ঢাকা, রোববার, ১২ জুলাই ২০২০, ২৮ আষাঢ় ১৪২৭, ২০ যিলক্বদ ১৪৪১ হিজরী

সম্পাদকীয়

মিথ্যা মামলায় ফেঁসে গেলে কী করবেন

অ্যাডভোকেট সিরাজ প্রামাণিক | প্রকাশের সময় : ৯ অক্টোবর, ২০১৯, ১২:০২ এএম

ছোট্ট একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রতিবেশী আলেয়া খাতুনের (ছদ্মনাম) সাথে মকবুল হোসেনের (ছদ্মনাম) ঝগড়া হয়। সামান্য ঝগড়াঝাটির প্রকৃত ঘটনা আড়াল করে আলেয়া খাতুন ধর্ষণ চেষ্টার অভিযোগ এনে মকবুলকে আসামি করে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইবুন্যালে মামলা দায়ের করেন। আদালত বাদিনীর জবানবন্দি গ্রহণান্তে ঘটনার সত্যতা যাচাইয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট থানার ওসি’র উপর তদন্ত দেন। আগে থেকেই শিখিয়ে-পড়িয়ে নেয়া লোকজন দিয়ে আলেয়ার পক্ষে একতরফা জবানবন্দি প্রদানের মাধ্যমে মামলাটি আমলে নেয়ার সব প্রক্রিয়া সম্পাদন করা হয়। এরপর ট্রাইব্যুনাল মামলাটি আমলে নিয়ে আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন।

সারা দেশে এরকম বহু ঘটনাই ঘটছে, যেখানে মিথ্যা মামলা করে মানুষকে হয়রানি করা হচ্ছে। তবে এতে চিন্তিত হওয়ার কিছু নেই। এরকম মামলা হওয়ার পর ভুক্তভোগীকে প্রথমে জানতে হবে, মামলাটি থানায় নাকি আদালতে হয়েছে। এরপর আইনজীবীর মাধ্যমে কিংবা আসামি নিজেরই মামলার আরজি বা এজাহারের কপি সংগ্রহ করতে হবে। মামলাটির ধারা বা অভিযোগ জামিনযোগ্য হলে সংশ্লিষ্ট আমলী আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন চাইতে পারেন মামলার আসামি।
মামলাটির ধারা বা অভিযোগ জামিন অযোগ্য হলে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগে উপযুক্ত কারণ দেখিয়ে আগাম জামিন চাইতেও পারেন আসামি। তবে হাইকোর্ট বিভাগ আগাম জামিন সাধারণত নির্দিষ্ট মেয়াদ পর্যন্ত দিয়ে থাকেন। এ মেয়াদের মধ্যেই মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট আদালতে গিয়ে জামিননামা সম্পাদনের জন্য আবেদন করতে হয়। তবে আদালতে বিচার চলাকালে নির্দিষ্ট তারিখে অবশ্যই হাজিরা দিতে হবে। কোনো যুক্তিসংগত কারণ ছাড়া অনুপস্থিত থাকলে আসামির জামিন বাতিল করে দিতে পারেন আদালত।
থানা কর্তৃক মাামলাটি রেকর্ড হলে তদন্তকারী কর্মকর্তা আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগটির সত্যতা না পেলে নির্দোষ দেখিয়ে চূড়ান্ত প্রতিবেদন বা ফাইনাল রিপোর্ট আদালতে দাখিল করবেন (পুলিশ রেগুলেশন অব বেঙ্গল এর প্রবিধান ২৭৫ অনুযায়ী)। সত্যতা পেলে ফৌজদারী কার্যবিধির ১৭৩ ধারার বিধান অনুসারে আদালতে একটি চার্জশিট দাখিল করবেন। এরপর মামলাটি বিচারের জন্য প্রস্তুত হবে। এরপর আসামির বিরদ্ধে অভিযোগ গঠনের পালা। মামলার নথি, দাখিল দলিলাদি এবং তৎসম্পর্কে আসামি ও অভিযোগকারী পক্ষের বক্তব্য শুনার পর আদালত যদি মনে করেন যে, আসামির বিরুদ্ধে মামলা চালাবার যথেষ্ট কারণ নাই, তাহলে আদালত আসামিকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেবেন এবং তার কারণ লিপিবদ্ধ করে রাখবেন। (ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ফৌজদারী কার্যবিধি ধারা ২৪১ (ক), দায়রা ও বিশেষ ট্রাইব্যুনালে ২৬৫গ)। তবে যদি অব্যাহতির পর নতুন সাক্ষ্য প্রমাণ উদঘাটিত হয়, তাহলে আসামির বিরুদ্ধে পুনরায় অভিযোগ গঠন করা যায়।
অভিযোগকারী পক্ষের সাক্ষ্য গ্রহণ, আসামির জবানবন্দি গ্রহণ এবং বিষয়টি সম্পর্কে অভিযোগকারী পক্ষ ও আসামি পক্ষের বক্তব্য শুনার পর আদালত যদি মনে করেন যে, আসামি অপরাধ করেছে বলে কোনো সাক্ষ্য প্রমাণ নাই, তাহলে আদালত আসামিকে খালাস দেবেন এবং তা লিপিবদ্ধ করে রাখবেন। (ফৌজদারী কার্যবিধি ধারা- ২৬৫জ)
অন্যদিকে কোনো আসামিকে বিচারে খালাস প্রদান করলে, পুনরায় তার বিরুদ্ধে একই অপরাধের অভিযোগ গঠন করা যায় না। অব্যাহতির আদেশ আদালতের কোনো রায় নয়। কিন্তু খালাসের আদেশ আদালতের একটি রায়।
আর গ্রেফতার হলে সে ক্ষেত্রে আসামি আইনজীবীর মাধ্যমে জামিনের আবেদন করতে পারবেন। যদি পুলিশ রিমান্ড চায়, তাহলে আইনজীবীর মাধ্যমে রিমান্ড বাতিলের আবেদন করতে হবে। যদি আদালত জামিন দেন, তাহলে আদালতের আদেশ অনুযায়ী আসামিকে জামিননামা সম্পাদন করতে হবে। যদি জামিন না হয়, তাহলে পর্যায়ক্রমে উচ্চ আদালতে আবেদন করতে হবে।
আর যদি আদালতে সিআর মামলা হয়, তাহলে আদালত সমন দিতে পারেন কিংবা গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি করতে পারেন। এ ক্ষেত্রেও আত্মসমর্পণ করে জামিন চাইতে হবে। ক্ষেত্রবিশেষে হাইকোর্ট বিভাগে আগাম জামিন চাইতে পারেন।
আসামি আদালতে হাজির না হলে বিচারের জন্য পর্যায়ক্রমে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি হতে পারে। আসামির মালামাল ক্রোকের আদেশও হতে পারে এবং তার অনুপস্থিতিতেই বিচার হতে পারে। তবে সাক্ষ্য প্রমাণে আসামি নির্দোষ প্রমাণিত হলে মিথ্যা অভিযোগকারী বা মামলা দায়েরকারীর বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনেই পাল্টা মামলা করা যাবে। দন্ডবিধির ২১১ ধারা অনুযায়ী মিথ্যা মামলা করা একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এছাড়া ক্ষতিপূরণ চাইতে পারেন। মিথ্যা নালিশ আনয়নকারী সব ব্যক্তির বিরুদ্ধে ফৌজদারি কার্যবিধি ২৫০ ধারা অনুযায়ী মিথ্যা মামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে ক্ষতিপূরণ প্রদানের আদেশ করা যায়। নারী ও শিশু নির্যাতনের মিথ্যা মামলা বা অভিযোগের শিকার হলে আইনের মধ্যে থেকেই আদালতে লিখিত পিটিশন দায়ের করার মধ্য দিয়ে প্রতিকার পেতে পারেন। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ১৭ ধারায় মিথ্যা মামলা বা অভিযোগের দায়ে অপরাধীর সাত বছর পর্যন্ত কারাদন্ডের বিধান রাখা হয়েছে। আর দেওয়ানি মামলা হলে জবাব দাখিলের জন্য আদালত আসামির কাছে সমন পাঠাবেন। নির্ধারিত তারিখে হাজির হয়ে আইনজীবীর মাধ্যমে জবাব দাখিল করতে হবে। পরবর্তী সময়ে মামলা ধারাবাহিকভাবে চলবে।
লেখক : বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন