ঢাকা, বুধবার, ২৩ অক্টোবর ২০১৯, ০৭ কার্তিক ১৪২৬, ২৩ সফর ১৪৪১ হিজরী

সম্পাদকীয়

অর্থনীতির অপার সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে

কামরুল হাসান দর্পণ | প্রকাশের সময় : ৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৯, ১২:২২ এএম

বিশ্বের উন্নয়কামী প্রতিটি দেশ উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রার শীর্ষে পৌঁছার লক্ষ্যে দ্রুত এগিয়ে চলেছে। মুক্ত অর্থনীতির প্রতিযোগিতায় শামিল হওয়ার জন্য যত ধরণের উন্নয়নমূলক কর্মসূচী নেয়া প্রয়োজন, তারা তাই নিচ্ছে। একেক দশকে একেকটি দেশ বিশ্বে অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। এক দশক আগেও চীনের কথা খুব একটা শোনা যেত না। এখন বলা হয়, চীন বিশ্বের অন্যতম অর্থনৈতিক শক্তি। সাম্প্রতিক এক জরিপে অর্থনৈতিক শক্তির দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়েও দেশটি এগিয়ে। ভেতরে ভেতরে চীনের এই বদলে যাওয়া অর্থনীতিবিদদের কাছে অভাবনীয় ও বিস্ময়কর। তারা এখন ভবিষ্যদ্বাণী করছেন, আগামী বিশ্বে চীনই হবে অর্থনীতির মহাপরাশক্তি, একচ্ছত্র অধিপতি। ইতোমধ্যে তাদেরকে বলা হচ্ছে ‘ইকোনমিক সুপার পাওয়ার’। আইএমএফ-এর জরিপে যুক্তরাষ্ট্রের পরই চীন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনৈতিক শক্তির দেশ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। যদিও চীন তাদের উন্নতির বিষয়টি অর্থনৈতিক বিনয় দেখিয়ে আড়াল করতে চাচ্ছে। বলছে, যেভাবে বলা হচ্ছে আমরা অত উন্নতি করিনি। তাদের এই বিনয় প্রকাশের কারণ, তারা মনে করছে এতে বিশ্বমন্দার চাপ তাদের উপর পড়বে। অর্থনৈতিক সহযোগিতা পাওয়ার জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশ তাদের দিকে হাত বাড়াবে। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে গৃহযুদ্ধে বিধ্বস্ত সোমালিয়াও ক্রমশঃ উন্নতির দিকে। তাদের অর্থনীতির মূল শক্তি পশুসম্পদ, রেমিটেন্স ও টেলিকমিউনিকেশন্স। ইথোপিয়াকে বলা হয়, বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে দ্রুতগতির উন্নয়নশীল দেশ। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার মধ্যে তারা এতটাই উন্নতি লাভ করছে যে, আইএমএফ-এর হিসেবে ২০০৪ থেকে ২০০৯ সালে দেশটি শতকরা ১০ ভাগের উপরে অর্থনৈতিক উন্নয়ন সাধন করে স্থিত অবস্থা লাভ করে। ২০১২ সালে এসে তারা জিডিপি’র লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে শতকরা ৭ ভাগ। তারা আশা করছে, লক্ষ্যমাত্রার শতকরা ৬.৫ ভাগ তারা অর্জন করতে সক্ষম হবে। এভাবে আফ্রিকার অন্যান্য দরিদ্র দেশগুলোও এখন অর্থনৈতিক উন্নতির লক্ষ্যে এগিয়ে চলেছে। অর্থাৎ বদলে যাওয়া বিশ্ব অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতায় দরিদ্রতম দেশগুলোও তাদের সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহারের মাধ্যমে দ্রু শামিল হচ্ছে। সাড়ে চার দশক আগেও অর্থনৈতিক শক্তির দিক থেকে এশিয়ার চতুর্থ টাইগার হিসেবে পরিচিত সিঙ্গাপুরের বলতে গেলে কিছুই ছিল না। ৭১০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের ক্ষুদ্র এ দেশটি ১৯৬৩ সালে বৃটেনের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করে মালয়েশিয়ার সাথে যুক্ত হয়। ১৯৬৫ সালে সিঙ্গাপুরে বসবাসরত চাইনিজদের সাথে মালয়েশিয়ানদের দাঙ্গার সূত্র ধরে সংসদে ১২৬-০ ভোটে সিঙ্গাপুরকে মালয়েশিয়া থেকে আলাদা করে দেয়। সে সময়ের প্রধানমন্ত্রী লি কুয়ান ইউ আফসোস করে বলেছিলেন ‘এখন আমাদের কি হবে। কি করে বাঁচব।’ সিঙ্গাপুরের জমি নেই, চাষবাস করারও কোন উপায় নেই। এ অবস্থায় তারা স্বাবলম্বী হওয়ার জন্য পণ্য আমদানি-রপ্তানির উপর জোর দেয়। ভৌগলিক গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান কাজে লাগিয়ে বন্দরকে আমদানি-রপ্তানির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করে। বাজারভিত্তিক অর্থনীতি আঁকড়ে ধরে। এই অর্থনীতিই এখন তাদের মূলভিত্তি। তাদের মূলশক্তি আমদানিকৃত পণ্যের পরিশোধন এবং রপ্তানি। বিশ্বের মধ্যে তারা রপ্তানির দিক দিয়ে ১৪ নম্বর এবং আমদানির দিক থেকে ১৫ নম্বর দেশ। দুর্নীতিমুক্ত পরিবেশ, দক্ষ জনশক্তি, শক্তিশালী অবকাঠামো ও নিম্ন ট্যাক্স রেটের কারণে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগের দেশে পরিণত হয়েছে। অর্থাৎ প্রায় শূন্য ও দরিদ্রতম অবস্থা থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ কিভাবে দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেছে এবং উঠে আসছে উল্লেখিত দেশগুলোর উন্নয়নমুখী অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও পদক্ষেপ থেকে তার একটি চিত্র পাওয়া যায়। উন্নয়নকামী দেশ হিসেবে দ্রুত অগ্রসরমান অর্থনীতির বিশ্বে আমাদের অবস্থান ও সম্ভাবনাও অপার।

দুই.
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক অগ্রসরতার দিক থেকে বাংলাদেশকে ‘ইমার্জিং টাইগার’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে। বিশ্বের শক্তিধর দেশগুলো প্রায়ই বাংলাদেশের উন্নতির বিষয়টি স্বীকৃতি দিয়ে ইতিবাচক মন্তব্য করে। তাদের ঘন ঘন আগমণ এবং অর্থনৈতিক উন্নতির প্রতিবেদন থেকে বিষয়টি আঁচ করা যায়। বিনিয়োগ করার জন্যও তারা আগ্রহ প্রকাশ করছে এবং তা করছেও। অর্থনীতির অপার সম্ভাবনা এবং তাদের লাভ না থাকলে বাংলাদেশ নিয়ে এত আগ্রহ তাদের থাকত না। আবার ভৌগলিক গুরুত্বের দিক থেকে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপীর্ণ হওয়ায় ভূরাজনৈতিক কারণেও তারা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখতে আগ্রহী হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ওয়ান বেল্ট ওয়ান রুট-এর যে পরিকল্পনা তাতে বাংলাদেশের অবস্থান অপরিহার্য। পূর্বমুখী অর্থনীতি বিকাশের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে আয়ের বৈষম্য থাকলেও তারা অনুভব করতে পারে, বাংলাদেশ ক্রমাগত উন্নতির দিকে। একটি শ্রেণীর বিপুল বিত্ত-বৈভব, শান-শওকত দেখেও অনেকে সান্ত¦না পান। আমাদের উন্নতি না হোক, তাদের তো উন্নতি হচ্ছে এবং তারাই দেশের হর্তা-কর্তা। তবে দেশে যে খাদ্যাভাব নেই, এ বিষয়টি তারা অস্বীকার করে না। এমনকি যে ১১ লাখ রোহিঙ্গা অতিথি হয়ে রয়েছে, তাদের ভরণ-পোষণে হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ হলেও খাদ্যাভাব দেখা দিচ্ছে না। এ থেকে বোঝা যায়, দেশের অর্থনীতির ভিত্তিটি মজবুত হতে শুরু করেছে। তবে আয়তনের তুলনায় ১৭ কোটির মতো বিপুল জনসংখ্যার দেশে খাদ্যাভাব না থাকার বিষয়টি উন্নয়নের প্রাথমিক সূচক হলেও, এগিয়ে যাওয়ার সূচক নয়। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, আইনশৃঙ্খলার উন্নতি সর্বোপরি মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের মাধ্যমে এগিয়ে যাওয়াই মূল সূচক হিসেবে পরিগণিত হয়। তারপরও অর্থনৈতিক উন্নয়নের সূচক যে গতি লাভ করেছে, তাতে সন্দেহ নেই। দশকের পর দশক অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়েই অর্থনীতি এগিয়ে এই গতি লাভ করেছে। বিগত দশকগুলোতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা থাকলে বাংলাদেশ হয়ত এতদিনে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হতো। বিগত এক দশক ধরে বাংলাদেশের অর্থনীতি স্থিতিশীল থাকায় অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার হয়েছে। জিডিপি গড়ে ৬ হারে এগিয়েছে। যা অর্থনীতির স্থিতিশীলতার সূচক। এবারের বাজেটে জিডিপি’র লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ৮ নির্ধারন করা হয়েছে। এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে কি হবে না তা অর্থবছর শেষে বোঝা যাবে। তবে উন্নতির জন্য লক্ষ্যমাত্রা থাকতেই হবে, তাতে লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টা থাকে। বিগত বছরগুলোতে সরকার জিডিপির যে হার নির্ধারণ করে তা অর্জিত না হলেও কাছাকাছি যেতে পেরেছে। তারপর আবার নতুন করে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হার নির্ধারণ করেছে। এভাবে একটু একটু করে দেশের অর্থনীতি এগিয়ে যাচ্ছে। যেসব উন্নয়নমূলক প্রকল্পের কাজ চলছে সেগুলো পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়িত হলে জিডিপি যে গতি পাবে এবং নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জিত হবে, তাতে সন্দেহ নেই। বলা যায়, এখন যে গতিতে দেশের অর্থনীতি এগিয়ে চলেছে, তা দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোর চেয়ে এগিয়ে। সমস্যা হচ্ছে, সরকার প্রকল্প গ্রহণ করে ঠিকই, তবে সেসব প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দক্ষতা ও স্বচ্ছতার অভাব থাকে। এ কারণে একদিকে নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পের কাজ শেষ হয় না, অন্যদিকে প্রকল্পের বরাদ্দকৃত অর্থও অনেক সময় ফেরত যায়। আবার দুর্নীতির কারণে প্রকল্পের অর্থের অপচয় হয় এবং তাতে ত্রুটিও থাকে। এ কারণে অর্থনীতির গতি যেভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার কথা, সেভাবে পাচ্ছে না। অথচ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন হলে অর্থনৈতিক উন্নতি দ্রুত দৃশ্যমাণ হয়ে উঠত। দুঃখের বিষয়, এমন একটি প্রকল্প নেই যেটি নির্ধারিত সময়ে শেষ হয়ে উন্নয়ন কার্যক্রম শুরু করতে পেরেছে বা পারছে।

তিন.
বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি হতে পারে আবিষ্কৃত ও অনাবিষ্কৃত বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক সম্পদ। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এ সম্পদ আঁকড়ে ধরেই বাংলাদেশ হতে পারে এশিয়ার অন্যতম অর্থনৈতিক শক্তি। শুধু প্রয়োজন সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর উপলব্দি ও সম্পদের যথাযথ ব্যবহার। ইতোমধ্যে জিওলজিক্যাল সার্ভে অব বাংলাদেশ (জিএসবি) বিভিন্ন সমীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে মাটির নিচে কি পরিমাণ বিভিন্ন ধরনের মূল্যবান খনিজ সম্পদ রয়েছে, তা এখনও সঠিকভাবে নির্ণয় করা সম্ভব হয়নি। প্রায়ই মূল্যবান খনিজ সম্পদ আবিষ্কারের খবর আমাদেরকে বিস্মিত করে। যেমন বিস্মিত করেছে স¤প্রতি দিনাজপুরের হাকিমপুর উপজেলার (হিলি) মশিদপুর এলাকায় মূল্যবান আকরিক লোহার খনির সন্ধান। জিএসবি’র হিসাব অনুযায়ী, এই খনির দেড় হাজার থেকে দুই হাজার ফুট গভীরতায় এক থেকে তিন ফুট পুরুত্বে ম্যাগনেটিক মিনারেলস, হেমাটাইট, ম্যাগনেটাইট ও লিমোনাইট পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে খনির ১২০০ ফুট গভীরে রয়েছে চুনাপাথর। প্রথমবারের মতো লৌহ আকরিকের খনির আবিষ্কার দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই আবিষ্কারের ফলে বর্হিবিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমর্যাদা বেড়ে যাবে এবং আবস্থানও উন্নত হবে। বলা প্রয়োজন, ইতোমধ্যে বাংলাদেশে অত্যন্ত মূল্যবান বিভিন্ন খনিজ সম্পদের সন্ধান পাওয়া গেছে। গ্যাস, তেল, কয়লা ছাড়াও পাওয়া গেছে স্বর্ণের চেয়েও দামী ইউরেনিয়াম। অন্যান্য মূল্যবান খনিজের মধ্যে রয়েছে, চুনা পাথর, কঠিন পাথর, নুড়ি পাথর, কাচ বালি, হোয়াইট ক্লে, ব্রিক ক্লে, পিট, মিনারেলস সমৃদ্ধ বিচ স্যান্ড। ভূতাত্তি¡কভাবে বাংলাদেশ ‘বেঙ্গল ব্যাসিন’-এর বিরাট অংশ জুড়ে রয়েছে। এর উত্তরাংশ শতকরা ১২ ভাগ পাললিক পাথর, উত্তর ও উত্তর-পূর্বাংশের ৮ ভাগ প্লিস্টোসিন এবং উত্তর-পশ্চিম, মধ্য উত্তরাংশ ও পূর্বাংশ শতকরা ৮০ ভাগ বালি, পলি ও কাদা দ্বারা পরিবেষ্টিত। অর্থাৎ দেশের এই অংশ বিভিন্ন ধরনের খনিজ সম্পদের বেল্ট হিসেবে পরিচিত। ইতোমধ্যে জিএসবি দেশের ৪২ ভাগ ভূখণ্ডে যে জরিপ পরিচালনা করেছে, তাতে বিভিন্ন ধরনের খনিজ পদার্থ প্রাপ্তির উজ্জ্বল সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। এসব সম্পদ যথাযথভাবে আহরণ ও ব্যবহার করতে পারলে বাংলাদেশের অর্থনীতির চেহারা বদলে যাবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। বাংলাদেশকে যে ইমার্জিং টাইগার হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে, এর অন্যতম মূল কারণ আবিষ্কৃত ও অনাবিষ্কৃত মূল্যবান খনিজ সম্পদের ভাণ্ডার। বিশ্বের পরাশক্তিধর দেশগুলো যে ইউরেনিয়ামকে ব্যবহার করে পারমাণবিক শক্তি অর্জন করেছে, এর পর্যাপ্ত মওজুত বাংলাদেশে রয়েছে। ১৯৭৫ সালে মৌলভীবাজারে প্রথম ইউরেনিয়ামের সন্ধান মেলে। এরপর ১৯৮৫ সালে সিলেটের জৈন্তাপুরে এবং ১৯৮৯ সালে ময়মনসিংহের গারো পাহাড় পরিবেষ্টিত সোমেশ্বরী নদীতে ইউরেনিয়াম পাওয়া যায়। জিএসবি’র জরিপে পদ্মা, ব্রহ্মপুত্র, যমুনা এবং সিলেট ও ময়মনসিংহের নদীবাহিত বালুতে ভারি খনিজ ও আহরণযোগ্য ইউরেনিয়াম পাওয়ার কথা বলা হয়েছে। কয়েক বছর আগে, জিএসবি পদ্মা-যমুনার প্রায় ১০টি স্থানে ২০ মিটার গভীর থেকে বালু সংগ্রহ করে পরীক্ষা করে দেখেছে, আহরণযোগ্য ভারি খনিজ ও রাসায়নিক পদার্থের পরিমাণ প্রায় সাড়ে ৯ শতাংশ। বাণিজ্যিক ভিত্তিতে উৎপাদনের জন্য ৭ শতাংশ যথেষ্ট। ১ টন বালুতে ১ গ্রাম ইউরেনিয়াম পাওয়া গেলেই বাণিজ্যিকভাবে তা আহরণযোগ্য বলে বিবেচনা করা হয়। এই আহরণযোগ্য ইউরেনিয়াম ব্যবহার করে বাংলাদেশ ব্যাপক উপকৃত হতে পারে। বাংলাদেশ পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের অনুমতি পাওয়ায় ইউরেনিয়াম ব্যবহারের উজ্জ্বল সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। এতে ইউরেনিয়াম ব্যবহার করা হলে সাশ্রয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন যেমন সম্ভব, তেমনি জ্বালানি সংকটও অনেকটা কেটে যাবে। বেশ কয়েক বছর আগে সমুদ্র উপকূলের বালুতে অত্যন্ত মূল্যবান ভারি খনিজ পদার্থের সন্ধান পাওয়া যায়। এই খনিজের নাম দেয়া হয় ‘ব্লাক গোল্ড’ বা কালো সোনা। বিশেষজ্ঞরা সৈকতের বালু পরীক্ষা করে দেখেছেন এতে রয়েছে জিরকন (১ লাখ ৫৮ হাজার ১১৭ টন), রুটাইল (৭০ হাজার ২৭৪ টন), ইলমেনাইট (১০ লাখ ২৫ হাজার ৫৫৮ টন), লিউকক্সেন (৯৬ হাজার ৭০৯ টন), কায়ানাইট (৯০ হাজার ৭৪৫ টন), গারনেট (২লাখ ২২ হাজার ৭৬১ টন), ম্যাগনেটাইট (৮০ হাজার ৫৯৯ টন) এবং মোনাজাইট (১৭ হাজার ৩৫২টন)। এই বিপুল পরিমাণ মূল্যবান খনিজ আহরণ ও ব্যবহার করতে পারলে অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশের অবস্থান অনেক উন্নত হবে। এতো গেল প্রাকৃতিক সম্পদের অপার সম্ভাবনার কথা। এখন বলা দরকার সরকারের গৃহীত উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের কথা। সরকার বিগত প্রায় এক দশকের বেশি সময় ধরে অর্থনৈতিক উন্নয়নমূলক বেশ কিছু বড় বড় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। ১০০টি শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে। ইতোমধ্যে দুয়েকটির কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেছে। চট্টগ্রামে মিরের সরাইয়ে ৩০ হাজার একর জমিতে গড়ে উঠছে শতভাগ রপ্তানিমুখী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগরী। এতে দেশি-বিদেশি বড় বড় শিল্প প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগ করছে। এ বছরের শেষের দিকে এর উৎপাদন কার্যক্রম শুরু হতে পারে। এই শিল্পনগরী চালু হলে দেশের রপ্তানি যেমন বৃদ্ধি পাবে, তেমনি কর্মসংস্থানসহ অর্থনৈতিক উন্নয়নে নতুনমাত্রা যুক্ত হবে। এছাড়া পদ্মা সেতু হলে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সাথে যোগাযোগ সহজ ও দ্রুত হবে। এতে যাতায়াতাসহ পণ্য আনা-নেয়া এবং বাজারজাত সহজ হয়ে অর্থনীতিতে গতি আনবে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, পায়রা বন্দরসহ অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে এমন প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে আশা করা যায়, আগামী এক দশকে বাংলাদেশের অর্থনীতির চেহারা বদলে যাবে।

চার.
এ পর্যন্ত যেসব মূল্যবান খনিজ সম্পদের সন্ধান পাওয়া গেছে, তা যথাযথভাবে আহরণ ও ব্যবহারযোগ্য করে তুলতে পারলে এবং সরকারের গৃহীত অর্থনৈতিক উন্নয়নমূলক প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন হলে অর্থনীতিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হবে। এক ইউরেনিয়াম দিয়েই বাংলাদেশ অনেকদূর এগিয়ে যেতে পারে। বাংলাদেশে সরাসরি ইউরেনিয়াম ব্যবহারের আইন না থাকলেও, তা রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব। এর সাথে অন্যান্য খনিজ সম্পদ যুক্ত হলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সূচক কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, তা সহজেই অনুমেয়। এ কথা অনস্বীকার্য, এসব সম্পদ আহরণে আমাদের প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে। অর্থাৎ সামনে সুস্বাদু খাবার থাকা সত্তে¡ও খেতে না পারার সামর্থ্য আমাদের নেই। এই অসামর্থ্য কাটিয়ে ওঠার পরিকল্পিত উদ্যোগ যে আছে, তাও পরিলক্ষিত হচ্ছে না। আমরা কেবল সম্পদের খবর পাওয়ার আনন্দের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছি। সম্পদ ভোগ করার আনন্দের ব্যবস্থা করতে পারছি না। এ অবস্থা হলে সম্পদ আবিষ্কার করলেই কি আর না করলেই কি! প্রাকৃতিক সম্পদ আবিষ্কারের পর তা মাটির নিচে ফেলে রাখার কোন অর্থ হয় না। অর্থনীতিতে সমৃদ্ধ হতে হলে সরকারের গৃহীত প্রকল্প বাস্তবায়নের পাশাপাশি বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ ও ব্যবহারের উদ্যোগ নেয়া অপরিহার্য। যেহেতু আমাদের প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে, তাই বিদেশী প্রতিষ্ঠানকে চুক্তিভিত্তিতে এ সম্পদ আহরণের অনুমতি দেয়া যেতে পারে। এ ব্যবস্থা করতে পারলেও, আহরিত সম্পদ থেকে অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশ অনেক লাভবান হবে। সিঙ্গাপুর যদি শূন্য থেকে অতি দ্রুত এশিয়ার চতুর্থ টাইগারে পরিণত হতে পারে, তবে আমরাও বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণের ব্যবস্থা এবং তা কাজে লাগিয়ে হংকং, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান ও সিঙ্গাপুরের পর এশিয়ার পঞ্চম টাইগারে পরিণত হতে পারব। আগামী দশকে অর্থনীতির উদীয়মাণ শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে পারব।
darpan.journalist@gmail.com

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন