ঢাকা, বৃহস্পতিবার , ১২ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ১৪ রবিউস সানি ১৪৪১ হিজরী

জাতীয় সংবাদ

উল্লাপাড়ায় রেললাইনের ফেসিং পয়েন্টের সমস্যা বহু পুরনো

কর্তৃপক্ষকে জানানোর পরও ব্যবস্থা নেয়া হয়নি

বিশেষ সংবাদদাতা | প্রকাশের সময় : ১৬ নভেম্বর, ২০১৯, ১২:০১ এএম

বঙ্গবন্ধু সেতু অতিক্রম করার পর থেকে দ্রুত গতিতে ছুটছিল রংপুর এক্সপ্রেস। উল্লাপাড়া স্টেশনে প্রবেশের আগে হোম সিগনালের কাছে এসে হঠাৎ করেই বিকট একটা শব্দ হয়। এরপর ট্রেনের কোচগুলো হেলে দুলে চলতে থাকে। তখন ভয়ে চিৎকার করতে থাকেন যাত্রীরা। এক পর্যায়ে ট্রেনটি থেমে যায়। দুর্ঘটনাকবলিত ট্রেনের যাত্রী সাদিকুল ইসলাম আরও বলেন, আমি একা ছিলাম বলে দ্রুত ট্রেন থেকে নেমে যাওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু মহিলা ও শিশু যাত্রীদের কান্না ও চিৎকারে তাদেরকে রেখে নামতে পারিনি। তাই প্রথমে তাদেরকে নামিয়ে পরে আমি নেমেছি। তিনি বলেন, ট্রেনটি থামার আগেই ইঞ্জিন উল্টে তাতে আগুন ধরে যায়। আমি ছিলাম ইঞ্জিন থেকে এক বগি পরেই। সে কারণে যা কিছু ঘটেছে সবই আমার চোখের সামনেই।

ট্রেনটি চালাচ্ছিলেন লোকো মাস্টার (এলএম) তারিক রহমান। আহত হয়ে তিনি সিরাজগঞ্জের একটি ক্লিনিকে চিকিৎসাধীন। তার সহকারী এএলএম মোশাররফও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। একজন সহকর্মী চিকিৎসাধীন চালক তারিকের সাথে কথা বলেছেন। তিনি জানান, চালক তারিক তাকে বলেছেন, বঙ্গবন্ধু সেতু পার হওয়ার পর ট্রেনের গতিবেগ ছিল ৭৫ কিলোমিটার। উল্লাপাড়া এবং তার পরের স্টেশন লাহিড়ী মোহনপুর পর্যন্ত লাইন ক্লিয়ার পেয়ে প্রায় ৮০ কিলোমিটার ছুটছিল ট্রেনটি। উল্লাপাড়ার প্রবেশের সময় ফেসিং পয়েন্টে হঠাৎ করে একটা বিকট শব্দ হলে চালক পেছনের দিকে তাকান। দেখেন বগীগুলো হেলে দুলে চলছে। সাথে সাথে তিনি ইমার্জেন্সি ব্রেক করে ট্রেনটি থামানোর চেষ্টা করেন। তার আগেই ইঞ্জিনটি উল্টে যায়। এতে তার মাথা ফেটে যায়। আঘাত লাগে শরীরের কয়েকটি অংশে। সহকর্মীকে ট্রেন চালক তারিক জানিয়েছেন, কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই সহকারী চালক মোশাররফ চিৎকার করে বলতে থাকে, ভাই বেরিয়ে আসেন। ইঞ্জিনে আগুন ধরেছে। তিনি নিজের চেষ্টায় কোনোমতে বের হন।

কি কারণে এই দুর্ঘটনা তা নিয়ে দুই ধরনের কথা বলছেন খোদ রেলওয়ের কর্মকর্তারাই। উল্লাপাড়া স্টেশন মাস্টার দাবি করেছেন, যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে ট্রেনটি লাইনচ্যুত হওয়ায় এ দুর্ঘটনা ঘটেছে। আবার রেলপথ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেছেন, সিগন্যালের ভুলেই এই দুর্ঘটনা ঘটেছে। তবে এই রেলপথে মিটার গেজের যে সব ট্রেন প্রতিনিয়ত চলাচল করে সে সব ট্রেনের চালকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, উল্লাপাড়া স্টেশনের কাছে আপ (ঢাকা থেকে যাওয়ার পথে) ফেসিং পয়েন্টে রেললাইনের ত্রুটি বহু পুরনো। কোনো স্টেশনে প্রবেশের আগে মেইন লাইন থেকে যখন একাধিক লাইন বিভাজিত হয় সেই পয়েন্টকে রেলের ভাষায় ফেসিং পয়েন্ট বলে। উল্লাপাড়ার এই পয়েন্টটি আগে থেকেই ত্রুটিপূর্ণ। মেইন লাইন থেকে ট্রেন এক বা দুই নম্বর লাইনে যাওয়ার সময় সজোরে ঝাঁকুনি হয়। ইঞ্জিন সজোরে কেঁপে ওঠে। বগীগুলোও হেলে যায়। ট্রেনের চালকরা ইতিপূর্বে বিষয়টি পাকশি কন্ট্রোলকে একাধিকবার জানিয়েছেন। কিন্তু তারপরেও ওই পয়েন্টটি মেরামত করা হয়নি। রংপুর এক্সপ্রেসের এক চালক বলেন, চাটমোহর ও জামতৈল স্টেশনের ফেসিং পয়েন্টও ত্রুটিপূর্ণ। মেইন লাইন থেকে ট্রেন লুপ লাইনে ঢোকার সময় ইঞ্জিন খুবই জোরে ঝাঁকুনি খায়। কাত হয়ে উল্টে যাওয়ার উপক্রম হয়। ট্রেন চালকদের ধারণা- ত্রুটিপূর্ণ ওই ফেসিং পয়েন্টেই বড় ঝাঁকুনিতে রংপুর এক্সপ্রেসের ইঞ্জিন প্রথমে লাইনচ্যুত হয়ে এ দুর্ঘটনা ঘটেছে। ৭৫-৮০ কিলোমিটার গতির কারণে ত্রুটিপূর্ণ ফেসিং পয়েন্টে ইঞ্জিন লাইনচ্যুত হতেই পারে বলে জানান রেলওয়ের একজন প্রকৌশলী।

আলাপকালে কয়েকজন ট্রেন চালক জানান, রেললাইন সংস্কার না করে রেল কর্তৃপক্ষ শুধু ট্রেনের গতি বাড়িয়ে চলেছে। আগে জয়দেবপুর থেকে সান্তাহার পর্যন্ত রংপুর এক্সপ্রেসের গতিবেগ ছিল ৭২ থেকে ৭৫ কিলোমিটার। এখন তা বাড়িয়ে ৭৫ থেকে ৮০ কিলোমিটার করা হয়েছে। যে সব স্টেশনে ট্রেন দাঁড়ানোর কথা নয় সে সব স্টেশন অতিক্রমকালে ট্রেনের গতিবেগ থাকে ৭৫ কিলোমিটার। মেইন লাইন থেকে লুপ লাইনে প্রবেশের সময় ফেসিং পয়েন্টগুলো এত দ্রুত গতির ট্রেনের জন্য খুবই ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করেন চালকরা। অনেকের মতে, কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি বোঝানোর চেষ্টা করেও ট্রেন চালকরা ব্যর্থ হয়েছেন। লালমনি এক্সপ্রেসের এক ট্রেন চালক বলেন, আমরা চলার পথে রেললাইনে অনেক ত্রুটিই দেখতে পাই, উপলব্ধি করি। সেটা কন্ট্রোলকে জানানোর পরেও কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয় না। তিনি বলেন, রেললাইন সরেজমিনে পরিদর্শনকালে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা ট্রলিতে ভ্রমণ করেন। এটা বাস্তবতাবির্বজিত। প্রকৌশলীরা ইঞ্জিনে ভ্রমণ করলে বুঝতেন কোন স্থানে ইঞ্জিন কতোটা ঝাঁকুনি খায়।

আরেক চালক আক্ষেপ করে বলেন, রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও প্রকৌশলীরা নিজেদের এতোটাই উচ্চ মর্যাদাপূর্ণ ভাবেন যে, তারা ফিল্ডের লোকজনের কথা শুনতেই চান না। বললে বিরক্ত হন। লিখিত দিলেও ব্যবস্থা নেন না। উল্লাপাড়ার দুর্ঘটনার কথা উল্লেখ করে ওই চালক বলেন, এই ফেসিং পয়েন্ট নিয়ে চালকদের অভিযোগ পশ্চিমাঞ্চলের পাকশি কন্ট্রোলে রেকর্ড আছে। কর্তৃপক্ষের উচিত সেটা বের করে কেনো ব্যবস্থা নেয়া হলো না তার জবাবদিহিতা চাওয়া। তা না হলে আরও যে সব দুর্ঘটনাপ্রবণ পয়েন্ট আছে সেগুলোতেও ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

 

 

 

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন