ঢাকা, শনিবার, ১১ জুলাই ২০২০, ২৭ আষাঢ় ১৪২৭, ১৯ যিলক্বদ ১৪৪১ হিজরী

সম্পাদকীয়

বন্দরের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে

| প্রকাশের সময় : ৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৯, ১২:২২ এএম

দেশের আমদানি-রফতানির শতকরা ৯০ শতাংশ চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দর দিয়ে সম্পাদিত হয়। দেশের মোট রাজস্ব আয়ের বড় অংশের যোগানদাতা চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউজ। চলতি অর্থবছরে চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউজ থেকে ৬০ হাজার কোটি টাকার বেশি রাজস্ব আদায়ের লক্ষমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে শুধুমাত্র মিথ্যা ঘোষণায় পণ্য আমদানী ও খালাসের পথ বন্ধ করতে পারলে এ অঙ্ক সহজেই প্রায় দ্বিগুণ হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন। মিথ্যা ঘোষণায় রাজস্ব ফাঁকি কমিয়ে আনার পাশাপাশি বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগগুলো বাস্তবায়ন সম্ভব হলে আগামী দশকের শেষে চট্টগ্রাম বন্দরের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা আরো কয়েক গুন বাড়তে পারে। চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দরে মিথ্যা ঘোষণায় পণ্য আমদানিতে একদিকে সরকার হাজার হাজার কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে, অন্যদিকে দেশে অবৈধ ও নিষিদ্ধ পণ্যের বিপণন ও ব্যবহার বাড়ছে এবং মিথ্যা ঘোষণা, আন্ডার ও ওভার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে বৈদেশিক মূদ্রায় হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে মিথ্যা ঘোষণায় আমদানি করা নিষিদ্ধ পণ্যের মধ্যে শত শত কোটি টাকার মাদকদ্রব্য, সিগারেট, ভায়াগ্রার মত পণ্য বোঝাই কনটেইনার কাস্টমস গোয়েন্দাদের হাতে ধরা পড়ছে। কয়েক মাস আগে প্রকাশিত আরেক রিপোর্টে দু’টি এগ্রোবেইজড কোম্পানী মিথ্যা ঘোষণা ও জালিয়াতির মাধ্যমে মাত্র ৩ কোটি ৪৭ লাখ টাকার এলসি খুলে ১ হাজার ৪০ কোটি টাকার পণ্য খালাস করা হয়েছে। এর মধ্যে সর্বশেষ ১২টি কন্টেইনার পরীক্ষা করে জালিয়াতি ধরা পড়লেও মোট ৭৮টি কন্টেইনারে এ পরিমান রাজস্ব ফাঁকির ঘটনা ফাঁস হয়। এই একটি মিথ্যা ঘোষণার জালিয়াতিতে অন্তত ২৬৭ কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

বন্দরে কাস্টমস জালিয়াতি এবং মিথ্যা ঘোষণায় পণ্য আমদানির সাথে একশ্রেনীর ব্যাংক কর্মকর্তা, বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগের উর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং বন্দরের একশ্রেনীর কর্মকর্তার যোগসাজশের অভিযোগ রয়েছে। জালিয়াত ব্যবসায়ী, অসৎ ব্যাংকার এবং দুর্নীতিবাজ বন্দর কর্মকর্তাদের যোগসাজশে দীর্ঘদিনে গড়ে ওঠা এই সিন্ডিকেট বন্দরকে কালো টাকার আখড়ায় পরিণত করেছে। রাজনৈতিক রাঘব বোয়ালদের সংশ্লিষ্টতা ছাড়া রাজস্ব খাতে দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপর্ণ বন্দর ও কাস্টমস হাউজে এমন তৎপরতা চলতে পারে না। চট্টগ্রাম বন্দরের অনিয়ম দুর্নীতি, অস্বচ্ছতা এবং জালিয়াতির ঘটনা মাঝে মধ্যে গণমাধ্যমে উঠে আসলেও এসব গুরুতর অভিযোগ এবং হাজার হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির উপযুক্ত তদন্ত এবং আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে দায়ীদের শাস্তি নিশ্চিত করার কোনো উদ্যোগ দেখা যায় না। তবে বর্তমান অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল দায়িত্ব গ্রহণের পর তাঁর কড়া নির্দেশনায় জাল জালিয়াতির উপর নজরদারি এবং মিথ্যা ঘোষণায় আমদানী করা পণ্যের কন্টেইনার আটকের সংখ্যা অনেক বেড়েছে। সেই সাথে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, রাজস্ব গোয়েন্দা এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের তৎপরতাও বেড়েছে। শত শত কোটি টাকার দুর্নীতি ও জাল জালিয়াতির সাথে প্রভাবশালী রাঘব বোয়ালদের নেপথ্য সংশ্লিষ্টতা থাকার কারণেই দীর্ঘদিন ধরে এরা ধরা-ছোঁয়ার বাইরে থাকতে সক্ষম হলেও এখন অর্থমন্ত্রীর কঠোর অবস্থানের কারণে তারা প্রমাদ গুনতে শুরু করেছে। সংশ্লিষ্ট দফতর এবং কর্মকর্তাদের নিয়মিত নজরদারী, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি জাল-জালিয়াতি শনাক্তকরণে আধুনিক প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও সাজ-সরঞ্জামের যোগান ও প্রতিস্থাপন পরিকল্পনার বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করতে হবে। সর্বাগ্রে বন্দর ও কাস্টমস কর্তৃপক্ষের দুর্নীতিগ্রস্তদের সরিয়ে দেয়ার পাশাপাশি তদন্ত সাপেক্ষে দোষিদের বিচারের আওতায় আনতে হবে।

বন্দর সংশ্লিষ্ট দুর্নীতির বিরুদ্ধে কর গোয়েন্দা এবং বন্দর কর্তৃপক্ষের সাম্প্রতিক সময়ের ভ‚মিকা খুবই ইতিবাচক। বন্দরের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা, গতিশীলতা নিশ্চত করতে এবং নজরদারি বাড়াতে বন্দর ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রযুক্তিসমৃদ্ধ সমন্বিত নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই। তবে নজরদারির নামে আমদানি-রফতানিকারকরা যেন কোনো প্রকার হয়রানির শিকার না হন সেদিকে বিশেষ নজর রাখতে হবে। চট্টগ্রাম বন্দরের পাশাপাশি মংলা ও বেনাপোল বন্দর দিয়ে পণ্য আমদানি রফতানী বৃদ্ধি পাওয়ার প্রেক্ষাপটে এসব বন্দরেও ইন্টার-কাস্টমস নেটওয়ার্কের আওতায় নজরদারি বাড়াতে হবে। বিশেষত ভারত থেকে পণ্য আমদানিতে বেনাপোল বন্দর ব্যবহৃত হওয়ায় এই বন্দরের ক্রমবর্ধমান দুর্নীতি, অনিয়ম ও অস্বচ্ছতা রাজস্ব খাতে বড় ধরনের বঞ্চনার শিকার হচ্ছে দেশ। বেনাপোলসহ স্থল বন্দর দিয়ে মূলত ভারত থেকে মাদকসহ অবৈধ পণ্যের অনুপ্রবেশ দেশে সামাজিক সঙ্কট তৈরী করছে। চট্টগ্রাম বন্দর নিয়ে অনেক পরিকল্পনা, মহাপরিকল্পনা ও ভবিষ্যদ্বাণী শোনা গেলেও গত ১০ বছরে বন্দরের কর্মক্ষমতা তেমন বাড়েনি। নতুন জেটি নির্মাণ, গেন্ট্রি ক্রেন সংগ্রহ, কন্টেইনার ইয়ার্ড নিমার্নের পাশাপাশি বন্দরের নিরাপত্তাসহ সামগ্রিক কর্মকান্ডে বিশ্বমানের সুযোগ সুবিধা, গতিশীলতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে নিয়মিত সফ্টওয়্যাার আপগ্রেডেশন হওয়া প্রয়োজন। বন্দর উপদেষ্টা কমিটির সর্বশেষ সভায় চট্টগ্রাম বন্দরের বে-টার্মিনালের কাজ দ্রুত শুরু করার তাগিদ দেয়া হয়েছে বলে জানা যায়। দ্রুততম সময়ে কাজ শেষ করার উপর বিশেষ জোর দিতে হবে। বন্দর ব্যবহারকারি এবং সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের কথা বিবেচনায় রেখেই বন্দরের সব কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। মিথ্যা ঘোষণায় পণ্য আমদানী এবং টাকা পাচারের সাথে জড়িত আমদানি-রফতানিকারক, সিএন্ডএফ এজেন্ট, ব্যাংকার ও কাস্টমস কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। রাজস্ব ফাঁকি, অবৈধ ও নিষিদ্ধ পণ্যের অনুপ্রবেশ এবং অযাচিত হয়রানি বন্ধে সম্ভাব্য সব প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন