ঢাকা, সোমবার, ১৪ অক্টোবর ২০১৯, ২৯ আশ্বিন ১৪২৬, ১৪ সফর ১৪৪১ হিজরী

আন্তর্জাতিক সংবাদ

কাশ্মীরে গ্রেফতার, গুম, হত্যা আর অস্বীকার এই চার অস্ত্রে চলছে নির্যাতন

ইনকিলাব ডেস্ক | প্রকাশের সময় : ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৯, ৫:২৯ পিএম

ভারতের অধিকৃত কাশ্মীর এখন বিশ্বের একমাত্র খোলা কারাগার। এক মৃত্যু উপত্যকা। টানা কারফিউ, নিরাপত্তার নামে কড়া অবরোধ। হাটবাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল বন্ধ। ঘর থেকে বেরুতে পারছে না মানুষ।
খাবার ফুরিয়ে গেছে, চিকিৎসার অভাবে প্রসূতিরা ছটফট করছে। রাস্তায় রাস্তায় টহল, একটু পরপর ব্যারিকেড। খাঁচাবন্দি প্রায় ৮০ লাখ বাসিন্দা।
বিক্ষোভ-সমাবেশে পেলেট বা ছররা গুলি ছুড়ে অন্ধ করে দেয়া হচ্ছে। বাড়ি বাড়ি চলছে তল্লাশি। রাতের আঁধারে তুলে নেয়া হচ্ছে তরুণ-যুবকদের। থানা আর সেনা ক্যাম্পে নিয়ে চালানো হচ্ছে অকথ্য নির্যাতন-নিপীড়ন।
পুলিশ হেফাজতে অব্যাহত রয়েছে গুম-হত্যার মতো চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা। আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো তথ্য-প্রমাণসহ অভিযোগ করলেও অস্বীকার করছে কর্তৃপক্ষ।
বিশ্লেষকরা বলছেন, মূলত ঢালাও গ্রেফতার, গুম, হত্যা আর অস্বীকারের খেলা- এই চার অস্ত্রে এক মাসেরও বেশি সময় ধরে পুরো উপত্যকার নিয়ন্ত্রণ করছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সরকার।
কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিল পদক্ষেপ ও উপত্যকাজুড়ে কারফিউ-অবরোধ আরোপের পরই কাশ্মীরিদের ওপর ঢালাও আটক-গ্রেফতার শুরু হয়। খ্যাতনামা রাজনীতিক, নেতাকর্মী, ব্যবসায়ী, আইনজীবী, সাংবাদিক, দিনমজুর কেউই বাদ যাচ্ছে না।
এএফপি জানিয়েছে, সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ ছাড়াই চার হাজারের বেশি মানুষকে আটক করা হয়েছে। কাশ্মীরের কারাগারগুলোতে জায়গা সংকুলান না হওয়ায় তাদেরকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ ও মহারাষ্ট্রের মতো রাজ্যের কারাগারগুলোতে।
বিচ্ছিন্নভাবে বিক্ষোভ-প্রতিবাদ হচ্ছে। কিন্তু বিক্ষোভ করার ‘অপরাধে’ অভিযান চালাচ্ছে নিরাপত্তা বাহিনী। বিশেষ করে রাতের আঁধারে বাড়ি বাড়ি তল্লাশি চালানো হচ্ছে। অবরোধ আরোপের পাঁচদিন পর (১০ আগস্ট) কাশ্মীরের দক্ষিণাঞ্চলের ইলেকট্রনিক্স মিস্ত্রি বসির আহমেদ দারের বাড়িতে হানা দিয়ে তাকে ধরে নিয়ে যায় ভারতীয় সেনারা। সেনা ক্যাম্পে নিয়ে তাকে অকথ্য ও পাশবিক নির্যাতন করা হয়।
আলজাজিরাকে এক সাক্ষাৎকারে ৫০ বছর বয়সী দার বলেছেন, আটকের ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তাকে দুই-দুইবার পেটায় সেনারা। প্রথমবার পেটানোর পর জ্ঞান হারিয়ে ফেললে বিদ্যুতের শক দিয়ে চেতনা ফিরিয়ে আনা হয়। তিনি জানান, এভাবে অজ্ঞান না পর্যন্ত লাঠি দিয়ে একটানা পেটাতে থাকে তিন সেনা।
সারারাত অচেতন থাকার পর সকালে জ্ঞান ফেরে, তখন উঠে দাঁড়ানোর ক্ষমতা ছিল না তার। দার বলেন, ‘পিঠ থেকে শরীরের নি¤œাংশ পর্যন্ত রক্তাক্ত। অসহনীয় ব্যথা আর যন্ত্রণায় বসতেও পারিনি।’
দারের দুর্ভাগ্যের এখানেই শেষ নয়। চারদিন পরই (১৪ আগস্ট) সেনারা ফের হানা দেয় তাদের বাড়িতে। এবার তার পরিবারের কয়েক মাসের খাদ্যের মজুদ, চাল এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন জিনিস সার ও কেরোসিন ঢেলে নষ্ট করে ফেলে। দারের মতো কাশ্মীরজুড়ে শতশত গ্রামের হাজার হাজার বাসিন্দা এপিকে জানায়, রাতে তাদের বাড়িতে অভিযান চালিয়েছে। কিন্তু এ ব্যাপারে সঠিক কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি কর্তৃপক্ষ।
১৬ বছর বয়সী কিশোর বুরহান নাজির। তার কাঁধে একটা ক্রিকেট বলের আকারের জখমের গর্ত। তিনি ভারতীয় বাহিনীর পাশবিক নির্যাতনের সর্বশেষ শিকার। এএফপিকে এক সাক্ষাৎকারে সেনাবাহিনীর ভয়াবহ নির্যাতনের বর্ণনা দিয়ে নাজির জানান, কাশ্মীর কাÐের একদিন পর ৬ আগস্ট এক বন্ধুর সঙ্গে বাইরে হাঁটতে গিয়েছিলেন তিনি। হঠাৎই সিআরপিএফ জওয়ানরা তাদেরকে ঘিরে ধরে।
নাজির বলেন, ‘এক সেনা আমার কাঁধে পেলেট গান লাগিয়ে গুলি করে। পেলেটের সেল বিঁধে যায়। আরেক সেনা আমাকে নিচে ফেলে বুটওয়ালা পা দিয়ে চেপে সেই শেল আমার কাঁধের মধ্যে আরও ঢুকিয়ে দেয়। আরেকজন আমার ঘাড় ভেঙে দেয়ার চেষ্টা করে। তারা ওখানেই হত্যা করতে চেয়েছিল।’ নাজিরের বাবা আহমেদ জানান, তার ছেলের কাঁধের গভীর ক্ষত থেকে চারশ’র বেশি ছররা গুলি বের করেছে ডাক্তার। কিন্তু সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এমন কোনো ঘটনার তথ্য তাদের কাছে নেই।
পুলিশ হেফাজতে মৃত্যু কাশ্মীরে ভারতীয় পুলিশ বাহিনীর আরেক অন্ধকার দিক। টিআরটি ওয়ার্ল্ড জানায়, চলতি মাসের ৩ সেপ্টেম্বর রাতে উত্তর কাশ্মীরের হান্দওয়ারা জেলায় জরিনা বেগমের বাড়ি তল্লাশি চালিয়ে তার ২৪ বছর বয়সী দিনমজুর ছেলে রিয়াজ আহমেদ ঠিকরেকে আটক করে নিয়ে পুলিশ।
পরদিন তাকে থানার এক টয়লেটে অচেতন অবস্থায় পাওয়া যায়। পুলিশ জানায়, আত্মহত্যা করেছে রিয়াজ। কিন্তু পরিবারের অভিযোগ, তাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। তারা জানান, তার মাথা ও সারা শরীরে জখমের চিহ্ন পাওয়া গেছে। লাশ গোসল দেয়ার সময় তার নাক দিয়ে রক্ত পড়ছিল।
সেনা-পুলিশের হাতে এখন পর্যন্ত কতজন মারা গেছে তার সঠিক সংখ্যা জানা যায়নি। তবে সংবাদমাধ্যমগুলো বলছে, টিয়ারগ্যাস ও পেলেট গুলির আঘাতে চারজন নিহত হয়েছেন। সর্বশেষ গত সপ্তাহে মারা যান ১৭ বছর বয়সী কিশোর আসরার খান। কিন্তু জম্মু-কাশ্মীরের গভর্নর সত্যপাল মালিক এ পর্যন্ত একজন মারা গেছে বলে জানিয়েছেন।
সেনা-পুলিশের জম্মু-কাশ্মীরের রাজধানী শ্রীনগরের অন্যতম শহরতলী আনসার সোরা। অনেকটা ছিটমহলের মতো এলাকাটির চারপাশে অসংখ্য পরিখা করেছে অধিবাসীরা। সেই সঙ্গে ইট, কাঠ আর তাঁরকাটা দিয়ে আটকে দিয়েছে এলাকায় প্রবেশের সব রাস্তা। প্রতিটি ব্যারিকেডের কাছে টায়ার জ্বালিয়ে সতর্ক অবস্থানে কয়েক ডজন করে তরুণ-যুবক।
উদ্দেশ্য, যেকোনো মূল্যে এলাকার ৫০০ পরিবার ও তাদের সদস্যদেরকে ভারতীয় বাহিনীর গ্রেফতারের হাত থেকে মুক্ত রাখা। কিন্তু প্রায় ৫০ হাজার সেনা-পুলিশ তাদের ঘিরে রেখেছে। প্রতিনিয়ত তাদের ওপর পেলেট গুলি আর টিয়ারগ্যাস ছুড়ছে। সোরার বাসিন্দা ফাজি বলেন, ‘বৃষ্টির মতো পেলেট গুলি পড়ছে। আমাদের কোনো অস্ত্র নেই। আছে শুধু আল্লাহ নাম।’ তিনি আরও বলেন, ‘লোকে নরকের কথা শোনে, আর আমরা নরকের মধ্যে বাস করছি। ওরা আমাদের নিশ্চিহ্নত করার চেষ্টা করছে।’

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (1)
মুন্সী আরিফ ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৯, ৭:৪৯ পিএম says : 0
ইসলাম জিন্দা হোতা হায় হর কারবালা কি বাদ। স্বাধীনতাই যেন হয় কাশ্মীরের মুসলমানদের পুরস্কার আর সমগ্র ভারত জুড়ে যেন অবারও জ্বলে উঠে ইসলামের আলো।
Total Reply(0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন