ঢাকা, বুধবার , ২০ নভেম্বর ২০১৯, ০৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ২২ রবিউল আউয়াল ১৪৪১ হিজরী

জাতীয় সংবাদ

গ্রামীণফোনের বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড়

স্টাফ রিপোর্টার | প্রকাশের সময় : ২২ অক্টোবর, ২০১৯, ১২:০০ এএম

দেশের সবচেয়ে দ্রুতগতির ইন্টারনেট সেবার স্বীকৃতি পাওয়ার প্রচারণা চালাচ্ছে বেসরকারি মোবাইল ফোন অপারেটর গ্রামীণফোন। অথচ তাদের সেই প্রচারণার নিচেই ইন্টারনেট ও ভয়েস সেবা নিয়ে অসন্তোষ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন গ্রাহকরা। রাজধানীসহ সারাদেশ থেকেই শহর কিংবা গ্রামের গ্রাহকরা নিম্নমানের সেবা দেয়ার জন্য অভিযোগ করেছেন। গ্রাহকদের অভিযোগ- উচ্চমূল্য পরিশোধ করেও অপারেটরটির কাছ থেকে নির্ধারিত সেবা পাচ্ছেন না তারা। প্রতিনিয়তই গ্রামীণফোন গ্রাহকরা কথা বলতে গিয়ে কলড্রপ, মিউট কল, কল সেটআপে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা এবং ইন্টারনেটের ক্ষেত্রে ধীরগতি, অব্যবহৃত ডাটা পরবর্তীতে যোগ না হওয়া, টাকা কেটে নিয়ে ডাটা না দেয়া, ফোরজি’র দামে ডাটা কিনে টুজি ও থ্রিজিতে ব্যবহারের অভিজ্ঞতা পাচ্ছেন। অপারেটরটির এমন নিম্নমানের সেবার বিরুদ্ধে টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ সংস্থা বিটিআরসি, গ্রামীণফোন ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জমেছে অভিযোগের পাহাড়। এমনকি জাতীয় সংসদেও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মন্ত্রী-এমপিরা। সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ সংসদে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, গ্রামীণফোনে একবার কথা শেষ করতে ৪-৫ বার কল করতে হয়। এটি হতে পারে না। তিনি বলেন, আমরা যারা গ্রামীণফোন ব্যবহার করি, প্রত্যেকটি কলে কলড্রপ হয়। একেকটি কলে ৩, ৪, ৫ বার ড্রপ হয়। এজন্য বারবার কল করতে হয়। এটি কেমন কথা! আমরা গুরুত্বপূর্ণ একটি করছি, হঠাৎ একটি ড্রপ করল। বিদেশে কল করছি তা ড্রপ করল। এর আগে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমও গ্রামীণফোনের কলড্রপ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। গ্রাহকদের এই অভিযোগের প্রমাণও পায় নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি গতবছর প্রকাশিত কলড্রপের একটি পরিসংখ্যানে বলা হয়, এক বছরে গ্রামীণফোনের কলড্রপ ১০৩ কোটি ৪৩ লাখ বার। আর একের কলড্রপ হয়েছে ২৭ কোটি ৭৭ লাখ বার। অথচ এই কলড্রপের বিনিময়ে অপারেটরটি গ্রাহকদের মিনিট ফেরত দিয়েছে ১০ কোটি ৩০ লাখ মিনিট। যদিও কলড্রপ কিংবা কল করার পর কথা শুনতে না পেলেও কেটে নেয়া হয় গ্রাহকদের টাকা।
দেশ থ্রিজি থেকে ফোরজিতে উন্নীত হয়েছে। প্রথম সাবমেরিনের পর দ্বিতীয় সাবমেরিনে যুক্ত হয়েছে। গ্রাহকদের সেবার মান বাড়ানোর জন্য দেয়া হয়েছে টেক নিউট্রালিটি (তরঙ্গের নিরপেক্ষতা)। কিন্তু মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেট গ্রাহকদের সেবার মান যেন নিচের দিকেই নামছে। নেটওয়ার্ক না থাকা, সীমাহীন কলড্রপ, ইন্টারনেট সার্ভিসও খুবই দুর্বল। খোদ রাজধানীতেই গ্রামীণফোনের ফোরজি সিমে পাওয়া যাচ্ছে টুজি সিগনাল। জেলা শহরগুলোতে নামে ফোরজি হলেও টুজিতেই সীমাবদ্ধ ডাটা সার্ভিস। সবকিছু মিলিয়ে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে গ্রামীণফোন ভয়েস ও ডাটা সেবা গ্রহণকারীদের।
বিটিআরসি সূত্রে জানা যায়, কমিশনে জমা হওয়া অভিযোগের মধ্যে গ্রামীণফোনের বিরুদ্ধেই গ্রাহকদের অভিযোগ বেশি। ভয়েস ও ইন্টারনেট সেবা নিয়ে গ্রাহকদের অভিযোগের অন্ত নেই। গ্রাহকের সর্বাধিক অভিযোগ কলড্রপ নিয়ে। তারা বলছেন, কাউকে কল দেয়ার পর ঠিকমতো কথা বলা যায় না কিংবা এক প্রান্তের গ্রাহক কথা শুনলেও অন্যপ্রান্তের গ্রাহক শুনতে পান না। ফলে পুনরায় কল করতে হয় এবং গচ্ছা যায় অতিরিক্ত অর্থ। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে নতুন আরেক বিড়ম্বনা মিউট কল। এই কলে সচল থাকে নেটওয়ার্ক, হ্যান্ডসেটের পর্দায় এয়ারটাইম মিনিট গতিশীল থাকে, কিন্তু শোনা যায় না কথা তবে পরিশোধ করতে হয় বিল। এ ছাড়া ইন্টারনেটের গতি নিয়ে প্রতারণা, ইন্টারনেট ঠিকমতো কাজ না করলেও বিল কেটে রাখা, বিভিন্ন প্যাকেজ একবার চালু হওয়ার পর আর বন্ধ না হওয়া, এসএমএসের যন্ত্রণা, নেটওয়ার্কের আসা-যাওয়া, স্থানে-স্থানে কভারেজ না থাকা, বিভিন্ন ট্যারিফ/প্যাকেজ বিল নিয়ে প্রতারণা সংক্রান্ত আরও অনেক অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু প্রতিকারের কোনো ব্যবস্থা যেন নেই। বাধ্য হয়ে গ্রাহকরা তাদের ক্ষোভ ও অসন্তুষ্টির কথা তুলে ধরছেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেই।
খোদ রাজধানী ঢাকা শহরে নিয়ন্ত্রক সংস্থার পরিচালিত পরীক্ষায় গ্রামীণফোনের কলড্রপের হার ৩ দশমিক ৩৮ শতাংশ। এ থেকেই অনুমান করা যায়, দেশের জেলা, উপজেলা এবং গ্রামাঞ্চলে অপারেটরটির নেটওয়ার্কের কি অবস্থা?
সাইদুর রহমান খানের অভিযোগ তিনি রাজধানীর শ্যামলীতেই গ্রামীণফোনের নেটওর্য়াক পাচ্ছেন না। অপারেটরটি সবচেয়ে দ্রুতগতির ইন্টারনেটের স্বীকৃতি পাওয়ার খবর প্রচার করলে ফয়সাল আহমেদ নুহান লেখেন, জানালার কাছ থেকে ২ হাত দূরে গেলে ফোরজি থেকে টুজি হয়ে যায় সেটা আবার ১নম্বর হয় কিভাবে? সাতক্ষীরার কালীগঞ্জের গ্রাহক সোহাগ গাজীর অভিযোগ বিগত ৯ বছর ধরেই তার এলাকায় নেটওয়ার্কের ত্রæটি, সিগন্যাল দুর্বল, ইন্টারনেটের গতি কম। রাজধানীর পাশে গাজীপুরে মিজানুর রহমান জুয়েলকে গ্রামীণফোনের নেটওয়ার্কে কথা বলতে হলে রুমের বাইরে গিয়ে কথা বলতে হয়। একই অবস্থা বরিশালের সাঈদ সাকিবের। তিনি ঘরে ঢুকলে নেটওয়ার্ক পান না, গ্রামীণফোন নেটওয়ার্ক ব্যবহার করার জন্য তাকে ঘর-বাড়ী ছাড়তে হবে কিনা সে প্রশ্ন রেখেছেন। সজিব শেখ ডাটা কিনে কোন কিছুই ডাউনলোড করতে পারেন না। দিনের বেলায় ফোরজিতে স্পিড পান ১০০ কিলোবাইট আর রাতে এক মেগাবাইট। লক্ষীপুরের রামগঞ্জ উপজেলার শামীম আহমেদ খান অভিজ্ঞতা পাচ্ছেন খুবই দুর্বল নেটওয়ার্কের, নয়ন রায় ঠিকভাবে কথা বলা বা শোনা কোনটিই গ্রামীণফোনের নেটওয়ার্কে করতে পারেন না নিয়মিতই। জাহিদুল কবির গ্রাম থেকে ইন্টারনেট চালানো তো দূরে থাক একটি এসএমএস পাঠাতেও পারেন না। সিয়াম আহমেদ চট্টগ্রাম শহরেই ফোরজি সিমে টুজি সিগন্যাল পান। অপারেটরটিকে ফেনী শহরে গিয়ে ইন্টারনেটের গতি মাপার আহ্বানন জানিয়েছেন তৌহিদুর রহমান সুমন, চাঁদপুরে নেটওয়ার্কে অবস্থা দেখে যাওয়ার জন্য বলেছেন গোলাম শাওন রহমান। নাফিসা জেবিন ১৩ মিনিট কথা বলতে গিয়ে ২ বার কলড্রপের শিকার হয়েছেন। ময়মনসিংহে ফোরজি তো দূরে থাক থ্রিজি ঠিকমতো পান না রাশেদুর রহমান রানা, ভোলাতে চলছে কচ্ছপ গতির ইন্টারনেট। আর আবু আলী ফেসবুক চালানোর জন্য গ্রামীণফোনের ৭ দিনের ডাকা কিনে ফেসবুকই ব্রাউজ করতে পারেন নি। তার অভিযোগ- এভাবে আর কতো সাধারণ মানুষকে প্রতারিত করে গ্রামীণফোন? অপারেটরটির বিরুদ্ধে মামলা হওয়া দরকারও মনে করেন তিনি। যে কোন প্যাকেজ ব্যবহার শুরু করলে প্রতিনিয়তই দাম বাড়ানোর অভিযোগ করেছেন হাসিবুল হাসান বিপু। বগুড়ার সোহাগ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের শওকত ফয়সাল এতো ¯েøা ইন্টারনেটের অভিজ্ঞতা পাচ্ছেন যে কোন কিছুই ওপেন করতে পারেন না। এই ফোরজি নিয়ে তারা কি করবেন? সে প্রশ্নও করেছেন। কলড্রপ নিয়ে দুই বছর ধরে অভিযোগ করেও কোন প্রতিকার পাননি মোস্তফা কামাল। সব সময় বলা হয় নেটওয়ার্ক উন্নয়নের কাজ চলছে। ঢাকার সন্নিকটে নওয়াবগঞ্জেই নেট পান না মেথিউ। একবছর ধরে নেটওয়ার্ক নিয়ে অভিযোগ করছেন কাইয়াম হোসেন, গ্রামীণফোন থেকে লোক এসে দেখে যায় কিন্তু কোন সমাধান হয় না। দীর্ঘ ৬ মাস ধরে গাজীপুরের এম আর ইমরান অভিযোগ করছেন তার এলাকায় ইন্টারনেট, ভয়েস কলে সমস্যা হচ্ছে। কিন্তু কোন সমাধান হয়নি। মৌলভিবাজারের আহমেদ রাহাত, সুনামগঞ্জের রফিকুল ইসলাম, ঝালকাঠির মনির জামানেরও একটি অভিযোগ।
যদিও বিটিআরসির নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রতিদিন একজন গ্রাহকের একটির বেশি কলড্রপের প্রতিটির জন্য এক মিনিট করে টকটাইম ফেরত দিতে হবে। তবে সেই নির্দেশনা মানছে না গ্রামীণফোন। ভুক্তভোগীরা ক্ষতিপূরণ না পাওয়ার কথা জানিয়েছেন।
এবিষয়ে জানতে চাইলে গ্রামীণফোন বরাবরই তাদের বকেয়া রাজস্ব আদায়ের জন্য বিটিআরসির বন্ধ করে দেয়া এনওসির (অনাপত্তিপত্র) অজুহাত দেখান। এনওসি বন্ধ থাকায় তারা বিনিয়োগ করতে পারেন না বলে জানান। তবে গ্রাহকদের প্রশ্ন এনওসি বন্ধ হওয়ার আগে কি তাদের নেটওয়ার্ক ভালো ছিল?
বিটিআরসির সিনিয়র সহকারী পরিচালক জাকির হোসেন খান বলেন, অপারেটরদের সেবা প্রদানের জন্য যে পরিমাণ স্পেকট্রাম চাহিদা সেটা এখন পর্যাপ্ত না। তাদেরকে স্পেকট্রাম কেনার জন্য বলা হচ্ছে। এছাড়া গ্রাহকরা যেসব অভিযোগ করেন তা পর্যালোচনা করে সমাধান করা হয়। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট অপারেটরকে নোটিশও দেয়া হয়।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (2)
হারুন অর রশীদ ২২ অক্টোবর, ২০১৯, ৯:৪৪ এএম says : 0
আমি থাকি ঢাকারশাড়ি কেরানীগঞ্জ,কদমতলীতে।এখানে গ্রামীমনের ডাটা চালু করলে ২জি-৩জি হয়, কখনো আবার নেটওয়ার্কই থাকে না।এই যদি হয় রাজধানীতে তাহলে গ্রামাঞ্চলের গ্রামীনের নেটওয়ার্কর কি অবস্থা তা সহজেই বোঝা যায়।
Total Reply(0)
juned ahmed ১১ নভেম্বর, ২০১৯, ২:৫৫ পিএম says : 0
Dear sir, i had gp internet valid till 9 2019 november. But in 8 November gp closed my interne.why gp closed this? Let me know.
Total Reply(0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

গত ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন