ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১৪ ফাল্গুন ১৪২৬, ০২ রজব ১৪৪১ হিজরী

জাতীয় সংবাদ

বেহাল বিআরটিসি

এক দশকে বিনিয়োগ ১৬১২ কোটি টাকা

বিশেষ সংবাদদাতা | প্রকাশের সময় : ২৩ আগস্ট, ২০১৯, ১২:০০ এএম

বিআরটিসির অকেজো বাসের সারি -ফাইলফটো


এক-চতুর্থাংশ বাস অচল


বেহাল অবস্থা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি)। একের পর এক ভারত থেকে কেনা হচ্ছে নি¤œমানের বাস। বছর না যেতেই সেগুলো অচল হয়ে পড়ে থাকছে ডিপোতে। গুনতে হচ্ছে লোকসান। তারপরেও রহস্যজনক কারণে নি¤œমানের ভারতীয় বাসেই আগ্রহ বিআরটিসির।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বিআরটিসির বহরে বাস রয়েছে ১ হাজার ৩৮৯টি। এর মধ্যে ৫২৫টিই অচল হয়ে বিভিন্ন ডিপোয় পড়ে আছে। এ হিসাবে বিআরটিসির বহরে থাকা বাসগুলোর ৩৮ শতাংশ অচল অবস্থায় আছে। এ অচল বাসগুলোর সিংহভাগই গত ১০ বছরে কেনা। এর বাইরে ভারত থেকে নতুন করে কেনা হচ্ছে ৬০০ বাস। যার মধ্যে গত মে মাস পর্যন্ত বিআরটিসির বহরে যুক্ত হয়েছে ২৫৩টি। সবক’টি নতুন বাস এলে সংস্থাটির বহরে সচল বাসের সংখ্যা দাঁড়াবে ১ হাজার ৪৬৪। তখনো ২৬ শতাংশ বাস অচল অবস্থায় থাকবে।

জানা গেছে, গত এক দশকে নতুন বাস-ট্রাক ক্রয়ে বিআরটিসিকে বিনিয়োগ করতে হয়েছে ১ হাজার ৬১২ কোটি টাকা। বিপুল এ বিনিয়োগের পরও লোকসান থেকে বেরোতে পারেনি রাষ্ট্রায়ত্ত পরিবহন সংস্থাটি। বাড়েনি যাত্রীসেবার মানও। ২০১৭-১৮ অর্থবছর বিআরটিসি লোকসান গুনেছে ২ কোটি ৯২ লাখ টাকা। ২০১০ সালে চীন থেকে ২৭৫টি বাস কেনে বিআরটিসি। ওই সময় বাসগুলো কিনতে ব্যয় হয় ১১৩ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। অভিযোগ রয়েছে, টাকার অঙ্ক বেশি দেখানো হলেও কম টাকায় অত্যন্ত নি¤œমানের বাসগুলো কেনা হয়েছিল। বর্তমানে সেগুলোর বেশিরভাগই নষ্ট হয়ে বিভিন্ন ডিপোয় পড়ে আছে। চীনের পর ২০১১-১২ অর্থবছর দক্ষিণ কোরিয়া থেকে কেনা হয় আরো ২৫৫টি বাস। এগুলো সংগ্রহ করতে বিআরটিসি ব্যয় করে ২৮১ কোটি ৫১ লাখ টাকা।

বিআরটিসির বহরে আর্টিকুলেটেড বাস যুক্ত হয় ২০১২ সালে। ৫৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে ৫০টি আর্টিকুলেটেড বাস কেনা হয়। একই বছর ভারত থেকে কেনা হয় ২৯০টি ডাবল ডেকার বাস। ডাবল ডেকার বাসগুলো কিনতে ৩০৩ কোটি টাকা খরচ করে বিআরটিসি। পরের বছর (২০১৩) ভারত থেকে প্রায় ৬০ কোটি টাকায় কেনা হয় আরো ৮৮টি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাস। সর্বশেষ ২০১৬ সালে ভারত থেকে ৬০০ বাস ও ৫০০ ট্রাক কেনার উদ্যোগ নেয় বিআরটিসি। এরই মধ্যে এসব বাস-ট্রাক সংস্থাটির বহরে যুক্ত হতে শুরু করেছে। ভারত থেকে এসব বাস-ট্রাক কিনতে ৭৯৮ কোটি টাকা খরচ হচ্ছে। সব মিলিয়ে গত ১০ বছরে ২ হাজার ৫৮টি বাস-ট্রাক কিনতে ১ হাজার ৬১২ কোটি টাকা ব্যয় করেছে সংস্থাটি।

বিপুল এ বিনিয়োগের পরও লোকসান থেকে বের হতে পারেনি বিআরটিসি। সংস্থাটির হিসাব শাখার তথ্যমতে, ২০১৭-১৮ অর্থবছর স্টাফদের বেতন-ভাতাসহ পরিচালন ব্যয় হয়েছে ২৫৬ কোটি ১০ লাখ টাকা। একই সময়ে সংস্থাটি রাজস্ব আয় করেছে ২৫৩ কোটি ১৭ লাখ টাকা। এ হিসাবে লোকসান হয়েছে ২ কোটি ৯২ লাখ টাকা। সবচেয়ে বেশি লোকসান করেছে বিআরটিসির যশোর ডিপো। ১৭ কোটি ৩১ লাখ টাকা আয় করতে গিয়ে এ ডিপো ব্যয় করেছে ১৮ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। অর্থাৎ ডিপোটি লোকসান করেছে ১ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। একইভাবে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে চট্টগ্রাম, নরসিংদী, বরিশাল, সিলেট, নারায়ণঞ্জ, সোনাপুর, গাবতলী, গাজীপুর, মিরপুর ডিপোও লোকসানে ছিল। লোকসান হয়েছে ঢাকা ও চট্টগ্রাম ট্রাক ডিপোতেও। এর মধ্যে ঢাকা ট্রাক ডিপো ৮৬ লাখ ও চট্টগ্রাম ট্রাক ডিপো ১০ লাখ টাকা লোকসান করেছে। বিআরটিসির টুঙ্গিপাড়া ডিপো ২৮ লাখ টাকার বেশি লোকসান করেছে গত অর্থবছরে।

২০১৭-১৮ অর্থবছর পরিচালন বাবদ ২৫৬ কোটি টাকা খরচ করেছে বিআরটিসি। এর বড় একটা অংশ চলে গেছে পুরনো যানবাহন মেরামতে। টাকার অংকে এর পরিমাণ ২৬ কোটি ৯৫ লাখ। এর মধ্যে হালকা মোটরযানের যন্ত্রাংশ (ব্যাটারিসহ) কিনতে ব্যয় হয়েছে ১২ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। হালকা মোটরযানের টায়ারের পেছনে আরো ১০ কোটি ৮ লাখ টাকা খরচ করেছে বিআরটিসি। একই সময়ে ভারী যানবাহন মেরামতে বিআরটিসির ব্যয় হয়েছে ৪ কোটি ৩২ লাখ টাকা।

এতোকিছুর পরেও বিআরটিসির যাত্রীসেবার মান একেবারেই নি¤œমানের। ভুক্তভোগিদের মতে, ঢাকা শহরে অফিস সময়ে যাত্রীরা বাধ্য হয়ে বিআরটিসির বাসে ওঠেন। দুরপাল্লার বাসগুলোতেও পর্যাপ্ত যাত্রী হয় না। বেশিরভাগ বাসই সময় মেনে চলে না। এজন্য যাত্রীরা বিরক্ত। তবে ঈদ মৌসুমে পরিবহন যান সঙ্কটে বিআরটিসি কিছুটা আয় করে।

জানা গেছে, বিআরটিসির বাস পরিচালনায় রুট পারমিট লাগে না। বাস-ট্রাক রাখার জন্য সারা দেশেই রয়েছে বিপুল পরিমাণ জায়গা। প্রয়োজনের তুলনায় কম হলেও জনবলও কম নয়। তার পরও গত অর্থবছর প্রতি ১০০ টাকা আয় করতে গিয়ে ১০১ টাকা ১৫ পয়সা খরচ করেছে বিআরটিসি। এজন্য বিআরটিসির সুযোগসন্ধানী কর্মকর্তা-কমচারীদের দুষছেন বিশেষজ্ঞরা।

বিআরটিসির একজন কর্মকর্তা জানান, আয়-ব্যয়ের দিক দিয়ে সর্বশেষ ২০১৪-১৫ অর্থবছর তুলনামূলক ভালো অবস্থানে ছিল বিআরটিসি। ওই অর্থবছর ২৩৪ কোটি টাকা আয়ের বিপরীতে ব্যয় হয়েছিল ২৩০ কোটি টাকা। পরের অর্থবছর (২০১৫-১৬) ২২৬ কোটি ৩৬ লাখ টাকা আয়ের বিপরীতে পরিচালন ব্যয় ২৫৮ কোটি। আর ২০১৬-১৭ অর্থবছর ২৬২ কোটি টাকা আয় করতে গিয়ে ২৬৭ কোটি টাকা ব্যয় করে সংস্থাটি।

গত ১০ বছরে বিআরটিসির বহরে দুই হাজারের বেশি নতুন বাস এলেও সংস্থাটির আয়ে এর তেমন কোনো প্রভাব পড়েনি। ২০০৭-০৮ সালে মাত্র ৩১৮টি বাস দিয়ে ১০৫ কোটি টাকা আয় করেছিল সংস্থাটি। আর গত অর্থবছর প্রায় দেড় হাজার বাস দিয়েও আয় আয় হয়েছে মাত্র ২৫৬ কোটি টাকা। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, এবার ভারত থেকে যে বাসগুলো আনা হয়েছে সেগুলো দিয়েও খুব বেশি সুবিধা করা যাবে না। কারণ ভারতীয় বাসগুলোও নি¤œমানের। বিশ্বের কোথাও এ বাসগুলো চলে না। ঢাকার যানজটের রাস্তায় এ বাসগুলো চললে কয়েক মাসের মধ্যেই বিকল হয়ে আগের মতোই ডিপোতে পড়ে থাকতে থাকতে একদিন ডাম্পিংয়ে চলে যাবে।

 

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন