ঢাকা, বুধবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৩ আশ্বিন ১৪২৬, ১৮ মুহাররম ১৪৪১ হিজরী।

সম্পাদকীয়

হেরিটেজ ধ্বংসের হুমকি ও পর্যটনের সম্ভাবনা অগ্রাহ্য করার সুযোগ নেই

জামালউদ্দিন বারী | প্রকাশের সময় : ১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯, ১২:০৪ এএম

পরিবেশবান্ধব টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত ও নিরাপদ রাখতে একটি দেশের মোট আয়তনের শতকরা ২৫ ভাগ বনভ’মি থাকা প্রয়োজন। আমাদের মত ঘনজনবসতির দেশে এ শর্ত আরো কঠোরভাবে পালনীয় হয়ে দেখা দিয়েছে। এক শতাব্দী আগে যখন আমাদের জনসংখ্যা ২ কোটির কম ছিল, তখন আমাদের দেশে বনভ’মির আয়তন এখনকার দ্বিগুণের বেশি ছিল। একদিকে জনসংখ্যা বাড়ছে অন্যদিকে বনভ’মি ও আবাদযোগ্য ভ’মির পরিমান কমে যাচ্ছে। পুঁজিবাদি অর্থনৈতিক প্রতিরোগিতায় সওয়ার হয়ে যেনতেন প্রকারে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর কৌশল হিসেবে শিল্পায়ণ ও নগরায়ণের গ্যাঁড়াকলে পড়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। ইতিমধ্যে দেশের রাজধানী শহর বিশ্বের অন্যতম দূষিত ও বসবাসের অযোগ্য নগরী হিসেবে বিশ্ব র‌্যাংকিংয়ে জায়গা করে নিয়েছে। চলতি বছরের তালিকায়ও ঢাকা নগরী বিশ্বের বসবাসের অযোগ্য নগরীগুলোর তালিকায় ৩ নম্বরে স্থান পেয়েছে। গত বছর এ তালিকায় ঢাকা ছিল ২ নম্বরে এবার একধাপ এগিয়ে ৩ নম্বরে উঠেছে। বিশ্বের ১৪০টি সিটির মধ্যে এই মুহূর্তে মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি শহর গৃহযুদ্ধ ও আঞ্চলিক যুদ্ধে তছনছ হয়ে গেছে, যা এখানো অব্যাহত আছে। কিন্তু প্রত্যক্ষ কোনো ন্যাচারাল ক্যালামিটি বা যুদ্ধ-গৃহযুদ্ধের অবস্থায় না থেকেও চারপাশে নদী বিধৌত ও সবুজে বেষ্টিত নগরী ঢাকা কেন ইকোনমিক ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের গেøাবাল লিভেবিলিটি ইনডেক্সের সর্বনি¤œ স্তরে স্থান পাচ্ছে তা নিয়ে আমাদের সরকার বা নগর কর্তৃপক্ষের তেমন কোনো মাথাব্যথা আছে বলে মনে হয় না। আট বছরের অব্যাহত যুদ্ধে সিরিয়ার রাজধানী দামেস্ক অনেকটা ধ্বংসস্তুপের কাছাকাছি পৌছেছে। স্বাভাবিকভাবেই বসবাসের অযোগ্য শহরের তালিকার শীর্ষে বা প্রথম স্থানে রয়েছে দামেস্কের নাম। গত বছর এর পরের নামটিই ছিল ঢাকা। এ বছর সেখানে নাইজেরিয়ার লাগোসের নাম উঠেছে। লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপোলি বা ইয়েমের সানার চেয়েও ঢাকার অবস্থা খারাপ ! ভাবতেও কষ্ট লাগে। এসব র‌্যাংকিং তৈরী করতে যে সব সূচক ব্যবহার করা হয় তা একটি নগরী বা জনপদের সামগ্রিক নিরাপত্তা, গতিশীলতা ও গ্রহণযোগ্যতার মাত্রা নির্দেশ করে। এসব বিষয় হঠাৎ করেই কোনো শহরের উপর চেপে বসে না। দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম, নিয়ন্ত্রণহীনতা এবং প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার মধ্য দিয়ে এ অবস্থা তৈরী হয়েছে। অবস্থা এমন দাড়িয়েছে যে, বিদেশি গার্মেন্টস ক্রেতারাও এখন ঢাকায় আসতে চায় না। কোনো কোনো পশ্চিমা দেশ তাদের ভিসা অফিস ঢাকা থেকে প্রতিবেশি দেশগুলোতে স্থানান্তর করতে শুরু করেছে। দেশ যখন উন্নয়নের মহাসড়ক দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন আমাদের রাজধানী শহরটির এমন অমর্যাদা ও নিরাপত্তাহীন অবস্থা সরকার কিভাবে মেনে নেয়! এখনো ঢাকার চারপাশের নি¤œাঞ্চলগুলো ভরাট করছে ভ’মিদস্যুরা, এখনো ঢাকার চারপাশের নদীগুলোতে প্রতিদিন লাখ লাখ লিটার তরল রাসায়নিক শিল্পবর্জ্য নদীতে ফেলা হচ্ছে। শুধু রাজধানী শহরই নয়, এখন পুরো বাংলাদেশই বাসযোগ্যতার শঙ্কায় পতিত হতে শুরু করেছে। গেøাবাল ক্লাইমেট চেঞ্জের প্রভাব তো আছেই।আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের ভবিষ্যদ্বানী অনুসারে আগামী দশকের শেষে সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা দেড় মিটার বেড়ে গেলে বাংলাদেশের কয়েক কোটি মানুষ জণবায়ু উদ্বাস্তুতে পরিনত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ মহা বিপদ থেকে উত্তরণের পথ খোঁজা যখন অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে, তখনো উন্নয়ন, শিল্পায়নের নামে অপরিনামদর্শি খেলায় মেতে আছি আমরা। দেশের দক্ষিনাংশে সুন্দরবনের ভবিষ্যত নিয়ে দেশের নাগরিক সমাজ এবং দেশি-বিদেশি পরিবেশবাদিরা যখন উদ্বেগ প্রকাশ করছে, দেশের সরকার তখন উন্নয়নের একপাক্ষিক গান গেয়ে চলেছে। ইতিপূর্বে সরকারের কোনো কোনো মন্ত্রী-এমপির কণ্ঠে সুন্দরবনের ভবিষ্যত নিয়ে উদ্বিঘœ এবং রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে বিক্ষুব্ধ মানুষের বিরুদ্ধে তীর্যক মন্তব্য করতেও দেখা গেছে। মেঘে মেঘে অনেক বেলা গড়িয়ে গেছে। রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মানের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের আগে থেকেই সুন্দরবনের সন্নিহিত এলাকায় সিমেন্ট ক্লিঙ্কার ফ্যাক্টরি, শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডসগ নানা ধরনের ভারী শিল্প কারখানার নামে ভ’মি দখলের অনুমোদন দিয়ে এই বনের ভবিষ্যতকে হুমকির মুখে ঠেলে দেয়া হয়েছে।

প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্য বলতে শুধুমাত্র সোনার খনি, হীরা বা তেলের খনি, লোহার খনি এবং ব্যাপক শিল্পায়ণের মাধ্যমে অর্জিত সম্পদকেই বুঝায় না। মানুষ, ভ’মি, নদী, পাহাড়, বনভ’মি, হাওর-জলাভ’মি, সমুদ্রোপকুল দেশের অগ্রগণ্য সম্পদ। এসব সম্পদের উপর ভিত্তি করেই দেশে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান হয়, কৃষি উৎপাদন ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়, মানবসম্পদ তৈরী হয়, জনশক্তি রফতানির মাধ্যমে বৈদেশিক মূদ্রার রির্জাভ স্ফীত হয়। অনেক কিছুর ঘাটতি থাকা সত্বেও শুধুমাত্র প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও পর্যটনের উপর ভিত্তি করে কোনো কোনো দেশের মজবুত অর্থনৈতিক ভিত্তি গড়ে উঠার অনেক উদাহরণ আছে। যে সব সম্পদের উপর ভিত্তি করে একটি দেশ অর্থনৈতিক ভাবে উন্নত রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে বাংলাদেশে তার সবই রয়েছে। জনশক্তি রফতানী এবং তৈরী পোশাক খাতের মত শ্রমঘন শিল্পকারখানার সুযোগ সৃষ্টির কারণে অধিক জনসংখ্যা এখন বাংলাদেশের জন্য শাপে বর হয়েছে। পরিশ্রমী কৃষক-শ্রমিক, মিষ্টি পানির অসংখ্য নদনদী, উর্বর সমতল ভ’মি, জাতিগত ঐক্য ও সংহতি, অসাম্প্রদায়িক ধর্মীয় সংস্কৃতি, যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করার সমৃদ্ধ রাজনৈতিক ইতিহাস যে জাতির আছে তাদের পিছিয়ে পড়ার আর কোনো কারণ থাকতে পারে না। শুধুমাত্র আত্মঘাতি রাজনৈতিক সংস্কৃতি, অর্থনৈতিক লুণ্ঠন, সামাজিক বিশৃঙ্খলা এবং রাষ্ট্র পরিচালনার ব্যর্থতা থেকে সৃষ্ট নিরাপত্তাহীনতাই কেবল এমন জাতির সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রাকে স্তিমিত করতে পারে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সেটিই ঘটে চলেছে। আন্তর্জাতিক নদী আইনের বাধ্যবাধকতা অগ্রাহ্য করে উজানে বাঁধ নির্মান করে, পানি প্রত্যাহার করে ভাটির দেশ বাংলাদেশের নদনদীগুলোর গলা চেপে ধরেছে ভারত। পর্যাপ্ত পানি প্রবাহ না থাকায় নদীর বুকে পলি জমে নাব্যতা হারিয়ে ক্ষীন¯্রােতা বিশীর্ণ নদীগুলো এখন ভারতের খামখেয়ালিপনার শিকার হচ্ছে। কখনো পানি আটকে দিয়ে দেশের মধ্যভাগে মরুপ্রক্রিয়া সৃষ্টি করা হচ্ছে আবার কখনো হঠাৎ বাঁধের ¯øুইস গেট খুলে দিয়ে আকষ্মিক বন্যা, ফসলহানি ও তীব্র নদী ভাঙ্গনের শিকারে পরিনত করা হচ্ছে। সেই সাথে যুক্ত হয়েছে একটি স্থানীয় ভ’মিদস্যু, নদী দূষণ, ভরাট ও দখলবাজ শ্রেণী। ক্ষমতার কেন্দ্রে জেঁকে বসা নষ্ট রাজনীতির ধারক, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান এবং আদালতের দুর্নীতিগ্রস্ত ও দলবাজ বিচারকরা এদের লুন্ঠণ, দূষণ ও দখলবাজির ক্ষমতার উৎস। এভাবেই দখল, দূষণ, বিচারহীনতা ও নিরাপত্তাহীনতার খাঁচা বন্দি হয়ে অনিরাপদ ও বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ে দেশ, জনপদ ও সমাজ। যেখানে মরুভ’মির তপ্ত বালির উপর গড়ে ওঠা মরুময় শহরগুলো বিশ্বের মানুষের কাছে স্বর্গের মত নিরাপদ হয়ে উঠেছে, সেখানে সুজলা-সুফলা, ধনধান্য পুষ্প ভরা বাংলাদেশ কেন দূষিত, বিষাক্ত, অনিরাপদ ও বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠছে, তার হিসাব মেলাতে চায় না কেউ। বিশ্বের বৃহত্তম গাঙ্গেয় ব-দ্বীপ বাংলাদেশ। বিশ্বের দীর্ঘতম সমতল সমুদ্রসৈকত কক্সেজবাজার আমাদের, বিশ্বের বৃহত্তম ও বৈচিত্র্যময় ম্যানগ্রোভ বনভ’মি সুন্দরবন আমাদের, আছে অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভ’মি পার্বত্য চট্টগ্রাম, আমাদের আছে টাঙ্গুয়ার হাওর, হাকালুকি হাওর, চলন বিল, বাইক্কার বিলের বিস্তীর্ণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্যের অসামান্য ভান্ডার অকাতরে অকৃপণভাবে আমাদের মাঝে ঢেলে দিয়েছেন সৃষ্টিকর্তা। এসব সম্পদ ব্যবহার করে যে কোনো জাতি ঐশ্বর্য ও সমৃদ্ধির সাথে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে। আমরা পারছি না কেন? এই প্রশ্নটিকে সামনে রেখেই আমাদেরকে উত্তরণের পথ খুঁজতে হবে।
আমাদের উত্তরের ল্যান্ডলক্ড প্রতিবেশি দেশ নেপালে গত বছর প্রায় ২০ লাখ টুরিস্ট এসেছিল। এ খাত থেকে নেপালের আয় হয়েছে ২১০ কোটি মার্কিন ডলার। বলতে গেলে নেপালের বৈদেশিক মূদ্রা আয়ের আর তেমন কোনো বড় খাত নেই। হিমালয়ের পাদদেশ নেপালের পর্যটক আকর্ষণের মূল সম্পদ হিসেবে ধরা হয়। আর বাংলাদেশে পর্যটন আকষর্ণ করার মত স্থান নেপালের চেয়ে অনেক বেশি হলেও গত বছর বাংলাদেশের পর্যটন খাত থেকে আয় হয়েছে ১০ কোটি ডলারের কম। বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত, অন্যতম প্রাকৃতিক বিশ্ব ঐতিহ্য বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবন, বান্দরবানের নয়নাভিরাম মনোমুগ্ধকর দৃশ্য, কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতের অসাধারণ বৈশিষ্ট্য, আরেক বিশ্বঐতিহ্য টাঙ্গুয়ার হাওর, হাকালুকি হাওরের খবর বিশ্বের ভ্রমণ পিপাসু মানুষের জানা আছে। শুধুমাত্র নিরাপত্তাহীনতা ও প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও উপযুক্ত পরিকল্পনার অভাবে বিশ্বের ভ্রমণ পিপাসু মানুষ এসব অনন্য সাধারণ পর্যটনকেন্দ্রে পা রাখতে সাহস পায় না। উপরন্তু পশ্চিমা দেশগুলোর সাথে বছরে বাংলাদেশের হাজার কোটি ডলারের বাণিজ্যিক সম্পর্ক থাকার পরও তারা মাঝে মধ্যেই তাদের নাগরিকদের জন্য ভ্রমণ সতকর্তা জারি করছে। তারা প্রায়শ: বাংলাদেশে কার্গো নিষেধাজ্ঞা জারি করছে। বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, গুম-খুন, রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা-অনিশ্চয়তা, গণতন্ত্রের সংকট ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি নিয়ে কথা বলছে। মাঝে মধ্যেই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে শ্রমিক ও সাধারণ মানুষ। এসব ঘটনা-দুর্ঘটনার খবর বিশ্ব মিডিয়ায় প্রচার করে কোনো কোনো স্বার্থান্বেষী মহল বিশ্বের কাছে বাংলাদেশ সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা ও বার্তা দিচ্ছে। এভাবেই এক সময়ের ক্ষরা-বন্যা ও দারিদ্র্যপীড়িত বাংলাদেশ যখন অপার সম্ভাবনার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়াচ্ছে, তখন একটি মহল দেশকে আতঙ্কের জনপদে পরিনত করছে। গত বছর ভারতে বিদেশে পর্যটক এসেছিল এক কোটির বেশি, যা থেকে তাদের আয় হয়েছে প্রায় ৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ভারতে আসা পর্যটকদের এক-চতুর্থাংশ এবং নেপালে আসা পর্যটকদের প্রায় অর্ধেক স্থলপথে বা আকাশপথে সহজে স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশে আসতে পারে। এটা সম্ভব হলে পর্যটন খাত থেকে গার্মেন্টস রফতানির চেয়েও বেশি আয় করতে পারে বাংলাদেশ। বিশাল আয়তন, ভৌগলিক অবস্থান ও বৈচিত্রের পাশাপাশি তাজমহলের মত ঐতিহাসিক বিশ্বঐতিহ্যের কারণে ভারতে পর্যটন আর্কষণ একটি সাধারণ বাস্তবতা। তবে ক্ষুদ্রায়তনের মধ্যেও সারাবিশ্বের মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণের এমন বহুবিধ উপাচার বাংলাদেশ ছাড়া দক্ষিন এশিয়ায় আর কোনো দেশের নেই। একই বঙ্গোপসাগরের অংশিদার হওয়ার পরও দীর্ঘতম সমতল সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার শুধু বাংলাশেই পড়েছে। ইনানি সমুদ্রসৈকত, প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিন, একই সৈকতে সূর্যোদয় ও সূর্যান্ত দেখার অদ্বিতীয় ক’য়াকাটা সমুদ্র সৈকত শুধুই বাংলাদেশের। রয়েলবেঙ্গল টাইগার, চিত্রা হরিণ, ইরাবতি ডলফিনের ঐতিহ্য সমৃদ্ধ বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবনের বেশিরভাগ বাংলাদেশে। এই একটি প্রাকৃতিক সম্পদের উপর ভর করে যে কোনো দেশের অর্থনীতি মজবুত ভিত্তি লাভ করতে পারে। এ ছাড়া বাংলাদেশের প্রায় সর্বত্র ছড়িয়ে আছে অসংখ্য ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও পুরাকৃত্বি। মহাস্থানগড়-পাহাড়পুর, কান্তজি মন্দির, লালবাগ কেল্লা, ষাটগম্বুজ মসজিদ, রবীঠাকুরের কুঠিবাড়ি, লালনসাইয়ের মাজার, শাহজালাল-শাহপরানের মাজারসহ অসংখ্য ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ নির্দশন বছরে লাখ পর্যটক আর্কষণ করতে পারে। শুধুমাত্র সামাজিক-রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তাহীনতা ও অপপ্রচারের কারণে বাংলাদেশের পর্যটন সম্ভাবনা বাঁধাগ্রস্ত হচ্ছে। এই বিশাল অর্থনৈতিক সম্ভাবনা থেকে বাংলাদেশকে বঞ্চিত করতেই দেশে কৃত্রিম রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টির মাধ্যমে রাষ্ট্রবিরোধি শক্তির দ্বারা নিরাপত্তাহীনতার সৃংস্কৃতি জিইয়ে রাখা হচ্ছে কিনা তা খতিয়ে দেখা দেশের সরকার, রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের দায়িত্ব।

নিরাপত্তাহীনতা, অপপ্রচার ও অব্যবস্থাপনার কারণে দেশে শুধু আন্তর্জাতিক পর্যটনের বিশাল সম্ভাবনাই মার খাচ্ছে না, সেই সাথে আভ্যন্তরীণ পর্যটনের সম্ভাবনাও হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। ভ্রমণ এবং চিকিৎসার জন্য গত বছর ২০ লাখের বেশি মানুষ বাংলাদেশ থেকে ভারত ভ্রমণ করেছেন। প্রায় সমসংখ্যক বাংলাদেশি থাইল্যান্ড, নেপাল, মালয়েশিয়া-সিঙ্গাপুরসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে ভ্রমণ করেছেন। এ খাতে বাংলাদেশ থেকে শত শত কোটি ডলার বিদেশে চলে গেলেও বাংলাদেশের পর্যটনখাতের আয় ১০ কোটি ডলারের কম ! দেশের স্বাস্থ্যখাতে বছরে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করছে সরকার। বেসরকারি উদ্যোগেও দেশে বেশ কিছু বিশেষায়িত হাসপাতাল গড়ে উঠেছে। দেশে আন্তর্জাতিক মানের বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের সংখ্যাও নেহায়েত কম নেই। এরপরও প্রতি বছর দেশ থেকে হাজার হাজার এমন সব রোগি ভারতে যাচ্ছে যার চিকিৎসার সব রকমের ব্যবস্থা দেশেই আছে। একদিকে হাজার হাজার মানুষ বিনা চিকিৎসা-অপচিকিৎসায় মারা যাচ্ছে, অন্যদিকে দেশীয় হাসপাতাল ও চিকিৎসকদের প্রতি আস্থাহীনতার কারণে দেশে চিকিৎসার সুযোগ থাকা সত্বেও অনেক রোগি ভারতে চলে যাচ্ছে। আমাদের হাসপাতালগুলো অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির আখড়ায় পরিনত হওয়ার কারণে প্রতিবেশি দেশের মেডিকেল ট্যুরিজম রমরমা হয়ে উঠেছে। অথচ বাংলাদেশে যে সব অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার আছেন, তাদের উপর ভরসা করে দেশের স্বাস্থ্য সেবা স্বয়ংসম্পুর্ণ হয়ে উঠার পাশাপাশি বাংলাদেশও মেডিকেল ট্যুরিজমের বিশেষ আর্কষণ হয়ে উঠতে পারে। গত দুই দশকে বাংলাদেশ ওষুধশিল্পে স্বনির্ভরতা অর্জনে সক্ষম হয়েছে। এক সময় দেশের প্রয়োজনীয় ওষুধের বেশিরভাগই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হতো, এখন শতকরা ৯৮ ভাগই দেশে উৎপাদিত হচ্ছে এবং শত শত মিলিয়ন ডলারের ওষুধ ইউরোপ আমেরিকার বাজারে রফতানি হচ্ছে। ওষুধ শিল্পের এই অগ্রযাত্রা আমাদের হাসপাতাল ও চিকিৎসাব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য একটি মাইলফলক অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করতে পারে। তার আগে অবশ্যই স্বাস্থ্যসেবাকে দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনামুক্ত ও উন্নততর প্রযুক্তিসমৃদ্ধ করতে হবে। দেশের সরকারি চিকিৎসা ব্যবস্থা কোন অবস্থায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে তা সাম্প্রতিক একটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পর্দা কেনার দুর্নীতি থেকেই আঁচ করা যায়। সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা দামের পর্দা কিনতে ৩৭ লাখ টাকা ভরচ দেখানো হয়েছে। এভাবেই জনগনের ট্যাক্সের টাকা জনগণের স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নের বদলে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের লুটপাটের জালে বন্দি হয়ে পড়েছে। আমরা আমাদের রাজনৈতিক অধিকার রক্ষা করতে পারছি না। অর্থনৈতিক অধিকার ও সম্ভাবনা বাঁচিয়ে রাখতে পারছি না। নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা পাচ্ছি না। জনগণের ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদ সত্বেও দেশের অন্যতম প্রাকৃতিক সম্পদ ও নিরাপত্তাব্যুহ সুন্দরবনের উপর তথাকথিত উন্নয়নের খড়গ চলছে। ইতিমধ্যে ইউনেস্কোর ওর্য়াল্ড হেরিটেজ কমিটি সুন্দরবন নিয়ে যে সব উদ্বেগ প্রকাশ করেছে তা তেমন আমলে নেয়নি সরকার। গত জুলাই মাসে আজারবাইজানের রাজধানী বাকুতে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ কমিটি’র ৪৩তম বৈঠকে সুন্দরবন রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের জন্য বাংলাদেশ সরকারকে আগামী ফেব্রæয়ারী পর্যন্ত সময় দিয়েছে। সুন্দরবনে ভারত-বাংলাদেশ যৌথ উদ্যোগে নির্মানাধীণ কয়লাবিদ্যুত কেন্দ্র যে ধরনের পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহার করা হোক না কেন, এর জন্য সুন্দরবনের ভেতর প্রতিদিন শত শত নৌযানকে কয়লা, ডিজেলসহ নানা ধরনের রাসায়নিক ও কাঁচামাল পরিবহন করতেই হবে। এসব নৌযানের জ্বালানী ও বর্জ্যই এক সময় সুন্দরবনের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠবে। ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে শেলা নদীতে সাউদার্ণ স্টার নামের একটি ট্যাংকার সাড়ে ৩ লাখ লিটার জ্বালানী তেল নিয়ে ডুবে যাওয়ার পর সুন্দরবনের জীববৈচিত্রের উপর অভাবনীয় বিপর্যয় দেখা দেয়। সুন্দরবনে বিদ্যুৎকেন্দ্র বা ভারি শিল্পকারখারানা প্রতিষ্ঠার অনুমোদন রহিত করতে এই একটি উদাহরণই যথেষ্ট ছিল। এ প্রসঙ্গে দেশের মানুষের এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিবাদ ও সকর্তাকে আমলে নেয়নি সরকার। তবে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের অনেক পরে প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন শুরু করেও পায়রাতে চায়না উদ্যোগে দেশের বৃহত্তম তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র তার আনুষ্ঠানিক উৎপাদন শুরু করতে চলেছে। অর্থাৎ দেশে বিদ্যুতের চাহিদা পুরণে রামপালের বিকল্প উদ্যোগগুলো সাফল্যজনকভাবে এগিয়ে চললেও সুন্দরবনের ধ্বংসাত্মক তৎপরতা বন্ধ হচ্ছে না।

 

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন