ঢাকা, বুধবার, ২১ আগস্ট ২০১৯, ০৬ ভাদ্র ১৪২৬, ১৯ যিলহজ ১৪৪০ হিজরী।

ধর্ম দর্শন

নামাজের নৈতিক, সাংস্কৃতিক ও ব্যবহারিক উপকারিতা

এ. কে. এম. ফজলুর রহমান মুন্শী | প্রকাশের সময় : ১ আগস্ট, ২০১৯, ১২:০১ এএম

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

৬। আল্লাহর ভয় : একজন মুসলমান যখন নামাজ আদায় করে, তখন ভুলক্রমে অথবা মানবিক দুর্বলতার কারণে যদি তার পদযুগল সুস্থির রাখতে অক্ষম হয় তখন আল্লাহর রহমত তার প্রতি সাহায্যের দুয়ার উন্মুক্ত করে দেয়। ফলে নামাজী ব্যক্তি নিজের কর্মকান্ডের জন্য লজ্জানুভব করে এবং আল্লাহর সামনে উপস্থিত হতে শঙ্কাবোধ করে। তার অন্তর স্বভাবত:ই তাকে অনুশোচনা দ্বারা দগ্ধীভূত করতে থাকে এবং এই ধারণা তার সামনে তুলে ধরে যে, নামাজী হয়েও সে কিভাবে এমনতর কাজ করতে পারে? এর ফলশ্রæতিতে অন্যায় কাজের প্রতি কদম বাড়ানো তার পক্ষে সম্ভব হয় না। মোটকথা, এমনিভাবে নামাজ মানুষের নৈতিক অনুভুতিগুলোকে সচেতন করে তোলে। এই সচেতনতা মানুষকে অন্যায় ও গর্হিত কার্যাবলী হতে বিরত রাখতে সহায়তা করে। একারণে মহান রাব্বুল আলামীন নামাজের আভ্যন্তরীণ গুণাবলীকে তুলে ধরে ইরশাদ করেছেন, “অবশ্যই নামাজ লজ্জাহীনতা ও অমঙ্গলকর কার্যাবলী হতে বিরত রাখে।” (সূরা আনকাবুত : রুকু-৫)

৭। সচেতনতা : নামাজ হচেছ জ্ঞান, বুদ্ধি, সচেতন মনোবৃত্তি এবং আল্লাহর নির্দেশাবলীর মাঝে চিন্তা ও গবেষণা করা এবং আল্লাহর তাসবীহ-তাহলীল ও নিজের মাগফেরাতের জন্য দোয়া করার সমষ্টিগত নাম। এ কারণে যে সকল বস্তুু মানুষের জ্ঞান, বু্িদ্ধ, বিবেচনা ও অনুভূতিকে বিলুপ্ত করে দেয় সেগুলো প্রকৃতই নামাজের প্রতিবন্ধকস্বরূপ। এজন্য শরাব নিষিদ্ধকরণ সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা জারী হওয়ার পূর্বে নেশাগ্রস্ত অবস্থায় নামাজ আদায় করাকে চূড়ান্তভাবে নিষেধ করা হয়েছিল। পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করা হয়েছে, “নেশাগ্রস্ত অবস্থায় তোমরা নামাজের নিকটবর্তী হয়ো না, যতক্ষণ না তোমরা মুখে যা বল তা বুঝতে পার।’ (সূরা নিসা: রুকু-৭) এ নির্দেশের পরিপ্রেক্ষিতে একজন নামাজী ব্যক্তি ঐ সকল বস্তুু ও কর্মকান্ড অবশ্যই পরিহার করে চলবে যেগুলোর দ্বারা তাদের স্বাভাবিক জ্ঞান-বুদ্ধি ও বিবেচনা এবং ইন্দ্রিয়ানুভূতি অবলুপ্ত হয়।

৮। মুসলমানদের বৈশিষ্ট্য : ধর্মীয় বরং রাজনৈতিক দিক থেকেও ইসলামের সংস্কারধর্মী পদক্ষেপসমূহ উজ্জীবিত করা এবং কপর্ট বিশ্বাসীদের থেকে তাদের জীবনযাত্রা ও কমকান্ডকে পৃথক পরিমন্ডলে সুশোভিত করার প্রয়োজন রয়েছে। মানবিক আইন-কানুন দ্বারা এ দুটো শ্রেণীর মাঝে কোনও প্রকার প্রভেদ সূচিত করা সম্ভব নয়। ইসলামী আহকামের মাঝে হজ্জ এমন একটি অনুষ্ঠান আরবাসীরা দীর্ঘকাল পর্যন্ত যার প্রতি অনুরক্ত ছিল। একই সাথে হজ্জ তাদের অতিপ্রিয় অনুষ্ঠানও ছিল। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের লোকজন নির্দিষ্ট সময়ে একইস্থানে সমবেত হওয়ার ফলে তা একটি মানব-মেলার রূপ পরিগ্রহ করত। যা ছিল আরবের আরবী সভ্যতার একটি অপরিহার্য অংশ। অহঙ্কার এবং সুনামের সুযোগও এর দ্বারা অর্জিত হত। ইসলাম এই অনুষ্ঠানের সার্বিক সংস্কার সাধন করেছে। ইসলামী আহকাম যাকাতের দ্বারা পার্থক্য নির্ধারণের সুযোগ ছিল না বিধায় এর একটি সুস্পষ্ট দিক নির্দেশনার প্রয়োজন ছিল। কেননা অধিকাংশ মুনাফেক ছিল বিত্তবান। এই অর্থ-বিত্তের দ্বারা তাদের মাঝে অহঙ্কার ও আত্মম্ভরিতার ভাবও ফুটে উঠত। একইসাথে আরবদের মাঝে স্নেহ, মহানুভবতা এবং দানশীলতারও প্রবণতা ছিল। দরিদ্রের প্রতি সহানুভূতির হাত সম্প্রসারিত করা আরবদের মাঝে মজ্জাগত ব্যাপার ছিল। এসকল কারণে শুধুমাত্র একটি অনুপ্রেরণাসুলভ আহবানের প্রয়োজন ছিল। যে আহবান ইসলামী আহকাম নামাজের মাধ্যমেই সুস্পষ্টভাবে সূচিত হয়েছে। তাছাড়া ইসলামী আহকাম রোজাকেও পার্থক্য নির্ণায়ক মানদনড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা যায় না। কারণ রোজা অবস্থায় লুকিয়ে বা নিভুতে পানাহার করার সুযোগও দেখা দিতে পারে তাই নামাজ এমন একটি বস্তুু বা অনুষ্ঠান যা মু’মিন ও মুনাফেকদের মাঝে পার্থক্য সৃষ্টি করতে সক্ষম। তাই পবিত্র কুরআনে নামাজের এই অপরিহার্যতাকে মুমিন ও মুনাফিকদের মাঝে পরিচয়ের মানদন্ড হিসেবে সূচিত হয়েছে এবং আল-কুরআনে ঘোষণা করা হয়েছে, “এবং যখন তারা নামাজ পড়তে দাঁড়ায় তখন অলসতা ও অমনোযোগীতাসহ দন্ডায়মান হয়।” (সূরা নিসা: রুকু-২১) অপর এক আয়াতে ঘোষণা করা হয়েছে, “অবশ্যই নামাজ বিনয় ও ভয়ের অধিকারী ব্যক্তিদের ছাড়া অন্যান্যদের জন্য কষ্টকর বিষয়।” (সূরা বাকারাহ : রুকু-৫) বিশেষ করে নিদ্রা গ্রহণ ও শ্রাস্তি লাঘবের উপযুক্ত সময় হচ্ছে এশা এবং ফজরের ওয়াক্ত। রাসূলুল্লাহ (সা:) বলেছেন, “মুনাফেকদের উপর ফজর এবং এশার চেয়ে অধিক গুরুভার কোন নামাজ নেই। (সহীহ বুখারী : কিতাবুস সালাত) এ প্রসঙ্গে হযরত ইবনে ওমর (রা:) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেছেন, ‘যখন আমরা সাহাবীদের মাঝে কাউকে এশা এবং ফজরের নামাজে অনুপস্থিত পেতাম তখন তার প্রতি সন্দেহ আমাদের মনে দানা বেঁধে উঠত।” (মুস্তাদরেকে হাকেম : ১ম খন্ড : ২১১ পৃ:)

মদিনায় আগমন করার পর নামাজের কিবলা পরিবর্তিত হয়। এই পরিবর্তনের মাঝে মৌলিক যে উপকারীতা নিহিত ছিল তা হল মুমিন এবং মুনাফিকদের পরিচয় নির্ধারিত হওয়া। মক্কার অধিবাসীরা কাবা শরীফের শ্রেষ্ঠত্বের কারণে বায়তুল মুকাদ্দাসের দিকে মুখ করে নামাজ আদায় করাকে অপ্রিয় মনে করত। মদীনার ইহুদি অধিবাসীদের মাঝে যারা ইসলাম কবুল করেছিল তারা নামাজের সময় বায়তুল মুক্কাদ্দাসের দিকে মুখ করেই দাঁড়াত এবং তারা কাবার শ্রেষ্ঠত্বকে প্রাথমিক পর্যায়ে স্বীকার করত না। এজন্য আরবের মুনাফেকদের পরিচয় বায়তুল মুকাদ্দাসকে কিবলা হিসেবে গ্রহণ করার মাঝে সুস্পষ্ট হয়ে উঠে এবং ইহুদী মুনাফেকদের পরিচয় কা’বা শরীফকে কিবলা বানানোর দ্বারা নির্ধারিত হয়ে যায়। সুতরাং আল-কুরআনে এই পার্থক্য নির্ণায়ক অবস্থাকে সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরে ঘোষণা করা হয়েছে, “এবং যে কেবলার উপর প্রতিষ্ঠিত ছিলে একে আমি কিবলারূপে নির্ধারিত করি নাই এজন্য যে,্ আমি যেন রাসূলের অনুসরণকারীদেরকে পৃথক করে নিতে পারি। যারা পশ্চাদ্দিকে ফিরে যায় তাদের থেকে এবং এই কিবলা যাদেরকে আল্লাহ সুপথ দেখিয়েছেন, তাদের ছাড়া অন্যান্যদের জন্য খুবই ভারী বা জটিল বিষয়।” (সূরা বাকারাহ : রুকু-১৭) এই পরিচয় এবং পার্থক্য নির্ধারক মানদন্ড কিয়ামত পর্যন্ত প্রতিষ্ঠিত থাকবে। একারণে রাসূলুল্লাহ (সা:) বলেছেন, “যে ব্যক্তি আমাদের যবেহকৃত গোশত ভক্ষণ করেছে এবং আমাদের কিবলার দিকে মুখ করে নামাজ আদায় করেছে, সেই মুসলমান।” (সহীহ বুখারী)

৯। পরিণামদর্শিতা : বাতেল এবং মিথ্যার পরাজয় সাধনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করা এবং সত্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রাণান্ত সংগ্রাম করা মানুষের অপরিহার্য কর্তব্য। এই কর্তব্য ও দায়িত্ব নিষ্পন্ন করার জন্য মানুষকে সর্বদাই প্রস্তুুত এবং সতর্ক থাকতে হবে। এই প্রস্তুুতি এবং সচেতনতার নিদর্শন দৈনন্দিন নামাজ আদায়ের মাঝে পাওয়া যায়। এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা:)-এর পবিত্র জীবনাদর্শ তুলে ধরে আবু দাউদ শরীফে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ (সা:) এবং তাঁর সেনাবাহিনী যখন কোনও পাহাড়ের উপর আরোহণ করতেন তখন তাকবীর ধ্বনি উচ্চারণ করতেন এবং যখন নীচে অবতরণ করতেন তখন তাসবীহ পাঠ করতেন। নামাজের মাঝে এই তাকবীর ও তাসবীহের প্রবর্ত কায়েম রাখা হয়েছে। (চলবে)

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন