ঢাকা, মঙ্গলবার , ১৯ নভেম্বর ২০১৯, ০৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ২১ রবিউল আউয়াল ১৪৪১ হিজরী

সম্পাদকীয়

ভারত : আলোর নিচে অন্ধকার

সরদার সিরাজ | প্রকাশের সময় : ১০ নভেম্বর, ২০১৯, ১২:০১ এএম

জনসংখ্যার দিক দিয়ে ভারত বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ। বর্তমান জনসংখ্যা ১৩০ কোটি। দেশটি গণতান্ত্রিক। স্বাধীনতার পর হতে একদিনও গণতন্ত্রের ছেদ ঘটেনি। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো পূর্ণ স্বাধীন ও শক্তিশালী। তাই ভারতকে বলা হয় বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ। দেশটি সাংবিধানিকভাবে ধর্মনিরপেক্ষ। এখানে কয়েক হাজার বছর যাবত বহু ভাষা, জাতি ও সংস্কৃতির মানুষের বাস। তাই ভারতকে বহুত্ববাদের দেশ বলা হয়। বহু দেশ ও জাতি ভারতবর্ষ শাসন-শোষণ করেছে বহু বছর। তবুও দেশটির বহুত্ববাদী বৈশিষ্ট্য ক্ষুণœ হয়নি। এরূপ বিচত্রপূর্ণ দেশ বিশ্বে বিরল। ভারত আর্থিকভাবে খুবই শক্তিশালী। বøুমবার্গের প্রতিবেদন মতে, ২০১৯-২৪ সাল পর্যন্ত বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি অর্জনে ২০টি দেশ আধিপত্য দেখাবে, যার মধ্যে ভারত অন্যতম। সামরিক দিক দিয়েও দেশটি খুবই শক্তিশালী। পরমাণু বোমা আছে ১২০টি। এছাড়া, রাশিয়ার সহায়তায় হাইপারসোনিক ক্ষেপণাস্ত্র নির্মাণ করছে, যার গতিবেগ শব্দের চেয়ে ৫ গুণ বেশি। আধুনিকতায়ও খুবই উন্নত। চিকিৎসা ও আইটি খাতেও তাই। এডিআই-২০১৯ প্রতিবেদন মতে, ১৩৬টি দেশের মধ্যে ভারত ১৪তম। আউটসোর্সিংয়েও বিশ্বে প্রথম। শিল্প-সাহিত্য এবং খেলা-ধুলায়ও খুব উন্নত। নোবেল বিজয়ী রয়েছেন কয়েকজন। সার্বিকভাবে ভারতের প্রভাব-প্রতিপত্তি ব্যাপক এবং তা বিশ্বব্যাপীই। এমনকি মহাকাশেও। ইতোমধ্যেই দেশটি দু’বার নভোযান প্রেরণ করেছে। কিন্তু সেই ভারতেরই আলোর নিচেই রয়েছে ঘোর অন্ধকার! যেমন: মোট জনসংখ্যার এখনো ৩৪% মানুষ দরিদ্র। ইউনিসেফের ‘দ্য স্টেট অব দ্য ওয়ার্ল্ডস চিলড্রেন-২০১৯’ শীর্ষক প্রতিবেদন মতে, ভারতে প্রতি বছর অপুষ্টির কারণে অন্তত ৬৯% শিশুর মৃত্যু হয়। যাদের বয়স পাঁচ বছরের নিচে। ভারতের মাত্র ২১% শিশুর খাদ্য তালিকায় সুষম খাবার রয়েছে। পুষ্টির অভাবে অধিকাংশ শিশুই নানা ধরনের জটিল রোগে ভোগে। নারীদের স্বাস্থ্যের অবস্থা আরও খারাপ। প্রতি দুজন নারীর মধ্যে একজন রক্ত স্বল্পতায় ভোগেন। বিশ্বব্যাংকের ‘এন্ডিং লার্নিং পভার্টি: হোয়াট উইল ইট টেক-২০১৯’ শীর্ষক প্রতিবেদন মতে, দারিদ্র্যের হার ভারতে ৫৪.৮%। ‘গেøাবাল হাঙ্গার ইনডেক্স-২০১৯’ মতে, ‘১১৭টি দেশের মধ্যে ভারত ১০২তম। এ সূচকে চারটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ধরা হয়েছে। তা হলো: ‘অপুষ্টি, শিশু মৃত্যু, শিশুদের অপচয় এবং শিশুদের বাড়তে না দেওয়া।’ জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার নির্ধারিত সংজ্ঞা অনুযায়ী, একটি শিশুর প্রতিদিনের গ্রহণ করা খাদ্যের পুষ্টিমান গড়ে ১৮০০ কিলো ক্যালরির কম হলে বিষয়টিকে ক্ষুধা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুর উচ্চতার তুলনায় কম ওজনের বিষয়টি সবচেয়ে বেশি প্রকট ভারত, ইয়েমেন ও জিবুতিতে। ভারতে এই হার ২০.৮%। ২০১৫-১৬ সালের হিসেব অনুযায়ী, ভারতে ৩৯% পরিবারের বাড়িতে পয়ঃপ্রণালী নেই। সিএসআরআই’র ‘গেøাবাল ওয়েলথ রিপোর্ট-২০১৯’ মতে, চলতি বছর বৈশ্বিক সম্পদের পরিমাণ ৩৬০ ট্রিলিয়ন ডলার। তন্মধ্যে ভারতের অবদান ৬২,৫০০ কোটি ডলার, যা মোট বৈশ্বিক সম্পদের প্রায় ৭%। বিশ্বব্যাপী প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকদের মাথাপিছু গড় সম্পদের পরিমাণ ৭০,৮৪৯ ডলার। ভারতে এটা ১৪,৫৬৯ ডলার, যা বৈশ্বিক গড়ের প্রায় ৮০% নিচে। ভারতে সম্পদের পরিমাণ বাড়লেও প্রত্যেক ব্যক্তি এ প্রবৃদ্ধির সমান অংশীদার নয়। এখনো দেশটিতে উল্লেখযোগ্য সম্পদ ঘাটতি রয়েছে। ভারতে প্রাপ্তবয়স্ক জনসংখ্যার ৭৮% সম্পদের পরিমাণ ১০ হাজার ডলারের নিচে। অথচ বিশ্বের সম্পদশালীদের তালিকায় ভারতের অবদান বেশ বড়। এদিকে ভারতে গৃহস্থালি ঋণ প্রবৃদ্ধির হার বিশ্বের অন্যতম সর্বোচ্চ। বৈশ্বিক ৪% গড় গৃহস্থালি ঋণের তুলনায় ভারতে এ হার ১১.৫%, তবে তা এখনো উন্নত দেশগুলোর নিচে রয়েছে। ওয়েলথ রিপোর্টের প্রাক্কলন অনুসারে, ভারতে ব্যক্তিগত ঋণের হার ১,৩৪৫ ডলার। ভারতের ক্ষেত্রে আর্থিক সম্পদের প্রবৃদ্ধি মাত্র ১.৪% হয়ে ৩,৭০০ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা বৈশ্বিক গড় ২% নিচে রয়েছে। স¤প্রতি ৫৭টি সূচকের ভিত্তিতে বিশ্বের ৬০টি শহরের তালিকা প্রকাশিত হয়েছে। সেই তালিকায় ভালো অবস্থানে নেই ভারতের শহরগুলি। সূচকগুলির মধ্যে অন্যতম ডিজিটাল নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য নিরাপত্তা, পরিকাঠামোগত নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তা। আধুনিক শহুরে জীবনের জন্য এসব গুরুত্বপূর্ণ। ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরো প্রকাশিত প্রতিবেদন মতে, ২০১৭ সালে সারা ভারতে নারী নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৩,৫৯,৮৪৯টি, যার ২৭.৯% নারীর ওপর অত্যাচার করেছে স্বামী ও নিকটাত্মীয়রা, শ্লীলতাহানি ২১.৭%, অপহরণ ২০.৫% এবং ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতন ৭%। বৈশ্বিক নারী নিরাপত্তা সূচক-২০১৯ মতে, ১৬৭টি দেশের মধ্যে ভারত ১৩৩তম। এর বাইরে সারাদেশে খুন, জখম, লুট, ডাকাতি, দুর্নীতি, অর্থ পাচার, রাজনৈতিক হানাহানি, মাওবাদীদের কর্মকান্ডে ব্যাপক জানমালের ক্ষতি নিত্য দিনের ঘটনা তো রয়েছেই। এছাড়া, বিশ্বব্যাংকের ‘ইজি অব ডোয়িং বিজনেস রিপোর্ট-২০২০’ মতে, ১৯০টি দেশের মধ্যে ভারত ৬৩তম। বেকারত্ব আকাশচুম্বী! জাত-পাতেরও বৈষম্য প্রকট।

এই অবস্থায় দেশটির উন্নতির বেলুন হুট করে ঠুস হয়ে পড়েছে। গত সেপ্টেম্বর মাসে ৩০ দিনেই ১২ লাখ কোটি রুপি উধাও হয়েছে। প্রবৃদ্ধিও অনেক হ্রাস পাচ্ছে। তাই দেশটিতে মন্দাভাব চলছে বলে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর অভিমত। এমতাবস্থায় ব্যাংকগুলোকে মার্জ করা হচ্ছে। অনেক সরকারি অফিসে বেতন দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। কল-কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এরূপ আর্থিক করুণ পরিণতি আর কখনো হয়নি। এটা হয়েছে মূলত গরু জবাই নিষিদ্ধের জন্য। কারণ, গরু জবাই নিষিদ্ধ করায় কয়েক লাখ কসাইখানা বন্ধ হয়ে অসংখ্যা মানুষ কর্ম হারিয়েছে। এছাড়া, পরিবহন খাতও চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মাংস রফতানিতে আগে বিশ্বে প্রথম ছিল ভারত, দ্বিতীয় ছিল ব্রাজিল। এখন তার বিপরীত হয়েছে। তাই গত সেপ্টেম্বর মাসে গরু জবাই নিষিদ্ধ আইন বাতিল করা হয়েছে।
ভারতের জনসংখ্যার বিরাট অংশ কুসংস্কারাচ্ছন্ন। তাই ভন্ড গুরুদের সংখ্যা এবং তাদের প্রভাব ব্যাপক। তারা ধনাঢ্যও, যার উদাহরণ বিজয় কুমার। স¤প্রতি টাইমস অব ইন্ডিয়ায় প্রকাশ, ভারতীয় আধ্যাত্মিক গুরু ‘কল্কি ভগবানের’ বাগানবাড়ি ও ট্রাস্টে অভিযান চালিয়ে নগদ ৪৪ কোটি রুপি ও ৮৮ কেজি সোনা উদ্ধার করেছে দেশটির আয়কর বিভাগ। এ ছাড়া অভিযানে ১৮ কোটি রুপি সমমূল্যের মার্কিন ডলারও জব্দ করা হয়। সব মিলিয়ে জব্দকৃত সম্পদের আর্থিক মূল্য প্রায় ৯৩ কোটি রুপি। ওই আধ্যাত্মিক গুরুর চেন্নাই, হায়দ্রাবাদ, বেঙ্গালুরু ও অন্ধ্র প্রদেশের ডেরায় অভিযান চালায় আয়কর বিভাগের দল। এ সময় তার জ্ঞাত আয় বহির্ভূত ৫০০ কোটির বেশি রুপিরও সন্ধান পাওয়া গেছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তার কোম্পানি আছে। ৭০ বছর বয়সী বিজয় কুমার ৯০-এর দশকে নিজেকে ভগবান বিষ্ণুর দশম অবতার কল্কি বলে দাবি করেন এবং তখন থেকেই কল্কি ভগবান নামে পরিচিত তিনি। এর আগে তিনি লাইফ ইনশিওরেন্স কর্পোরেশনের এক কেরানি ছিলেন। এর আগে আরও বিত্তশালী কয়েকজন ভন্ড গুরু গ্রেফতার হয়ে কারাগারে আছে। তাদের মধ্যে রাম রহিম অন্যতম। সারাদেশে সন্ধান চালালে এরূপ আরও অনেক ভন্ড গুরু আটক হবে এবং তাদের বিশাল সম্পদ পাওয়া যাবে নিঃসন্দেহে। সাহিত্য, নাটক, সিনেমা ইত্যাদিতে অত্যধিক ধর্ম চর্চার কারণে সাধারণ মানুষ ধর্মাসক্ত হয়ে পড়ায় তার সদ্ব্যবহার করে ভন্ড ধর্মগুরুরা, এমন অভিমত পন্ডিতদের অভিমত। অন্যদিকে, নারীদের তেমন মূল্যায়ন হয় না দেশটিতে। বরং ধর্ষণ, নির্যাতন, নিষ্পেষণ ইত্যাদিতে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। ভ্রূণ পরীক্ষা নিষিদ্ধ থাকা সত্তে¡ও তা বহাল আছে এবং তাতে নারী চিহ্নিত হলে তা নষ্ট করে দেওয়া হয়। তাই ২০১৯ সালে সুন্দরী প্রতিযোগিতায় বিজয়ী এক নারী প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘গরুর চেয়ে নারীর দিকে বেশি গুরুত্ব দেন।’
বহুত্ববাদী ভারতের ‘বহুত্ববাদ দূর করে হিন্দুত্ববাদ’ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে কট্টর হিন্দুত্ববাদী বিজেপি ও তার জোট সঙ্গীরা। ফলে সংখ্যালঘুরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় পড়েছে। বিশেষ করে মুসলিমরা, যারা সংখ্যায় মোট জনসংখ্যার ১৪% তথা প্রায় ২০ কোটি। তাই ভারতকে বলা হয় বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম অধ্যুষিত দেশ। অবশ্য ভারতে সংখ্যালঘু নির্যাতন চালু আছে বহুকাল থেকেই। এমনকি সা¤প্রদায়িক হানাহানিও সংঘটিত হয়েছে বিশ্বে মধ্যে সর্বাধিক। বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকে সংখ্যালঘু নির্যাতন ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে। গোরক্ষকরা গো মাংস খাওয়ার সন্দেহে বহু মুসলমানকে পিটিয়ে হত্যা করেছে। ঘর ওয়াপস বলে বহু মুসলমানকে জোর করে হিন্দু বানিয়েছে। বিভিন্ন স্থানে মুসলমানদের জোর করে ‘জয় শ্রীরাম’ বলতে বাধ্য করছে, না বললে চরম নির্যাতন করছে। এখন আবার মুসলমানদের দেশ থেকে বিতাড়ন করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। সে জন্য আসামে এনআরসি করা হয়েছে। এটা সারাদেশেই করা হবে বলে সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা প্রায়ই বলছেন। এ ক্ষেত্রে বিজেপি সভাপতি ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বেশি সরব। ভারতের হিন্দু উগ্রবাদীদের টার্গেট ২০৩০ সালের মধ্যে দেশটিকে হিন্দু রাষ্ট্র বানানো। তারা পার্শ্ববর্তী সব দেশ মিলে রামরাজত্ব প্রতিষ্ঠারও স্বপ্নবিলাসী। ভারতে পাঁচ হাজার বছর আগে আবির্ভূত হিন্দু ধর্মের ইতিহাসে বর্তমানের মতো অবস্থা আগে কখনো দেখা যায়নি। যা’হোক, এনআরসির কারণে ভারতের মুসলমানরা চরম নিরাপত্তাহীনতা ও অনিশ্চয়তায় পড়েছে। পশ্চিমবঙ্গে তো এনআরসি আতংকে কয়েকজন হার্ট অ্যাটাক করে মারা গেছেন ইতোমধ্যেই। কিন্তু এত বিপুল সংখ্যক মুসলমানকে বিতাড়ন করা সহজতর নয়। বিষয়টি সাংবিধানিকভাবে বে-আইনিও। তবুও সে চেষ্টা করা হলে সংঘাত নির্ঘাত। ভারতের মজলিশ-ই-ইত্তেহাদুল-মুসলেমিন প্রধান ব্যারিস্টার আসাদ উদ্দিন ওয়াইসি এমপি গত ১৮ অক্টোবর বলেন, ‘মুসলিমদের বাদ দিয়ে সবাইকে নাগরিকত্ব দেওয়ার যে কথা বলা হচ্ছে তা আইন ও সংবিধান বিরোধী। বিজেপি শাসন ক্ষমতায় রয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলছেন, মুসলিম বাদে সবাইকে নাগরিকত্ব দেওয়া হবে। কিন্তু এর উদ্দেশ্য কী? এটা কী ভারতীয় সংবিধানের ১৪ ধারা সমতার অধিকার বিরোধী নয়? এটা কী বৈষম্য নয়? এটা আমাদের সংবিধানের ১৫ ধারা বিরোধী, মৌলিক অধিকার বিরোধী।’ অন্যদিকে, সরকার হঠাৎ করে গত ৫ আগস্ট সংবিধানের ৩৭০ এবং ৩৫এ ধারায় জম্মু-কাশ্মীরকে প্রদান করা বিশেষ আইনি অধিকার ও মর্যাদা খারিজ করে রাজ্যকে ভেঙে দুটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল (জম্মু-কাশ্মীর ও লাদাখ) গঠন করে, যা ৩১ অক্টোবর থেকে জম্মু-কাশ্মীর ও লাদাখ এই দুটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ করেছে এবং এতে দু’জনকে লেফটেন্যান্ট গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু গত ৫ আগস্ট থেকেই কাশ্মীরে চরম উত্তপ্ত পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। কাশ্মীরীরা এখন স্বাধীনতার ডাক দিয়েছে। ৮০ লাখ জনসংখ্যার রাজ্যে ৯ লাখ সেনা ও পুলিশ মোতায়েন করেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা যায়নি। অন্যদিকে, কাশ্মীরকে কেন্দ্র করে পাকিস্তানের সাথে পুনরায় যুদ্ধের আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। প্রায়ই সীমান্তে চরম উত্তেজনা ও গোলাগুলি চলছে। তাতে অনেক হতাহত হচ্ছে। লাদাখ নিয়েও চীনের সাথে চরম বিরোধ শুরু হয়েছে। এই তিনটি দেশই পরমাণু বোমার অধিকারী। তাই যুদ্ধ বাঁধলে পরমাণু বোমার ব্যবহার নিশ্চিত এবং তাতে ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। তাই এ নিয়ে ব্যাপক শঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে বিশ্বব্যাপী। বিষয়টি জাতিসংঘ এবং বিশ্বের বিভিন্ন ফোরামে আলোচিত হয়েছে। কাশ্মীরের বিষয়টি এখন আর দ্বিপাক্ষিক নয়, তার আন্তর্জাতিকরণ হয়েছে। কাশ্মীরের ৩৭০ ধারা বাতিলের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে মালয়েশিয়া ও তুরস্ক। ভারত দেশ দু’টির বিরুদ্ধে চরম ক্ষিপ্ত হয়ে মালয়েশিয়ার ভোজ্য তেল আমদানি বন্ধ এবং তুরস্কের নির্ধারিত সফর বাতিল করেছেন প্রধানমন্ত্রী মোদি। অবশ্য মুসলিম দেশগুলো পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণ করলে ভারত চরম ক্ষতির শিকার হবে। ভারতে সা¤প্রতিক সময়ে গণতন্ত্র, বাকস্বাধীনতা এবং বহুত্ববাদ চরম হুমকির মুখে পড়েছে। এ ব্যাপারে নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের মন্তব্য প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেছেন, ‘ভারতে মতপ্রকাশ এখন ভয়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।’ ৬ অক্টোবর, ২০১৯ প্রকাশিত যুক্তরাষ্ট্রের দ্য নিউইয়র্কার সাময়িকীতে এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ মন্তব্য করেন।
ভারত একটি আধিপত্যবাদী দেশও। এই দেশটির দাদাগিরিতে পার্শ্ববর্তী সব দেশই চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ব্যাপারে স¤প্রতি প্রকাশিত চীনের গেøাবাল টাইমস’র প্রতিবেদন স্মরণযোগ্য। ‘ভারতের অতিমাত্রায় প্রভাব থেকে বেরিয়ে যাওয়া সার্বভৌম দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ’ শিরোনামে এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নেপালের সাথে সম্পর্ক থেকে আমরা দক্ষিণ এশিয়ার দুই আঞ্চলিক শক্তি চীন আর ভারতের পার্থক্য বুঝতে পারি। নয়াদিল্লি এই অঞ্চলকে তাদের বাড়ির উঠোন মনে করে, তাদের ওপর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে এবং চীনের মতো বড় দেশের সাথে সহযোগিতার ক্ষেত্রে অন্যদের জন্য বাধার সৃষ্টি করে। নেপাল যদিও রাজনৈতিকভাবে স্বাধীন, কিন্তু নয়াদিল্লির প্রভাবের কারণে কূটনৈতিকভাবে তারা খুব কমই স্বাধীনতা ভোগ করতে পেরেছে। শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ এবং মালদ্বীপের মতো দেশগুলোরও কমবেশি নেপালের মতো অভিজ্ঞতা হয়েছে।
পাকিস্তানের কারণে সর্বাধিক কল্যাণকর আঞ্চলিক সংস্থা-সার্ক’কে মৃতপ্রায় বানিয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ অন্য সংস্থাগুলো প্রতিষ্ঠা করেছে ভারত। এসব নানা কারণে প্রায় সব দেশের বেশিরভাগ মানুষ চরম ভারত বিরোধী। উপরন্তু সব দেশ সাধ্যমতো সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করছে। এতে করে দেশগুলো তার নাগরকিদের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে ব্যর্থ হচ্ছে। সর্বোপরি কোনো কোনো দেশ ভারতের দাদাগিরি থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য অন্য বড় শক্তিশালী দেশের সাথে সখ্য গড়ে তুলছে। ভারতও তার দাদাগিরি বহাল রাখার লক্ষ্যে সামরিক শক্তি বৃদ্ধি অব্যাহত রেখেছে। এতে করে দেশটির সার্বিক উন্নতি চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে।
একটি দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রধান রক্ষাকবচ তার জনগণ। জনগণ যদি নিরাপদে থাকে, মৌলিক অধিকারসমূহ পূরণ হয়, তাহলে তারা দেশপ্রেমিক হয়। জীবন দিয়ে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষা করে। আর জনগণ যদি দেশপ্রেমিক না হয়, তাহলে হাজার হাজার পরমাণু বোমা দিয়েও দেশের স্বাধীনতা রক্ষা করা সম্ভব নয়। তাই ভারতের উচিৎ দেশবাসীর মৌলিক অধিকারসমূহ পূরণের দিকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া। অন্যদিকে, ভারতের উচিত অতীত ঐতিহ্য তথা গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও বহুত্ববাদ রক্ষা করা। সর্বোপরি দাদাগিরি ত্যাগ করে পাশের সব দেশের সাথে সমতা ও মর্যাদাশীল সম্পর্ক গড়ে তোলা।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

গত ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন