ঢাকা, রোববার , ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯, ৩০ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ১৭ রবিউস সানি ১৪৪১ হিজরী

জাতীয় সংবাদ

শঙ্কুচিত হচ্ছে শ্রমবাজার

সউদী দূতাবাসের বেড়াজালে কর্মীরা মালয়েশিয়ায় দ্বিপাক্ষিক বৈঠক আজ

শামসুল ইসলাম | প্রকাশের সময় : ৬ নভেম্বর, ২০১৯, ১২:০০ এএম

বিদেশে শ্রমবাজার দিন দিন সঙ্কুচিত হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে অর্থনৈতিক মন্দা এবং সউদীর ভিশন ২০৩০ এর কর্ম পরিকল্পনায় অভিবাসী কর্মীদের কর্মসংস্থান হ্রাস পাচ্ছে। জনশক্তি রফতানির সর্ব বৃহৎ শ্রমবাজার সউদী আরব থেকে প্রতি মাসেই প্রায় দুই থেকে তিন হাজার কর্মী খালি হাতে দেশে ফিরছে। এদের মধ্যে বৈধ আকামাধারী কর্মীও রয়েছে। ঢাকাস্থ সউদী দূতাবাসে কথিত এ-ক্যাটাগরি ও বি-ক্যাটাগরির বেড়াজালে হাজার হাজার কর্মী বৈধ ভিসা পেয়েও পাসপোর্ট জমা দিতে পারছে না। তাদের মোফার (ভিসার) মেয়াদও শেষ হয়ে যাচ্ছে। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ জরুরি হয়ে পড়েছে। একাধিক রিক্রুটিং এজেন্সির স্বত্বাধিকারী এ অভিমত ব্যক্ত করেছেন।

বিদেশে বাংলাদেশি লেবার উইংগুলো শ্রমবাজার সম্প্রসারণে বাস্তবমুখী ভূমিকা রাখতে পারছে না। প্রবাসী কর্মীরা অনেকাংশেই কনস্যুলেট সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। কোনো কোনো কনস্যুলেটের কতিপয় কর্মকর্তা নানা অনিয়ম দুর্নীর আশ্রয় নিয়ে পাড় পেয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠছে।

দ্বিতীয় বৃহৎ শ্রমবাজার সংযুক্ত আরব আমিরাতে দীর্ঘ পাঁচ বছর যাবত কর্মী নিয়োগ বন্ধ রয়েছে। বাহরাইনেও শ্রমবাজারের দুয়ার বন্ধ। কুয়েত, কাতার, ওমান, জর্ডান ও লেবাননে স্বল্প সংখ্যক কর্মী যাচ্ছে। দীর্ঘ প্রতিক্ষীত বন্ধকৃত মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার উন্মুক্তকরণের লক্ষ্যে আজ বুধবার মালয়েশিয়ার পুত্রাজায়ায় উভয় দেশের মন্ত্রী পর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক বৈঠক হবার কথা রয়েছে। দশ সিন্ডিকেটের অনৈতিক কর্মকান্ডের দরুণ মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী ড. মাহথির মোহাম্মদ গত বছর বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেয়া বন্ধ করে দেন। মালয়েশিয়া সরকার ঘোষণা দেয় আর কোনো সিন্ডিকেট নয়; শ্রমবাজার চালু হলে সকল বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সিই কর্মী নিয়োগের সুযোগ পাবে। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী ইমরান আহমদও মালয়েশিয়ায় সিন্ডিকেট বিহীন শ্রমবাজার চালুকরণে ব্যাপক কূটনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছেন।

তেল সমৃদ্ধ দেশ সউদী আরবে ১৫ লক্ষাধিক নারী-পুরুষ কর্মী কঠোর পরিশ্রম করে প্রচুর রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছে। জনশক্তি রফতানির গতি বাড়াতে এবং বন্ধ শ্রমবাজার পুনরুদ্ধারে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তৎপরতা বাড়ানোর ওপরগুরুত্বারোপ করেছেন বায়রার সভাপতি বেনজীর আহমদ। তিনি শ্রমবাজার সম্প্রসারণে বিদেশে বাংলাদেশের মিশনগুলোতে পর্যাপ্ত জনবল বৃদ্ধি এবং প্রবাসীদের সেবা নিশ্চিতকরণে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনার জোর দাবি জানিয়েছেন।
২০১৭ সালের শেষের দিকে সউদী নাগরিকদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে ১২টি সেক্টরকে সউদীকরণ করার ঘোষণা দিয়েছে রাজকীয় সউদী সরকার। এতে বিদেশি কর্মীর চাহিদা কমে যায় সেখানে। সউদী আরব ছাড়তে শুরু করে অভিবাসী কর্মীরা। এরমধ্যে বাংলাদেশি কর্মীর সংখ্যাই বেশি। যারা স্বেচ্ছায় সউদী ছাড়ছেনা, তাদেরকে জোর করে পাঠিয়ে দেয়ার অভিযোগ উঠছে। আকামা (কাজের অনুমতি) থাকা সত্তে¡ও দেশটি থেকে অনেককেই দেশে ফিরতে হয়েছে।

বার্তাসংস্থ এএফপিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এর মধ্যপ্রাচ্য ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক পরিচালক জিহাদ আজৌর বলেছেন, আমরা এমন একটি অঞ্চলে রয়েছি, যেখানে বেকারত্বেও হার ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ ছাড়িয়েছে। বেকারত্ব মোকাবেলার জন্য প্রবৃদ্ধি এক থেকে দুই শতাংশ বৃদ্ধি প্রয়োজন। আইএমএফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বেকারত্বেও উচ্চ হারের কারণে আরব দেশগুলোতে সামাজিক বিশৃঙ্খলা বাড়ছে। উদীয়মান অন্যান্য অর্থনৈতিক বাজার ও উন্নয়নশীল অর্থনৈতিক দেশগুলোতে বেকারত্বের হার ৭ শতাংশ হলেও এই অঞ্চলে গড় বেকারত্বে প্রায় ১১ শতাংশ। আজৌর আরো বলেন, বিশেষ করে এ অঞ্চলের তরুণ এবং নারীরা কর্মহীন হয়ে পড়েছে। ২০১৮ সালে ১৮ শতাংশের বেশি নারীর কোনো কর্ম ছিল না। আইএমএফ বলছে, আরব বিশ্বের অনেক দেশে সরকারি ঋণের পরিমাণ খুবই বেশি। কোনো দেশে মোট জিডিপির ৮৫ শতাংশকে ছাড়িয়ে গেছে এই ঋণ। লেবানন এবং সুদানে এই ঋণের হার ১৫০ শতাংশ ছাড়িয়েছে।

এদিকে, ঢাকাস্থ সউদী দূতাবাস গত ১৮ অক্টোবর থেকে এ- ক্যাটাগরি ও বি-ক্যাটাগরির নামে সউদী গমনেচ্ছু কর্মীদের ভিসা জমা নেয়ার ক্ষেত্রে নতুন শর্তারোপ করায় হাজার হাজার কর্মী বিপাকে পড়েছে। কথিত এ-ক্যাটাগরি ও বি-ক্যাটাগরির বেড়াজালে পড়ে সউদী গমনেচ্ছুদের পাসপোর্ট দূতাবাসে জমা দিতে না পারায় অনেকেরই ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাচ্ছে। এতে জনশক্তি রফতানিতে ভয়াবহ ধস নামার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এ ব্যাপারে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় সউদী দূতাবাসের সাথে আলোচনা করে সৃষ্ট সঙ্কট নিরসন করার জন্য একাধিক জনশক্তি রফতানিকারক জোর দাবি জানিয়েছেন। শোনা যাচ্ছে, সউদী দূতাবাসে ভিন্ন পন্থায় আন লিমিটেড পাসপোর্ট দূতাবাসে সকালে জমা দিয়ে তা’ বিকালেই ভিসা হাতে পাওয়া যাচ্ছে।

সম্প্রতি সউদী দূতাবাসের চার্জ দ্যা এ্যাফেয়ার্সকে সম্প্রতি প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী ইমরান আহমদ তার দপ্তরে ডেকে এনে সউদী গমনেচ্ছু কর্মীদের ভিসা সংক্রান্ত জটিলতা নিরসনের অনুরোধ জানান। ঐ বৈঠকে সউদী চার্জ দ্যা এ্যাফেয়ার্স বৈধ ভিসা প্রাপ্ত কর্মীদের সর্বাত্মস সহযোগিতার আশ্বাস দেন। কিন্ত গত ১৭ অক্টোবরের পর থেকে ইস্যুকৃত মোফায় ভিসা দিতে পাসপোর্ট দূতাবাসে জমা নেয়া বন্ধ করে রাখা হয়েছে। এতে সউদী গমনেচ্ছু কর্মীরা প্রতিদিন রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোতে ধরর্ণা দিয়ে চরম হয়রানির শিকার হচ্ছে। গামকার কতিপয় অসুধা মেডিক্যাল সেন্টারের আব-গ্রেড নামে ঘুষ নিয়ে স্বাস্থ্য পরীক্ষা ছাড়াই হাজার হাজার কর্মীদের সউদী আরবে পাঠানোর সুযোগ করে দেয় রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোকে। এসব অনৈতিক কর্মকান্ডের সাথে জড়িত রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোকে ব্লক করে রেখেছে সউদী দূতাবাস কর্তৃপক্ষ। দূতাবাসের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা এসব অনৈতিক কর্মকান্ডের সাথে জড়িত রয়েছে। একাধিক রিক্রুটিং এজেন্সির মালিক এতথ্য জানিয়েছে।

অসমর্থিত একাধিক সূত্র জানায়, সউদী ভিসা ইস্যুর জন্য একশ’ থেকে ৫শ মার্কিন ডলার বকশিস দিয়ে কয়েকটি চক্রের মাধ্যমে পাসপোর্ট জমা নেয়া হচ্ছে। এসব চক্রের মাধ্যমে নাকি সকালে পাসপোর্ট জমা দিয়ে বিকেলেই নির্বিঘেœ ভিসা হাতে পাওয়া যাচ্ছে। যেসব কর্মীর সউদী সরকারের ড্রাইভিং লাইসেন্স আছে তাদেরকে বাংলাদেশি ড্রাইভিং লাইসেন্সর থাকা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। যারাই বাংলাদেশি ড্রাইভিং লাইসেন্স যোগাতে পাড়ছে না তাদের কাছ থেকে ৫শ মার্কিন ডলারের বিনিময়ে ভিসা মিলছে বলে শোনা যাচ্ছে। ঢাকাস্থ কুয়েত দূতাবাসেও গত ১৩ অক্টোবর ও ২০ অক্টোবর বিভিন্ন রিক্রুটিং এজেন্সি প্রায় ৫শ পাসপোর্ট কুয়েত এয়ারওয়েজের কনফার্ম টিকিটসহ স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় ভিসা পাওয়ার জন্য জমা দিয়েছে। অজ্ঞাত কারণে গতকালও এসব পাসপোর্টে ভিসা লাগেনি। ফলে কুয়েত গমনেচ্ছু কর্মীরা চরম হয়রানির শিকার হচ্ছে। অপর একটি অসমর্থিত সূত্র জানায়, কুয়েত দূতাবাসের মেসেঞ্জার জাহাঙ্গীরের মাধ্যমে প্রতি পাসপোর্টে নির্বিঘেœ ভিসা পেতে একশ মার্কিন ডলার নেয়া হয়। এ পন্থায় যারা পাসপোর্ট জমা দেয় তাদের কুয়েত এয়ারলাইন্সের কনফার্ম টিকিটও জমা দিতে হয় না। গতকাল মঙ্গলবার কুয়েত দূতাবাসের ভিসা সেকশনের কর্মকর্তা আব্দুর রশিদকে ঘুষ নিয়ে ভিন্ন পথে কুয়েতের ভিসা ইস্যুর ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন সরি এ ব্যাপারে আমি কিছু জানি না।

প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সূত্র মতে, গত জানুয়ারি থেকে ৪ নভেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন দেশে প্রায় ৫ লাখ ৫২ হাজার ২৭৮ জন কর্মী চাকুরি নিয়ে গেছে। এর মধ্যে শুধু জানায়ারী থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সউদী আরবে গিয়েছে ২ লাখ ৬৮ হাজার ১১২ জন নারী পুরুষ কর্মী। এ সময়ে দেশটিতে শুধু নারী গৃহকর্মী গেছে ৪৭ হাজার ২৮৩ জন। নানা নির্যাতনের শিকার হয়ে গত ৯ মাসে সউদী থেকে খালি হাতে দেশে ফিরেছে প্রায় সাড়ে ১৬ হাজার নারী-পুরুষ কর্মী। রিয়াদস্থ বাংলাদেশ দূতাবাস ও জেদ্দাস্থ কনস্যুলেট-এর শ্রম উইং নানা হয়রানির শিকার প্রবাসী নারী পুরুষ কর্মীদের দেখভাল করতে চরমভাবে ব্যর্থ হচ্ছে। দূতাবাস ও কনস্যুলেটে অধিকার বঞ্চিত প্রবাসী কর্মীদের ভুরিভুরি অভিযোগ জমা পড়ছে। অধিকাংশ ভুক্তভোগি প্রবাসী কর্মী কনস্যুলেট সেবা থেকে বঞ্চিত হওয়ার অভিযোগ উঠছে। প্রবাসী মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়, গত দু’মাস আগে জেদ্দাস্থ বাংলাদেশ কনস্যুলেটের শ্রম কাউন্সেলর আমিনুল ইসলামের বিরুদ্ধে আনীত দূর্নীতি ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগগুলো মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব সারওয়ার আলম সরেজমিনে তদন্ত করলে অজ্ঞাত কারণে অদ্যাবদি তদন্ত রিপোর্ট মন্ত্রণালয়ে দালিখ করেনি। প্রবাসীদের সাথে চরম দুর্ব্যবহার ও সরকারি আর্থিক অনিয়মের বিষয়টি ধামাচাপা দেয়ার অপচেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

এদিকে, নতুন শ্রমবাজার জাপানে কর্মী নিয়োগের জন্য বিপুল সংখ্যক রিক্রটিং এজেন্সিকে টোকিওস্থ বাংলাদেশ দূতাবাস নির্বাচিত করে কর্মী প্রেরণের প্রক্রিয়া শুরুর অনুরোধ জানিয়েছে। কিন্ত প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে নির্বাচিত বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোকে অনুমতি না দেয়ায় জাপানে কর্মী প্রেরণের প্রক্রিয়া শুরু করা সম্ভব হচ্ছে না। এতে সম্ভাবনাময় জাপানের শ্রমবাজার হাত ছাড়া হবার উপক্রম হচ্ছে।

এদিকে, গতকাল মঙ্গলবার মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরে বাংলাদেশ হাই কমিশন এবং নির্বাচন কমিশন যৌথভাবে আয়োজিত ভিডিও কনফারেন্স এর মাধ্যমে প্রবাসীদের ভোটার তালিকা ও জাতীয় পরিচয় পত্র নিবন্ধন কার্যক্রমের শুভ উদ্বোধন করেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী ইমরান আহমদ এবং বাংলাদেশের প্রধান নির্বাচন কমিশনার। নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব মো. আলমগীর এর স্বাগত বক্তব্যের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শুরু হয়। এরপর পাওয়ারপয়েন্ট উপস্থাপন করেন এনআই ডির মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাইদুল ইসলাম। এতে নির্বাচন কমিশনারবৃন্দ এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনার বক্তব্য রাখেন।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন