ঢাকা, সোমবার, ১৪ অক্টোবর ২০১৯, ২৯ আশ্বিন ১৪২৬, ১৪ সফর ১৪৪১ হিজরী

সম্পাদকীয়

সড়ক-মহাসড়ক আগে মসৃণ ও নিরাপদ করতে হবে

| প্রকাশের সময় : ৮ অক্টোবর, ২০১৯, ১২:০৪ এএম

গত ৩ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় মহাসড়কে টোল আদায়ের নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে তিনি ২১ মহাসড়কে এক্সেল লোড নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার তাকিদ দেন। বৈঠকের পর পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান সাংবাদিকদের জানান, টোল হিসাবে আদায়কৃত অর্থ একটি ব্যাংক একাউন্টে জমা করা হবে এবং রাস্তা রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতে খরচ করা হবে। তিনি আরো জানান, কম দূরত্বের যানবাহনে কোনো টোল আদায় করা হবে না। গত ১১ সেপ্টেম্বর এক সংবাদ সম্মেলনে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, বিশ্বের প্রায় সব দেশেই টোল আদায় করা হয়। বাংলাদেশ তার ব্যতিক্রম থাকবে কেন? তিনিও বলেন, আদায়কৃত অর্থ মহাসড়ক রক্ষণাবেক্ষণে ব্যয় করা হবে। যতদূর জানা যায়, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পর সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় সক্রিয় ও তৎপর হয়ে ওঠে। এরই ধারাবাহিকতায় গত ২৯ সেপ্টেম্বর মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে চার লেনের মহাসড়কে টোল আদায়ের কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে সড়ক ও মহাসড়ক বিভাগকে। এই বিভাগের জয়েন্ট সেক্রেটারী (টোল ও এক্সেল) মোহাম্মদ শফিকুল করিম জানিয়েছেন, এখনো টোল আদায়ের জন্য মহাসড়ক নির্বাচন করা হয়নি। তবে প্রাথমিকভাবে চার লেনের মহাসড়কগুলোকেই টার্গেট করা হয়েছে। অবশ্য এখনো ঠিক করা হয়নি কবে নাগাদ টোল আদায় শুরু হবে এবং কোন যানবাহনের টোলের পরিমাণ কত হবে। ২০১৪ সালের টোল পলিসি অনুযায়ী সড়ক ও মহাসড়ক বিভাগ বর্তমানে টোল আদায় করছে দুই লেনের হাটিকুমরুল-বনপাড়া মহাসড়ক, চট্টগ্রাম পোর্ট একসেস সড়ক এবং ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের জগদীশপুর ও শেরপুর অংশে। টোলের ক্ষেত্রে বিভিন্নতা আছে। গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কে কিলোমিটার প্রতি টোলের পরিমাণ ২ টাকা, জাতীয় মহাসড়কে প্রতি কিলোমিটার ১ টাকা ৫০ পয়সা, আঞ্চলিক মহাসড়কে ১ টাকা এবং জেলাসড়কে ৫০ পয়সা। সড়ক ও মহাসড়ক বিভাগের অধীন জাতীয়, আঞ্চলিক মহাসড়ক ও জেলা সড়ক রয়েছে ২ হাজার ২০৯ কিলোমিটার। ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক চার লেনের। এছাড়া ঢাকা-টাঙ্গাইল ও ঢাকা-মাওয়া চার লেন মহাসড়কের কাজ চলছে। সড়ক ও মহাসড়ক বিভাগের চীফ ইঞ্জিনিয়ার ইবনে আলম হাসান বলেছেন, ৩ হাজার ৯০৬ কিলোমিটার জাতীয় মহাসড়ককেই টোলের আওতায় আনা উচিৎ। তবে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতির অভাবে এখন চারলেনের মহাসড়কগুলোতে টোল আরোপ ও আদায় করা হবে। 

প্রাথমিকভাবে নির্ধারিত চার লেনের মহাসড়কগুলোতে টোল আদায়ের সিদ্ধান্ত হলেও কবে নাগাদ আদায় কার্যক্রম শুরু হবে তা সংশ্লিষ্টদের পক্ষে বলা সম্ভব হয়নি। তাদের মতে, প্রস্তুতি সম্পন্ন হলেই আদায় শুরু হবে। এজন্য স্থাপনা ও টোলপ্লাজা তৈরি করতে হবে। দক্ষ লোকবলের ব্যাপারও আছে। এটা বলার অপেক্ষা রাখে না, মহাসড়কগুলোতে টোল আদায় শুরু হলে পরিবহনের ভাড়া বেড়ে যাবে সঙ্গত কারণে। পরিবহন মালিকরা টোলের অর্থ ভাড়ার সঙ্গে যুক্ত করে আদায় করে নেবে, যা যাত্রী এবং ভোক্তা-ক্রেতাদের পকেট থেকেই বের হয়ে যাবে। বলা যায়, টোলের প্রতিক্রিয়া সব মানুষের ওপরই পড়বে। আবার এও তো অস্বীকার করা যাবে না, সড়ক-মহাসড়ক রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতে প্রতিবছর প্রচুর টাকার প্রয়োজন। এ অর্থের যোগান, যে কোনোভাবেই হোক, আসতে হবে। তা না হলে বিপুল অর্থে নির্মিত সড়ক-মহাসড়কগুলো স্বাভাবিক থাকবে না, ভেঙেচুরে শেষ হয়ে যাবে। চলাচল ও মালামাল পরিবহনের ক্ষেত্রে দুর্ভোগের সীমা-পরিসীমা থাকবে না। এরকম পরিস্থিতি কাম্য হতে পারে না। সেক্ষেত্রে সকল সড়ক-মহাসড়ক সংরক্ষণ ও মেরামত করতেই হবে। একাজে প্রতিবছর যে পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন, সরকার তার যোগান দিতে পারে না। চলতি অর্থবছরে এখাতে বরাদ্দ আছে ২ হাজার ৫৫০ কোটি টাকা। চাহিদার তুলনায় এ অর্থ যথেষ্ট নয়। যেহেতু এখাতে অর্থাগমের একটি নির্ভরযোগ্য উপায় টোল আদায় এবং বিশ্বের প্রায় সব দেশেই টোল আদায় করা হয়, সুতরাং আমাদের দেশেও টোল আদায়ের আবশ্যকতা অস্বীকার করা যায় না।
দুঃখজনক হলেও বলতে হচ্ছে, আমাদের দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলো যথাযথভাবে নির্মাণ করা হয় না। নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহার করা হয়। এতে ঘোষিত ও নির্ধারিত সময়ের আগেই সড়ক মহাসড়কগুলো নষ্ট হয়ে যায়। প্রয়োজন হয় মেরামতের। সড়ক-মহাসড়ক নির্মাণে ব্যয়ও আমাদের দেশে অন্যান্য দেশের তুলনায় বেশি। এক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নেই বললেই চলে। ফলে এখাতের তথাকথিত ব্যায়ের বেশিরভাগেই লুটপাট হয়ে যায়। শুধু নির্মাণের ক্ষেত্রেই নয়, রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা লক্ষ করা যায়। অন্যদিকে সড়ক-মহাসড়ক ব্যবস্থাপনা বলতে যা বুঝায়, তা অনুপস্থিত। এ কারণে যানজট, দুর্ঘটনা, থ্রি হুইলার ও অযান্ত্রিক যানবাহনের চলাচল, চাঁদাবাজি, নিরাপত্তাহীনতা, টোল প্লাজায় অনিয়ম-দুর্নীতি সহজেই প্রত্যক্ষ করা যায়। সড়ক-মহাসড়ক ব্যবহারের ক্ষেত্রে যে ধরনের সুযোগ-সুবিধা ও অধিকার মানুষের থাকবার কথা, তার দুঃখজনক ঘাটতি বিদ্যমান। এমতাবস্থায়, টোলআদায় শুরুর আগেই সড়ক-মহাসড়ক চলাচল উপযোগী, মসৃণ, দুর্ভোগমুক্ত, নিরাপদ করতে হবে।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন