ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৪ আশ্বিন ১৪২৬, ১৯ মুহাররম ১৪৪১ হিজরী।

জাতীয় সংবাদ

ট্যানারি মালিকদের চামড়া দেবেন না আড়তদাররা

সিন্ডিকেট করে ফায়দা, দু’পক্ষের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ

অর্থনৈতিক রিপোর্টার | প্রকাশের সময় : ১৮ আগস্ট, ২০১৯, ১২:০১ এএম

এবার কোরবানির পশুর চামড়া নিয়ে চলছে নৈরাজ্য। পানির দামে চামড়া কেনেন ব্যবসায়ীরা। আবার অনেক চামড়া বিক্রি না হওয়ায় রাস্তায় পচেছে। এবারের কাঁচা চামড়া বিগত ত্রিশ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ দরপতন হয়। কোরবানির পশুর চামড়া রাস্তায় পচে নষ্ট হয়। বিনা মূল্যেও নেয়নি। এ নিয়ে বিপাকে পড়েন মৌসুমী ব্যবসায়ীরা। সিন্ডিকেট করে ফায়দা লুটছে পোস্তার আড়তদার ও ট্যানারি মালিকরা। এ নিয়ে দু’পক্ষই পাল্টাপাল্টি অভিযোগ করছে। এ জন্য দু’পক্ষকে নিয়ে আজ রোববার বৈঠকে বসছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।

কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ীদের ট্যানারি মালিকরা বকেয়া পরিশোধ না করা পর্যন্ত কাঁচা চামড়া বিক্রি বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি দেলোয়ার হোসেন। তিনি বলেন, ট্যানারি মালিকদের কাছে কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ীদের প্রায় ৪০০ কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে ট্যানারি মালিকরা এই বকেয়া টাকা পরিশোধ না করায় এবারের কোরবানিতে কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করা যায়নি। এতে কোরবানির বিপুল চামড়া নষ্ট হয়ে গেছে। গতকাল রাজধানীর পোস্তায় কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ীদের এক জরুরি সভা শেষে সংগঠনের সভাপতি সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন। এ সময় আরো উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক হাজী টিপু সুলতান, সহ-সভাপতি হাজী সেকান্দার।

দেলোয়ার হোসেন বলেন, কাঁচা চামড়া এবং ওয়েট ব্ল রফতানির বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে আমরা তার সাথে একমত। তারা যে সিদ্ধান্ত দেবে আমরা তা মেনে নেব। গতকাল থেকে সারাদেশে ট্যানারি মালিকদের কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করার কথা থাকলেও বকেয়া টাকা না পেলে কাঁচা চামড়া বিক্রি করব না। তিনি বলেন, ট্যানারি মালিকরা সংবাদ সম্মেলন করে আমাদের পাওয়া টাকা নিয়ে মিথ্যাচার করেছে। আমরা তার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি।

দেলোয়ার হোসেন বলেন, ২০১২ সাল থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ট্যানারি মালিকদের কাছে আমাদের পোস্তায় ব্যবসায়ীদের পাওনা ১শ’ কোটি টাকা এবং সারাদেশের কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ীদের বকেয়ার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪শ’ কোটি টাকা। এই টাকা পরিশোধ হলেই কেবল আমরা কাঁচা চামড়া বিক্রি করব। অন্যথায় আমরা চামড়া বিক্রি বন্ধ রাখব।

তিনি বলেন, আগামীকাল (আজ) বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে বৈঠক হবে। বৈঠকে পাওনা টাকা পরিশোধের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি না পাওয়া পর্যন্ত সব ধরনের কাঁচা চামড়া বিক্রি বন্ধ থাকবে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বৈঠকে কোনো সিদ্ধান্ত হলে চামড়া বিক্রির বিষয়ে পরবর্তী করণীয় জানিয়ে দেয়া হবে।

দেলোয়ার হোসেন বলেন, আমরা চামড়া কিনছি বিক্রির জন্যই। কিন্তু ট্যানারি মালিকরা আমাদের জিম্মি করে রেখেছে, আমরা এই জিম্মিদশা থেকে মুক্তি চাই। আমরা চাই ট্যানারি মালিকগুলো আমাদের বকেয়া টাকা পরিশোধ করুক। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বৈঠকে তারা আমাদের পাওনা টাকা পরিশোধের নিশ্চয়তা দিলে এবং কবে থেকে কিভাবে টাকা পরিশোধ করবে তার ঘোষণা দিলে আমরা চামড়া বিক্রি শুরু করব। মাঠ পর্যায়ে চামড়া নিয়ে যা ঘটছে তা বাংলাদেশের ইতিহাসে বিরল। এই ঘটনাটি ট্যানারি মালিকদের কারণে ঘটেছে বলে দাবি করেন তিনি।

এদিকে পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী কোরবানির পশুর লবণযুক্ত কাঁচা চামড়া কেনা শুরু করেন ট্যানারি মালিকরা। গতকাল বিষয়টি নিশ্চিত করেন বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ও সালমা ট্যানারির মালিক সাখাওয়াত উল্লাহ।

তিনি বলেন, আনুষ্ঠানিকভাবে আমরা ট্যানারি মালিকরা লবণযুক্ত কাঁচা চামড়া আজ থেকে কেনা শুরু করেছি। আমরা সরকার নির্ধারিত মূল্যে আগামী দুই মাস চামড়া সংগ্রহ করব। যেসব চামড়া ভালোভাবে সঠিক সময়ে লবণ দিয়েছে ওইসব চামড়া ভালো দামে কেনা হবে।

এ ছাড়া বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে ট্যানারি মালিক, আড়তদার ও কাঁচা চামড়া সংশ্লিষ্টদের বৈঠকে বর্তমান চামড়ার পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হবে। এরপর বিস্তারিত জানানো যাবে বলে জানান ট্যানারি মালিকদের এ নেতা।
এদিকে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কাঁচা চামড়া রফতানির সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। পরে নড়েচড়ে বসে ট্যানারি মালিকরা। দেশীয় শিল্প রক্ষায় কাঁচা চামড়া রফতানির সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবি জানান তারা। গত বুধবার সকালে ধানমন্ডিতে জরুরি সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানান ট্যানারি মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএ)।

কাঁচা চামড়া রফতানির বিষয়ে জানতে চাইলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. মফিজুল ইসলাম বলেন, আমরা কাঁচা চামড়া রফতানির সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করিনি। তবে আমরা এটাও জানি যে, ঢালাওভাবে কাঁচা চামড়া রফতানি করার অনুমোদন দিলে দেশে চামড়া শিল্প উন্নয়নে কিছু বাধাগ্রস্ত হবে। আমরা চাই না একটা সম্ভাবনাময় খাত বাধাগ্রস্ত হোক। তাই বলে আমরা এ-ও হতে দিতে পারি না যে, চামড়া বিক্রি হবে না। দাম না পেয়ে মানুষ চামড়া পুঁতে ফেলবে, নদীতে ফেলে দেবে। তাই আমরা ঢালাওভাবে না দিয়ে কেস টু কেস ভিত্তিতে কাঁচা চামড়া রফতানিতে অনুমোদনের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

সচিব বলেন, শনিবার (১৭ আগস্ট) থেকে নির্ধারিত মূল্যে কাঁচা চামড়া ক্রয় শুরু করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন। এর ফলে যদি চামড়ার বাজারে ন্যায্যমূল্য ফিরে আসে তাহলে হয়তো আমরা কাঁচা চামড়া রফতানি অনুমোদন দেব না। তবে বিক্রেতারা যদি চামড়ার ন্যায্যমূল্য না পায়, তাহলে কাঁচা চামড়া রফতানির অনুমোদন দেব। কারণ এটা এতিম, গরিব, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর হক। এক্ষেত্রে আমরা পানির দরে চামড়া বিক্রি হতে দিতে পারি না।

এবারও পবিত্র ঈদুল আজহার আগে সরকার ও ব্যবসায়ীরা মিলে কোরবানির পশুর চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দেয়। এবার ঢাকায় প্রতি বর্গফুট গরুর চামড়ার দাম ৪৫-৫০ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ৩৫-৪০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। গত বছর প্রতি বর্গফুটের দাম একই ছিল। ২০১৭ সালে প্রতি বর্গফুট গরুর চামড়ার দাম ছিল ঢাকায় ৪৫-৫৫ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ৪০-৪৫ টাকা। এ ছাড়া সারাদেশে খাসির চামড়া প্রতি বর্গফুট ১৮-২০ টাকা এবং বকরির চামড়া ১৩-১৫ টাকায় সংগ্রহ করতে বলা হয় ব্যবসায়ীদের। গতবার খাসির চামড়ার দামও ছিল একই। তবে ২০১৭ সালে খাসির চামড়ার দাম ছিল প্রতি বর্গফুট ২০-২২ এবং বকরির চামড়া ১৫-১৭। সাভারে ট্যানারি স্থানান্তর, রফতানি আদেশ কমে যাওয়া ও অর্থ সংকটের কারণে এ বছর চামড়ার দাম কমানোর সুপারিশ করেছিল কাঁচা চামড়ার ব্যবসায়ী ও ট্যানারি মালিকরা। এসব বিবেচনায় সরকার দাম না বাড়িয়ে আগের মূল্য নির্ধারণ করে।

 

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (6)
James Anjan ১৮ আগস্ট, ২০১৯, ৩:৩৮ এএম says : 0
কাস্মীর এ যেন শান্তি ফিরে আসে সেই ব্যাবস্থা করা দরকার।ধর্মীয় ব্যাপার যেন না উঠে আসে সেইভাবে কাজ করতে হবে
Total Reply(0)
Zohirul Islam Chowdhury ১৮ আগস্ট, ২০১৯, ৩:৩২ এএম says : 0
সরকারের থেকে ট্যানারি মালিকরা রপ্তানির বিপরীতে বিভিন্ন রকম সুবিধা পায় যেমন ক্যাশ ইন্সেন্টিভ/ ডিউটি ড্র ব্যাক, বন্ডেড অয়্যার হাউজ ফ্যাসিলিটি, সল্পসুদে লোন পায়।এছাড়া তাদের প্রফিট মার্জিনতো থাকেই। এত কিছুর পরেও এভাবে গরীব মানুষকে ঠকাতে হবে কেন?
Total Reply(0)
Gulam ali Azmal ১৮ আগস্ট, ২০১৯, ৩:৩৪ এএম says : 0
ট্যানারি ব্যবসা সরকারের নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। সরকারি প্রতিষ্ঠানে রুপান্তরিত করতে হবে।আর যাই হোক সিন্ডিকেট হবে না।
Total Reply(0)
Lavlu Ahmed ১৮ আগস্ট, ২০১৯, ৩:৩৪ এএম says : 0
বাংলাদেশে ট্যানারি ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাবে। ভারত কাঁচা চামড়া কিনবে আন্তর্জাতিক বাজার মূল্যে প্রতি বর্গফুট হিসেবে।
Total Reply(0)
Jiban Khan ১৮ আগস্ট, ২০১৯, ৩:৩৫ এএম says : 0
চামড়া নিয়ে খেলা, পিঠের চামরা দুনিয়ার বুকেই যেনো আল্লাহ্‌ না রাখে। জালিমের যেনো শাস্তি হয় দুনিয়ার বুকে ইনশাআল্লাহ্
Total Reply(0)
Robert Hassan ১৮ আগস্ট, ২০১৯, ১১:২৬ এএম says : 0
Some kind of dirty politics involved on it
Total Reply(0)

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন