ঢাকা, সোমবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৮ আশ্বিন ১৪২৬, ২৩ মুহাররম ১৪৪১ হিজরী

জাতীয় সংবাদ

জেগে ওঠা চরে নতুন বসতি

১ লাখ ৯৬ হাজার হেক্টর জমি

পঞ্চায়েত হাবিব | প্রকাশের সময় : ২৬ আগস্ট, ২০১৯, ১২:০১ এএম

নোয়াখালীর উড়ির চরে একটি বাড়ি নির্মাণ করেছে সিডিএসপি -সংগৃহীত


নদী ভাঙনের শিকার ভূমিহীন অতি দরিদ্র মানুষদের শহরমুখী হওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। এই প্রবণতা রোধে দেশের উপকূলীয় এলাকায় জেগে ওঠা নতুন ১ লাখ ৯৬ হাজার হেক্টর চরে প্রায় ২ লাখ ৭০ হাজার মানুষের নতুন বসতির ব্যবস্থা করেছে সরকার। ২৫ বছর ধরে পাঁচটি মন্ত্রণালয় ও ছয়টি সংস্থার যৌথ উদ্যোগে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হয়েছে। উপকূলীয় এলাকায় জেগে ওঠা চরে সিডিএসপি প্রকল্পের সবুজ বনায়ন ও বসতি স্থাপন করা হয়েছে। সিডিএসপি প্রকল্পের মাধ্যমে উপকূলীয় এলাকায় জেগে ওঠা ভূমিতে বসতি স্থাপনের বরাদ্দপত্র হাতে পেয়ে প্রতিটি দম্পতির মুখে এখন হাসি। সিডিএসপি প্রকল্প এলাকায় পানি উন্নয়ন বোর্ড উপকূলীয় বাঁধ নির্মাণ করেছে। তৈরী করেছে বনায়ন। এ প্রকল্প এলাকায় বসবাসকারী অনেক নারী হাঁস চাষ করে স্বাবলম্বী হয়েছেন।

পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী এ কে এম এনামুল হক শামীম এ বিষয়ে ইনকিলাবকে বলেন, উপকূলীয় এলাকায় জেগে ওঠা দেশের ১ লাখ ৯৬ হাজার হেক্টর নতুন চরে প্রায় ২ লাখ ৭০ হাজার ভূমিহীন মানুষের বসবাস ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়েছে। এ প্রকল্পটি পাঁচটি মন্ত্রণালয় ও ছয়টি সংস্থার যৌথ উদ্যোগে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে। তিনি বলেন, পরিকল্পনা অনুযায়ী, যৌথ মালিকানার মাধ্যমে নারীর ক্ষমতায়ন এবং পানি ব্যবস্থাপনা গঠনের মাধ্যমে নারীর কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রকল্প এলাকায় বনায়নের মাধ্যমে পরিবেশগত ভারসাম্য এবং চরাঞ্চলের মাটির স্থিতিশীলতা বৃদ্ধির ব্যবস্থা করা হয়েছে। ফলে, ওই এলাকায় কৃষি উৎপাদন বেড়েছে কয়েক গুণ। প্রকল্প গ্রহণের শুরুতে বেকার মানুষের কোনো আয় না থাকলেও বর্তমানে তারা কর্মসংস্থানের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হয়েছেন।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের মহাপরিচালক মো. মাহফুজুর রহমান ইনকিলাবকে বলেন, প্রকল্পটির সাফল্যের ধারাবাহিকতায় সিডিএসপি-৪ ও সিডিএসপি-৫ এর মধ্যে ৩ বছর মেয়াদী সিডিএসপি-ব্রীজিং প্রকল্প প্রণয়নের কাজ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এ প্রকল্পটি ২০২১ সালের ডিসেম্বরে সমাপ্ত হবে। সমন্বিত উন্নয়ন এবং নারীর ক্ষমতায়নে সিডিএসপি একটি রোল মডেল।

জানা গেছে, পাঁচটি মন্ত্রণালয় ও ছয়টি সংস্থার যৌথ উদ্যোগে দেশের উপকূলীয় চরের ভূমিহীন মানুষের বাসস্থান, দারিদ্র্য বিমোচন, স্বাস্থ্য, নিরাপদ জীবনমান নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে ১৯৯৪ সালে চর ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড সেটেলমেন্ট প্রকল্পের (সিডিএসপি) যাত্রা চট্টগ্রাম, ফেনী, নোয়াখালী ও লক্ষীপুর চার জেলায় শুরু করা হয়। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, ভূমি মন্ত্রণালয় ও বন বিভাগ। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে প্রধান বা লিড এজেন্সি হিসেবে কাজ করছে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড প্রকল্পটি কয়েকটি মন্ত্রণালয় যৌথভাবে বাস্তবায়ন করছে। এসব জেলায় জেগে উঠা উপকূলীয় চরে ভূমিহীন মানুষের বাসস্থান, দারিদ্র্য বিমোচন, স্বাস্থ্য, নিরাপদ জীবনমান নিশ্চিত করার চর ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড সেটেলমেন্ট প্রকল্প বা সিডিএসপির ৪টি প্রকল্পটির কাজ শেষ হয়েছে। দীর্ঘ ২৫ বছরে এসব জেলায় ১ লাখ ৯৬ হাজার হেক্টর উপকূলীয় এলাকায় নতুন চর জেগে ওঠেছে। উপকূলীয় এলাকায় জগে ওঠা চরে বাস্তবায়িত প্রকল্পের মাধ্যমে ৩৪ হাজার ১৬২টি অতি দরিদ্র পরিবারের মধ্যে ৪৪ হাজার ৪১০ একর ভূমি বিতরণ করা হয়েছে। এতে প্রায় ২ লাখ ৭০ হাজার ভূমিহীন মানুষের বসবাস ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সম্ভাবনাময় এই প্রকল্পটির ১ম, ২য় ও ৩য় পর্যায়ের সফল ধারাবাহিকতায় ৪র্থ পর্যায়ের কাজও নির্ধারিত সময়ে সম্পন্ন হয়েছে। সফল এ প্রকল্পটিতে অর্থায়ন করেছে বাংলাদেশ সরকার, নেদারল্যান্ডস সরকার, বিশ^ খাদ্য সংস্থা ও উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ফান্ড ফর এগরিকালচারাল ডেভেলপমেন্ট (আইএফএডি)।

সরকারের পাঁচটি মন্ত্রণালয় ও ছয়টি সংস্থার যৌথ উদ্যোগে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, ভূমি মন্ত্রণালয় ও বন বিভাগ। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে প্রধান বা লিড এজেন্সি হিসেবে কাজ করছে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড। প্রকল্পটিতে বেশ কয়েকটি মন্ত্রণালয় যৌথভাবে বাস্তবায়ন করছে বিধায় ভবিষ্যতে এমন প্রকল্পের সাথে সহযোগিতার করতে উন্নয়ন সহযোগীরা বেশ আগ্রহী।

প্রকল্পের অগ্রগতি প্রতিবেদন বলা হয়, প্রায় ১ লাখ ৯৬ হাজার হেক্টর উপকূলীয় এলাকায় নতুন জেগে ওঠা চরে প্রকল্পটির অবস্থান। এসব চরের মধ্যে রয়েছে. সিডিএসপি-১ আওতায় চর বাগারদোনা-২, চর মজিদ ও চর ভাটিরটেক, সিডিএসপি-২ আওতায় দক্ষিণ হাতিয়া, গাংচিল, চর এলাহী, মুহুরী, চর গাবতলি, চর আলগি, পোল্ডার ৫৯/৩ বি ও পোল্ডার ৫৯/৩ সি, সিডিএসপি-৩ আওতায় চর মরাদোনা, চর বাগারদোনা ও বয়ার চর, সিডিএসপি-৪ আওতায় নান্গুলিয়া, নলের চর, উড়ির চর, জিয়াউদ্দিন চর। প্রকল্পের ৪র্থ ফেজে ব্যয় হয়েছে ৬৩ হাজার ৩৬ কোটি ৯৭ লাখ টাকা।

প্রতি বছর গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা নদী অববাহিকায় এক বিলিয়ন টনের বেশি পলি জমা হয়ে সাগর উপকূলে চরাঞ্চলের সৃষ্টি হচ্ছে। সমুদ্র উপকূলে গজিয়ে ওঠা এসব নতুন ভূখন্ডে দেশের ক্রমবর্ধমান দরিদ্র মানুষের মৌলিক চাহিদা বাসস্থান ও কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে সরকারের পানি সম্পদ আওতায় উদ্যোগ গ্রহণ করে। সমন্বিত এই প্রকল্পের মাধ্যমে লাখ লাখ ভূমিহীন মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে দীর্ঘ প্রায় দুই যুগ ধরে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে বলে প্রকল্প সংশ্লিষ্টগণ জানান। সরকারী ও উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার পাশাপাশি বেশ কিছু এনজিও প্রকল্প এলাকায় তাদের কার্যক্রম সম্পন্ন করেছে। তারা প্রকল্প এলাকায় নতুন বসতিতে পুনর্বাসিত দরিদ্র নারী কর্মসংস্থান, হস্তশিল্প, কারুশিল্প, বনায়ন, মৎস্যচাষ, আইন ও মানবাধিকার, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও জলবায়ু পরিবর্তন, প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন, স্যানিটেশন, স্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা ইত্যাদিতে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে গড়ে তুলছে।

প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় ১লাখ ৮৭ হাজার ৫৯৪ হেক্টর এলাকা বন্যা ও ঘূর্ণিঝড় হতে রক্ষা পেয়েছে, নিষ্কাশন ব্যবস্থা উন্নতকরণ করা হয়েছে এবং কৃষি জমিতে সেচ সুবিধা প্রদান করা হয়েছে। দরিদ্র ও অতিদরিদ্র ভূমিহীন পরিবারের মধ্যে বসবাস ও চাষাবাদের জন্য ভূমি বিতরণ করা হয়েছে। চর এলাকার মানুষের জীবন মান উন্নয়নের জন্য যোগাযোগ ও সুরক্ষার ব্যবস্থার উন্নতি করা হয়েছে। প্রকল্প এলাকায় ৫৪৩.৯৮ কি:মি: গ্রামীণ রাস্তা, ৩৪১টি ব্রিজ/কালভার্ট, ১২৪ টিসাইক্লোন শেল্টার নির্মাণ করা হয়। এছাড়া ২ হাজার ৬২৮টি গভীর নলকূপ, ১৫ হাজার ৩৮৪টি স্যানিটারী ল্যাট্রিন/ পাবলিক ট্রয়লেট নির্মাণ করা হয়েছে। এ প্রকল্পের মাধ্যমে কয়েক লাখ মানুষকে পানি ও স্যানিটেশন সুবিধার আওতায় আনা হয়েছে।

এ বিষয়ে সিডিএসপির (বাপাউবো অংশ) প্রকল্প পরিচালক মো. শামসুদ্দোহা ইনকিলাবকে বলেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়নের মাধ্যমে উপকূলীয় এলাকার নদী ভাঙনের শিকার ভ‚মিহীন অতিদরিদ্র মানুষের জন্য গৃহ নির্মাণ ও পুনর্বাসনের মাধ্যমে দারিদ্র্য দূরীকরণ করা হয়েছে। তাদের উন্নত জীবনমান নিশ্চিতকরণ, জলবায়ু পরিবর্তন সহায়ক অবকাঠামো নির্মাণ এবং ভূমির উপর আইনগত অধিকার প্রতিষ্ঠা ও অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে। এতে নদী ভাঙনের শিকার ভ‚মিহীন অতি দরিদ্র মানুষদের শহরমুখী হওয়ার প্রবণতা হ্রাস করা সম্ভব হয়েছে। প্রকল্পটি সরাসরি দরিদ্র মানুষের দারিদ্র্য নিরসনে সহায়তা করায় এ রকম প্রকল্পে অর্থায়নের বিষয়ে উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার বিশেষ আগ্রহ রয়েছে। এধরণের প্রকল্পের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা প্রয়োজন।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (5)
Arif Arifzaman ২৬ আগস্ট, ২০১৯, ১:২২ এএম says : 0
খুবই ভালো একটা কাজ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ধন্যবাদ সরকারকে।
Total Reply(0)
নাহিয়ান ২৬ আগস্ট, ২০১৯, ১:২৩ এএম says : 0
এটা অবশ্যই আমাদের জন্য সুখবর। জেগে ওঠা চরে ভুমি হারানো মানুষদের পুনর্বাসন করা গেলে ভালোই হবে।
Total Reply(0)
মোঃ জামান হোসেন জন ২৬ আগস্ট, ২০১৯, ১:২৫ এএম says : 0
সবই আল্লাহর লিলা খেলা। তিনি চাইলে বসতিকে পানিতে বিলীন করে দিতে পারেন আবার সমুদ্রের বুকে বসতি জাগিয়ে দিতে পারেন। সুবহানাল্লাহ।
Total Reply(0)
জহির আল যাবের ২৬ আগস্ট, ২০১৯, ১:২৫ এএম says : 0
আল হামদুলিল্লাহ। আল্লাহ আমাদের সহায় হোউন।
Total Reply(0)
টাইগার মামুন ২৬ আগস্ট, ২০১৯, ১:২৬ এএম says : 0
নিঃসন্দেহের সুখবর।
Total Reply(0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন