ঝাপ দেয়। পুরুষেরা হাঁটুর উপরে সংকীর্ণ পোশাক ও মহিলারা অর্ধ উলঙ্গ অথবা অত্যন্ত মিহি পোশাক পরিধান করে। নামাজ তাদের মাঝেও সংশোধন এনে দিয়েছে এবং সুসভ্য জাতিসমূহকে মধ্যম পন্থা অতিক্রম করার অনুমোদনও দেয়া হয়নি। এমনিভাবে মহিলাদেরকে খোশবু ব্যবহার করে মসজিদে গমন করতেও নিষেধ করেছে। লজ্জাহীনতার পোশাক পরিধান করতেও মহিলাদেরকে বারণ করা হয়েছে এবং সুস্পষ্টভাবে বলে দেয়া হয়েছে, গাত্রাবরণ ছাড়া নামাজ হতে পারে না।

২। পবিত্রতা : এরপর সভ্যতার দ্বিতীয় প্রাথমিক শিক্ষা হচ্ছে পবিত্রতা এবং পরিচ্ছন্নতা, যা ইসলামের প্রাথমিক আহকামের অন্তর্ভুক্ত। ইকরা অর্থাৎ ‘পাঠ কর’ নির্দেশের পর দ্বিতীয় অহী যা রাসূলুল্লাহ (সা:)-এর উপর নাজিল হয়েছিল। এতে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল :

অর্থাৎÑ “তোমার পরিধেয় বসনকে পবিত্র কর।” (সূরা মুদ্দাসসির : রুকু-১) সুতরাং ইসলাম এই পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতা নিয়ম নির্দিষ্ট করেছে এবং রাসূলুল্লাহ (সা:) স্বীয় শিক্ষা ও তালীম দ্বারা এর সীমা ও পরিমাণ নির্ধারিত করে দিয়েছেন। নামাজের সহীহ ও বিশুদ্ধতার জন্য এটাকে আবশ্যকীয় করেছেন যে, মানুষের শরীর, পরিধেয় বসন আর নামাজ আদায়ের স্থান নাপাকী ও অপবিত্রতা হতে পবিত্র হতে হবে। আরবদের মাঝে অন্যান্য বর্বর জাতিগুলোর মত পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতার প্রতি মোটেই খেয়াল ছিল না। এমনকি একজন বেদুঈন মসজিদে নবুবীতে এসে সবার সামনে বসে পেশাব করে দিল। সাহাবীগণ তাকে মারতে উদ্যত হলেন। রাসূলুল্লাহ (সা:) তাদের বারণ করেলন এবং সেই বেদুঈনকে নিজের কাছে ডেকে এনে অত্যন্ত মেহেরবাণীর সাথে বললেন, “এটা হচ্ছে নামাজের স্থান। এজাতীয় অপবিত্রতার জন্য এই স্থান উপযুক্ত নয়।” তারপর সাহাবীদের প্রতি লক্ষ্য করে বললেন, “এই নাপাকীর উপর পানি ঢেলে দাও।” একবার রাসূলুল্লাহ (সা:) একটি কবরের পাশ দিয়ে গমন করার সময় বললেন, এই কবরের বাসিন্দার উপর এজন্য আযাব হচ্ছে যে, সে পেশাবের ছিটে- ফোঁটা হতে পরহেজ করত না। মোটকথা, এই শিক্ষা যা কেবলমাত্র নামাজের জন্য ছিল, আরববাসী ও সাধারণ মুসলমানকে পাক-সাফ রাখার প্রতি অভ্যস্ত করে তোলে এবং এস্তেঞ্জা, পায়খানা ও পবিত্রতার ঐ সকল অনভিজ্ঞ। তিনি অপবিত্রতা হতে নিজের শরীর, কাপড় ও স্থানকে পরিষ্কার রাখার তালীম দিয়েছেন এবং সে সকল সাহাবী পবিত্রতার জন্য সর্বদাই প্রস্তুুত থাকতেন, আল্লাহপাক তাদের প্রশংসা করে ইরশাদ করেছেন, “এই মসজিদে কিছু লোক এমনও আছে, যারা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকতে ভালোবাসে এবং আল্লাহ পাক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অবলম্বনকারীদের ভালোবাসেন।: (সূরা তাওবাহ : রুকু-১৩)

৩। পবিত্রতার বাধ্য-বাধকতা : নামাজের তৃতীয় উপকারীতা হচ্ছে এই যে, তা মানুষকে নিজের দেহ এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে পাক ও পবিত্র রাখার উপর বাধ্য করেছে। দিনে অন্তত: পাঁচবার প্রত্যেক নামাজীকে মুখ, হাত এবং পা যা অধিকাংশ সময় খোলা থাকে, সেগুলো ধোয়ার প্রয়োজন পড়ে। নাকে পানি দিয়ে নাক সাফ করতে হয়। একজন বড় ডাক্তার আমাকে বলেছেন, বর্তমানকালের রোগজীবাণুর নিরীক্ষা-ধর্মী প্রজ্ঞার আলোকে জানা যায়, অনেক রোগ নাকের নি:শ্বাস-প্রশ্বাসের দ্বারা শরীরে প্রবেশ করে এবং এর দ্বারা রোগ সৃষ্টি হয়। তাই পানি দ্বারা নাসারন্ধকে ধুয়ে ফেললে সে সকল জীবাণু দূরীভুত হয়ে যায়।

দুনিয়ার বুকে ইসলাম ছাড়া এমন কোনও মাজহাব নেই যেখানে নাকে পানি প্রবেশ করানোকে আবশ্যকীয় নির্দিষ্ট করা হয়েছে। অথচ চিকিৎসা শাস্ত্রে এগুলোকে সবচেয়ে আবশ্যকীয় বস্তুু বলে ধরে নেয়া হয়। এতে বুঝা যায় যে, ইসলামের হুকুম-আহকাম কতখানি চিকিৎসা বিজ্ঞানসম্মত। নামাজীদেরকে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের অজু করার প্রয়োজনীয়তা এভাবে আরও বেড়ে যায়। একারণে যে, এই নির্দেশ আল্লাহ পাকের নিকট হতে অবতীর্ণ হয়েছে এবং যেস্থানে পানি দুষ্প্রাপ্য হয় সেখানে অজুর পরিবর্তে তায়াম্মুমের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

আরবের অধিবাসীরা বিশেষ করে বেদুঈনরা দাঁত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার প্রতি খুবই উদাসীন যদ্দরুন মুখের দুর্গন্ধ ছাড়াও অপরিচ্ছন্নতার কারণে নানারকম রোগ দেখা দেয়। রাসূলুল্লাহ (সা:) প্রত্যেক নামাজের সময় মেছওয়াক করার প্রতি এমনই তাকীদ করেছেন যে, তা ওয়াজিবের সন্নিকটে পৌঁছে গেছে এবং তিনি একথাও বলেছেন, “যদি আমার উম্মতের উপর এ কাজটি কঠিন হয়ে না দাঁড়াত তাহলে আমি একে আবশ্যকীয় বলে নির্ধারণ করতাম।” তাছাড়া পানি কম হওয়ার দরুন আরবের অধিবাসীরা গোসল কম করত। তাদের পরিধেয় বসন অধিকাংশ ক্ষেত্রেই থাকত পশমের তৈরী। একই সাথে তারা কঠোর পরিশ্রমও করত। এতে করে শরীর ঘর্মাক্ত হলে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ত। যেহেতু তারা সপ্তাহাবধি পোশাক পরিবর্তন করত না। সেহেতু যখনই তারা মসজিদে নামাজ আদায় করার জন্য আগমন করত তাদের পরিধেয় বসন ও শরীর হতে দুর্গন্ধ বের হত। এজন্য ইসলাম প্রতি সপ্তাহে কমপক্ষে ১দিন অর্থাৎ জুময়ার দিন গোসল করাকে সুন্নাত বলে ঘোষণা দিয়েছে এবং প্রয়োজনে গোসলকে ফরজ সাব্যস্ত করেছে। রাসূলুল্লাহ (সা:) বলেছেন, ‘জুমআর দিন গোসল করা প্রত্যেক বালেগ ব্যক্তির উপর অবশ্যই জরুরী।” (ছহীহ বোখারী : কিতাবুল জুমআ) দিনে ধৌত করা পরিচ্ছন্ন কাপড় পরিধান করা, খোশবু ব্যবহার করা এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অন্যান্য উপায়-উপকরণ অবলম্বন করাকে আবশ্যিক বলে সাব্যস্ত করেছে। যে পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতা ছাড়া নামাজ আদায় করা মোটেই সম্ভব নয়। তাই পবিত্র কোরআনে ঘোষণা করা হয়েছে, “যদি তোমরা অপবিত্র হয়ে যাও তাহলে গোসল করে পবিত্রতা অর্জন কর।” (সূরা মায়েদাহ : রুকু-২) (চলবে)

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন