ঢাকা, রোববার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৭ আশ্বিন ১৪২৬, ২২ মুহাররম ১৪৪১ হিজরী

সাহিত্য

নজরুলের বাল্যজীবন

শাশ্বতী মুখার্জী | প্রকাশের সময় : ৩০ আগস্ট, ২০১৯, ১২:০৪ এএম

বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম সাম্যবাদী কবি, মানবপ্রেম আর জাতীয়তাবাদী চেতনাকে আত্মায় লালন করে কবি তাঁর অজগ্র গান, আর সাহিত্য রচনায় ব্রতী হয়েছিলেন, মানবতার রুদ্ধ কপাটে আঘাত হেনে মানুষের মুক্তি সংগ্রামের চেতনাকে ত্বরান্বিত করতে তাঁর কবিতাগুলি যেন আগ্নেয়গিরি, প্লাবন ও ঝড়ের প্রচন্ড রুদ্ররূপ ধারণ করে বিদ্রোহী কবির মর্মজ্বালা প্রকটিত করেছেন। সেই কারণেই জাতি, ধর্ম, গোষ্ঠীর উর্দ্ধে একটি উচ্চারিত নাম, আমাদের অহংকারের এক অনন্য ঠিকানা। তিনি একাধারে কবি, সাহিত্িযক, সঙ্গীতজ্ঞ, সাংবাদিক, সম্পাদক, রাজনীতিবিদ, সৈনিক। অগ্নিবীণা হাতে তাঁর প্রবেশ, ধূমকেতুর মতো তাঁর প্রকাশ।
বিষের বাঁশি ও ভাঙনেরগান এর সুরে তরুণেরা তখন মাতোয়ারা।
১৮৯৯ খ্রিষ্টাব্দে ২৪শে মে ( ১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ই জৈষ্ঠ্য পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার চুরুলিয়া গ্রামে এক দরিদ্র মুসলিম পরিবারে কাজী নজরুল ইসলাম জন্মগ্রহণ করেন। পিতামহ কাজী আমিন উল­াহ ও মাতামহ তোফায়েল আলী ‹র পুত্র কাজী ফকির আহমেদের দ্বিতীয়া পতœী জাহেদাখাতুনের ষষ্ঠ সন্তান তিনি। তাঁর বাবা ছিলেন স্থানীয় এক মসজিদের ইমাম।
কাজী নজরুল ইসলামের ডাকনাম ছিল ‹ দুখু মিঞা, বাল্যকালে তিনি ‘তারা ক্ষ্যাপা নামেও পরিচিত ছিলেন, পরে ‘নুরু’ নামও ব্যবহার করেন, অনেকে তাঁকে ‘নজরআলি’ নামেও ডাকতেন।
তিনি স্থানীয় মক্তবে কোরান, ইসলাম ধর্ম, দর্শন, অধ্যয়ন করেন।
মাত্র নয় বৎসর বয়সে তিনি পিতৃহারা হন।
পারিবারিক অভাব অনটনের কারণে মাত্র দশ বৎসর বয়সে জীবিকা অর্জনের জন্য তার শিক্ষায় বাধা পড়ে।
১৯০৯ সালে তিনি মক্তব থেকে নিম্ন মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে মক্তবে শিক্ষকতা, হাজী পালোয়ানের কবরের সেবক ও আজানদাতা হিসাবে কাজ শুরু করেন। ইসলাম ধর্মের মৌলিক আচার - অনুষ্ঠানের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত হবার সুযোগ পান।
মক্তব, মসজিদ, মাজারের কাজে তিনি বেশিদিন ছিলেন না, বাল্যবয়সেই লোকশিল্পের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে একটি লেটো ( বাংলার রাঢ় অঞ্চলের কবিতা, সঙ্গীত ও নৃত্যের মিশ্র আঙ্গিক চর্চার ভ্রাম্যমাণ নাট্যদল) দলে যোগ দেন, তাঁর চাচা কাজী বজলে করিম চুরুলিয়া অঞ্চলের লেটো দলের ওস্তাদ ছিলেন, আরবি, ফারসি ও উর্দু ভাষায় তাঁর দখল ছিল, মিশ্রভাষায় গান রচনা করতেন। ঐ অঞ্চলের জনপ্রিয় কবি শেখ চকোর (গোদা কবি ), কবিয়া বাসুদেবের লেটো ও কবিগানের আসরে কবি নজরুল নিয়মিত অংশ গ্রহণ করতেন, এখানেই সাহিত্যচর্চা শুরু হয়, তিনি অল্পবয়সেই বহু নাটকের লোকসঙ্গীত রচনা করেন, যেমন - ‘চাষার সঙ’, ‘শকুনীবধ’, দাতা কর্ণ, ‘আকবর বাদশাহ, কবি কালিদাস, ‘বিদ্যাভূতুম, ‘রাজপুত্রের গান’, মেঘনাদবধ ইত্যাদি।
একদিকে মসজিদ, মাজার, মক্তব জীবন, অপরদিকে লেটো দলের বিচিত্র অভিজ্ঞতা নজরুলের সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে।
তাঁর এসময়ের কবিতা ---- ‘আমি আল­া নামের বীজ বুনেছি, এবার মনের মাঠে ফলবে ফসল, বেচবো তারে নিয়ামতের হাটে’।
১৯১০ সালে লেটো দল ছেড়ে রানীগঞ্জের সিয়ারসোল রাজ স্কুলে ভর্তি হন, অতঃপর এক বছর পর তিনি মঙ্গলকোট থানার মাথরুন স্কুলে পড়াশোনা করেন, আর্থিক সমস্যার কারণে তিনি পড়া ছেড়ে পুনরায় যোগ দেন বাসুদেবের কবিদলে,
১৯১২ - ১৩ সালে আসানসোল ছেড়ে ঘটনাচক্রে চলে আসেন প্রসাদপুরে, সেখানে বর্ধমানের অন্ডাল ব্রাঞ্চ রেলওয়ের বাঙালি খ্রিস্টান গার্ড সাহেবের খানসামা, পরে এম. এ. বখ্শের চা-রুটির দোকানে চাকরি। দোকানে বসে তিনি কবিতা, ছড়া রচনা করেন, সেই রচনা দেখে কাজী রফিজ উল­াহ তাঁর প্রতিভার পরিচয় পান।
অবশেষে আসানসোলের পুলিশ সাব ইন্সপেক্টর ময়মনসিংহের কাজী রফিজ উল­াহ ও তাঁর পতœী শামসুন্নেসা খানমের স্নেহ লাভ, ১৯১৪ খ্রিঃ ময়মনসিংহের দরিরামপুরে সপ্তম শ্রেণীতে ভর্তি হন, অষ্টম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হয়ে পুনরায় রাজ স্কুলে পড়াশোনা, ১৯১৭ খ্রিঃ মাধ্যমিকের প্রিটেস্ট পরীক্ষা না দিয়ে তিনি সেনাবাহিনীতে সৈনিক হিসাবে যোগ দেন।
নবম শ্রেণীতে পড়ার সময় একটি সত্য ঘটনা অবলম্বনে ১০৬ চরণের ‘ক্ষমা’ নামে দীর্ঘ কবিতা লেখেন যেটি ১৯১৯ সালে মুজফ্ফর আহমদ ‘মুক্তি’ নামে প্রকাশ করেন ত্রৈমাসিক বঙ্গীয় -মুসলমান সাহিত্য পত্রিকায়।
১৯১৬ খ্রিঃ রাজস্কুলের প্রধান শিক্ষক মৌলবি আবদুল গফুরের বিদায় উপলক্ষে ‘বিদায়’ কাব্যবাণী রচনা করেন। ‘করুণ গাথা’ নামে আরো একটি বিদায় কাব্যবাণী রচনা করেন প্রবীণ শিক্ষক ভোলানাথ কর্মকারের বিদায় উপলক্ষে। স্কুলজীবনে ‘চড়ুই পাখির ছানা’ ও চুরুলিয়ার প্রচলিত লোককথা অবলম্বনে ‘রাজার গড়’ ও রানীর গড় নামে দুটি কবিতা লেখেন।
বিদায় বেলায় সুরধুনী ধারার মত সুধার সাগর পড়ুক ঝরে - যত মলিন আঁধার কালো হোক সুধাময়।

 

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন