ঢাকা, বুধবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৩ আশ্বিন ১৪২৬, ১৮ মুহাররম ১৪৪১ হিজরী।

জাতীয় সংবাদ

অনুসন্ধান-তদন্তে হয়রানি

দুদকের সেন্ট্রাল ডাটাবেজ হয়নি চার বছরেও

বিশেষ সংবাদদাতা | প্রকাশের সময় : ১৮ আগস্ট, ২০১৯, ১২:০১ এএম

স্বশাসিত স্বাধীন প্রতিষ্ঠান দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক)-এর ভেতরের অবস্থা ‘হ-য-ব-র-ল’। আইনের এক নম্বর এজেন্ডায় গুরুত্ব না দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি ব্যতিব্যস্ত ৬ নম্বর নিয়ে। এতে দুদক তাল হারিয়েছে অনেক ক্ষেত্রে। সমন্বয়হীনতা দৃশ্যমান অনুসন্ধান-তদন্তের ধাপে ধাপে। চলছে অনুসন্ধানাধীন একই ফাইল নিয়ে একাধিক কর্মকর্তার টানাহেঁচড়া। জমজমাট কর্মকর্তাদের ‘নোটিশ বাণিজ্য’ও। অকারণ ফাইল আটকে রেখে ফায়দা হাসিলের চেষ্টা তো রয়েছেই। হৃত ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের জন্য কমিশন কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে ক্ষণে ক্ষণে হুঙ্কার ছাড়লেও এটি যেন নিছক ‘বজ্র আঁটুনি ফসকা গেরো’। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামানের মতে, দুদকের পেশাদারিত্ব এখনো কাক্সিক্ষত মানের নয়। বর্তমান কমিশনের কাছে আমাদের অনেক কিছুই প্রত্যাশা ছিল। কতটা পূরণ হয়েছে, এখন সে প্রশ্ন করা যেতেই পারে।

কেস স্টাডি (এক) : ২০১৭ সালের ১২ এপ্রিল জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের কাছে ‘রূপনগর গভ: হাউজিং এস্টেট সমবায় সমিতি লি:’-এর রেকর্ডপত্রের অনুলিপি চেয়ে চিঠি দেয় দুদক। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষে উপ-পরিচালক মোশাররফ হোসেন মৃধা রেকর্ডপত্র চান। দুদক আইনের ১৯(৩) ধারা অনুযায়ী, সকল ব্যক্তি কিংবা প্রতিষ্ঠান এ কাজে দুদককে সহযোগিতা করতে বাধ্য।

এ কারণে দুদক অনুসন্ধান ও তদন্তের প্রয়োজনে রেকর্ডপত্র চেয়ে যখন কোনো চিঠি লেখে- প্রতিষ্ঠানগুলো চেষ্টা করে দুদককে চাহিত রেকর্ডপত্র দ্রæততম সময়ের মধ্যে সরবরাহ করতে। রাজধানীর মিরপুরস্থ ‘রূপনগর গভ: হাউজিং এস্টেট সমবায় সমিতি লি:’-এর নামে বরাদ্দকৃত প্রধান সড়কের ৩ নং প্রাতিষ্ঠানিক প্লটের ছায়া নথি তলব (স্মারক নং-১২৪১৮) করে দুদক। এ প্রেক্ষিতে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ একই বছর ১১ মে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ উপ-পরিচালক মোশাররফ হোসেন মৃধাকে ফাইলটির ছায়া নথি প্রদান (স্মারক নং-৩৮৩০) করে।
এ দিকে সংশ্লিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক প্লটের বৈধ দাবিদার হিসেবে ওই সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. শাহ আলম প্লটের ওপর পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহণের আবেদন করেন। কিন্তু গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ ফাইলটি দুদকে থাকার দোহাই দিয়ে কার্যক্রম বন্ধ রাখে। অন্যদিকে বর্তমানে নথিটির কোনো কার্যক্রম গ্রহণ করা যাবে কি না, এ বিষয়ে দপ্তরকে অবহিত করার জন্য দুদক চেয়ারম্যানকে নির্দেশক্রমে অনুরোধ জানান জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের সচিব মোহাম্মদ উল্যাহ।

জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ সূত্র জানায়, প্লটটির অনুকূলে দায়েরকৃত রিট পিটিশনের (নং-৩৭৮৩/২০১৮) পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৮ সালের ২৭ মার্চ একটি আদেশ হয়। ওই আদেশে আদালত পরবর্তী ৪ সপ্তাহের মধ্যে বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য নির্দেশ দেন। সেই সঙ্গে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের ১৫৭তম বোর্ড সভায় প্লটটির দখল সরেজমিন বুঝিয়ে দিতে বলা হয়।

কিন্তু দুদক নথিটি আটকে রাখায় প্লটের বৈধ দাবিদার পক্ষ এখন পর্যন্ত প্লটের দখল বুঝে পায়নি। ৬ মাস অতিবাহিত হলেও চিঠিটির কোনো প্রতিউত্তর দেয়নি দুদক চেয়ারম্যানের দপ্তর। অভিযোগ রয়েছে, উপ-পরিচালক মোশাররফ হোসেন মৃধাকে ‘সন্তুষ্ট’ করা হয়নি। এ কারণেই এখন পর্যন্ত ফাইলটির ওপর কোনো মতামত না দিয়ে ৫ মাসের বেশি সময় আটকে রেখেছেন।
কেস স্টাডি (দুই) : কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা (চলতি দায়িত্ব) মো. দেলোয়ার হোসেন গত ১০ জুন একটি চিঠি পান। চিঠি পাঠিয়েছেন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) বিশেষ অনুসন্ধান ও তদন্ত-২ এর উপ-পরিচালক মির্জা জাহিদুল আলম। চিঠিতে তাকে দুদক আইন-২০০৪ এর ২৬(১) ধারা উল্লেখ করে (স্মারক নং-২২৫৬৮) সম্পদ বিবরণী দাখিল করতে বলা হয়।

এর আগে গত এপ্রিল মাস থেকে দেলোয়ার হোসেনের সম্পদ অনুসন্ধান শুরু হয়। এ পরিপ্রেক্ষিতে মো. দেলোয়ার হোসেন ১৮ জুলাই দুদকের প্রধান কার্যালয়ে সম্পদ বিবরণী দাখিল করেন। সম্পদ বিবরণী দাখিলের প্রস্তুতি যখন নিচ্ছিলেন তখন ৩ জুন ২০১৯ তিনি আরো একটি চিঠি (স্মারক নং-২২৩৭) পান।

এটি দিয়েছেন একই প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত জেলা কার্যালয়-১ এর সহকারী পরিচালক মো. আলমগীর। একই সংস্থা থেকে একই বিষয়ে দুই কর্মকর্তার ভিন্ন দু’টি নোটিশ পেয়ে ভিমরি খেলেন দেলোয়ার। সভয়ে তিনি খোঁজ নিতে যান শেষোক্ত নোটিশদাতার কাছে। মো. আলমীর জানিয়ে দেন দুদকের প্রধান কার্যালয়ে তার বিষয়ে আর কেউ অনুসন্ধান করছেন বলে তার জানা নেই। দেলোয়ার নিশ্চিন্ত হন এই ভেবে যে, ভুল মানুষের হতেই পারে। এটি হয়তো কোনো মিসটেক।

কিন্তু না। তার সকল ধারণা ভেঙে দেয় যখন ততোধিক কঠিন ভাষায় আরেকটি চিঠি (স্মারক নং-২৮৭৩) পান। ১৫ জুলাইয়ের এ চিঠিতে আলমগীর কাগজপত্র নিয়ে সশরীরে দেলোয়ার হোসেনকে উপস্থিত হতে বলেন। না হলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের হুঁশিয়ারি দেয়া হয়। কিংকর্তব্যবিমূঢ় দেলোয়ার তড়িঘড়ি সময় প্রার্থনা করে একটি আবেদন দেন সহকারী পরিচালক মো. আলমগীরের বরাবর।

অন্যদিকে একটি সংস্থা একই বিষয়ে একসঙ্গে দু’টি অনুসন্ধান চলমান থাকার বিষয়টি অবহিত করে দুদক চেয়ারম্যান বরাবর আবেদন দেন। পরে ওই আবেদনের ‘রিসিভ কপি’ সঙ্গে নিয়ে আলমগীরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যান। আলমগীর তাকে দেখেই তেলে-বেগুনে জ্বলে ওঠেন এবং আবেদনটি খুলে না পড়েই ছুড়ে ফেলে দেন। দেলোয়ারের সঙ্গে দুর্ব্যবহারও করেন। অভিযোগ রয়েছে, দুদকের উপ-সহকারী পরিচালক মো. আলমগীর ‘নোটিশ বাণিজ্য’-এর সঙ্গে জড়িত।

কেস স্টাডি (তিন) : ভাটারা মৌজার জে.এল. নং-২৯৪ এর ১৩৮/১৯৬১-৬২ নং এল.এ. কেসভুক্ত ৩১১.২৪ একর জমি অবমুক্তির গেজেট পুনঃপ্রকাশ সংক্রান্ত বিষয়টিও দুদকের স্বেচ্ছাচারী মানসিকতার কারণে আটকে আছে বলে জানা গেছে। ভূমি মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, মন্ত্রণালয়ের অধিগ্রহণ অধিশাখা-১ এর তৎকালীন উপ-সচিব মির্জা তারিক হিকমত ঢাকা জেলা প্রশাসক বরাবর একটি চিঠি (স্মারক নং-০২৩.১৬-২৩৮) দেন।

ওই চিঠিতে মন্ত্রিসভা বৈঠকে অবমুক্তির সিদ্ধান্তকৃত এবং ০৭/০৯/২০০৬ তারিখে প্রকাশিত গেজেটে অন্তর্ভুক্ত ভাটারা মৌজায় ২৩.৩৭ ভূমি ব্যতীত অপরাপর ভূমি নিয়ে সংশোধিত রূপে অধিগ্রহণ অধ্যাদেশ-১৯৮২ অনুযায়ী গেজেট প্রকাশের অনুরোধ জানান তিনি। পরে মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়, এ সংক্রান্ত নথিটি মন্ত্রণালয় থেকে দুদকের এক কর্মকর্তা নিয়ে গেছেন। তবে কোন কর্মকর্তা, কী কারণে কবে নিয়ে গেছেন- তার কোনো সূত্র মন্ত্রণালয়ে রেখে যাননি। ফলে এ সম্পত্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা এখন মন্ত্রণালয় থেকে দুদকে ছোটাছুটি করেও কোনো কিনারা পাচ্ছেন না।

শুধু এক শাহ আলম কিংবা দেলোয়ার হোসেন নন- এ রকম অনেকের মান-সম্মান, সামাজিক মর্যাদা, অর্থনৈতিক স্বার্থ ধুলায় মিশছে দুদকের সমন্বয়হীনতা, অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি এবং স্বেচ্ছাচারিতার কারণে। গত চার বছরে বর্তমান কমিশনের উল্লেখযোগ্য কোনো অর্জন না থাকলেও অনুসন্ধান-তদন্তের নামে নিরীহ মানুষকে হয়রানিতে পিছিয়ে নেই।

কার্যক্রমে অস্বচ্ছতা, আইন ও বিধি প্রয়োগে বজ্র আঁটুনি ফসকা গেরো নীতি, আইনগত অবাধ স্বাধীনতার সুযোগে কমিশনকে কার্যত একটি জবাবদিহিহীন প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার কারণেই দুদকের এই সমন্বয়হীনতা বলে মনে করেন প্রতিষ্ঠান থেকে অবসরে যাওয়া কর্মকর্তারা।

দুদক থেকে মহাপরিচালক হিসেবে অবসরে যাওয়া এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বলেন, প্রতিষ্ঠানটির মনোগ্রামের সঙ্গে কার্যক্রমের মিল নেই। মনোগ্রামে ‘হীরকখন্ড’ দিয়ে বোঝানো হয়েছে, দুদক হবে স্বচ্ছ, দৃঢ় ও কঠিন। বর্তমান বাস্তবতা উল্টো। দৃঢ়তা এবং কঠিনের পরিবর্তে বিরাজ করছে বিশৃঙ্খলা। স্বচ্ছতার পরিবর্তে সৃষ্টি করা হয়েছে জটিলতা। আইন ও বিধি সংশোধন হলেও হয়রানি কমেনি। সেন্ট্রাল ডাটাবেজের কাজ শুরু হয়েছে চার বছর আগে। এখন অবধি সম্পন্ন হয়নি। দুদকে কাজের চেয়ে কথা বেশি হচ্ছে।

সমন্বয়হীনতা প্রসঙ্গে দুদক সচিব মুহাম্মদ দিলোয়ার বখত বলেন, সেন্ট্রাল ডাটাবেজ প্রকল্পের কাজ এগিয়ে চলছে। এটি বাস্তবায়ন হলে আশা করছি একই অনুসন্ধান একাধিক কর্মকর্তার হাতে যাওয়ার বিষয়টি ঘটবে না। তদুপরি যে ধরনের ঘটনার কথা আপনি উল্লেখ করলেন, এসবের বিষয়ে অবহিত হওয়া মাত্র ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি রোধেও শক্তিশালী একটি কমিটি সদা সক্রিয় রয়েছে।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন