ঢাকা, শুক্রবার , ১৩ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ১৫ রবিউস সানি ১৪৪১ হিজরী

সম্পাদকীয়

ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের আঘাত

| প্রকাশের সময় : ১২ নভেম্বর, ২০১৯, ১২:০২ এএম

ঘূর্ণিঝড় বুলবুল অনেকটা দুর্বল হয়ে আঘাত হানায় বাংলাদেশে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আশঙ্কার তুলনায় কম হয়েছে। এটা মহান আল্লাহতায়ালার অপার রহমত। জানা গেছে, গতি পথ বদল করে বুলবুল ভারতে আঘাত হানে এবং এর ডান দিকের অংশ সুন্দরবন হয়ে খুলনা-বরিশাল অঞ্চলে আঘাত করে। সুন্দরবনে বাধা পাওয়ায় ঘূর্ণিঝড়টি দুর্বল হয়ে যায় এবং এর গতি কমে যায়। এটাই ক্ষয়ক্ষতি কম হওয়ার মূল কারণ। উল্লেখ করা যেতে পারে, ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর ঘূর্ণিঝড় সিডর এবং ২০০৯ সালের ২৫ মে ঘূর্ণিঝড় আইলা সুন্দরবনে বাধা পেয়ে দুর্বল হয়ে পড়ায় ক্ষয়ক্ষতি কম হয়। সুন্দরবন সংলগ্ন উপকূলীয় জেলাগুলো ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির পুরো বিবরণ না পাওয়া গেলেও যতদূর জানা গেছে, ১০/১২ জন মারা গেছে। বাড়িঘর, ধান, শাকসবজি, তরিতরকারি ইত্যাদির যথেষ্ট ক্ষতি হয়েছে। জলোচ্ছ¡াসে এলাকার পর এলাকা তলিয়ে গেছে। মাছের ঘেরগুলো সব ভেসে গেছে। ফসলাদি ও হাজার হাজার মাছের ঘের ভেসে যাওয়ায় বৃহত্তর খুলনার অর্থ-সামাজিক অবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। বৃহত্তর বরিশালে হাজার হাজার বাড়িঘর, ধানক্ষেত, সবজি ক্ষেত, গাছপালা ইত্যাদির অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় বরিশাল শহরসহ অন্যান্য শহরে মানুষের দুর্ভোগের শেষ নেই। বিদ্যুতের অভাবে পানি সরবরাহ বন্ধ এবং গতকাল সকাল পর্যন্ত পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হয়নি। চট্টগ্রাম বন্দর তিনদিন বন্ধ থাকার পর সচল হয়েছে। কক্সবাজারে মাছ ধরা এখনো বন্ধ। সাগর ধীরে ধীরে শান্ত হচ্ছে।

ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের মোকাবিলায় সরকারের তরফে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছিল। উপকূলীয় এলাকা থেকে মানুষজন নিরাপদ এলাকায় বা আশ্রয় কেন্দ্রে সরিয়ে আনার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। ১৭ থেকে ১৮ লাখ লোক সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়েছিল। মানুষজন উদ্ধার ও তাদের সহযোগিতা প্রদানের জন্য স্বেচ্ছাসেবকদের প্রস্তুত রাখা ছাড়াও উপকূলীয় এলাকায় সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছিল। সশস্ত্র বাহিনীর সকল সেনানিবাস, ঘাঁটি, জাহাজ ও হেলিকপ্টার প্রস্তুত রাখা হয়েছিল। আইএসপিআর’র সংবাদ বিজ্ঞপ্তি মোতাবেক, ঘূর্ণিঝড় বুলবুল পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি উদ্ধার, ত্রাণ ও চিকিৎসা সহায়তায় বরিশাল, ঝালকাঠি, পটুয়াখালী, বরগুনা, সাতক্ষীরায় পাঁচটি, চট্টগ্রামে তিনটি ও সেন্টমার্টিনে দুটি জাহাজসহ নৌ কন্টিজেন্ট ও মেডিকেল টিম প্রস্তুত রাখা হয়েছিল। ঘূর্ণিঝড় পরবর্তী উদ্ধার তৎপরতায় নৌ বাহিনীর তরফে তিন স্তম্ভের ব্যাপক কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। উপরন্ত মেডিকেল টিম, খাদ্য সামগ্রী এবং জীবনরক্ষাকারী ওষুধপত্রও মজুদ রাখা হয়েছিল। প্রশাসনসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগ, দফতর ও পরিদফতরকে ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় সতর্ক, সজাগ, ও তৎপর রাখা হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বয়ং সব ধরনের প্রস্তুতি, পদক্ষেপ ও আয়োজন সার্বক্ষণিকভাবে তত্ত্বাবধান করেছেন। মন্ত্রী, সচিব ও ডিসিদের প্রয়োজনীয় দিক-নির্দেশনা দিয়েছেন। একই সঙ্গে ঘূর্ণিঝড়ের কারণে যেন বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি না হয়, সেজন্য দেশবাসীর কাছে দোয়া কামনা করেছেন। বন্যা, ঝড়, জলোচ্ছ্বাস প্রভৃতি প্রাকৃতিক দুর্যোগে, আমরা বরাবরই লক্ষ করেছি, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অতটা বিচলিত না হয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলায় দৃঢ় মনোভাব প্রদর্শন করেন। নিজে সক্রিয় হয়ে সবকিছু দেখভাল করেন, নির্দেশনা প্রদান করেন। এতে প্রস্তুতিসহ সকল কাজ যে ভালোভাবে হয় তা বলার অপেক্ষা রাখে না। স্মরণ করা যেতে পারে, দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশের সক্ষমতা অন্য অনেক দেশের তুলনায় বেড়েছে, যার কারণে যে কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কম হয়।

ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের আঘাত তেমন প্রচন্ড বা সবল না হওয়ায় ক্ষয়ক্ষতি কম হয়েছে এবং এটা যে আল্লাহপাকের রহমত, সে কথা আমরা শুরুতেই উল্লেখ করেছি। তবে ক্ষতি যাই হোক বা যতটা হোক, তা সহজে পূরণ হবে না। বিশেষ করে ঘরবাড়ি, ধান-ফসল ও মাছের যে ক্ষতি হয়েছে, তা সহসা পূরণ হওয়ার নয়। ক্ষতিগ্রস্ত অনেকেই বলেছেন, সরকার যদি তাদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেয় তবে যা ক্ষতি হয়েছে তা দ্রুত কাটিয়ে ওঠা তাদের পক্ষে সম্ভব হবে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও মাছের ঘের মালিকদের এখনই আর্থিক ও উপকরণ সহায়তা দিতে হবে। যাদের বাড়িঘর ধ্বংস বা নষ্ট হয়েছে তাদের তা পুনঃ নির্মাণের জন্য আর্থিক সহায়তা দিতে হবে। অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে আমরা বলতে বাধ্য হচ্ছি, ঘূর্ণিঝড় আইলায় ক্ষতিগ্রস্তদের অনেকের আজো পুনর্বাসন করা সম্ভব হয়নি। কেন এই ব্যর্থতা, সেটা খুঁজে বের করতে হবে এবং একইসঙ্গে বুলবুলে ক্ষতিগ্রস্তদের অবিলম্বে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। এখানে একটি বিষয়ের উল্লেখ প্রাসঙ্গিক এবং অত্যন্ত আবশ্যক বলেই আমরা মনে করি। তা হলো, ঘূর্ণিঝড় সিডর ও আইলার মতো এবার বুলবুলকেও রুখে দিয়েছে সুন্দরবন। সুন্দরবন একটি প্রাকৃতিক দেয়াল বা রক্ষাকবচ, যুগ যুগ ধরে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ¡াস রুখে দিয়ে উপকূলীয় মানুষজনকে সুরক্ষা দিয়েছে এই ম্যানগ্রোভ বন। অথচ তার প্রতি আমরা কোনো সুবিচার করছি না। বনের আশপাশে কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও কলকারখানা স্থাপন করে তার অস্তিত্ব বরং বিপন্ন করার কাজ করে যাচ্ছি অবলীলায়। মনে রাখতে হবে, কলকারখানা যে কোনো জায়গায় করা যাবে, কিন্তু সুন্দরবন কোথাও করা যাবে না। কাজেই, আগে সুন্দরবন রক্ষা করতে হবে, নিরাপদ করতে হবে, যাতে তার প্রহরা আরো শক্তিশালী হয়। অন্যদিকে উপকূলীয় সবুজ বেষ্টনী বাড়াতে হবে, যাতে সাগরের প্রতিকূলে সুরক্ষা ব্যুহ হিসাবে তা আরো ভালো কাজ করতে পারে। আমরা আশা করি, সরকার বিষয়টি গভীরভাবে বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনীয় কার্যব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন