ঢাকা, বুধবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৩ আশ্বিন ১৪২৬, ১৮ মুহাররম ১৪৪১ হিজরী।

ধর্ম দর্শন

আমলে সালেহ সমাচার

সত্যালোকের সন্ধানে

এ. কে . এম ফজলুর রহমান মুন্শী | প্রকাশের সময় : ১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯, ১২:০৪ এএম

যারা ঈমান এনেছে এবং নেক আমলসমূহ করেছে

রাসূলুল্লাহ (সা:) যে তালীম ও শিক্ষা নিয়ে আগমন করেছিলেন এর বুনিয়াদী মাসআলা হচ্ছে এই যে, মানুষের মুক্তি দু’টি জিনিসের উপর নির্ভরশীল। প্রথমত : ঈমান এবং দ্বিতীয়ত : আমলে সালেহ বা নেক আমল। বক্ষ্যমান নিবন্ধে আমলে সালেহের বিশ্লেষণ ও বয়ান স্থানলাভ করেছে। ঈমান হচ্ছে বুনিয়াদী বিধি-বিধানের উপর পরিপূর্ণ বিশ্বাস স্থাপন করার নাম। আর আমলে সালেহ হচ্ছে সেই বিধানসমূহ অনুসারে আমল করা ও বাস্তবায়িত করা। কোনও কথার শুধুমাত্র জ্ঞান ও বিশ্বাস কামিয়াবীর জন্য যথেষ্ট হতে পারে না। যতক্ষণ পর্যন্ত সে জ্ঞান ও বিশ্বাস মোতাবেক আমল করা না হয়। ইসলাম মানুষের নাজাত ও মুক্তিকে দুটি জিনিসের উপর নির্ভরশীল সাব্যস্ত করেছে। এ দুটি বস্তুু একটি অপরটির সম্পূরক। পার্থক্য শুধু এতটুকু যে, ঈমান হচ্ছে বুনিয়াদ এবং আমলে সালেহ হচ্ছে এর উপর প্রতিষ্ঠিত দেয়াল ও স্তম্ভ। যেভাবে একটি ইমারত ভিত্তি ছাড়া প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। তেমনি দেয়াল ও স্তম্ভ ছাড়া তা দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না।
ঈমান ও আমলে সালেহের উত্তম উদাহরণ হচ্ছে আর্কিমিডিসের সূত্র ও ছকের মত। ঈমানের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে উদ্ভাবনী নিময়-নীতি এবং পরিজ্ঞাত বিধানাবলীর সাথে সম্পৃক্ততা। যেগুলোর যথার্থতা স্বীকার না করলে আর্কিমিডিসের ছকগুলোর অস্তিত্ব বিল্প্তু হতে বাধ্য। কিন্তু যদি এসকল উদ্ভাবনী নিয়ম-নীতি এবং পরিজ্ঞাত বিধানাবলীকে স্বীকার করে নেয়া হয়, এবং সে মোতাবেক ছকগুলোর ব্যবহার না করা হয়, তাহলে নির্মাণ, ভূগোল, দূরত্ব ও পরিধি নির্ণয়ে আর্কিমিডিসের উদ্ভাবিত বিষয়ের কোন মূল্যই থাকবে না। এমনকি এর দ্বারা মানুষ আসল উদ্দেশ্যও সাধন করতে পারবে না। সাধারণ মানুষের ভূল বুঝাবুঝিকে দূর করার জন্য এ ব্যাপারে কূরআনুল কারীমের শিক্ষাকে বিস্তৃভাবে তুলে ধরা দরকার।
কূরআনুল কারীমের মূল শিক্ষার প্রতি গভীরভাবে তাকালে একথা অবশ্যই মেনে নিতে হবে যে, মানুষের মুক্তি ও কামিয়াবী অর্জনের অসংখ্য নির্দেশ আল-কুরআনে আছে। কিন্তুু এই নির্দেশাবলীর সকল স্থানেই ঈমান এবং নেক আমলকে পরস্পর নির্ভরশীল বলে সাব্যস্ত হয়েছে। মানুষের মুক্তি ও সফলতার জন্য আল- কুরআনে সর্বত্রই প্রথম ঈমানকে এবং তারপরে নেক আমলকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। পবিত্র কূরআনে ঘোষণা করা হয়েছে, “কালের শপথ! প্রকৃতই মানুষ ক্ষতিগ্রস্ততার মাঝে নিমগ্ন; কিন্তু তাদের ছাড়া, যারা ঈমান এনেছে এবং নেক আমল করেছে।” (সূরা আসর : রুকু-১)
কালের খাতায় ইতিহাসের পাতায় এমন বহু ঘটনার কথা সমুজ্জ্বল হয়ে রয়েছে যে, আল্লাহর উপর বিশ্বাসী সম্প্রদায়ের জন্য উন্নতি, অগ্রগতি এবং কামিয়াবীর দুয়ার সর্বদাই খোলা ছিল। এই বিশ্বাসের জন্য নেক আমলেরও প্রয়োজন আছে। অপর এক আয়াতে আল্লাহপাক ঘোষণা করেছেন, “অবশ্যই আমি মানুষকে সুন্দরতম আকৃতিতে পয়দা করেছি। তারপর তাকে নিম্নতম পর্যায়ে নিক্ষেপ করেছি। কিন্তুু ঈমানদার ও নেক আমলকারীদেরকে নয় : সুতরাং তাদের জন্য রয়েছে অফুরন্ত পুরস্কার।” (সূরা তীন : রুকু-১)
এই আয়াতের দ্বারা সুস্পষ্টভাবে বুঝা যায় যে, মানুষ স্বীয় কাজ-কর্মের দ্বারা নিম্ন হতে নিম্নতর পর্যায়ে অবনমিত হয়ে যায়। কিন্তু এই নিকৃষ্টতম পর্যায়ের কোনই শেষ সীমা নেই। অপকর্মের কূফল শুধু কেবল বর্তমান সময়ের জন্যই নয় বরং অনাগত ভবিষ্যতকে অন্ধকারময় করে তোলে। বস্তুুত : এখান হতেই ঈমানের সমুন্নত অবস্থা এবং নেক আমলের বিশেষ মর্যাদার কথা অনুধাবন করা যায়।
এ পর্যায়ে আল-কূরআনে ইহুদী সম্প্রদায়ের স্বভাবকে তুলে ধরে ঘোষণা করা হয়েছে যে, তারা দাবী করত জান্নাত কেবলমাত্র ইহুদীদের জন্যই নির্ধারিত। কিন্তু তাদের সেই দাবী যে ভিত্তিহীন এবং ভূয়া তার স্বরূপ উদঘাটন করে আল-কূরআনে ইরশাদ হচ্ছে, “কিন্তু যারা ঈমানদার এবং নেক আমলকারী, জান্নাত তাদেরই জন্য নির্ধারিত।” মোটকথা, জান্নাত লাভের ব্যাপারটি বংশ এবং সম্প্রদায় বিশেষের জন্যই নির্ধারিত নয়। বরং জান্নাত লাভের জন্য যা একান্ত প্রয়োজন, তাহলো ঈমান এবং নেক আমল। যে ব্যক্তি ঈমান আনয়নের পর নেক আমল করবে, সদানুষ্ঠানে নিজের জীবনকে অতিবাহিত করবে, তারাই হবে জান্নাতের হকদার। আল- কুরআনে স্পষ্টতই বলে দেয়া হয়েছে যে, “নিশ্চয়ই যারা ঈমান এনেছে এবং ইহুদী, সাবেঈন ও নাসারাদের মাঝে যারা আল্লাহ ও আখেরাতের উপর ঈমান এনেছে এবং নেক আমল করেছে, তাদের কোনই ভয় নেই এবং তারা চিন্তান্বিতও হবে না।” (সূরা মায়িদাহ : রুকু-১০)
এই আয়াতের মর্মকথাও একই যে, জান্নাত লাভের ব্যাপারটি বংশ এবং গোত্রের উপর নির্ভরশীল নয়। বরং আহকামে ইলাহীর উপর বিশ্বাস করা এবং সে মোতাবেক আমল করাই হচ্ছে জান্নাত লাভের একমাত্র উপায়। ঈমানহীনতা ও পাপ কাজের চূড়ান্ত ফল হচ্ছে আখেরাত বরবাদ হয়ে যাওয়া। পক্ষান্তরে ঈমান ও নেক আমলের ফল হচ্ছে দ্বীন ও দুনিয়ার মঙ্গল লাভ করা। মহান আল্লাহ পাকের এটাই হচ্ছে স্বাভাবিক কানুন। এই নিয়ম-নীতির মাঝে চুল পরিমাণ ব্যতিক্রমও হয় না। সুতরাং জুল-কারনাইনের জবানীতে আল্লাহপাক ঘোষণা করেছেন। “তিনি বলেছেন, যে ব্যক্তি গোনাহের কাজ করেছে, অচিরেই আমি তাকে আজাবে নিপতিত করব, তারপর তাকে তার প্রতিপালকের দরবারে প্রেরণ করা হবে, সুতরাং তাকে নিকৃষ্টতম আজাব দেয়া হবে, পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি ঈমান এনেছে এবং নেক আমল করেছে, তারজন্য রয়েছে সম্মানজনক প্রতিফল।” (সূরা কাহাফ : রুকু-১২)
অপর এক আয়াতে ঘোষণা করা হয়েছে- “যে ব্যক্তি নেক আমল করে এবং সে মুমিন, তবে তার পরিশ্রম ব্যথা যাবে না; এবং অবশ্যই আমি তার নেক আমলকে লিপিবদ্ধ করে রাখি।” (সূরা আম্বিয়া : রুকু-৭) অন্যত্র আল্লাহপাক আরো ঘোষণা করেছেন, “সুতরাং তাদের পরে তাদের এমন সব উত্তরাধিকারী হয়েছে যারা সালাতকে বরবাদ করেছে, নফসের খাহেশ অনুযায়ী পথ চলছে, তবে তারা পথভ্রষ্টতার সাথেই মিলিত হবে। কিন্তুু যারা তাওবাহ করেছে, ঈমান এনেছে এবং নেক আমল করেছে সুতরাং তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং তাদের উপর বিন্দুমাত্র ও জুলুম করা হবে না।” (সূরা মারইয়াম : রুকু-৪)
এই আয়াত এবং সমপর্যায়ের অন্যান্য আয়াত দ্বারা একথা সুস্পষ্ট প্রমাণিত হয়ে গেছে যে, জান্নাতের হকদার কেবল তারাই, যারা ঈমানদার এবং ঈমানের চাহিদা মোতাবেক নেক আমলের দ্বারা জীবনকে সুন্দরতম করে গড়ে তুলেছে। একই সাথে যাদের মাঝে এই যোগ্যতা নেই তারা আল্লাহপাকের রহমত ও বরকত হতেও বঞ্চিত থাকবে। আল-কুরআনে ঘোষণা করা হয়েছে, “এবং যারা ঈমান এনেছে ও নেক আমল করেছে, তারা জান্নাতের বাগানসমূহে অবস্থান করবে, এবং তারা আল্লাহর কাছে যা চাইবে, তাই লাভ করবে, এবং এটাই হচ্ছে শ্রেষ্ঠ মেহেরবাণী। আল্লাহর পক্ষ হতে এই খোশ-খবরী ঐ সকল বান্দাহদের জন্য যারা ঈমান এনেছে এবং নেক আমল করেছে।” (সূরা শু’রা : রুকু-২) আল- কুরআনের অন্যত্র ইরশাদ হচ্ছে, “অবশ্যই যারা ঈমান এনেছে এবং নেক আমল করেছে, তাদের জন্যই জান্নাতুল ফেরদাউসের আতিথ্য।” (সূরা কাহাফ : রুকু-১২) এরপর আল্লাহ পাক আরও ইরশাদ করেছেন, “যে ব্যক্তি স্বীয় পরওয়ারদিগারের সাথে মিলনের আশা রাখে তবে সে যেন নেক আমল করে এবং আল্লাহর ইবাদতে কাউকেও যেন শরীক না করে।” (সূরা কাহাফ : রুকু-১১)
ঈমান আনয়ন করার পর নেক আমল হতে মাহরুম থাকার কথা কল্পনাই করা যায় না। আসল কথা হচ্ছে এই যে, যেক্ষেত্রে আমলের স্বল্পতা দেখা দিবে সে ক্ষেত্রে পরিমাণ অনুপাতে ঈমানের দুর্বলতাও প্রকট হয়ে দেখা দেয়া স্বাভাবিক ব্যাপার। পক্ষান্তরে কোনও জিনিসের ওপর পূর্ণ বিশ্বাস গ্রহণের পর এর বিপরীত কাজ করা প্রকৃতিবিরুদ্ধ। আগুন তৃণখন্ডকে জ্বালিয়ে দেয়। একথা বিশ্বাস করার পর কেউ কি আগুনে নিজের হাত বাড়িয়ে দিতে পারে? কিন্তু অবুঝ শিশু যে আগুনের দাহিকা শক্তি সম্পর্কে অজ্ঞ, সে হয়ত আগুনে হাত বাড়িয়ে দিতে আগ্রহী হতে পারে। সুতরাং আমলের ক্ষেত্রে দুর্বলতাকেই ইহা প্রতিভাত করে।
একারণেই শুধু ঈমান অথবা শুধু আমলকে নয়, বরং সকল স্থানেই ঈমান এবং আমল উভয়কে মিলিয়েই নাজাতের পথ সুগম হতে বাধ্য। পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করা হয়েছে, “যারা ঈমান এনেছে এবং নেক আমল করেছে, তারা নেয়ামতপূর্ণ জান্নাতে অবস্থান করবে।” (সূরা হজ্জ : রুকু-৭) (চলবে)

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন