ঢাকা, সোমবার, ১৪ অক্টোবর ২০১৯, ২৯ আশ্বিন ১৪২৬, ১৪ সফর ১৪৪১ হিজরী

ধর্ম দর্শন

এক আল্লাহর ইবাদত

এ. কে . এম ফজলুর রহমান মুন্শী | প্রকাশের সময় : ১০ অক্টোবর, ২০১৯, ১২:০১ এএম

(পূর্ব প্রকাশিতে র পর) কিন্তুু তাই বলে অন্যান্য ধর্মের কেবলার যে গুরুত্ব দেখতে পাওয়া যায়, ইসলামের কেবলা তা হতে মুক্ত ও পবিত্র। কেননা ইসলামের কেবলা উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব ও পশ্চিম দিকের সীমারেখা হতেও পবিত্র। ইসলাম চাঁদ, সুরুজ ও গ্রহ-নক্ষত্রের দিকে মুখ করারও অনুমোদন করে না। দুনিয়ার বিভিন্ন দেশের মুসলমানগণ প্রত্যেক দিক ও প্রত্যেক অঞ্চল হতেই কা’বা শরীফের দিকে মুখ করে দাঁড়াতে পারে। এর জন্য প্রাচ্য, পাশ্চাত্য, উত্তর ও দক্ষিণ দিকের কোন বাধ্য-বাধকতা নেই। এমনকি স্বয়ং কা’বা শরীফে উপস্থিত লোকজনও একইসাথে বিভিন্ন দিক থেকে কা’বা ঘরকে সামনে রেখে দাঁড়াতে পারে। যেখানে দিক মাত্রের কোন জড়তাই নেই। যে যেখানে যেভাবেই থাকুক না কেন, কা’বাকে সামনে রেখে দাঁড়ালেই হল।

আর কোনও কারণে যদি কা’বা কোন দিকে তা নির্ণয় করা না যায়, তাহলে যেদিকেরই মুখ করে দাঁড়াবে, সেখানেই আল্লাহপাক হাজির আছেন। সুতরাং কোনও চলমান যানবাহনে আরোহণ করে ভ্রমণ করার সময় এবং সাধারণ নফল নামাজ সহীহ শুদ্ধ করার লক্ষ্যে কেবলারও কোন বাধ্যবাধকতা নেই। যানবাহন যেদিকে যাবে সেদিকেই সিজদা করা যাবে। যুদ্ধের ময়দানে বরাবর সবদিকেই নামায আদায় করা যাবে। যদি খোদা নাখাস্তা কা’বা শরীফের ইমারতও বাকী না থাকে তবুও সেই দিকে মুখ করাই যথেষ্ট হবে। এমনকি কেউ যদি কা’বা শরীফের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে, তাহলে যেদিকে ইচ্ছা, সেদিকেই নামাজ আদায় করতে পারে।

মানুষ কুরবানী নিষিদ্ধ :
কোন কোন ধর্মে আল্লাহর শ্রেষ্ঠ ইবাদত হিসেবে নিজের প্রাণ, কিংবা সন্তানের জান কুরবানী করাকে গণ্য করা হয়। কিংবা দরিয়ায় ফেলে দেয়া বা আগুনে জ¦ালিয়ে দেয়ার প্রচলনও দেখা যায়। কিন্তু ইসলাম এই শ্রেণীর ইবাদতকে পুরোপুরি নিষিদ্ধ করেছে। এবং সাথে সাথে একথাও বলে দিয়েছে যে, আল্লাহর পথে জান কুরবানের অর্থ হচ্ছে কোনও সত্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কিংবা দুর্বলকে সাহায্য দানের নিমিত্ত, নিজের জানেরও পরোয়া করতে নেই। যদিও এপথে মৃত্যুও হয়। এর অর্থ এই নয় যে, নিজের হাতে নিজের গলা কাটতে হবে, কিংবা দরিয়াতে ফেলে দিতে হবে অথবা নিজেকে আগুণে ফেলে দিতে হবে অথবা পানিতে ডুবে মরে যেতে হবে।

এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা:) বলেছেন, “যে ব্যক্তি কোনও বস্তুু দ্বারা নিজেকে নিজে হত্যা করবে, তাকে জাহান্নামে ঐ বস্তুু দ্বারাই শাস্তি দেয়া হবে।” (বুখারী : কিতাবুল আদব)

পশু কুরবানীর সংস্কার :
কোন পশুকে কুরবানী করে আল্লাহর সন্তুুষ্টি লাভের প্রত্যাশা কোন কোন ধর্মে প্রচলিত ছিল। আর আরব দেশে এর তরীকা ছিল এই যে, মানুষ জানোয়ার জবেহ করে দেবতার নামে উৎসর্গ করত, আবার কখনো কখনো মৃতের কবরের উপর কোন পশুকে বেঁধে রেখে দানা-পানি ছাড়া ফেলে রাখত, এভাবেই পশুটি ক্ষুৎ-পিপাসায় কাতর হয়ে কাঁতরাতে কাঁতরাতে মরে যেত। আরববাসীর একথাও মনে করত যে, আল্লাহ রক্তের নজরানা খুবই পছন্দ করেন। সুতরাং তারা পশু যবেহ করে এর রক্ত মন্দিরের গায়ে ছাপ লাগিয়ে রাখত। ইহুদীদের মাঝে এই দস্তুর ছিল যে, তারা কোনও পশু কুরবানী করে এর গোশত আগুনে জ্বালিয়ে দিত। এ সম্পর্কে তারা যে সকল আচার পালন করত তা উপস্থাপিত করলে বৃহৎ আকারের বই হওয়া মোটেই অসম্ভব নয়।

ইহুদীরা বিশ্বাস করত যে, কুরবানী আল্লাহর খাদ্য। কোন কোন ধর্মে কুরবানীর গোশত চিল এবং কাককে বিলিয়ে দেয়া হত। পয়গামে মুহাম্মদী (সা:) এসকল ভ্রান্ত মতবাদকে নির্মূল করে দিল। তিনিই সর্বপ্রথম ঘোষণা করলেন, কুরবানীর দ্বারা গোশত এবং রক্ত মাকসুদ নয় বরং কুরবানী হচ্ছে অন্তরের প্রশান্তি। আল-কুরআনে ইরশাদ হচ্ছে,Ñ“আল্লাহর কাছে কুরবানীর গোশত ও রক্ত কিছুই পৌঁছে না, বরং তোমাদের অন্তরের পরহেজগারীই পৌঁছে।” (সূরা হজ্জ : ৪-৫)

ইসলাম সকল ইবাদতের মাঝে শুধু কেবল হজ্জের মওসুমেই কুরবানীকে ওয়াজিব করেছে এবং সামর্থ্যবানদের জন্য যারা হজ্জে গমন করেনি, তারা হজ্জের স্মরণে কুরবানী করবে এটাই হচ্ছে মাসনুন তরীকা। যাতে করে হজ্জের সাথে সম্পৃক্ত কুরবানীর ঘটনা সকলের স্মৃতিপটে জাগরুক থাকে। যখন মিল্লাতে হানিফীর সর্বপ্রথম আহ্বানকারী স্বপনের ব্যাখ্যা সদৃশ্য নিজের একমাত্র পুত্রকে আল্লাহর সামনে কুরবানী করতে চেয়েছিলেন। আল্লাহপাক তাঁর পরীক্ষায় পূর্ণ উত্তীর্ণ হতে দেখে ছুরির নীচে ছেলের বদলে দুম্বার গর্দান রেখে দিলেন। এতে করেই এই মহান ঘটনা মুসলমানদের নিকট বাৎসরিক স্মরণীয় ক্ষণ হিসেবে অম্লান রয়েছে।
একই সাথে পয়গামে মুহাম্মদী (সা:) এই শিক্ষাও প্রদান করলো যে, কুরবানীর উদ্দেশ্য শুধুমাত্র আত্মসমূহকে খুশী করা, বালা-মুসিবত দূর করা, প্রাণের ফেদিয়া দেয়া কিংবা কেবলমাত্র রক্ত প্রবাহিত করা বা গর্দান কাটাই নয়, বরং এর দ্বারা মকসুদ হচ্ছে দু’টি। প্রথমত : আল্লাহপাকের এহসানের শোকর আদায় করা যে, তিনি জীবজন্তুসমূহকে আমাদের প্রয়োজনে লাগিয়েছেন এবং এগুলোকে আমাদের আহার্য সামগ্রী হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। দ্বিতীয়ত ” এগুলোর গোশত গরীবদের, মিসকীনদের এবং ফকিরদের আহার করায়ে আল্লাহ পাকের খোশনুদী হাসিল করার সুযোগ প্রদান করেছেন। আল-কুরআনে ইরশাদ হচ্ছে, “আমি প্রত্যেক কওমের জন্যই কুরবানী নির্দিষ্ট করেছি। যাতে করে তারা ঐ সকল পশুর উপর আলœাহর নাম স্মরণ করতে পারে, যা আমি তাদেরকে রিজিকস্বরূপ দান করেছি। বস্তুুত : তোমাদের উপাস্য কেবলমাত্র একক সত্তা। তার সামনেই মস্তক অবনত কর। আর বিনয় প্রকাশকারী বান্দাহদের খোশ-খবরী শুনিয়ে দিন।” (সূরা হজ্জ: ৫)

আল্লাহ পাক আরোও ইরশাদ করেছেন, “এবং উটকে আল্লাহর নিদর্শনগুলোর অন্যতম করেছি, তোমাদের জন্য এতে মঙ্গল রয়েছে। সুতরাং সারিবদ্ধভাবে দ-ায়মান অবস্থায় এদের উপর তোমরা আল্লাহর নাম নাও। যখন তারা কাতর হয়ে পড়ে যায় তখন তোমরা এদের হতে আহার কর এবং ধৈর্যশীল অভাবগ্রস্তকে, যাঞ্চাকারী অভাবগ্রস্তকে আহার করাও, এভাবে আমি এদেরকে তোমাদের অধীন করে দিয়েছি যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর।” (সূরা হজ্জ: ৫)

সুতরাং এটাই হচ্ছে একমাত্র কারণ যে, আল্লাহর নাম ছাড়া অন্য কারো নামে যদি পশু কুরবানী করা হয় তাহলে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা:)-এর শরীয়তে এ কাজকে শিরক হিসেবে গণ্য করা হবে এবং এর গোশত খাওয়াও হারাম হবে। আল-কুরআনে সুস্পষ্ট নির্দেশ রয়েছে, “যা আল্লাহর নাম ছাড়া অন্যের নামে যবেহ করা হয়েছে তা হারাম।”

আরব দেশে এই প্রথা চালু ছিল যে, তারা খাস করে রজব মাসে কুরবানী করতো। ইসলাম আগমনের পর, লোকজন এ সম্পর্কে প্রশ্ন রাখলে রাসূলে পাক (সা:) উত্তর করলেন, “আল্লাহর নামে যে কোন মাসে ইচ্ছা যবেহ কর, নেক কাজ আল্লাহর উদ্দেশ্য সম্পাদন কর, এবং গীরবদেরকে আহার করাও। (আবু দাউদ : ২য় খ-, আতিরাহ অধ্যায়)

মোটকথা কুরবানীর এই দু’টি হাকীকতই মূলত : মূখ্য। শুধু কেবল রক্ত প্রবাহিত করাই কুরবানীর হাকীকত নয়। আর এই রক্ত প্রবাহিত করা মোশরেকদের দেবীসমূহ এবং দেবতাসমূহের খুশী করার মত আল্লাহকে খুশী করার জন্যও নয়।

অংশীবাদী কুরবানীর নিষিদ্ধতা
এ কারণে সকল মুশরেকানা কুরবানী-যা আরবে প্রচলিত ছিল তার মূল্যেৎপাটন করা হল। আরবে পশু কুরবানী করা এবং এগুলোর দেবতাদের নামে উৎসর্গ করার বিভিন্ন পন্থা প্রচলিত ছিল। উটনীর প্রথম বাচ্চা হলে তা দেবতার নামে কুরবানী করা হত এবং এর চামড়া গাছে লটকায়ে রাখা হত। এই শ্রেণীর বাচ্চাকে বলা হত ‘ফারা’ আর রজব মাসের প্রথম দশ তারিখে একশ্রেণীর কুরবানী করা হত-এর নাম ছিল আতিরাহ। ইসলাম এই উভয় কুরবানীকেই নাযায়েজ সাব্যস্ত করেছে। রাসূল পাক (সা:) এ প্রসঙ্গে ইরশাদ করেছেন। -‘লা ফারায়া ওয়ালা আতিরাতা’ অর্থাৎ ফারা এবং আতিরাহ যায়েজ নয়। (আবু দাউদ: কিতাবুল জানায়েজ, ২য় খ: ৫ পৃ:)

কখনো কখনো দেবতার নামে জীবিত পশুকে ছেড়ে দেয়া হত এবং এগুলোকে কোন লোক অন্য কোন কাজে ব্যবহার করতে পারত না। সুতরাং আল-কুরআনে এ সম্পর্কে খাস করে এই আয়াত নাজিল হয়। ইরশাদ হচ্ছে, “বাহীরা, সাইবা, ওয়াসীলা ও হাম” আল্লাহ স্থির করেন নাই। (সূরা মায়িদাহ : ১৭) (চলবে)

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন