ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৫ অক্টোবর ২০১৯, ৩০ আশ্বিন ১৪২৬, ১৫ সফর ১৪৪১ হিজরী

সম্পাদকীয়

প্রধানমন্ত্রীর সঠিক সিদ্ধান্ত

| প্রকাশের সময় : ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৯, ১২:০১ এএম

বিলম্বে হলেও ছাত্রলীগের সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রব্বানীকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। তাদের জায়গায় ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে যথাক্রমে আল-নাহিয়ান খান ও লেখক ভট্টাচার্যকে। গত শনিবার গণভবনে আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সংসদের সভায় দলের সভানেত্রী শেখ হাসিনা ছাত্রলীগের দুই শীর্ষ নেতাকে বাদ দেয়ার কথা বলেন এবং তাদের স্থলাভিসিক্তদের নাম ঘোষণা করেন। গত ৭ সেপ্টেম্বর আওয়ামী লীগের যৌথসভায় ছাত্রলীগের কর্মকান্ডে ক্ষুদ্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী বর্তমান কমিটি ভেঙ্গে দেয়ার কথা বলেছিলেন। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের জানিয়েছেন, ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে দিয়ে ছাত্রলীগের কার্যক্রম চালানো হবে। পরে সম্মেলনের মাধ্যমে নতুন নেতৃত্ব গঠন করা হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক নেত্রী ও অভিভাবক। সেই হিসাবে ছাত্রলীগের বিষয়ে যথোপযুক্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার এখতিয়ার তিনি সংরক্ষণ করেন। ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে গত কিছুদিন ধরে যেসব অভিযোগ শোনা যাচ্ছিল এবং কিছু প্রমাণও মিলছিল তার প্রেক্ষিতে তাদের সরিয়ে দেয়ার বিকল্প ছিল না। প্রধানমন্ত্রী সেই কাজটিই করেছেন। তিনি অত্যন্ত যৌক্তিক ও সঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছেন। এজন্য অকুণ্ঠ ধন্যবাদ তার প্রাপ্য। এ সিদ্ধান্তের ইতিবাচক প্রভাব আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী সংগঠনগুলোর ওপর পড়বে বলে আশা করা যায়। অতীতে ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে এভাবে সরিয়ে দেয়া হয়েছে, এমন নজির বিরল। এই বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে প্রধানমন্ত্রী সর্ব মহলে প্রশংসার অধিকারী হয়েছেন।
আওয়ামী লীগ লাগাতার তিন মেয়াদে ক্ষমতায় রয়েছে। প্রথম মেয়াদে ক্ষমতাসীন হওয়ার পর পরই ছাত্রলীগের অনাচার, অপকর্ম ও অপরাধমূলক তৎপরতা ব্যাপক আকার ধারণ করে। ছিনতাই, চাঁদাবাজি, কমিশনবাজি, টেন্ডারবাজিতে মানুষ অতীষ্ট হয়ে পড়ে। এনিয়ে সর্ব মহলে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হয়। তখন বিভিন্ন সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অসন্তোষ ও বিক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। ছাত্রলীগ নেতাদের সব রকমের অনাকাঙ্খিত কাজ থেকে দূরে থাকার আহবান জানান। এমন কি শেষ পর্যন্ত চরম বিরক্তি প্রকাশ করে ছাত্রলীগের সাংগঠনিক নেত্রীর পদ ও অভিভাবকত্ব ত্যাগ করার ঘোষণা দেন। দু:খজনক হলেও বলতে হচ্ছে, এত কিছুর পরও ছাত্রলীগ ও এর নেতাদের স্বভাবের এতটুকু পরিবর্তন হয়নি। আওয়ামী লীগের দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর ছাত্রলীগের দৌরাত্ম্য ও এর নেতাদের অসৎ কর্ম আরো বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতাকালে ছাত্রলীগ ও এর নেতারা সীমা অতিক্রম করে গেছে। শোভন ও রব্বানীর বিত্তবৈভব, জীবনাচার, বেপরোয়া অর্থলিপ্সা ইত্যাদি তার প্রমাণ দেয়। এই দুই প্রধান নেতার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের মধ্যে রয়েছে: চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, মাদকব্যবসা ও সেবন, বিরোধী মতাদর্শীদের অর্থের বিনিময়ে অনুপ্রবেশ ঘটানো, স্বেচ্ছাচারিতা, ত্যাগী নেতাদের অবমূল্যায়ন, দুপুর পর্যন্ত ঘুমানো, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থের ৬ শতাংশ চাঁদা দাবি, আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতাদের অগ্রাহ্য করা ইত্যাদি। এই দু’ নেতার জাকজমকপূর্ণ জীবনযাপনের চিত্র পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হওয়ার আগে তাদের জীবনযাপন এতটা লাক্সারিয়াস ছিলনা। পদ লাভ করার পর যেন, আলাদিনের চেরাগের বদৌলতে তাদের জীবনচিত্র সম্পূর্ণ পাল্টে যায় দামী গাড়ি, উচ্চ ভাড়ার ফ্লাট বাড়িতে বসবাস, মূল্যবান আসবাবপত্র, উত্তম খাওয়া দাওয়া, চলাফেরা ও পোশাক-আশাক থেকে মনেই হয় না তারা ছাত্র। অথচ এই ছাত্রলীগেরই পাকিস্তান আমলের শীর্ষ নেতাদের কথা আমরা অনেকেই জানি, যারা হলে থাকতো, হলের খাবার পেতো, দু’তিন সেটের বেশি পোশাক-আশাক তাদের ছিল না। অতিসাধারণভাবে তারা জীবন অতিবাহিত করতো। অনেকে টিউশনি, সংবাদপত্রসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে পার্টটাইম কাজ করে প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান করতো। চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, কমিশনবাজি এবং অনৈতিক পন্থায় অর্থ উপার্জনের কথা তাদের কল্পনায়ও আসতো না। সেই ছাত্রলীগ ও এর নেতাদের আজকের অবস্থা থেকে একই সঙ্গে চরম লজ্জা ও বিরক্তি উৎপাদিত হয়। এ ধরনের সংগঠনের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা উচিৎ কিনা, সে প্রশ্ন দেখা দেয়।
ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিভিন্ন সময় বলেছেন, উচ্চ নৈতিক আদর্শ এবং অতি সাধারণ জীবনযাপনই হোক তোমাদের জীবনের আদর্শ। এটাই হওয়ার কথা। কিন্তুু ব্যতিক্রমই আমরা লক্ষ্য করছি। তিনিও করছেন। এ অবস্থার পরিবর্তন হওয়া জরুরি। অনেকে মনে করেন, ছাত্ররাজনীতি বন্ধ করে দেয়া উচিৎ। অনেকে ছাত্র সংগঠনকে রাজনৈতিক দলের সহযোগী সংগঠন হিসাবে স্বীকৃতি না দেয়ার কথা বলেন। বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের মধ্যে অনৈতিকতার চর্চা, সন্ত্রাস, অর্থলিপ্সা ইত্যাদির অবস্থিতি এসব মতামতের কারণ। আদর্শবাদের অনুসরণ ছাড়া রাজনীতি যেমন সুষ্ঠু ও স্বচ্ছভাবে বিকশিত হতে পারে না, তেমনি ছাত্র রাজনীতিও কালিমামুক্ত হতে পারেনা। উচ্চ নৈতিকতা ও নির্লোভ ও হিতৈষি রাজনীতির চর্চা ব্যতীত এটা হতে পারে না। সব ছাত্র ও রাজনৈতিক সংগঠনে আদর্শবাদের আবাদ বাড়াতে হবে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ একাজটি শুরু করে দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করতে পারে। আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী সংগঠনগুলোতে নীতি-আদর্শের প্রতিষ্ঠা ঘটানো গেলে অনেক অন্যায়-জুলুম থেকে মানুষ মুক্ত থাকতে পারবে। তেমনি এসব সংগঠনের জনভিত্তি আরো শক্ত ও দৃঢ় হবে। অন্যদিকে অন্যান্য দল ও সংগঠনেও এর ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া হবে। যে কোনো অপরাধ, দুর্নীতি, দুষ্কৃতি ও নৈতিক স্খলনকে শাস্তির আওতায় আনতে হবে। এক্ষেত্রে ছাড় দেয়া যাবে না। ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে সরিয়ে দেয়া হয়েছে কিছু অভিযোগের প্রেক্ষিতে। এটাই এর একমাত্র প্রতিকার হতে পারে না। এখন অভিযোগগুলো তদন্ত করে দেখতে হবে। প্রয়োজনে তাদের গ্রেফতার করতে হবে। আইনী প্রক্রিয়ায় তাদের অভিযোগ প্রমাণিত হলে এবং উপযুক্ত শাস্তি হলে নজির সৃষ্টি হবে। এর শুভ প্রভাব সর্বত্র প্রতিফলিত হবে।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন