ঢাকা, সোমবার , ০৯ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ১১ রবিউস সানি ১৪৪১ হিজরী

সম্পাদকীয়

ডায়াবেটিস ও কিডনি

আফতাব চৌধুরী | প্রকাশের সময় : ১৪ নভেম্বর, ২০১৯, ১২:০১ এএম

কিডনি মানুষের শরীরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। এটিকে আমাদের দেহের ছাঁকনিও বলা হয়। দিনে দিনে অসংখ্য মানুষ এই কিডনির সমস্যায় আক্রান্ত হচ্ছেন। বহুবিধ কারণে কিডনির সমস্যা দেখা দিতে পারে। যেমন সংক্রমণ বা ইনফেকশন, কিছু কিছু অটোইমিউন অসুখ, উচ্চরক্তচাপ, হাই ইউরিক অ্যাসিড, অত্যধিক ব্যথার ওষুধ খাওয়া, ডায়াবেটিসজনিত কারণে কিডনির জটিলতা ইত্যাদি। তবে ডায়াবেটিক নেফ্রোপ্যাথি আজকের দিনে কিডনি ফেলিওরের অন্যতম কারণ এবং এটি বহুলাংশে প্রতিরোধযোগ্য। ডায়াবেটিস এমন একটি অসুখ যেটি শরীরের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ক্ষতি করতে পারে বিশেষত যদি ব্লাড সুগার অনেকদিন অনিয়ন্ত্রিত থাকে। তার মধ্যে স্নায়ূর রোগ (ডায়াবেটিস নিউরোপ্যাথি), চোখের অসুখ (ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি), কিডনির অসুখ (ডায়াবেটিক নেফ্রোপ্যাথি), হৃদরোগ (পক্ষাঘাত বা ষ্ট্রোক) এবং ডায়াবেটিক ফুট অন্যতম। এগুলোর মধ্যে ডায়াবেটিসজনিত কিডনির অসুখ বা ডায়াবেটিস কিডনি ডিজিজ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কারণ এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ক্রনিক মরবিডিটি এবং মরটালিটি অর্থাৎ দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতা এবং মৃত্যু। শুধু তা-ই নয়, ডায়াবেটিক কিডনি ডিজিজকে ডায়াবেটিসের একটি অত্যন্ত ব্যয়সাপেক্ষে জটিলতা হিসাবে গণ্য করা হয়। এই ধরনের কিডনির অসুখের চিকিৎসা অত্যন্ত দীর্ঘমেয়াদী ও ব্যয়বহুল। ডায়াবেটিস রোগীদের মধ্যে ৩০ থেকে ৩৬ শতাংশ রোগী কিডনির অসুখে আক্রান্ত হন। টাইপ-১ : জুভেনাইল ডায়াবেটিস অসুখে সাধারণত কিডনির জটিলতা শুরু হয় ডায়াবেটিস ধরা পড়ার ১০ বছরের মধ্যে। টাইপ-১: রোগীর শরীরে ডায়াবেটিসের আয়ু যদি ৩০ বছরের অতিক্রান্ত হয় তাহলে ৫০ শতাংশ রোগীর মধ্যেই কিডনির অসুখ দেখা যায়। টাইপ-২: অ্যাডাল্ট অন সেট ডায়াবেটিসেও কিডনির অসুখের পরিসংখ্যানটা অনুরূপ। তবে অনেক ক্ষেত্রে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের রোগীরা কিডনির জটিলতা নিয়েই প্রথম চিকিৎসকের দ্বারস্থ হন।

ডায়াবেটিসের কিডনির জটিলতার জন্য কতকগুলো কারণ দায়ী : ১) কতদিন রোগী ডায়াবেটিসে ভুগছেন (ডিউরেশন অফ ডায়াবেটিস), ২) ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রণের মাত্রা (ডিগ্রি অফ গøাইসেমিক কন্ট্রোল, ৩) ব্লাড প্রেশার বা রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের মাত্রা (ডিগ্রি অফ ব্লাড প্রেশার কন্ট্রোল), ৪) বংশগতি (জেনেটিক ফ্যাক্টরস)।

ডায়াবেটিস রোগীদের রক্তচাপ সম্পর্কে চিকিৎসকরা বিশেষ সচেতন থাকেন। একজন সাধারণ মানুষের, যার ডায়াবেটিস নেই তার রক্তচাপ যদি ১৪০/৯০-এর নিচে হয় তাহলেই চিকিৎসক সন্তুষ্ট হন। কিন্তু একজন রোগী যার ডায়াবেটিস আছে তার রক্তচাপ ১৩০/৮০-এর নিচে রাখা একান্ত প্রয়োজন কিডনিকে রক্ষা করার জন্য। নতুবা কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আর যে ডায়াবেটিক রোগীর কিডনির অসুখ ধরা পড়েছে তার ক্ষেত্রে এই মাপকাঠিটা আরও কঠোর করতে হবে। তাদের ব্লাড প্রেশার বা রক্তচাপ১২০/৭৫-এর নিচে রাখতে পারলে কিডনির ক্ষতি বহুলাংশে প্রতিহত করা যেতে পারে। সেই কারণে একজন ডায়াবেটিস রোগীর কিডনির অসুখ প্রতিহত করার জন্য অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে । এই পদক্ষেপগুলো হল:

ভালোভাবে বা যতদূর সম্ভব ব্লাড সুগারের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা (ষ্ট্রিক্ট ব্লাড সুগার কন্ট্রোল)। এর জন্য সুষম খাদ্য, নিয়মিত কায়িক-শ্রম, ওষুধ বা ইনসুলিন যা প্রয়োজন চিকিৎসকের পরামর্শে ব্যবহার করতে হবে। রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে, বিশেষ করে যাদের উচ্চরক্তচাপ আছে। রক্তে কোলেষ্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা, প্রয়োজনে ওষুধের মাধ্যমে। ধূমপান না করা।

ডায়াবেটিস রোগীদের যে কিডনির অসুখ হয়, তার কিন্তু একদম অ্যাডভান্সড স্টেজ অর্থাৎ শেষ পর্যায় পর্যন্ত কোনো লক্ষণ থাকে না। অবশ্য একজন অনেকদিনের ডায়াবেটিস রোগীর যদি পা ফুলতে থাকে, ওজন বাড়তে থাকে, রক্তাল্পতা দেখা দেয়, দুর্বল হয়ে পড়েন, অরুচি হয়, বারবার কারণ ছাড়াই ব্লাড সুগার কমে যেতে থাকে (হাইপোগøাসিমিয়া), ব্লাডপ্রেসার বাড়তে থাকে তাহলে সন্দেহ করতে হবে কিডনির অসুখ বা কিডনির জটিলতা আসতে শুরু করেছে। তবে এতদিন অবধি অপেক্ষা করা কোনোমতেই বাঞ্ছনীয় নয়। সেই কারণে আধুনিক ডায়াবেটিসে চিকিৎসায় ডায়াবেটিসজনিত কারণে কিডনির জটিলতা হচ্ছে কি না তা জানার জন্য প্রথম থেকেই কিছু স্ক্রিনিং বা পরীক্ষার ব্যবস্থা আছে। একজন টাইপ-১ ডায়াবেটিস রোগীর রোগ ধরা পড়ার ৫ বছর পর থেকে বছরে একবার করে এইসব পরীক্ষা চিকিৎসকের পরামর্শে করা উচিত। অনুরূপভাবে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের রোগীর কোনও লক্ষণ না থাকলে ও রোগ ধরা পড়ার সঙ্গে সঙ্গে বছরে একবার করে এই পরীক্ষাগুলো করা উচিত, কিডনির জটিলতা শুরু হচ্ছে কি না তা জানার জন্যই। কারণ প্রথম দিকে কিডনির অসুখ ধরা পড়লে তা চিকিৎসা করা অনেক সহজ এবং কম ব্যয়বহুল ও অনেক বেশি ফলপ্রসূ।

কিডনির জটিলতা শুরু হচ্ছে কিনা তা বোঝার জন্য প্র¯্রাবে মাইক্রোঅ্যালবুমিনারিয়া নামক একটি পরীক্ষা করা হয়। আর সঙ্গে রক্তে ইউরিয়া ক্রিয়াটিনিনের মাত্রাও মাপা হয়। অবশ্যই ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে অন্যান্য পরীক্ষা প্রয়োজন অনুসারে করাতে হবে। সুখের কথা, এই পরীক্ষাগুলো এমন কিছু ব্যায়সাধ্য নয় এবং সরকারি-বেসরকারিগুলোতে এগুলোর ব্যবস্থা আছে।

ডায়াবেটিস কিডনি ডিজিজের সঙ্গে একই সঙ্গে হাত ধরে চলে হার্টের অসুখ এবং ডায়াবেটিসজনিত চোখের সমস্যা। সেই কারণে হার্টের অসুখ এবং টার্ম ব্যবহার হয়, যাকে বলা হচ্ছে কনডায়োরেনাল ডিজিজ। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে ডায়াবেটিক নেফ্রোপ্যাথিতে কিডনি ফেলিওর যত না রোগী মারা যান তার থেকে বেশি সংখ্যক মারা যান হৃদরোগে। যদিও এটাও ঠিক, আজকের দিনে কিডনি ফেলিওরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হল ডায়াবেটিক নেফ্রোপ্যাথি। যেহেতু ডায়াবেটিস কিডনি ডিজিজের সঙ্গে হার্টের অসুখ ওতপ্রোতভাবে জড়িত তাই এই রোগীদের হার্টের অবস্থা জানার জন্য প্রয়োজনীয় টেষ্ট করাতে হবে এবং হার্টের কোনোরকম অস্বাভাবিকতা ধরা পড়লে তার যথাযথ চিকিৎসাও সমান্তরালভাবে চালাতে হবে। ঠিক একই রকমভাবে ডায়াবেটিসজনিত কারণে চোখের রেটিনার জটিলতা দেখা দিলে রোগীদের অন্ধত্ব প্রতিরোধের জন্য, যেমন লেজার ফোটোকোগুলেশন চিকিৎসারও প্রয়োজনীয়তা আছে।
ডায়াবেটিক কিডনি ডিজিজকে বলা হয় চিকিৎসার তুলনায় প্রতিহত করার জন্য-ঠিকমতো ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রণে রাখা, নিয়মিত ব্লাড প্রেসার নিয়ন্ত্রণে রাখা, নিয়মিত ওষুধ খাওয়া, সুষম আহার এবং ধূমপান না করা একান্ত প্রয়োজনীয়। যার কিডনির অসুখ সবে শুরু হয়েছে তার রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা, বিশেষত ওষুধের মাধ্যমে একান্ত জরুরী। কিন্তু যার কিডনির অসুখ কিছু অগ্রসর হয়েছে এবং যার কিডনি ঠিকমতো কাজ করছে না, যাকে পরিভাষায় বলা হয় সিকেডি বা ক্রনিক কিডনি ডিজিজ। যার সিকেডি আছে তার চিকিৎসা দু’ ধরনের- ১) কনজারভেটিভ বা ওষুধ দিয়ে, ২) ডায়ালিসিস ও কিডনি প্রতিস্থাপন করে।

ক্রনিক কিডনি ডিজিজ বা সিকেডি রোগীদের শরীরে খাদ্যের বিশেষ ভূমিকা আছে। যেহেতু অত্যধিক প্রোটিন কিডনির পক্ষে ক্ষতিকারক তাই এই রোগীদের চিকিৎসকরা খাদ্য থেকে প্রোটিনের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করেন। তার সঙ্গে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ডায়াটারি সোডিয়াম বা লবণও নিয়ন্ত্রিত করতে হবে। এইরকম রোগীদের রক্তে পটাশিয়ামের মাত্রা বেড়ে যায়, সেক্ষেত্রে পটাশিয়ামযুক্ত খাদ্য বিভিন্ন ফল, কিছু সবজি, ডাল ইত্যাদি খেতে বারণ করা হয়। সুতরাং একজন ডায়াবেটিক রোগী যার কিডনি ফেলিওর হয়েছে তার খাদ্য অনেকদিন থেকেই নিয়ন্ত্রিত হয়ে যায়। তার খাদ্যতালিকা একজন ডায়াটেশিয়ান বা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী হওয়া উচিত।

ডায়াবেটিসের কারণে কিডনির যে জটিলতা হয় সে বিষয়ে জনসাধারণের মনে একটা ভয়ের স্থান রয়েছে। এই ভয়, কিন্তু একেবারেই অমূলক নয়। যে পরিবারের একজন সদস্য এই কিডনির সমস্যায় ভুগছেন সেই পরিবারের অন্যান্যরাও এটির মর্ম বুঝবেন। বলা হয়, একজন কিডনি ফেলিওরের রোগী ধনেপ্রাণে মারা যান এবং পরিবারস্থ অন্যদেরও চরম বিপর্যয়ের মধ্যে ফেলেন। কারণ কিডনি ফেলিওরের চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং এর সুযোগ-সুবিধা ও আমাদের দেশের শহরের বড় হাসপাতাগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ। সৌভাগ্যবান কতিপয় যাঁরা ডায়ালিসিস বা কিডনি প্রতিস্থাপনের সুযোগ পান তাদের মধ্যেও ৭৫ শতাংশ মানুষ মারা যার চার বছরের মধ্যে। মূলত হৃদরোগ বা ওই ধরনের কোনো জটিলতার কারণে।

মানুষের মধ্যে ভ্রান্ত ধারণা আছে, যে কিডনি ফেলিওর হতে শুরু করলে বুঝি একটি কিডনি অকেজো হয় এবং অন্যটি দুটির সমান কাজ চালিয়ে নিতে পারে। কিন্তু ডায়াবেটিস বা উচ্চরক্তচাপ বা এই ধরনের কোনো কারণে কিডনি আক্রান্ত হলে দুটি কিডনি একই সঙ্গে প্রভাবিত হয়। সুতরাং একবার কিডনি ফেলিওর হলে যদি ওষুধে কাজ চালানো না যায় তাহলে ডায়ালিসিস বা কিডনি প্রতিস্থাপন ছাড়া গত্যন্তর নেই। তবে আশার কথা এই যে, সব ডায়াবেটিসের রোগী কিডনির জটিলতায় আক্রান্ত হন না এবং সারা বিশ্বে সমীক্ষার মাধ্যমে আজ প্রমাণিত যে, ডায়াবেটিস এবং উচ্চরক্তচাপের সুচিকিৎসার ফলে কিডনি ফেলিওর প্রতিহত করা প্রায় পুরোপুরি সম্ভব। কিন্তু তার জন্য চাই সচেতনতা রোগী থেকে চিকিৎসক, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এমনকি সমাজের সর্বস্তরে এই সচেতনা প্রয়োজন।

সাধারণ সুস্থ মানুষ অর্থাৎ যাঁরা এখনও ডায়াবেটিস বা কিডনির সমস্যা আক্রান্ত হননি তাঁদের জন্য সচেতনতা-১) নিয়মিত ফাস্টিংস ব্লাডসুগার পরীক্ষার মাধ্যমে ডায়াবেটিস হয়েছে কিনা জেনে নেওয়া। হলে তার যথাযথ চিকিৎসা। ২) রক্তচাপ বাড়ছে কি না তা মাঝেমধ্যেই পরীক্ষা করা এবং উচ্চরক্তচাপে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া। ৩) চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ, বিশেষ ব্যথার ওষুধ না খাওয়া। ৪) হাতুড়ে ডাক্তারের দ্বারা প্রেসক্রাইবড ওষুধ বা রেমিডিজ ব্যবহার না করা। সারা বিশ্বে বিশেষত এশিয়া, আমেরিকা ইত্যাদি মহাদেশে বহু রোগীই হাতুড়ে ডাক্তারের পরামর্শে মাছের পিত্তগুলো কাঁচা খান ডায়াবেটিস ও অন্যান্য রোগ প্রতিরোধের জন্য। এই ধরনের খাদ্যাভ্যাসে কিডনি ফেলিওরের সংখ্যা অনেক বৃদ্ধি পায়। এমনকি প্রাণসংশয়ও ঘটে। সুতরাং ডায়াবেটিসজনিত কারণে কিডনির সমস্যা বা অন্য যে কোনো কারণে কিডনির জটিলতা ধরা পড়লে অবিলম্বে সুচিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই বাঞ্ছনীয়।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট। সদস্য, কার্যকরি পরিষদ, ডায়াবেটিক এসোসিয়েশন, সিলেট।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন