ঢাকা মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২০, ১১ কার্তিক ১৪২৭, ০৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪২ হিজরী

সারা বাংলার খবর

স্বপ্নের আত্মাহুতি ট্রেনের নিচেই

টাঙ্গাইল জেলা সংবাদদাতা : | প্রকাশের সময় : ২৬ জুলাই, ২০১৯, ১২:০১ এএম

স্কুলে ফরম ফিলাপের জন্য টাকা লাগবে তাই বাবা-মায়ের কাছে শত অনুরোধ মিনার। টিভি পর্দার মিনা ও রাজুর পড়ালেখার কোন অসুবিধা না হলেও বাস্তবের মিনা হার মেনেছে দারিদ্রের কাছে। দারিদ্রের করাল গ্রাসে প্রায়ই পরিবারে ঝগড়া হয় বাবা-মা ও ভাই-বোনের। চোখের সামনে এসব দেখে অবুঝ শিশু বয়স পার করে এলেও কৈশোরে এসে প্রচণ্ড রকম মানসিক যন্ত্রণায় ভুগছিলো সে। তবে এই রূঢ় বাস্তবতার স্থায়ীত্বকে খুব বেশি বাড়তে দেয়নি মিনা।
পরিবারের ঝগড়া ও স্কুলের টাকা না পাওয়ায় অভিমান নিয়ে ট্রেনের নিচে ঝাপ দিয়ে চিরবিদায় নেয় সে।নাটকীয়তার এ জীবনে মিনাকে আরেকদফা নাটক দেখতে হলো তার মৃত্যুর পরেও। লাশ বাড়ির উঠোনে রেখে পরিবারের অন্য সদস্যদের পেটের দায়ে ছুটতে হলো সরকারি সহায়তার চাল আনতে। গত বুধবার হৃদয় বিদারক এই দৃশ্যের অবতারণা হয় টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার গোহালিয়াবাড়ী ইউনিয়নের গোহালিয়াবাড়ী বাগানবাড়ী এলাকায়।

মিনার বাড়ির সামনে কথা হয় মিনার ছোট ভাই রাসেলের সাথে। ঘরে খাবার নেই তাই হাতে ব্যাগ নিয়ে প্রতিবেশী একজনের সাথে সরকারি সহায়তার চাল আনতে যাচ্ছে। তার বাড়ির পথটায় বন্যার পানি জমে আছে। খালি পায়ে পানি মাড়িয়ে যেতে হয় তাদের বাড়িতে। বাড়িতে গিয়ে কথা হয় বাবা ইদ্রিস আলীর সাথে। তিনি পেশায় রিকশাচালক। ঢাকার সায়েদাবাদ-যাত্রাবাড়ী এলাকায় রিকশা চালিয়ে যে রোজগার করেন তা দিয়ে পাঁচ সদস্যের সংসার চালানো দায়। ইদ্রিস আলী ঢাকায় থাকলেও তিন ছেলে ও দুই মেয়ে নিয়ে গ্রামেই থাকতেন স্ত্রী ফাতেমা বেগম। অভাবের সংসারে ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া করানোর সুযোগ হয়নি। বড় মেয়ে বিনাকে কৈশোর পেরোনোর আগেই বিয়ে দেওয়া হয়। ছোট ছেলে রাসেল বাড়িতে থাকলেও অপর দুই ছেলে নির্মাণ শ্রমিকের কাজ করে। অন্য ছেলে-মেয়েদের পড়ালেখা করানোর সাধ্য না হলেও মিনাকে পড়ানোর খুব ইচ্ছা বাবা-মায়ের। একটু একটু করে মিনা অষ্টম শ্রেণিতে উঠে যায়। মেধাবী হওয়ায় তাকে থেমে থাকতে হয়নি। কিন্তু যেখানে দারিদ্র নিত্যসঙ্গী সেখানে পড়ালেখা সৌখিনতা ছাড়া আর কিছুই নয়।

মিনার স্বজন, এলাকাবাসী ও সহপাঠীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, ঈদের পরে পরীক্ষার জন্য ফরম ফিলাপ করতে হবে তাই টাকা লাগবে। নুন আনতে যেখানে পান্তা ফুরোয় সেখানে ফরম ফিলাপের টাকা দেওয়ার মতো অবস্থা দরিদ্র বাবা-মায়ের নেই। এদিকে এনজিওর কিস্তি পরিশোধের জন্য সকালে বাবা-মায়ের ঝগড়া হয়। এক পর্যায়ে মা রাগ করে বাবার বাড়ি চলে যায়। মা কে ফিরিয়ে আনতে চেষ্টা করেও সফল হয়নি মিনা।

একদিকে স্কুলের টাকা না পাওয়ার কষ্ট অপরদিকে পরিবারের নিয়মিত ঝগড়া আর অশান্তির কারণে অভিমান করে নিজেকেই সবার থেকে দূরে সরিয়ে নিলো মিনা আক্তার। তার মৃত্যুতে শুধু পরিবার নয় পুরো গ্রামের মানুষ আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ে। অসংখ্য মানুষের ভীড় জমে যায় তাদের ছোট্ট বাড়িতে।

বাবা ইদ্রিস আলী ও মা ফাতেমার করুণ আর্তনাদে আকাশ ভারি হয়ে উঠে। অনেকেই চেষ্টা করছেন তাদের শান্তনা দিতে। কিন্তু তা কোন কাজেই আসছে না। মিনার দ্বিখণ্ডিত লাশের দিকে চেয়ে তাদের প্রলাপ যেন বাড়তেই থাকে।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

গত ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন