ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৫ অক্টোবর ২০১৯, ৩০ আশ্বিন ১৪২৬, ১৫ সফর ১৪৪১ হিজরী

জাতীয় সংবাদ

অনুসন্ধান ধামাচাপা

পানামা পেপার্স কেলেঙ্কারির বাংলাদেশ অংশ

বিশেষ সংবাদদাতা | প্রকাশের সময় : ১ সেপ্টেম্বর, ২০১৯, ১২:০০ এএম

অনেকটা ঘটা করেই ‘পানামা পেপার্স কেলেঙ্কারি’র অনুসন্ধান শুরু করেছিল দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। কিন্তু রহস্যজনক কারণে সাড়ে তিন বছরেও দৃশ্যমান হয়নি ওই ‘যৌক্তিক’ পরিণতি। পানামা পেপার্স কেলেঙ্কারি সম্পর্কে এখন কোনো তথ্যই প্রকাশ করছে না দুদক।

দুদকের নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র জানায়, ‘পানামা পেপার্স কেলেঙ্কারি’র বাংলাদেশ অংশটির কোনো অনুসন্ধানে এখন আর আগ্রহী নয় দুদক। যদিও ইকবাল মাহমুদের নেতৃত্বে গঠিত বর্তমান কমিশন ২০১৬ সালের দায়িত্ব নেয়ার পরপরই পানামা পেপার্স কেলেঙ্কারি (বাংলাদেশ অংশ) অনুসন্ধানের ঘোষণা দিয়ে চমক সৃষ্টি করে। পরবর্তীতে দুদক এ বিষয়ে আর কোনো তথ্য দিতে পারেনি।

সূত্রটি জানায়, ২০১৬ সালের এপ্রিলে ‘পানামা পেপার্স’ ১ কোটি ১৫ লাখ গোপন নথি প্রকাশ করে। আইজিআইজে’র কাছ থেকে প্রাপ্ত এসব নথি বিবিসি, গার্ডিয়ানসহ বিশ্বের ৭৮টি দেশের ১০৭টি সংবাদ মাধ্যম ফলাও করে প্রচার করে। প্রচারিত তথ্যে ২ লাখ ১৪ হাজারের বেশি কোম্পানি ও ব্যক্তির নাম উঠে আসে। তারা ‘মোসাক ফনসেকা’ নামক আইনি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সম্পদের তথ্য গোপন করে অপ্রদর্শিত অর্থ বিদেশে বিনিয়োগ করেছেন।

এর মধ্যে বাংলাদেশের বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান এবং প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম উঠে আসে। এ নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়। ‘পানামা পেপার্স কেলেঙ্কারি’র সূত্র ধরে আইসল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী সিগমুন্ডুর গুনলাউগসন পদত্যাগ করেন। তালিকায় সরাসরি নাম না থাকলেও পদত্যাগ করেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল চিলি শাখার প্রেসিডেন্ট গঞ্জালো দেলাভেউ। বিষয়টি নিয়ে খোলামেলা তদন্ত করতে না দেয়ায় সুইজারল্যান্ডের দুর্নীতি দমন বিশেষজ্ঞ মার্ক পিথও দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ান।

অথচ গোপন নথিতে উঠে আসা বাংলাদেশের অর্ধশতাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নাম থাকলেও তাদের কাউকে বিন্দুমাত্র বিব্রত করেনি। ইকবাল মাহমুদ দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে যোগদান করেই পানামা পেপার্স কেলেঙ্কারি বাংলাদেশ অংশটির বিষয়ে অনুসন্ধান চালানোর ঘোষণা দেন। বিভিন্ন দেশে অফসোর অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে বিনিয়োগকৃত অর্থ বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়েছে কি না, এ ক্ষেত্রে কোনো দুর্নীতি সংঘটিত হয়েছে কি না, এটি খতিয়ে দেখবে সংস্থাটি।

এ লক্ষ্যে উপ-পরিচালক এস এম আখতার হামিদ ভূঁইয়ার নেতৃত্বে তিন সদস্যের টিম গঠন করা হয়। অনুসন্ধান শুরুর এক বছরের মাথায় দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ পানামা পেপার্স কেলেঙ্কারির অনুসন্ধানকে ‘সর্বোচ্চ গুরুত্ব’ দেয়া হচ্ছে বলে জানান।

পরবর্তীতে এ নিয়ে তাকে আর কোনো বক্তব্য দিতে দেখা যায়নি। গত বছর ১৮ জুলাই দুদক পরিচালক গোলাম শাহরিয়ার চৌধুরী ইউনাইটেড গ্রুপের চেয়ারম্যান-পরিচালকদের জিজ্ঞাসাবাদ করেন। তবে অনুসন্ধান শুরুর সাড়ে ৩ বছর পার হলেও আলোর মুখ দেখেনি পানামা পেপার্স-এর অনুসন্ধান প্রতিবেদন।

এদিকে বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধান কমিটির সদস্যদের সঙ্গে গণমাধ্যমের কথা বলাও নিষিদ্ধ করে দুদক।
তবে নির্ভরযোগ্য সূত্র মতে, মৌখিক নির্দেশে কমিশন পানামা পেপার্স কেলেঙ্কারির অনুসন্ধানটি বন্ধ রাখা হয়েছে। এর আগে দুদক টিম এ সংক্রান্ত রেকর্ডপত্র বিশ্লেষণ করে নিশ্চিত হয় যে, গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি (জিএফআই)-এ প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৫ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ৩ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়েছে। আর পাচারের সঙ্গে সরকারদলীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি, তাদের পরিবারের সদস্য, অনুগত আমলা, দলীয় তহবিলে অর্থ দানকারী এসব পাচারের সঙ্গে জড়িত। এ বিষয়ে অনুসন্ধান চালালে অনেকের মুখোশ উন্মোচিত হয়ে পড়বে। তাই এটিকে মানুষের স্মৃতি থেকে মুছে দিতেই প্রতিষ্ঠানটি এ বিষয়ে কোনো আপডেট জানাচ্ছে না। এ প্রক্রিয়ায় গত সাড়ে ৩ বছর পানামা পেপার্স সংক্রান্ত কোনো আপডেট দুদকের পক্ষ থেকে গণমাধ্যমকে দেয়া হয়নি। তাছাড়া অধিকাংশ গণমাধ্যম সরকার-অনুগত বিধায় তারাও কোনো তথ্য প্রচার করেনি।

দুদক টিমের অনুসন্ধানে উঠে আসা তথ্য মতে, অফশোর কোম্পানির নামে কর ফাঁকি দিয়ে অর্থ পাচারের তালিকায় সরকারদলীয় একজন প্রভাবশালী নেতা এবং তার স্ত্রী-পুত্র-কন্যার নাম এসেছে। তারা ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ড অফশোর কোম্পানি ‘এসেস্টস কানেকশন লি:’ নামক প্রতিষ্ঠানের মালিক। ২০০৮ সালের ১২ মে, ওই নেতার ছেলের মালিকানাধীন ‘এল্ডার স্টার’ নামক একটি প্রতিষ্ঠান কিনেছেন বলে তথ্য পায় দুদক। ওই প্রতিষ্ঠানে রয়েছে সরকারদলীয় নেতার অংশীদারিত্ব। এর আগে ৪ কোটি টাকারও বেশি অর্থ পাচারের অভিযোগে দুদক ওই নেতার বিরুদ্ধে মামলা করে। ওই মামলায় কারাদন্ড হলে উচ্চ আদালতের আদেশে দন্ড স্থগিত হয়ে যায়।
দুদক সূত্রটি আরো জানায়, ‘সামিট ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড মার্কেন্টাইল করপোরেশন প্রা: লি:’র চেয়ারম্যান এবং পাঁচ পরিচালকের বেশ কিছু রেকর্ডপত্রও দুদকের হাতে আসে। এছাড়া ইউনাইটেড গ্রুপের চেয়ারম্যান ও পরিচালকদের অফশোর অ্যাকাউন্টের তথ্য মিলেছে। তাদের কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়।

‘বাংলাদেশ এসোসিয়েশন অব ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ’ সাবেক সভাপতি এ এম এম খান, খুলনার পাট ব্যবসায়ী দীলিপ কুমার মোদী, ‘সি পার্ল লাইন্স’র চেয়ারম্যান ড. সৈয়দ সিরাজুল হক, ‘বাংলা ট্রাক লিমিটেড’-এর মো. আমিনুল হক, নাজিম আসাদুল হক, তারিক ইকরামুল হক, ‘ওয়েস্টার্ন মেরিন’-এর পরিচালক সোহেল হাসানের রেকর্ডপত্রও দুদকের হাতে আসে। ‘মোমিন টি’-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক আজমত মইন, মাসকট গ্রুপের চেয়ারম্যান এফ এম জুবাইদুল হক, তার স্ত্রী সালমা হকের তথ্যও দুদক হাতে পায়। ‘সেতু করপোরেশন’-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহতাবউদ্দিন চৌধুরী, তার স্ত্রী উম্মেহ রব্বানা, ‘অমনিকেম লিমিটেড’ চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইফতেখারুল আলম, তার পুত্রবধূ ফওজিয়া নাজ, আবদুল মোনেম লিমিটেডের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ এস এম মহিউদ্দিন আহমেদ, তার স্ত্রী আসমা মোনেম, অনন্ত গ্রুপের শরিফ জাহির, ‘ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপ বিল্ডার্স’-এর ক্যাপ্টেন সোহাইল হাসান, বিবিটিএল’-এর পরিচালক এ এফ এম রহমাতুল্লাহ বারী, ক্যাপ্টেন এম এ জাউল, মির্জা এম ইয়াহইয়া, মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম, নজরুল ইসলাম, সৈয়দা সামিনা মির্জা এবং জুলফিকার হায়দারের রেকর্ডপত্র হাতে পায় দুদক।

এর মধ্যে আজমত মঈন, এফ এম জুবাইদুল হক, তার স্ত্রী সালমা হক, মাহতাবউদ্দিন চৌধুরীসহ ১১ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে দুদক টিম। জিজ্ঞাসাবাদে অন্তত ৪ জন দাবি করেছেন, পানামা পেপার্সে যে অর্থের তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে তা বাংলাদেশ থেকে বিদেশে যায়নি। বিদেশে উপার্জিত অর্থই সেখানে বিনিয়োগ করা হয়েছে। আরেকজন দাবি করেছেন, ইউরোপে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকৃত অর্থই ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ড অফশোর কোম্পানিতে লগ্নি করা হয়েছে।

অন্য একজন দাবি করেন, এটি একটি স্বতঃসিদ্ধ পদ্ধতি। এ পদ্ধতি অনুসরণের বিএনপি নেতা ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনও বিনিয়োগ করেছেন। তবে যেহেতু এ উপার্জনের সঙ্গে বাংলাদেশের কোনো সম্পর্ক নেই এবং এ দেশ থেকে কোনো অর্থ নেয়াও হয়নি, তাই অফশোর কোম্পানিতে বিনিয়োগের বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংককে অবহিত করার প্রয়োজনীয়তাও তারা উপলব্ধি করেননি।

সূত্র মতে, প্রভাবশালী ব্যক্তি ও পরিবারের সদস্যদের দায়মুক্তি দিতেই পুরো অনুসন্ধানটি পরিচালনায় কঠোর গোপনীয়তা অবলম্বন করে দুদক। পক্ষান্তরে রাজনৈতিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন করতেই সরকারের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের অফশোর কোম্পানির বিনিয়োগকে ‘অপরাধ’ প্রতিপন্ন করে ফলাও প্রচার করে দুদক।
‘পানামা পেপার্স কেলেঙ্কারি’র অনুসন্ধান সম্পর্কে জানতে চাইলে দুদক সচিব মুহাম্মদ দিলোয়ার বখত বলেন, এটি একটি স্পর্শকাতর ইস্যু। সর্বশেষ এটির কী অবস্থা রয়েছে, সেটি খোঁজ নিয়ে জানাতে হবে।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন