ঢাকা, রোববার , ০৮ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ১০ রবিউস সানি ১৪৪১ হিজরী

সম্পাদকীয়

বিশ্ব আদালতে মিয়ানমারের গণহত্যার মামলা

| প্রকাশের সময় : ১৩ নভেম্বর, ২০১৯, ১২:০১ এএম

মিয়ানমারের রাখাইনে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠির ওপর গণহত্যা চালানোর অভিযোগে জাতিসংঘের সর্বোচ্চ বিচারিক আদালত ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস বা আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা করেছে পশ্চিম আফ্রিকান দেশ গাম্বিয়া। মিয়ানমার বাহিনীর গণহত্যা ও দমনাভিযানের শিকার হয়ে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা মুসলমানদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে তাদের নাগরিকত্ব ও পূর্ণ নিরাপত্তাসহ পুনর্বাসনের দাবীতে ৪৬ পৃষ্ঠার একটি আবেদন গত সোমবার ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিসে জমা দিয়েছে গাম্বিয়া। রাখাইনে রোহিঙ্গাদের উপর গণহত্যা, নারী ধর্ষণ, বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগসহ সুপরিকল্পিতভাবে গোষ্ঠিগত নির্মূলের জন্য এসব কর্মকান্ড চালিয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। গাম্বিয়া ও মিয়ানমার ১৯৪৮ সালের জেনোসাইড কনভেনশনে স্বাক্ষরকারী দেশ। গত মাসে গাম্বিয়ার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতা দিতে গিয়ে গাম্বিয়ার আইনমন্ত্রী আবুবকর তামবাদাউ কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরনার্থী শিবির পরিদর্শনের অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিতে গিয়ে মিয়ানমারের গণহত্যার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতে মামলার প্রস্তুতি গ্রহণের ঘোষণা দিয়েছিলেন। ইতিপূর্বে ওআইসিসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোগান এবং মালয়েশিয়ার নেতা মাহাথির মোহাম্মদ মিয়ানমার বাহিনীর গণহত্যার অভিযোগ তুলে আন্তর্জাতিক আদালতে মামলার সুপারিশ করেছিলেন। কানাডা, ফ্রান্স, তুরস্ক, নাইজেরিয়াসহ আরো বেশ কয়েকটি দেশ মিয়ানমারের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গার ওপর গণহত্যার অভিযোগ তুলেছিল। মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট এবং জাতিসংঘের একাধিক প্রতিবেদনে মিয়ানমার বাহিনীর মানবাধিকার লঙ্ঘনের সুস্পষ্ট অভিযোগ তোলা হয়েছিল।

রাখাইনে রোহিঙ্গা মুসলমানদের হাজার বছরের ধারাবাহিক ইতিহাস রয়েছে। রাখাইনের সাথে বাংলার স্বাধীন সুলতানদের নিবিড় ঐতিহাসিক সম্পর্কের যোগসুত্র খুঁজে পাওয়া যায়। অষ্টাদশ শতকে বার্মিজরা আরাকান দখলের আগে ভৌগলিক ও সাংস্কৃতিকভাবে রাখাইনের সাথে মিয়ানমারের কোনো সংশ্রব বা যোগসুত্র ছিল না। বৃটিশ ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলাকে আরাকান পর্যন্ত বিস্তৃত করার পর ১৮৯১ সালে করা আদমশুমারিতে আরাকানে রোহিঙ্গা মুসলমানের সংখ্যা ছিল ৫৮ হাজার ২৫৫জন । বৃটিশরা আরাকানের জমিচাষের জন্য চট্টগ্রাম থেকে শ্রমিক অভিবাসনের নীতি গ্রহণের কারণে পরবর্তি দুই দশকে আরাকানে মুসলমান জনসংখ্যা প্রায় পৌনে দুইলাখে পৌঁছায় বলে জানা যায়। তবে বৌদ্ধদের সাথে মুসলমানদের বিরোধও অনেক পুরনো। বৃটিশরা এই বিরোধ নিরসনের উদ্যোগ গ্রহণ করেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে তা সম্ভব হয়নি। তবে আরাকানের রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের প্রশ্নে প্রথম জটিলতাও বৃটিশরা সৃষ্টি করেছিলো বলে জানা যায়। মিয়ানমারে দীর্ঘ সামরিক শাসন এবং জান্তা সরকারের বৌদ্ধ জনতুষ্টিমূলক আচরণের কারণে তাদের মুসলমান বিদ্বেষি ভ’মিকা এক সময় রোহিঙ্গা জাতিগত নির্মূলের পরিকল্পনায় পরিনত হয়। মিয়ানমার জান্তা সরকারের প্রণীত ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের নাগরিকত্ব প্রদানের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়ায়। আশা করা হচ্ছিল, মিয়ানমারে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হলে আইনগত বৈষম্য দূর করে সেখানে রোহিঙ্গা মুসলমানসহ সব জাতি ও ধর্মাবলম্বী মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারসহ নাগরিকত্বের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্ত অংসান সুচির নেতৃত্বে মিয়ানমারে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রত্যাবর্তন হওয়ার পর রোহিঙ্গাদের উপর ইতিহাসের সবচেয়ে বর্বরতম গণহত্যা সংঘটিত হয়।

আশির দশকের পর থেকেই রাখাইনের মুসলমানরা বিশ্বের অন্যতম নিগৃহিত সংখ্যালঘু সম্প্রদায় হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। শান্তিতে নোবেল বিজয়ী অংসান সুচি মিয়ানমারের ডিফ্যাক্টো নেতা হওয়ার পর ২০১৬ সালে শুরু হওয়া রোহিঙ্গা বিরোধী অভিযান অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ করে। সেই থেকেই আন্তর্জাতিক মহল থেকে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব প্রদানসহ বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের দেশে ফিরিয়ে নেয়ার জোরালো দাবী ওঠে। জাতিসংঘের তৎকালীন মহাসচিব বান কি মুনের প্রচেষ্টায় সাবেক মহাসচিব কফি আনানের নেতৃত্বে গঠিত তদন্ত কমিশনের রিপোর্টে রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা ও জাতিগত নির্মূলের অপতৎপরতার চিত্রই উঠে আসে। আনান কমিশন ঘটনাবলীর সবিস্তার প্রামাণ্য দলিল, সাক্ষি-সাবুদসহ তুলে ধরার পাশাপাশি সংকট নিরসন ও সমস্যা সমাধানের সুস্পষ্ট নির্দেশনা ও সুপারিশও উপস্থাপন করেছেন। তবে মিয়ানমার সে পথে হাঁটেনি। দ্বিপাক্ষিক সমঝোতার ভিত্তিতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তন ও পুনর্বাসন প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে বাংলাদেশকে প্রতিশ্রæতি দিয়ে রক্ষা করেনি মিয়ানমার। এখন ওআইসির সদস্য এবং আন্তর্জাতিক জেনোসাইড কনভেনশনে স্বাক্ষরদাতা দেশ হিসেবে আন্তর্জাতিক আদালতে গাম্বিয়ার মামলা রোহিঙ্গা গণহত্যার বিচার এবং রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের সমাধান হবে বলে আমাদের বিশ্বাস। এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মতামত ও আকাঙ্খার প্রতিফলন নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সরকারকে মামলা প্রক্রিয়ায় সর্বাত্মক সহযোগিতা ও সহায়তার হাত প্রসারিত করতে হবে। রোহিঙ্গা সংকটের সবচেয়ে বগ ভুক্তভোগী বাংলাদেশ। সমস্যা সমাধানে মিয়ানমার সরকারের সদিচ্ছাই যথেষ্ট ছিল। তারা তা প্রমাণ দিতে ব্যর্থ হয়েছে। এখন আন্তর্জাতিক আদালত এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে দায়িত্ব গহণ করতে হবে। রাখাইনে গণহত্যা এবং ১০ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা মুসলমানের বাস্তুচ্যুতির ঘটনা বর্তমান বিশ্বের অন্যতম ন্যক্কারজনক মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা। বিশ্বসম্প্রদায় এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে মানবতার এই ক্ষতচিহ্ন মোচনের জন্য ন্যয়বিচার নিশ্চিত করার কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন