ঢাকা, বুধবার , ১১ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ১৩ রবিউস সানি ১৪৪১ হিজরী

সম্পাদকীয়

অর্থনীতির অমিত সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হবে

| প্রকাশের সময় : ২২ আগস্ট, ২০১৯, ১২:০২ এএম

বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্থরতা অব্যাহত থাকলেও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও গতিশীলতা আন্তর্জাতিক মহলকে বিস্মিত করছে। ইতিমধ্যে বাংলাদেশকে বিশ্বের অন্যতম অর্থনৈতিক সম্ভাবনাময় দেশ হিসেবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে। ‘গোল্ডম্যান স্যাক্স’র সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় চীন, ভারত, ব্রাজিল, রাশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকার মত দ্রুত উন্নয়নশীল অর্থনীতির পাশে আরো ১১টি দেশের একটি তালিকা তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হচ্ছে, ২০৩০ সাল নাগাদ এই দেশগুলোর অর্থনীতির আকার ইউরোপের ২৭টি দেশের সম্মিলিত অর্থনীতির চেয়েও বড় হতে পারে।এই ১১টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ভৌগোলিক অবস্থান ও ভ‚-রাজনৈতিক কারণেই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার কথা কয়েক দশক ধরেই আলোচিত হচ্ছে। সে সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে গত এক দশক ধরে ধারাবাহিকভাবে বিদ্যুত, জ্বালানীখাত, যোগাযোগ অবকাঠামো, বন্দর উন্নয়ন, গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণ, এলএনজি টার্মিনালসহ বেশ কিছু মেগা অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। পদ্মাসেতু নির্মান এবং শতাধিক নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার সরকারী উদ্যোগ এ ক্ষেত্রে আমাদের অর্থনৈতিক সম্ভাবনায় অনুঘটকের ভ‚মিকা পালন করছে। চীন-জাপানসহ এশিয়ার শিল্পোন্নত দেশগুলোর উদ্যোক্তারা এখন বাংলাদেশে তাদের শিল্প রি-লোকেট করার প্রস্তাব নিয়ে এগিয়ে এসেছে। ইতিমধ্যে বেশকিছু প্রতিষ্ঠান তাদের কাজ শুরু করে দিয়েছে। এসব বিনিয়োগ প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে দেশে লাখ লাখ নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা- হানাহানি, সুশাসনের অভাব, দুর্নীতি অব্যবস্থাপনা, মানবাধিকার লঙ্খন, অবকাঠামোগত ঘাটতি ও অধিক জনসংখ্যার চাপ সত্বেও মানবসম্পদ উন্নয়ন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও দারিদ্র্য বিমোচনের হার বাংলাদেশ কারো কারো কাছে অর্থনৈতিক মিরাকল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। শতাধিক নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার পাশাপাশি মিরসরাই- সীতাকুন্ড- সোনাগাজীতে ৩০ হাজার একর ভ‚মির উপর বঙ্গবন্ধু শিল্পপার্ক একটি অত্যুজ্জ্বল সম্ভাবনার নাম। দেশি-বিদেশি শত শত বিনিয়োগকারি ইতিমধ্যে এই অর্থনৈতিক অঞ্চলে যে বিনিয়োগ প্রস্তাব দিয়েছে তার অংক দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৮০০ কোটি ডলার। দ্রুত গতিতে উন্নয়নশীল এই শিল্পাঞ্চলে একটি চীনা কোম্পানীর ৮০ কোটি ডলারের বেশি বিনিয়োগে নির্মিত কারখানা এরই মধ্যে বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাওয়ার সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে বলে জানা যায়। পাশাপাশি চীনের একটি শিল্পগোষ্ঠি ১৫৯ কোটি টাকা বিনিয়োগে প্রায় হাজার একর জমির উপর ২৪টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান নিয়ে ‘সিচুয়ান ইন্ডাসট্রিয়াল পার্ক’ নামের একটি একক শিল্পপার্ক গড়ে তোলার প্রস্তাব করেছে। বিশেষত চীনা কোম্পানীগুলোর আগ্রহ এবং বিনিয়োগ বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু করার মধ্য দিয়ে দেশের বৃহত্তম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্প নগরী তার কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারলে এই একটি শিল্প নগরীতেই অন্তত ১০ লক্ষাধিক মানুষের কর্মসংস্থান হবে বলে বেজার পক্ষ থেকে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে।

দেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার নানামাত্রিক উপকরণ ও উপযোগ আমাদের দেশেই বর্তমান। বিশেষত বিপুল পরিমান জনশক্তি, সমুদ্র বন্দর, পানি সম্পদ এবং কাঁচামালের আভ্যন্তরীণ উৎস আমাদের অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর সম্ভাবনাকে অনেক বেশি সুদৃঢ় করে তুলেছে। এ ক্ষেত্রে দেশে শিল্পায়নের বর্তমান প্রেক্ষাপট বিবেচনায় অধিক সংখ্যক দক্ষ শ্রমিক ও জনসম্পদ গড়ে তোলা আমাদের জন্য অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। দেশে বিপুল সংখ্যক শিক্ষিত বেকার কর্মসংস্থানের জন্য অপেক্ষমান থাকলেও গার্মেন্টস সেক্টরের অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদ প্রতিবেশি দেশগুলোর নাগরিকরা দখল করে আছে। শুধুমাত্র ভারতীয় শ্রমিকরা বছরে শত শত কোটি ডলারের রেমিটেন্স নিয়ে যাচ্ছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্প নগরীতে, যে ধরনের শিল্প কারখানা গড়ে উঠছে সেখানে কর্মসংস্থানের উপযোগি দক্ষ শ্রমিক ও টেকনিশিয়ান গড়ে তুলতে সরকারকে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। আধুনিক শিল্পায়ন ও বাজার ব্যবস্থাপনা, যোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে দক্ষ শ্রমিক ও জনসম্পদ গড়ে তোলার পাশাপাশি এসব জনসম্পদকে দেশে-বিদেশে কর্মসংস্থানের উপর যে বিপুল অর্থনৈতিক সম্ভাবনা দাঁড়িয়ে আছে, সে সুযোগ যথাযথভাবে কাজে লাগানোর কর্মপরিকল্পনা অনেক আগে নেয়ার প্রয়োজন ছিল। মধ্যপ্রাচ্য, মালয়েশিয়াসহ বিশ্বের বহুদেশে কর্মরত প্রায় এককোটি শ্রমিকের পাঠানো রেমিটেন্স দেশের অর্থনীতির অন্যতম শক্তি। ভাষা ও কর্মদক্ষতার জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষা ও প্রশিক্ষন নিশ্চিত করা গেলে রেমিটেন্সের হার অন্তত দ্বিগুন হতে পারত। এখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্প নগরীসহ দেশের অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে বিদ্যমান এবং নির্মীয়মান অবকাঠামো কাজে লাগিয়ে যে বিপুল কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে তা অবশ্যই কাজে লাগাতে হবে। বাংলাদেশে অপেক্ষাকৃত কম মূল্যে দক্ষ শ্রমিকের যোগান নিশ্চিত হলে বিদেশি শ্রমিক ও টেকনিশিয়ান নিয়োগের প্রবণতা বন্ধ হবে। অনেক সম্ভাবনা অতীতে সিদ্ধান্তহীনতা বা দীর্ঘসুত্রিতার কারণে হারিয়ে গেছে। সমুদ্র বন্দর, নৌবন্দর, রেলপথ, সড়কপথসহ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর কাজ ত্বরান্বিত করতে হবে। বিনিয়োগ প্রস্তাব ও শিল্প রি-লোকেশনের প্রস্তাবগুলো যেন লালফিতার দৌরাত্ম্য বা আমলাতান্ত্রিক জটিলতার সম্মুখীন না হয়, সরকারকে সে দিকে বিশেষ নজর রাখতে হবে।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন